ঢাকা, বুধবার 30 May 2018, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ১৩ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

দুই মামলায় খালেদা জিয়ার জামিন স্থগিত

স্টাফ রিপোর্টার : কুমিল্লায় নাশকতার দুই মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে হাইকোর্টের দেওয়া ছয় মাসের জামিন আদেশ স্থগিত করেছেন সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার আদালত। একইসঙ্গে মামলা দুটি আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানির জন্য আগামীকাল ৩১ মে দিন ধার্য করেছেন আদালত।
গতকাল মঙ্গলবার রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের শুনানি নিয়ে চেম্বার বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী এ আদেশ দেন। এদিকে ঢাকার দুই মামলায় জামিন বিষয়ে আদেশের জন্য দিন ধার্য করেছে হাইকোর্ট।
আদালতে খালেদা জিয়াকে দেওয়া হাইকোর্টের জামিন আদেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষে আপিল শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। অন্যদিকে খালেদা জিয়ার পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন। তার সঙ্গে ছিলেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন প্রমুখ।
আর নড়াইলের মানহানি মামলার জামিন আবেদন উত্থাপিত হয়নি বলে খারিজ করে দিয়েছেন আদালত। গত সোমবার বিচারপতি একেএম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি জেবিএম হাসানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ড. মো. বশির উল্লাহ ও একেএম দাউদুর রহমান মিনা। আর খালেদা জিয়ার পক্ষে ছিলেন আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন, এ জে মোহাম্মদ আলী, জয়নুল আবেদীন, মাহবুব উদ্দিন খোকন প্রমুখ।
এর আগে গত ২৮ মে কুমিল্লার নাশকতার দুই মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ছয় মাসের জামিন দেন হাইকোর্ট। আর নড়াইলের মানহানি মামলার জামিন আবেদন উত্থাপিত হয়নি মর্মে খারিজ করে দেন। বিচারপতি একেএম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি জেবিএম হাসানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
আদেশের পর কুমিল্লার মামলার বিষয়ে খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, একটিতে ছয় মাসের জামিন দিয়ে রুল দিয়েছেন আদালত। অন্যটিতে ছয় মাসের জামিন দিয়েছেন।
নড়াইলের মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে আবেদন করেছিলাম। সেখানে ম্যাজিস্ট্রেট আদেশ দেননি। পরে আমরা হাইকোর্টে আবেদন করেছি। এটা জামিনযোগ্য অপরাধ। হাইকোর্টও জামিন দিতে পারে। তখন আদালত আমাদের বলেছেন, জজকোর্ট (মামলাটির বিচারিক আদালত) ঘুরে আসেন। জজ কোর্ট কোনও আদেশ না দিলে আমরা দেখবো।’
এর আগে গত ২০ মে কুমিল্লা ও নড়াইলের পৃথক তিন মামলায় হাইকোর্টের অনুমতির পর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পক্ষে জামিন আবেদন দাখিল করা হয়। এরপর গত ২১ মে আদালতে খালেদা জিয়ার দুই মামলায় জামিন শুনানির দিন ধার্য থাকলেও প্রস্তুতি না থাকার বিষয়টি আদালতকে অবহিত করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। এরপর আদালত তার আবেদন মঞ্জু করে এ বিষয়ে গত ২২ মে শুনানির দিন ধার্য করেছিলেন। এদিন আংশিক শুনানি নিয়ে মামলাটির ২৩, ২৪ ও ২৭ মে আবারও শুনানি হয়। সেই শুনানি শেষে আদালত সোমবার খালেদা জিয়াকে ছয় মাসের জামিন আদেশ দেন। এরপর সে আদেশ স্থগিত চেয়ে একইদিন রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করে। সেই আপিলের শুনানি নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার আদালত হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানির দিন ধার্য করেন। মামলা তিনটি হলো:
কুমিল্লায় দায়ের করা হত্যা মামলা
