ঢাকা, বুধবার 30 May 2018, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ১৩ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রেমিট্যান্স প্রবাহে মন্দাবস্থা

সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় অর্থনীতির সব খাতে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি অর্জনের প্রচারণা চালানো হলেও অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তব অবস্থা কিন্তু নৈরাশ্যজনক। এ সংক্রান্ত খবরও আবার গোপন রাখা যায় না। সেগুলো প্রকাশিত হয়ে পড়ে। এ রকম সর্বশেষ একটি তথ্যই জানা গেছে দৈনিক সংগ্রামের এক রিপোর্টে। মঙ্গলবারের ওই রিপোর্টে জানানো হয়েছে, সরকারের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখার বিশেষ খাত হিসেবে পরিচিত রেমিট্যান্স অত্যন্ত মন্দাবস্থায় পড়েছে। ধারাবাহিকভাবে কমে যাচ্ছে রেমিট্যান্সের পরিমাণ।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও জনশক্তি রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য-পরিসংখ্যানের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৭ সালে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের পরিমাণ পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় কমেছে ১৪ শতাংশ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এক হাজার ২৭৬ কোটি ৯৪ লাখ মার্কিন ডলার পাঠালেও বছর হিসেবে ২০১৭ সালে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন এক হাজার ৩৫২ কোটি ৬৮ লাখ মার্কিন ডলার। এই পরিমাণ অর্থ শুধু পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ১৪ শতাংশ কম নয়, বিগত ছয় বছরের মধ্যেও সর্বনি¤œ। এর আগে ২০১১-১২ অর্থবছরে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল এক হাজার ২৮৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার। আর বছর হিসেবে ২০১২ সালে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল এক হাজার ৪১৬ কোটি ৩৯ লাখ ডলার। একই রেমিট্যান্সের পরিমাণ ২০১৭ সালে এক হাজার ৩৫২ কোটি ৬৮ লাখ ডলারে নেমে এসেছে। অর্থাৎ সরকারের দাবি ও প্রচারণা অনুযায়ী যখন বাড়ার কথা তখন ২০১২ সালের তুলনায়ও কমেছে ৬৪ কোটি ডলার।
রেমিট্যান্স প্রবাহের এই পতন কিন্তু হঠাৎ করে ঘটেনি। বাস্তবে বেশ কয়েক বছর ধরেই রেমিট্যান্স কমছে ধারাবাহিকভাবে। অনেক বিলম্বে হলেও ২০১৬ সালে সরকারের টনক নড়ে এবং রেমিট্যান্স কেন কমে যাচ্ছে তার কারণ অনুসন্ধান শুরু করা হয়। এ ব্যাপারে সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকও তৎপর হয়। অনুসন্ধানকালে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অবৈধ পন্থায় টাকা পাঠানোকে একটি প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। হুন্ডিকেও দায়ী করেছিল অনুসন্ধানকারীরা। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে গত বছর মোবাইলভিত্তিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান বিকাশের দু’হাজার ৮৮৭টি এজেন্টের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে এক হাজার ৮৬৩ জন এজেন্টের হিসাবও বন্ধ করা হয়। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে তখন জানানো হয়েছিল, ব্যাংকিং চ্যানেলের পরিবর্তে হুন্ডি এবং বিকাশের মাধ্যমে টাকা পাঠানোর কারণেই রেমিট্যান্সের পরিমাণ কমে গেছে। বিশেষ করে বিকাশ এজেন্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ায় পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে এবং রেমিট্যান্সের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়তে থাকবে।
