ঢাকা, বুধবার 30 May 2018, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ১৩ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বর্তমান কমিশন বাতিল করে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে -মির্জা ফখরুল

গতকাল মঙ্গলবার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাত বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : বর্তমান নির্বাচন কমিশন বাতিল করে অবিলম্বে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছে বিএনপি। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে এক আলোচনা সভায় দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলের এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। তিনি বলেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশন একেবারে অথর্ব, এই সরকারের বংশবদ কমিশন। এরা একটি নির্বাচন পরিচালনা করতে পারে না। কথায় কথায় সরকারি দলের ধমকের মধ্য দিয়ে যারা আইন পরিবর্তন করে সেই নির্বাচন কমিশনকে অবশ্যই বাতিল করে দিয়ে পুনঃগঠন করতে হবে। তা না হলে এখানে কোনো নির্বাচন হবে না। আমি পরিষ্কার বলছি, আমরা চাই অবিলম্বে এই নির্বাচন কমিশনকে বাতিল করে দিয়ে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করা হোক, নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন করা হোক। যারা একটা সুষ্ঠু নির্বাচন কমিশন পরিচালনা করতে পারে। খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের পর বিএনপির তরফ থেকে নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগ দাবি করা হলেও এই প্রথম নতুন নির্বাচন কমিশনের দাবি আসলো।
রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশন মিলনায়তনে বিএনপির উদ্যোগে দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ৩৭তম শাহাদাত বার্ষিকী উপলক্ষে এই আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে এক দল সেনা বাহিনীর হাতে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিহত হন।
দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুলের সভাপতিত্বে ও প্রচার সম্পাক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানির পরিচালনায় আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন দলের স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ড. খন্দকার মোশমাররফ হোসেন। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বও চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, ভাইস চেয়ারম্যান হাফিজউদ্দিন আহমেদ, বেগম সেলিমা রহমান, যুগ্ম মহাসচিব, খায়রুল কবির খোকন,  মহিলা বিষয়ক সম্পাদক নুরে আরা সাফা, যুব দলের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মোরতাজুল করীম বাদরু, স্বেচ্ছাসেবক দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান, ছাত্র দলের এজমল হোসেন পাইলট প্রমুখ। অনুষ্ঠানে দলের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান, এজেডএম জাহিদ হোসেন, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আবুল খায়ের ভুঁইয়া, নাজমুল হক নান্নু, সিরাজউদ্দিন আহমেদসহ কেন্দ্রীয় ও অঙ্গসংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
একাদশ নির্বাচনে অংশ গ্রহণের পর দলের অবস্থান তুলে ধরে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন,  আমাদের দাবি পরিষ্কার যে, আমরা দেশনেত্রীকে ছাড়া কোনো নির্বাচনে যাবো না, এদেশের কোনো নির্বাচন হবে না। অবশ্যই তাকে মুক্ত করতে হবে। এই সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে, সংসদ ভেঙে দিতে হবে, নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে। সেনাবাহিনী মোতায়েন করে নির্বাচন করতে হবে। অন্যথায় দেশে নির্বাচন হবে না।
তিনি বলেন, আসুন আমরা সবাই এক হই, জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলি। জনগরে ঐক্যের মধ্য দিয়ে সকল রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি- আমাদের বুকের ওপর  যে পাথর চেপে বসে আছে, ভয়াবহ একটা  স্বৈরাচার চেপে বসে আছে তাকে আমাদের সরিয়ে দিতে হবে। জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
মাদক বিরোধী অভিযানের সমালোচনা করে মির্জা ফখরুল বলেন, এখন দেশে এক দলীয় শাসন নয়, এক ব্যক্তির শাসনের পরিণত হয়েছে। আজকে বাংলাদেশে কোনো মানুষের কোনো অধিকার নেই, বেঁচে থাকবার অধিকারটুকু কেড়ে নিয়েছে। পাখির মতো গুলী করে মারছে মানুষগুলোকে মাদক দ্রব্যের নাম দিয়ে। তারা(সরকার)  পারছে না নিয়ন্ত্রণ করতে, তারা পারছে না মাদক থেকে সমাজকে রক্ষা করতে সেজন্য তারা একটা ভয়াবহ হাতিয়ার বেঁছে নিয়েছে।
তিনি বলেন, গণতন্ত্রের যে নেত্রী যিনি বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী পতাকাকে তুলে নিয়েছিলেন, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের পতাকাকে তুলে নিয়ে দীর্ঘ ৯ বছর যুদ্ধ করেছেন স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সেই নেত্রীকে আজকে কারারুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। যারা সেদিন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হত্যা করেছিলো তারাই আজকে দেশনেত্রীকে কারাগারে আটকিয়ে রেখে এদেশের মানুষের সমস্ত গণতান্ত্রিক অধিকারকে হরণ করে নিয়েছে। আমাদের এই শাহাদাৎ বার্ষিকীতে আমাদের নতুন করে শপথ নিতে হবে যে গণতন্ত্রকে রক্ষা করবার জন্যে, গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনবার জন্যে, মানুষের অধিকারকে ফিরিয়ে আনবার জন্যে আমাদেরকে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ঐক্যবদ্ধ হয়ে দুর্বার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দেশনেত্রীকে মুক্ত করে আনতে হবে এবং সেই আন্দোলনে অবশ্যই এই জাতিকে সম্পৃক্ত করতে হবে।