২০১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে একটি বাসে পেট্রোলবোমা নিক্ষেপ করা হয়। এই ঘটনায় সাতজন যাত্রী মারা যান এবং আরও ২৫/২৬ জন গুরুতর অসুস্থ হন। ঘটনায় পরদিন (৩ ফেব্রুয়ারি) বিকাল তিনটায় চৌদ্দগ্রাম থানার এসআই নুরুজ্জামান ৫৬ জনের বিরুদ্ধে বাদী হয়ে মামলা করেন। পরে এ মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। বিচারকালে দায়রা জজ আদালতে খালেদা জিয়ার জামিন চেয়ে আবেদন করা হয়। সেই জামিন আবেদনের পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ৭ জুন দিন ধার্য রাখা হয়েছে। কিন্তু এ অবস্থায় গত ৫ এপ্রিল এ মামলায় খালেদা জিয়াকে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়। তাই ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৮ ধারায় হাইকোর্টে জামিন চেয়ে আবেদন করা হয়েছে।
অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের অভিযোগে কুমিল্লায় মামলা
২০১৫ সালের ২৫ জানুয়ারি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের হায়দার পুলের কাছে চৌদ্দগ্রামে একটি কাভার্ড ভ্যানে অগ্নিসংযোগ ও আশপাশে বেশ কিছু গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরে এই ঘটনায় ২০১৫ সালের ২৫ জানুয়ারি চৌদ্দগ্রাম থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে নাশকতার অভিযোগে মামলা হয়। ২০১৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারিতে এই মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। খালেদা জিয়াসহ ৩২ জনকে এ মামলায় আসামী করা হয়।
মামলাটি বর্তমানে কুমিল্লার বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ১-এ বিচারাধীন রয়েছে। ২০১৭ সালের ৯ অক্টোবর এ মামলায় অভিযোগ আমলে নেন আদালত। পরে গত ২৩ এপ্রিল এ মামলায় জামিন চেয়ে আবেদন করা হয়। কিন্তু আদালত আবেদনটির পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ৭ জুন দিন ধার্য় রাখেন। কিন্তু এ অবস্থায় শুনানি না করে এই মামলায় জামিন চেয়ে হাইকোর্টে আপিল আবেদন করা হয়েছে।
মানহানির অভিযোগে নড়াইলে মামলা
২০১৫ সালের ২১ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেন খালেদা জিয়া। এ ঘটনায় একই বছরের ২৪ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে নড়াইলে মানহানির মামলা করা হয়। স্থানীয় এক মুক্তিযোদ্ধার সন্তান রায়হান ফারুকী ইমাম বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন।
নড়াইলের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে। মামলাটিতে এ বছরের ১৬ এপ্রিল খালেদা জিয়ার জামিন চেয়ে তার আইনজীবীরা আবেদন করেন। কিন্তু বিচারক বাদীর উপস্থিতিতে জামিন শুনানির জন্য গত ৮ এপ্রিল শুনানির পরবর্তী দিন ধার্য করেছিলেন। এরপর নির্ধারিত দিনে শুনানি নিয়ে পুনরায় জামিন শুনানির জন্য ২৫ মে দিন ধার্য করেছিলেন আদালত। এ অবস্থায় চলমান মামলায় খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা তার জামিন চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেন।
দুই মামলায় জামিনের আদেশ বৃহস্পতিবার
বাংলাদেশের মানচিত্র, জাতীয় পতাকা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে জন্মদিন পালনের দুটি পৃথক অভিযোগে ঢাকায় দায়ের করা মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিন আবেদনের বিষয়ে বৃহস্পতিবার (৩১ মে) আদেশের দিন ধার্য করেছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে ওইদিন জামিনের বিষয়ে রাষ্ট্রে পক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের শুনানি শেষে এ আদেশ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন আদালত।
গতকাল মঙ্গলবার বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
আদালতে খালেদা জিয়ার জামিন আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন ও এজে মোহাম্মদ আলী। তাদের সঙ্গে ছিলেন ব্যারিস্টার এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন, ব্যারিস্টার একেএম এহসানুর রহমান, অ্যাডভোকেট মো. মাসুদ রানা প্রমুখ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ফরহাদ হোসেন, এএম আমিন উদ্দিন প্রমুখ।
