ঢাকা, বুধবার 30 May 2018, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ১৩ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

অভিন্ন অন্যান্য নদী নিয়ে ভাববার অবসর কোথায়

উপরে : ভারতের টিপাইমুখ বাঁধ ও সারি বাঁধ এবং নিচে : মহানন্দা ব্যারেজ ও তিস্তা-মহানন্দা লিংক ক্যানেল। -ফাইল ফটো

সরদার আবদুর রহমান : গঙ্গার নায্য হিস্যার জন্য লড়াই করে ক্লান্ত বাংলাদেশের সামনে এখন তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে চলছে কেবলই হৈচৈ। অন্যদিকে আড়ালে থেকে যাচ্ছে আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প, বরাক নদীতে টিপাইমুখ ও ফুলেরতল ব্যারেজ ও মহানন্দা নদীতে দেয়া পানি প্রত্যাহার প্রকল্প। আর আলোচনার মুখ দেখারই সৌভাগ্য মিলছে না মনু প্রকল্প, সারি নদী প্রকল্প, সোমেশ্বরী নদী প্রকল্পসহ অন্যান্য অভিন্ন নদীর ভবিষ্যত নিয়ে। ভারতের এসব একতরফা পানি প্রত্যাহারমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে নিরবতায় জনমনে প্রশ্ন উঠছে।
গত ২৬ মে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পশ্চিমবঙ্গ সফরকালে তাঁর সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় বৈঠক করেন। এসময় তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে চূড়ান্ত বা কাছাকাছি কিছু একটা হওয়ার বিষয়ে জোর আলোচনা ছিলো। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেছিলেন, মমতার সঙ্গে হাসিনার বৈঠকের মূল কারণ হয়তো সেটাই ছিল। কিন্তু বৈঠকের পর উভয়েই এ বিষয়ে নিরবতা পালন করেন। জানালেন এটা একান্তই সৌজন্য সাক্ষাৎ। উভয়ের মধ্যেই বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। ফলে তিস্তা নিয়ে না ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর তরফে কিছু পাওয়া গেলো আর না মুখ্যমন্ত্রীর কাছ থেকে কোন আশার বাণী শোনা গেলো। বিষয়টি শেষ পর্যন্ত বরাবরের মতো ঝুলেই থাকলো বলে ভাষ্যকাররা মনে করেন। এদিকে উজানে পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করায় প্রমত্তা পদ্মা এখন মরা খালে পরিণত হতে থাকলেও গঙ্গার নায্য হিস্যার জন্য লড়াই করে যেন ক্লান্ত বাংলাদেশ। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর করা সেই চুক্তিটির ২২ বছর অতিক্রান্ত হলেও আর রিভিউ করারও কোন উদ্যোগ নেই। এনিয়ে আর কোন কথাও উঠে না। চুক্তিতে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে, শুষ্ক সময়ে বাংলাদেশ ৩৫ হাজার কিউসেক পানি পাবে। কিন্তু বাংলাদেশ কোনো বছরই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পানি পায়নি। চুক্তিতে বলা হয়েছে, এই চুক্তি পাঁচ বছর পরপর উভয় সরকার রিভিউ করবে। যদি প্রয়োজন হয় অন্তরবর্তীকালীন রিভিউ করা যাবে। চুক্তিতে আরো বলা হয়েছে, আগামী দুই বছর পর যদি কোনো পক্ষ চুক্তিটি রিভিউ করতে চায় তা করা হবে। সমঝোতার ব্যত্যয় ঘটলে বা সমন্বয়ের অভাব  দেখা দিলে এই রিভিউ হবে। ফারাক্কায় যে পানি জমে তাই ভাগ করে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু গঙ্গার পুরো পানির ভাগাভাগির প্রসঙ্গ চুক্তিতে উল্লেখ নেই। ফলে চুক্তির পানি দিয়ে বাংলাদেশের চাহিদার অর্ধেকও পূরণ হচ্ছে না। ফলে চুক্তির রিভিউ করা জরুরি হয়ে পড়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।
