ঢাকা, মঙ্গলবার 29 May 2018, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ১২ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ভাসানীর ফারাক্কা আন্দোলন পানির দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল

জিবলু রহমান : [দুই]
মওলানা ভাসানী। তিনি আজীবন লড়াই করেছেন সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ, উপনিবেশিকতা, সাম্প্রদায়িকতা, নব-সাম্রাজ্যবাদ, ধর্ম নিরপেক্ষতার নামে ধর্মহীনতা প্রতিষ্ঠার চক্রান্তের বিরুদ্ধে। সংগ্রাম করেছেন পাকিস্তানী আধা-উপনেশিকতাবাদের কালো থাবা থেকে মাতৃভূমিকে মুক্ত করে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার। বিশ্ব শান্তির জন্য তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টা, শিক্ষা বিস্তারে ভূমিকা, আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন, ধর্মান্ধতা ও ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের মুখোশ উন্মোচন। কোথায় নেই মওলানা ভাসানী। পুরো দেশজুড়েই রয়েছে তার অবস্থান।
প্রায় পৌনে এক শতাব্দী ধরে উপ-মহাদেশের নিপীড়িত, নির্যাতিত, অবহেলিত, অত্যাচারিত মানুষকে আশা-আকাক্সক্ষার বাণী শুনিয়েছেন। শাসকের ভ্রুকুটি, শক্রর চোখ রাঙ্গানি, জেলজুলুমের মুখে অকম্পিত হৃদয়ের বিশাল মহিরুহের মতোই যিনি এদেশের মানুষকে অন্যায় অসত্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার বাণী শুনিয়েছেন।
মওলানা ভাসানীর জন্ম হয়েছিল পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জ শহরের এক ক্ষুদ্র পল্লীতে। তাঁর আত্মীয়-স্বজনও ঐ পল্লীতে বসবাস করেছেন। অখ্যাত পল্লীর এক সাধারণ পরিবারের সন্তান চেকা মিয়া পাক-ভারত উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ও পরবর্তীকালে পাকিস্তান-বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন তা তাঁর মাতা-পিতা বা আত্মীয়-স্বজন সম্ভবত কল্পনাও করতে পারেননি।
মওলানা ভাসানী ময়মনসিংহ জেলার টাঙ্গাইল মহকুমার অন্তর্গত কাগমারী গ্রামে এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে জীবনযুদ্ধে অবতীর্ণ হন। কিন্তু কাগমারী তাকে ধরে রাখতে পারেনি। যার দৃষ্টি সর্বব্যাপী তাঁকে শুধু কাগমারী আটকে রাখবেই বা কি করে! স্বাধীনতার ডাক এলো খেলাফত আন্দোলনের রূপ নিয়ে। মওলানা মোহাম্মদ আলী শওকত আলীর উদাত্ত আহ্বান যুবক আবদুল হামিদ খানের দেশপ্রেমকে উদ্বেলিত করে তুলল। খেলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনে মওলানা ভাসানী ঝাঁপিয়ে পড়লেন আত্মত্যাগের মহানমন্ত্রে দীক্ষা নিয়ে। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ভাসানীর আজীবন সংগ্রামের প্রথম অধ্যায় শুরু হলো।
৪০ দশকে বৃটিশ বিরোধী আজাদী আন্দোলন, ৫০ দশক ও ৬০ দশকে সর্বশেষ স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় ঐক্য রক্ষায় বারবার তিনি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর সচেতনা ও সদাজাগ্রত কন্ঠ বিভিন্ন সময়ের ক্রান্তিলগ্নে আমাদের আকাক্সিক্ষত পথের নিশানাই দেখিয়েছেন।