এর আগে গত ২২ মে ওই দুই মামলায় জামিন চেয়ে আদালতে অনুমতি চান খালেদা জিয়ার আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন। সেই আবেদন দুটি গতকাল মঙ্গলবার (২৯ মে) শুনানির জন্য দিন ধার্য ছিল। কিন্তু শুনানি না হওয়ায় মামলা দুটি বৃহস্পতিবার (৩১ মে) শুনানির জন্য দিন নির্ধারণ করেন হাইকোর্ট। মামলা দুটি হলো
মানচিত্র, জাতীয় পতাকা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃতির অভিযোগ
আদালত সূত্র জানায়, বাংলাদেশের মানচিত্র, জাতীয় পতাকা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করার অভিযোগে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ২০১৬ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্টেট আদালতে মানহানির মামলা করেন বাংলাদেশ জননেত্রী পরিষদের সভাপতি এবি সিদ্দিকী। এ মামলায় ২০১৭ সালের ১২ নভেম্বর তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা ইস্যু করা হয়। এরপর গত ১২ এপ্রিল আইনজীবীরা এ মামলায় তার জামিন চান। এরপর গত ১৭ মে আদালত তৃতীয় দফায় সময় পিছিয়ে আদেশের জন্য আগামী ৫ জুলাই আদেশের জন্য দিন ধার্য করেছেন। এ অবস্থায় তার জামিন চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করা হয়।
মিথ্যা তথ্য দিয়ে জন্মদিন পালনের অভিযোগ
মিথ্যা তথ্য দিয়ে জন্মদিন পালনের অভিযোগে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গাজী জহিরুল ইসলাম ২০১৬ সালের ৩০ আগস্ট খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অন্য মামলাটি করেন। এ মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ২০১৬ সালের ১৭ নভেম্বর গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। এরপর গত ২৫ এপ্রিল এ মামলায় খালেদা জিয়া জামিন চেয়ে আবেদন করেন। কিন্তু জামিন না দিয়ে ১৭ মে শুনানির দিন নির্ধারণ করেছিলেন আদালত। পরবর্তীতে ওই তারিখে তার গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকরের আদেশ দিয়ে ৫ জুলাই জামিন বিষয়ে আদেশের দিন ধার্য করা হয়। এ অবস্থায় তার জামিন চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করা হয়।
আমি জ্যোতিষী নই - এটর্নী জেনারেল
চেম্বার আদালতে স্থগিত হওয়া কুমিল্লার দুই মামলায় খালেদা জিয়ার জামিন আপিলে বহাল থাকলে তিনি মুক্তি পাবেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, আমি জ্যোতিষী নই। তাই বলতে পারবো না যে খালেদা জিয়া কবে মুক্তি পাবেন বা পাবেন না। এটা সম্পূর্ণ আদালতের বিষয়।
মঙ্গলবার কুমিল্লার দুই মামলায় খালেদা জিয়াকে হাইকোর্টের দেয়া জামিন আদেশ আপিল বিভাগের চেম্বার জজ আদালতে স্থগিত হওয়ার পর নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, হাইকোর্ট খালেদা জিয়াকে দুটি মামলায় জামিন দিয়েছিল। এর প্রেক্ষিতে সোমবার (২৮ মে) আপিল বিভাগে যে প্রভিশনাল লিভ পিটিশন করেছিলাম, সেটির উপর আজ (২৯ মে) শুনানি হয়েছে। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে ৩১ মে আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চ শুনানির দিন ধার্য করেছেন। সে অবধি হাইকোটের্র দেয়া জামিন আদেশের কার্যকারিতা স্থগিত রাখা হয়েছে।
সরকারের সদিচ্ছা না হলে খালেদা জিয়া মুক্তি পাবেন না বলে তার আইনজীবীদের বক্তব্যের জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এ ধরনের বক্তব্য আদালত অবমাননাকর। কারণ, এ দেশে আদালত আছে। আদালত জামিন দিচ্ছে, আবার জামিন স্থগিতও করছে।
তিনি খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের উদ্দেশ্যে বলেন, তাদেরকে মামলায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে এবং যে সব তথ্য-উপাত্ত আছে তার উপর নির্ভর করেই বক্তব্য দিতে হবে, যুক্তিতর্ক করতে হবে। মুখরোচক বক্তব্য দিয়ে কোনো লাভ হবে না। তবে এতটুকু বলতে পারি, এ ধরনের অপরাধ করে পৃথিবীর কোনো দেশের কোনো রাষ্ট্রপ্রধান পার পেত না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