তিনি বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন করেছিলেন। আজকের আওয়ামী লীগও নিষিদ্ধ ছিলো। জিয়াউর রহমানের কারণেই তারা রাজনীতি করতে পারছে। তিনি (জিয়া) বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা। অথচ আজকে তাকেই ছোট করার জন্য বিকৃত ইতিহাস তুলে ধরা হচ্ছে। আমাদের সেই গণতন্ত্র আজ সম্পূর্ণভাবে হরণ করা হয়েছে।  মির্জা ফখরুল বলেন, দেশ আজ একদলীয় শাসন নয়, এক ব্যক্তির শাসনে পরিণত হয়েছে। মানুষের কোনো অধিকার নেই। পাখির মতো গুলী করে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সুযোগ্য উত্তরসূরি বেগম খালেদা জিয়াকে একটি মিথ্যা মামলায় অন্যায়ভাবে কারাগারে বন্দী করে রাখা হয়েছে। তার অন্যান্য মামলার জামিন নিয়ে কি পরিমাণ সময় ক্ষেপণ করছে আপনারা দেখতে পারছেন। আমরা মনে করি, এই আইন আদালতের মাধ্যমে দেশনেত্রীর মুক্তি সম্ভব নয়। এজন্য তাকে মুক্ত করতে চাই, এই সরকারের পতনের মাধ্যমে বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে। আমরা যে ধরনের আন্দোলন করছি এই ধরনের আন্দোলনের  মধ্যে কর্মসূচি সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইনশাল্লাহ আগামী দিনে যে কর্মসূচি দিলে একটি স্বৈরাচার সরকারের পতন হয়, সেই ধরনের কর্মসূচি দেশের জনগণ দেবে। জনগণের দল হিসেবে বিএনপি তাদের সাথে থাকবে। সেজন্য সকলে প্রস্তুতি নিন।
কঠিন আন্দোলনের প্রস্তুতি নিতে দলের নেতার্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে খন্দকার মোশাররফ বলেন, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি হলে জনগণ রাস্তায় নেমে আসবে। তিনি বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদেও প্রহসনের নির্বাচন করতে চায় সরকার। বেগম খালেদা জিয়াকে বাইরে রেখে, ২০ দলকে বাইরে রেখে তারা নির্বাচন করতে চায়। এটা হলো পরিষ্কার ষড়যন্ত্র। এই নীলনকশার বিরুদ্ধে আমাদের রুখে দাঁড়াতে হবে। বারবার এ দেশের মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করবে এটা হতে দেয়া যায় না। তিনি বলেন, এদেশের মানুষ যেভাবে নির্যাতিত, নিপীড়িত, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, মানুষের জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই. যে কাউকে হত্যা করে একটা অপবাদ দিয়ে দেয়, এই অবস্থার মধ্য থেকে, এই স্বৈরাচার অন্ধকার যুগ, অন্যায়, অনাচার-অত্যাচার থেকে দেশের মানুষকে মুক্ত করতে হবে।
তিনি বলেন, জনগণ আজ বিক্ষুব্ধ। তারা রাগ, গণঅভ্যুত্থানের জন্য প্রস্তুত আছে। আমাদের বলা হয়, নরম কর্মসূচি দিচ্ছি, গরম কর্মসূচি দেয়া প্রয়োজন। সময় যখন হবে ইনশাআল্লাহ কেউ বসে থাকবে না। এদেশে গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। কোনো নোটিশ দিয়ে, কোনো দিন-তারিখ দিয়ে গণঅভ্যুত্থান হয় না। খন্দকার মোশাররফ বলেন, জনগণ এবার রুখে দাঁড়াবে। আর আমরা জনগণের দল হিসেবে বিএনপি জনগণের সঙ্গে থাকবে। আন্দোলন-সংগ্রামের বিকল্প নেই। সেই আন্দোলনের জন্য কৃষক দলের কর্মী ভাইদের প্রস্তুতি নিতে হবে। আমরা যদি নাও পারি জনগণ রাস্তায় নেমে আসবে।
স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেন, সকল মানুষ জানে দেশে  একদলীয় শাসন চলছে। এই একদলীয় শাসনের অবসান করতে হলে তিনটা এজেন্ডা আছে। প্রথমত আমাদের নেত্রীকে মুক্ত করতে হবে। তার মুক্তি ছাড়া দেশে কোনো নির্বাচন হতে দেয়া হবে না। দ্বিতীয়ত ২০ দলীয় জোট ছাড়াও অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশপ্রেমিক শক্তিসমূহকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে, জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। বিএনপিকে ত্যাগ স্বীকার করে হলেও ঐক্য আনতে হবে। তৃতীয়ত এই জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে দেশে গণআন্দোলন হবে এবং সেই গণআন্দোলনের মুখে সরকার বাধ্য হবে দেশে আগামী নির্বাচন একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠান করার জন্য। সেই সরকার হতে হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এখন অন্যকোনো সরকারের কথা বলে লাভ নেই।
স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, এখন আমাদের প্রধান কাজ হচ্ছে- দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে আনা।  এজন্য দুর্বার আন্দোলন  গড়ে তুলতে এখন থেকে সকলে প্রস্তুতি নিন।  শুধুমাত্র ‘জেলে তালা ভাঙবোৃ ইত্যাদি শ্লোগান শুনতে আর চাই না। রাস্তায় নামার প্রস্তুতি নিন।
স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন করা আত্মহত্যা করা একই কথা। যেদিন আমরা নির্দলীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত করতে পারবো, সেদিনই নির্বাচন হবে। এর আগে এদেশে কোনো নির্বাচন হবে না। আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো যদি বাংলাদেশে কোনো নির্বাচন করার পাঁয়তারা করা হয়, তাহলে রাজপথে থেকেই সেই নির্বাচন যাতে না হয় তার সম্পূর্ণ ব্যবস্থা করে আমাদেরকে রাজনীতিতে টিকে থাকতে হবে। হয় মরতে হবে নইলে জনগণের অধিকার আদায় করতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