বাংলার রাজনৈতিক জগতে মওলানা ভাসানী আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সংগ্রামী নেতা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তিনি বিভিন্ন সময়ে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় পরিচয় হচ্ছে তিনি কৃষকের প্রশ্নাতীত নির্ভরশীল বন্ধু এবং নেতা।
তাঁর বর্ণাঢ্য ও কর্মময় জীবন কাহিনী কথার মালা গাঁথিয়ে শেষ করা যাবে না। মাত্র ২৬ বছর বয়সে তিনি বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতের আসামে চলে যান। সেখানে তখন অসমীয় ও বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীর মধ্যে খারাপ সম্পর্ক যাচ্ছিল। বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীর অধিকার ছিনতাই করছিল শাসকগোষ্ঠী। আসামে গমন করে মওলানা ভাসানী বাঙ্গালীদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নেতৃত্ব দেন। তারই প্রেরণায় ও সংগ্রামী জীবনাদর্শের ডাকে নিপীড়িত জনতার মাঝে বিদ্রোহের অগ্নি জ্বলে ওঠে। কেঁপে ওঠে বৃটিশ সরকারের ভিত। সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে কারাবন্দি করেন। বৃটিশ শাসনের অবসানের মাধ্যমে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের ইতিহাসে যাদের নাম উজ্জ্বল নক্ষত্রের মত লেখা থাকার যোগ্য মওলানা ভাসানী তাদের মধ্যেই পড়েন।
জমিদার-মহারাজাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে গিয়ে মওলানা ভাসানী একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার তাগিদ বোধ করেন এবং প্রথমে যোগ দেন ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসে। কিন্তু হিন্দু জমিদার-মহারাজাদের সমর্থনে কংগ্রেসের প্রকাশ্য অবস্থান তাঁকে নিরাশ করে এবং তিনি অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগে যোগ দেন। তাকে আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি করা হয়। ১৯৪৭ সালের আগস্টে পাকিস্তান ও ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের সময় পর্যন্তও তিনি ঐ পদে বহাল ছিলেন। বৃটিশ ভারতে মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক জীবন ছিল অত্যন্ত ঘটনাবহুল। জমিদার-মহারাজাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন পরিচালনার পাশাপাশি তিনি বৃটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামেও নেতৃত্ব দিয়েছেন। গ্রেফতারবরণসহ নানাভাবে নির্যাতিত হয়েছেন।
সিরাজগঞ্জের প্রজা সম্মেলনের মধ্য দিয়েই মওলানা ভাসানী বৃটিশ ভারতের রাজনীতিতে প্রথমবারের মতো ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছিলেন এবং প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন একজন দুর্দান্ত সাহসী ও মজলুম জননেতা হিসেবে।
১৯৩৪ সালে নওগাঁয় ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। সারা আসাম জুড়ে মওলানা ভাসানীর কী অবিরাম ছুটোছুটি বন্যা পীড়িতদের সাহায্যের জন্য। তাঁর সঙ্গে কাজ করেছিলেন মুনাও’র আলী ও কংগ্রেস নেতা বাবু বসন্ত কুমার দাস প্রমুখ। ভাসানীর অদম্য কর্মক্ষমতা ও মানুষের প্রতি সীমাহীন দরদ সেদিন ফুটে উঠেছিল তার উদ্দাম কর্ম তৎপরতায়। বন্যার ধ্বংসলীলায় উৎসাদিত মানবতার করুণ আর্তনাদে ব্যথিত, বিচলিত ভাসানীকে সেদিন আসামের মানুষ দেখেছে বন্যার্তদের দ্বারে দ্বারে দুঃখ-দুর্দশার সাথী হিসেবে। এই বিপদের বন্ধুকে ভুলতে পারেনি নওগাঁও এর মানুষ।
ধুবড়ী (আসাম) বিখ্যাত ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরে একটি ছোট্ট শহর; এক বর্গমাইল ক্ষেত্রফল বিশিষ্ট একটি উঁচু ভূমিতে অবস্থিত। ১৯৪১ সালের সেনসাস অনুসারে সেখানে ২২০০০ লোকের বসতির মধ্যে বেশীরভাগই ছিল হিন্দু। শহরের পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলো বাংলাদেশ থেকে আগত মুসলমান অধিবাসীতে পূর্ণ ছিল। ১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের কমিটি অফ এ্যাকশনের সভা, বেঙ্গল আসাম মোজাহিদ সম্মেলন, বেঙ্গল আসাম ন্যাশনাল গার্ডস কনফারেন্স, বেঙ্গল আসাম নওজোয়ান সম্মেলন এবং বেঙ্গল আসাম লিটারেরি কনফারেন্স ধুবড়ীতে (আসাম) অনুষ্ঠিত হয়। কলকাতায় সংবাদপত্রগুলোতে এই সংবাদ ফলাও করে প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে জানা গেল বাংলাদেশ থেকে অনেক মুসলিম লীগ নেতা উক্ত সম্মেলনসমূহে যোগদান করবেন। সম্মেলনগুলো অনুষ্ঠিত হবে ১৯৪৭ সালের ৩ ও ৪ মার্চ। কলকাতা থেকে আগত ‘মুসলিম লীগ উইমেনস ন্যাশনাল গার্ডস’ এর অনেক সদস্যসহ মুসলিম লীগের বহু নেতা, প্রতিনিধি ও অতিথিদের যাঁরা সম্মেলনে যোগদানের জন্য আসার কথা প্রচার হচ্ছিল তাঁদের সবারই থাকা-খাওয়ার জন্য সেখানে কোন হোটেলের ব্যবস্থা ছিল না। কিন্তু মওলানা ভাসানীর তত্ত্বাবধানে সম্মেলনে যোগদানেচ্ছুক সকল প্রতিনিধি ও অতিথিদের জন্য একটা রাজকীয় অভ্যর্থনার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সকল প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাদি এমন নিখুঁতভাবে করা হয়েছিল যে, কোথাও এতটুকু ত্রুটি ছিল না। খোলা মাঠ (যেখানে সম্মেলনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল) সেখানে অনেক নতুন চালা ঘর তৈরী হয়েছিল। মাঝখানে প্যান্ডেল। চালা ঘরগুলোতে অতিথিদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। মওলানা ভাসানী ঘুরে ঘুরে নিমন্ত্রিতদের সকল প্রকার সুবিধার দিকে নিজেই নজর রেখেছেন ও এ চালা ঘর থেকে ও চালা ঘরে ছুটোছুটি করেছেন। মওলানা ভাসানীর ব্যবস্থাপনা এমন নিখুঁত ছিল যে অতিথিদের এতটুকু অসুবিধা হয়নি।
মাহমুদ আলী লিখেছেন, ‘........(নির্যাতিত মানুষের নেতা মওলানা ভাসানী) সম্মেলনস্থল বিরাট এলাকা জুড়ে ছিল বহু মানব সন্তান-যারা বাংলাদেশের সামন্ত প্রভূদের মর্মান্তিক অত্যাচারে উৎপীড়িত হয়ে পূর্ব পুরুষদের দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। এই অসহায় দুর্ভাগারা আসামের জঙ্গলে এসে ডেরা বেঁধেছে। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে আগত এই হতভাগ্যরা ঝাড় জঙ্গল কেটে চাষাবাদ করে বিস্তীর্ণ অনাবাদী জমি শস্য শ্যামলা করে তুলুক; আসামের সম্পদ বৃদ্ধি করুক, আসাম সরকার তা চায় না, যুগ যুগান্তর ধরে বন্য জন্তুর বিচরণ ক্ষেত্র এই বিস্তীর্ণ এলাকাকে ‘‘সংরক্ষিত’’ করে রাখাই আসাম সরকারের নীতি, অসহায়ভাবে বিচরণরত এই সকল পুরুষ ও নারী দেখলো, মওলানা ভাসানী একদল বীর যুবক নিয়ে তাদের পক্ষে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। তাই এসেছে হাজার হাজার পুরুষ ও নারী। এই সম্মেলন তাদের জন্য এনেছে মুক্তির আহ্বান। মওলানা এখানে, সেখানে সর্বত্র ঘুরে বেড়াচ্ছেন আর তাঁর ভক্তদের মধ্যে অনেকেই তাঁর কদমবুচি করছে। শুধু তাই নয়, তাঁর অসংখ্য ভক্ত একটি করে টাকা তাঁকে নজরানা দিচ্ছেন, এক টাকার নোটের ছড়াছড়ি এবং এই টাকা দিয়েই তিনি সম্মেলনের বিপুল ব্যয় মোকাবিলা করেছিলেন এমন কি অন্য কোন টাকার তাঁর দরকার পড়েনি। অগণিত অতিথি প্রতিনিধি ও কর্মীদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন চাউল, তরকারি এবং রান্না বান্নার অন্যান্য সামগ্রীর। দেখা গেলো, এ সবেরও ব্যবস্থা হয়ে গেছে। তিনি নাকি তাঁর ভক্তদের আগেই বলে রেখেছিলেন এ সবের কথা। প্রচুর মাংস ও মাছও এসে গেছে। বাবুর্চিরা রান্না করছে। রান্না চলতেই লাগলো। অসংখ্য লোক খাচ্ছে। খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থাপনার জন্যে নিয়োজিত বহু সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক-অক্লান্ত পরিশ্রম করছে। মওলানা নিজে সবদিকে তদারক করছেন। অতিথিদের কোথায় একটুকু ত্রুটি হয় সে ভয়ে মওলানা সারাক্ষণ উদ্বিগ্ন। তিনি যে পর্যন্ত না সব কাজ নিজের চোখে দেখেছেন সে পর্যন্ত কিছুতেই সন্তষ্ট হতে পারছেন না। অভ্যর্থনা কমিটির চেয়ারম্যান খান বাহাদুর আবদুল মজিদ জিয়া উস্-সামস্ (আইনজীবী) এবং আমাদের আইন সভার প্রাক্তন সদস্য আমাকে জানালেন যে তিনি বৈকালে শহরের বিভিন্ন রাস্তা দিয়ে শোভা যাত্রা বের করার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করে ডেপুটি কমিশনারের নিকট আবেদন করেছেন। কিন্তু এখনো তার কোনো উত্তর পাননি। আমি জানতাম, হয়তো তিনি এর কোন উত্তর পাবেন না। যদিও বা উত্তর আসে, তাহলে তাঁর আবেদন না মঞ্জুরের বার্তা নিয়েই আসবে। আমরা সরকারের উচ্ছেদ নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন চালাচ্ছি। সুতরাং এই সরকারের অধীনে চাকরিরত একজন ডেপুটি কমিশনার কিছুতেই আমাদের অনুমতি দিতে পারেন না। তাই আমরা নিজেদের দায়িত্বেই একটি শোভাযাত্রা বের করতে মনস্থ করলাম। আমরা আর অনুমতির ধার ধারলাম না। শোভা যাত্রার কথা আগেই ঘোষণা করা হয়েছিল। সুতরাং এই শোভা যাত্রা বের করতেই হবে। শোভা যাত্রা বের হলো, শহরের ভেতর দিয়ে শোভা যাত্রা চলতে লাগলো। বহু সশস্ত্র পুলিশ মোতায়েন ছিল শহরের রাস্তাঘাটে। আমাদের শোভা যাত্রায় ছিল প্রায় বিশ সহস্রেরও অধিক লোক। আইন সভার বহু সদস্য এবং অভ্যর্থনা কমিটির চেয়ারম্যানসহ মওলানা ভাসানী শোভা যাত্রার পুরোভাগে থেকে তা পরিচালনা করতে লাগলেন। শোভা যাত্রায় বাংলাদেশ এবং আসামের মুসলিম লীগ ন্যাশনাল গার্ডস নেতৃত্ব করেন আই.