টিপাইমুখ বাঁধ : টিপাইমুখ বাঁধ বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের ১০০ কিলোমিটার উজানে ভারতের বরাক নদীর ওপর নির্মিত একটি বাঁধ। টিপাইমুখ নামের গ্রামে বরাক এবং টুইভাই নদীর মিলনস্থলের ১,৬০০ ফুট দূরে বরাক নদীতে ৫০০ ফুট উঁচু ও ১,৬০০ ফুট দীর্ঘ বাঁধ নির্মাণ করে ১,৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে ভারত সরকার কাজ শুরু করে। অভিন্ন নদীর উজানে এই বাঁধ ভাটির বাংলাদেশের পরিবেশ আর অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন বিশেষজ্ঞরা। এছাড়াও বরাক নদীতে টিপাইমুখ ছাড়াও ভারত আরো প্রকল্প বাস্তবায়ন করে চলেছে। এই নদীতে তারা ইতোমধ্যে ‘ফুলেরতল ব্যারেজ’ নির্মাণ করেছে। সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য এই ব্যারেজ তৈরি করা হলেও এর ফলে বাংলাদেশের সুরমা ও কুশিয়ারায় পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। টিপাইমুখ ড্যাম থেকে ১০০ কিলোমিটার পরে এবং বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে আসামের কাছাঢ় জেলার ফুলেরতল নামক স্থানে এই ব্যারেজের অবস্থান। ১৯৯০ সালে এটি নির্মিত হয়। বরাক নদীর ডান তীরে নির্মিত এই ব্যারেজের ড্রেনেজ এলাকার আয়তন ১৪,৪৫০ বর্গকিলোমিটার। এর মাধ্যমে একদিকে আসামের বিস্তীর্ণ এলাকায় সেচের ব্যবস্থা করা হচ্ছে, অন্যদিকে বন্যা নিয়ন্ত্রণও করা হচ্ছে। বরাক নদীর উপর নির্মিত হবার ফলে স্বাভাবিকভাবেই এর শাখা সুরমা ও কুশিয়ারায় পানিপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। বরাককেন্দ্রিক এসব প্রকল্পের প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের অন্তত ৪টি প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এগুলো হচ্ছে, আপার সুরমা-কুশিয়ারা রিভার প্রজেক্ট, সুরমা রাইট ব্যাংক প্রজেক্ট, সুরমা-কুশিয়ারা-বাউলাই বেসিন প্রজেক্ট এবং কুশিয়ারা বিঝনা ইন্টারবেসিন প্রজেক্ট। বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ নদী মেঘনা বরাক তথা সুরমা-কুশিয়ারার সাথে সরাসরি যুক্ত বলে মেঘনার প্রবাহ হ্রাসের আশঙ্কা করা হচ্ছে। মেঘনার প্রবাহ হ্রাস পেলে এই অঞ্চলের কৃষি, মৎস্যসহ মানুষের নদীকেন্দ্রিক জীবনধারায় অস্বাভাবিক পরিবর্তন আসবে; এমনকি উজানের পানিপ্রবাহ হ্রাসের কারণে সাগর থেকে লবণাক্ততা উঠে আসার মত পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কাও রয়েছে। টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের ফলে বাঁধের উজান ও ভাটিতে স্বাভাবিক প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, ভাটি অঞ্চলে প্লাবন সমভূমি নষ্ট, মৎস্যসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর চলাচল, পলি ও পুষ্টি উপাদানের প্রবাহ বিঘ্নিত হবে- যা বাঁধের নিকটবর্তী এলাকা থেকে শুরু করে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃৃত হতে পারে। ভারতের মণিপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক জানিয়েছেন, এ বাঁধের কারণে রিখটার স্কেলের ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে এর পার্শ্ববর্তী ২০০ বর্গকি.মি. এলাকা ধ্বংসস্তুপে পরিণত হতে পারে।
আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প : বিভিন্ন নদীর পানি এক স্থান হতে অন্য স্থানে সরিয়ে নেয়ার জন্য উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ৩৭টি নদীর মধ্য দিয়ে ৩০টি সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে চলেছে ভারত। এই পরিকল্পনার বিশেষ দিক হচ্ছে নদীর এক বেসিন হতে অন্য বেসিনে পানি স্থানান্তর। অর্থাৎ যেখানে পানির ঘাটতি রয়েছে সেখানে উদ্বৃত্ত বেসিন থেকে পানি স্থানান্তর করা। এজন্য ১২০০ কিমি দীর্ঘ ৩০টি খাল খননের মাধ্যমে ৩০টি সংযোগ চিহ্নিত করা হয়েছে। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী বর্ষার সময় অতিরিক্ত পানি সঞ্চিত রাখার জন্যে সারা দেশে মোট ৭৪টি জলাধার ও বেশ কিছু বাঁধ নির্মাণ করা হবে। ফলে বর্ষার সময়ের সঞ্চিত পানি শুকনো মৌসুমে বিভিন্ন স্থানে কৃষি ও অন্যান্য কাজের জন্য সরবরাহ করা যাবে। বহুল আলোচিত আন্তঃনদী সংযোগ কার্যক্রমের আওতায় গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা বেসিনের ৩৭টি নদীর মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে এসব নদীর পানি ব্যাপকহারে প্রত্যাহার করে নেবে। প্রকল্পের আওতায় ১৭ হাজার ৩০০ কোটি ঘনমিটার পানি গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র থেকে প্রত্যাহার করে ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ অঞ্চলের শুকনো এলাকায় নিয়ে যাওয়া হবে। ভারতের এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো, দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর এই পানি প্রবাহ ব্যবহার করে ১২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার খাল খনন, সাড়ে ৩ কোটি হেক্টর জমিতে সেচ প্রদান এবং ৩৪ হাজার মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদন। এই বিশাল প্রকল্পের বাস্তবায়ন ইতোমধ্যে শুরু হয়ে এগিয়ে চলেছে। কিন্তু বাংলাদেশের বিশাল ভূভাগজুড়ে যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে- সে ব্যাপারে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে কোন আলোচনার উদ্যোগ আদৌ লক্ষ্য করা যায় না।
মনু নদীর পানি নিয়ন্ত্রণ : বহু আগেই মনু নদীর উজানে ত্রিপুরা রাজ্যের কেলা শহরের কাছে কাঞ্চনবাড়িতে একটি বাঁধ নির্মাণ করেছে ভারত। ওই বাঁধ থেকে তারা মনু নদীর পানি একতরফা নিয়ন্ত্রণ করছে। ধলার উজানে ত্রিপুরার কুলাইয়ে একটি বাঁধ নির্মাণের ফলে মনু ও ধলা শুকনো মৌসুমে থাকে পানিশূন্য। পিয়াইন নদীর মাতৃনদী ডাউকি নদীর পশ্চিম তীরে ৪৩ মিটার লম্বা, ৯ মিটার চওড়া ও ৯ মিটার উঁচু গ্রোয়েন নির্মাণ করেছে। এ গ্রোয়েনের কারণে জাফলং কোয়ারিতে পাথর আসার পরিমাণ কমে গেছে। খোয়াই নদীর উজানে ত্রিপুরা রাজ্যের চাকমাঘাটে ও কল্যাণপুরে দু’টি বাঁধ নির্মাণ করে পানি প্রত্যাহার করে নেয়া হচ্ছে। খোয়াইর ভারতীয় অংশে শহর প্রতিরক্ষার নামে স্পার নির্মাণ করে নদীকে বাংলাদেশ ভূখণ্ডের দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে। কুশিয়ারায় গ্রোয়েন নির্মাণ করে এর স্রোত ঠেলে দিয়েছে বাংলাদেশের দিকে। এই বিষয়েও কোন দ্বিপাক্ষিক আলোচনা দৃশ্যমান নয়।