অন্যদিকে পরিস্থিতিতে যে অত্যন্ত আশংকাজনক অবনতি ঘটেছে সে কথারই প্রমাণ পাওয়া গেছে মন্দাবস্থার খবরে। মাত্র এক বছরের মধ্যেই রেমিট্যান্স কমেছে ১৪ শতাংশ! আপত্তির কারণ হলো, এত কিছুর পরও ক্ষমতাসীনদের মধ্যে উদ্বেগের কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। অর্থমন্ত্রী বরং তার নিজস্ব স্টাইলে দেয়া ব্যাখ্যায় বোঝাতে চেয়েছেন, বিদেশে- বিশেষ করে সৌদি আরবের মতো দেশগুলোতে বাংলাদেশিদের বেতন বা আয়ের পরিমাণ কমে গেছে বলেই নাকি রেমিট্যান্সও কমেছে! উল্লেখ্য, অর্থমন্ত্রী কিন্তু এই সত্য স্বীকার করার ধারেকাছেও যাননি যে, সরকারের অভ্যন্তরীণ দমন-নির্যাতনের কারণে  বিদেশে বাংলাদেশিদের চাকরি পাওয়াই অনেক কমে গেছে। তাছাড়া সরকারের পক্ষ থেকেও জনশক্তি রফতানি বাড়ানোর লক্ষ্যে কোনো বিশ্বাসযোগ্য উদ্যোগের কথা জানা যায়নি। এর ফলে রেমিট্যান্সে শুধু নয়, জনশক্তি রফতানিতেও মন্দাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
অর্থনীতিবিদসহ দেশপ্রেমিক বিশেষজ্ঞরাও সরকারের উদ্যোগহীনতা এবং অব্যবস্থাপনাকেই রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। দেশপ্রেমিক অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সরকারের একদেশকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ক্ষেত্রে ইসলামী ও দেশপ্রেমিক দলগুলোর বিরুদ্ধে নিষ্ঠুর দমন-পীড়নের কারণে বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শীতল হয়ে পড়েছে। সে কারণে ওই দেশগুলো বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেয়া হয় বন্ধ করেছে নয়তো অনেক কমিয়ে দিয়েছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, রেমিট্যান্সের এই পতন অত্যন্ত ভীতিকর। কারণ, রফতানি আয়ের প্রধান খাত গার্মেন্ট কয়েক বছর ধরেই সংকটে হাবুডুবু খাচ্ছে। এমন অবস্থায় বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের দ্বিতীয় প্রধান খাত রেমিট্যান্সেও যখন ধস নামার খবর শুনতে হয় তখন উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায় না। কারণ, বিপুল পরিমাণ আমদানি ব্যয় মেটানোর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের যোগান আসে রফতানি আয় থেকে, এতদিন পর্যন্ত যার দ্বিতীয় প্রধান খাত ছিল রেমিট্যান্স। সে রেমিট্যান্সেই পতন শুরু হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, দেশের অর্থনীতি আসলে বিপর্যয়ের মুখোমুখি এসে পড়েছে।
অমরা মনে করি, এমন অবস্থায় কেবলই কল্পিত সাফল্যের কথা শোনানোর পরিবর্তে সরকারের উচিত আর্থিক খাতে সুষ্ঠু পরিকল্পনা নেয়া, বিশেষ করে বিনিয়োগ, জনশক্তি রফতানি এবং রেমিট্যান্স বাড়ানোর ব্যাপারে তৎপর হয়ে ওঠা। এজন্য সবচেয়ে বেশি দরকার সৌদি আরবসহ মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা। এ উদ্দেশ্যে সরকারকে ইসলামী ও দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে নিপীড়নমূলক কর্মকান্ড বন্ধ করতে হবে। প্রবাসীদের স্বজনরা যাতে সহজে ও ঝামেলামুক্তভাবে তাদের নামে পাঠানো টাকা ব্যাংক থেকে উত্তোলন করতে পারে, সে ব্যাপারেও সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ, ব্যাংকে গিয়ে ভোগান্তির কবলে পড়তে হয় বলেই প্রবাসীরা হুন্ডি ও বিকাশসহ নানা অবৈধ পন্থায় টাকা পাঠিয়ে থাকেন। এটাও রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার একটি প্রধান কারণ। এ ব্যাপারে সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংককেই সুফলদায়ক পদক্ষেপ নিতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