এ. মুহাজির এবং সৈয়দ বদরুল হোসেন। দি উইমেন ন্যাশনাল গার্ডস দলকে পরিচালনা করেন মিসেস রোকেয়া আনোয়ার। আমাদের গোটা শহর ঘুরতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেল। শোভা যাত্রা প্যান্ডেলের দিকে ফিরছে। কিন্তু আমরা আমাদের প্যান্ডেল থেকে এক ফার্লং এর মতো পথ দূরে থাকতেই দেখতে পেলাম অস্ত্রে-শস্ত্রে সজ্জিত একটি বিরাট পুলিশবাহিনী শোভা যাত্রার পথ রোধ করে দাঁড়িয়েছে। অবস্থা ঘোলাটেই মনে হলো। আমি পুলিশ অফিসারকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমরা যখন আমাদের গন্তব্যস্থলের প্রায় পৌঁছে গেছি, তখন এভাবে পথ আটকানোর অর্থ কি? আমি তাঁকে আমাদের পথ ছেড়ে দিতে বললাম। কিন্তু তিনি জানালেন যে, ডেপুটি কমিশনারের আদেশ ছাড়া তিনি আমাদের পথ ছেড়ে দিতে পারেন না। আমি তাঁকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ডেপুটি কমিশনারের কাছ থেকে অনুমতি আনাবার জন্য বললাম। পুলিশ অফিসার ডেপুটি কমিশনারের নিকট অনুমতির জন্য নোট লিখে পাঠালেন। ইতিমধ্যেই মাগরিবের নামাজের সময় হয়ে এলো। আমরা সবাই রাস্তার ওপরই কাতার বন্দী হয়ে দাঁড়ালাম এবং নামাজ পড়লাম। নামাজের শেষে সেদিনের মোনাজাতটাই ছিল বিশেষ উল্লেখযোগ্য। মোনাজাতের দৃশ্য ছিল অত্যন্ত মর্মস্পর্শী। ইমাম দু’হাত তুলে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করলেনঃ আল্লাহ যেনো অসহায় গরীবদের বৈধ দাবী-দাওয়া পূরণের জন্য শত্রুদের বিরুদ্ধে তাদেরকে সাহায্য করেন এবং সকল অত্যাচার ও অবর্ণনীয় দুঃখ অবসানের জন্য তাদেরকে সকল প্রকার শক্তি যোগান। মোনাজাত শেষ হ্বার পরেই আসলো ডেপুটি কমিশনারের অনুমতি পত্র। আমরা সবাই আবার গন্তব্যস্থলের দিকে এগুতে লাগলাম। কিন্তু কিছু দূর গিয়েই নজরে পড়লো, বহু লোক ‘লাঠি, বল্লম’ ইত্যাদি হাতে নিয়ে মারমুখো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কারণ, তারা কার থেকে যেনো শুনেছে যে, আমাদের ওপর পুলিশ অত্যাচার করেছে এবং মওলানা ভাসানীসহ অনেকে আহত হয়েছেন। তাদের রাগ দুঃখের নিরসন হলো যখন মওলানা সশরীরে তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। আমরা প্যান্ডেলে ফেরার পর কিছুক্ষণের মধ্যেই সম্মেলন আরম্ভ হলো। প্রকা- প্যান্ডেল। তার একটুকু স্থানও খালি নেই। প্যান্ডেলের বাইরের খালি জায়গাতেও লোকে লোকারণ্য। মওলানা ভাসানী দাঁড়ালেন লাউড স্পীকারের সামনে।
মুহুর্মূহু জিন্দাবাদ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠলো আকাশ বাতাস। মওলানা ভাসানী পুরো দু’ঘন্টা ধরে বক্তৃতা দিলেন। তিনি দেশের ও জনসাধারণের সকল প্রকার সমস্যা নিয়ে আলোচনা করলেন। তিনি বললেন, ‘আসামের স্বাধীনতার জন্যে আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে-আসুন আমরা সবাই এই মহান সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করি। আমরা ইস্পীত স্বাধীনতা লাভের পূর্বে সংগ্রাম বন্ধ করব না।’
তাঁর বক্তৃতা কালে সবাই স্তব্ধ হয়ে তাঁর কথা শুনেছিল-অত বড় সভার কোথাও এতটুকু শব্দটি পর্যন্ত হয়নি। এই সম্মেলনে বাংলাদেশ থেকে মুসলিম লীগের নেতারাও বক্তৃতা করেন এবং অনেক উৎসাহের সঙ্গে একথাও ঘোষণা করেন যে, প্রস্তাবিত নিরুপদ্রব প্রতিরোধ আন্দোলনের সত্যাগ্রহে যোগদান করার জন্য হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবক আসামে পাঠানো হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