সারি নদীতে বাঁধ : সীমান্ত নদী সারি বা সারিগোয়াই। মাইনটডু এবং লিমরিয়াং নদীর মিলিত স্রোত সারি গোয়াইন নদীর নাম নিয়ে সিলেটের জৈন্তাপুরের লালাখাল নামক স্থান দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। মেঘালয় রাজ্য বিদ্যুৎ বোর্ড এ প্রকল্পের ৩টি ইউনিট থেকে ৪২ মেগাওয়াট করে মোট ১২৬ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করার জন্য বাঁধ দিয়েছে। ড্যামটির উচ্চতা ৫৯ মিটার। ড্যামের স্থাপনার মধ্যে রয়েছে লেসকা পয়েন্টে জলাধার এবং এর সঙ্গে ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ কন্ডাক্টর সিস্টেম। যাতে আছে প্রেসার টানেল এবং পেনস্টেক পাইপ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বাঁধের জলাধারে তারা ইচ্ছামত পানি ধরে রাখতে পারবে এবং প্রয়োজনে ছেড়ে দিতেও পারবে। ফলে বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের সারি নদীতে শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাব দেখা দেবে এবং বর্ষাকালে ভাটির দেশ বাংলাদেশ অতিপ্লাবনের মুখে পড়বে। এ বাঁধ দিয়ে পানি প্রবাহ বন্ধ করায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশে। বর্ষা মৌসুমে সারি নদীতে উজানের ঢল নামে না। ফলে সীমান্তবর্তী হরিপুর হাওরসহ জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জের হাওর-বাঁওড়, বিল-ঝিল ও খালে পর্যাপ্ত পানি থাকে না। বলা বাহুল্য এনিয়েও কোন উচ্চবাচ্য শোনা যায় না।
সামেশ্বরীতে সেচ-বিদ্যুৎ প্রকল্প : বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদী সোমেশ্বরীর মূল প্রবাহ সিমসাং নদীর উপর ভারত একটি বৃহদাকার সেচ ও বিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের পূর্বাঞ্চলের নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে। ভারতের মেঘালয়ের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এই নদী স্থানীয়ভাবে ‘সিমসাং’ নামে পরিচিত। সোমেশ্বরীর মূলধারা তার উৎসস্থলে প্রায় বিলুপ্ত। বর্ষা মওসুম ছাড়া অন্য কোন মওসুমে পানি প্রবাহ থাকে না। বাংলাদেশের অন্যতম সীমান্ত নদী সোমেশ্বরীর উপনদীর মধ্যে রয়েছে, চিবক, রংদিক, রম্পা ও রিংদি। ভারতের ব্রহ্মপুত্র বেসিন বোর্ড ব্রহ্মপুত্রকেন্দ্রিক যে বিপুল সংখ্যক প্রকল্প বাস্তবায়ন করে চলেছে ‘সিমসাং বহুমুখি প্রকল্প’ তার অন্যতম। মেঘালয়ের পূর্ব গারো পাহাড় জেলার ননগাওলবিরা উপশহরের কাছে রংখান্দি নামক স্থানে এই ড্যাম নির্মাণ করা হয়। এমনিতেই সোমেশ্বরীর মূলধারা তার উৎসস্থলে প্রায় বিলুপ্ত। বর্ষা মওসুম ছাড়া অন্য কোন মওসুমে পানি প্রবাহ প্রায়ই থাকে না। এখন ভারতীয় প্রকল্পের ফলে বাংলাদেশের সোমেশ্বরী ও তার শাখা-প্রশাখাগুলি পুরোপুরি বিপন্ন্ হয়ে পড়বে। এই সঙ্গে নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
মহানন্দাকেন্দ্রিক প্রকল্প : বাংলাদেশের তেঁতুলিয়া সীমান্তের বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্টের পশ্চিম-উত্তর কোণে মহানন্দা নদীর ওপর বিশাল এক বাঁধ নির্মাণ করেছে ভারত। ১৯৭৯-৮০ সালে ‘তিস্তা-মহানন্দা প্রকল্প’র আওতায় ‘ফুলবাড়ি ব্যারেজ’ নামে খ্যাত এই বাঁধটি তৈরি হয়। এর মাধ্যমে ভারত একদিকে তিনটি ইউনিটে সাড়ে ২২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে, অন্যদিকে ৬৭৫ বর্গকিলোমিটার এলাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ করছে। এই সঙ্গে প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুমে ফিডার ক্যানেলের সাহায্যে পানি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার রাজ্যের বিভিন্ন স্থানের সেচ কাজ করছে। বিপরীতে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকার ভুগর্ভস্থ পানি নিচে নেমে যাওয়ার কারণে সেচ কাজ বিঘ্নিত হচ্ছে। বাঁধের মাধ্যমে পানি আটকে রাখায় শুষ্ক মওসুমে জেলার নদ-নদীগুলিকে মরা নদীতে পরিণত করছে। মহানন্দার স্বাভাবিক স্রোতধারা ও প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করার ফলে সেগুলি এখন মৃতপ্রায় পরিণতির শিকার। এসব নদীর মধ্যে আছে, চাওয়াই, তালমা, পাঙ্গা, কুড়ুম  পাম্প, ভেরসা, ডাহুক, তীরনই, রণচণ্ডি, বেরং, জোড়াপানি, ঘোড়ামারা, নাগর, সিঙ্গিয়া, ঘাগরা, বুড়িতিস্তা প্রভৃতি। পঞ্চগড় জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত উজান থেকে নেমে আসা  বেশ কয়েকটি নদীর উৎসমুখ হচ্ছে ভারত। কিন্তু ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নদী শাসন আইন উপেক্ষা করে নদীগুলির উৎস এবং প্রবেশমুখে বাঁধ, স্লুইসগেইট, জলাধার, ফিডার ক্যানেল ও রেগুলেটর নির্মাণ করে পানির স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন এবং ২২১ কিলোমিটার সীমান্তব্যাপী বেড়িবাঁধ নির্মাণ করেছে। এছাড়াও মহানন্দা প্রধান ক্যানেলের উপর দু’টি স্টেশন বিশিষ্ট একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও নির্মাণ করেছে ভারত। এতে ২২.৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। এর তিনটি টারবাইনে ৩৩০ ঘনমিটার পানি নেয়া হচ্ছে। এর পরিণতিতে ভরা বর্ষা মৌসুমেও এসব নদীতে পানি থাকে না। মাঝেমধ্যে বৃষ্টিপাত হলেও উৎসমুখ থেকে পানির প্রবাহ না থাকায় নদীগুলো শুকিয়ে যায়। নদীগুলোর পানির প্রবাহ স্বাভাবিক না হওয়ায় শুকনো মৌসুমে পানির স্তর আরো নিচে নেমে যায়। এতে সেচ ব্যবস্থা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। জীববৈচিত্র্যের ওপরেও বিরূপ প্রভাব পড়ে।
তিস্তা-মহানন্দা সংযোগ : ভারত তিস্তা ক্যানেল পাওয়ার হাউজ নামে তিন স্তরে প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়িতে তিস্তা মিলিত হয়েছে ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে এবং তিস্তার পানি ব্রহ্মপুত্রের পানির প্রবাহ বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে। এই শিলিগুড়ির কাছে তৈরি ক্যানেল মহানন্দা ব্যারেজে মিলিত হয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন তিস্তার পানি মহানন্দায় নেয়া যাচ্ছে। আবার এই ক্যানেলের উপর পাওয়ার হাউজও নির্মাণ করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ অভিমত : এবিষয়ে বিশিষ্ট নদী গবেষক ও গ্রন্থ রচয়িতা হেরিটেজ রাজশাহীর সভাপতি মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, ভারত তার অভ্যন্তরে বাংলাদেশমুখী প্রতিটি নদ-নদীতেই নানান প্রকল্প তৈরি করে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে চলেছে- এটা সকল মহলেরই জানা। কিন্তু বাংলাদেশের দৃঢ়তার অভাবে পুরো বিষয় নিয়ে কখনোই আলাপ-আলোচনা বা দাবী উত্থাপিত হতে দেখা যায় না। এটি আসলে একটি প্যাকেজের অন্তর্ভুক্ত করে উত্থাপিত হওয়া উচিত। কিন্তু রহস্যজনক কারণে তা হতে পারছে না। ফলে পুরো বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশের বিপর্যয়ের আশঙ্কা বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