ঢাকা, বুধবার 30 May 2018, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ১৩ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ভাসানীর ফারাক্কা আন্দোলন পানির দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল

জিবলু রহমান : [তিন]
কিন্তু যখন সময় হলো, দেখা গেলো এদের প্রেরিত একজন স্বেচ্ছাসেবকও আসামে এলো না। বাংলাদেশের প্রাদেশিক মুসলিম লীগের কোষাধ্যক্ষ ইউসুফ আলী চৌধুরী (মোহন মিয়া) মারফত দু’হাজার টাকা ছাড়া এই আন্দোলনে আর কোন সাহায্য বাংলা থেকে পাওয়া যায়নি। ১৯৪৭ সালের ৪ মার্চ তারিখে শেষ হলো। প্রতিনিধি, অতিথি এবং সম্মেলনে যোগদানকারী অন্যান্য ব্যক্তিবর্গ সবাই নিজ নিজ গন্তব্যস্থলে রওনা হয়ে গেলেন সম্মেলন থেকে লব্ধ প্রেরণা সঙ্গে নিয়ে। (সূত্র : মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী, ১৯ জানুয়ারি ১৯৭০। সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদে পুস্তিকাটি সংগ্রহীত রয়েছে)
ধুবড়ী শহরের অদূরে ভাসানীর চর নামে আর একটি গ্রামও গড়ে উঠেছিল। মওলানা ভাসানী হামিদাবাদের কাজ শেষ করে ভাসানীর চরে বসবাস শুরু করেন। ভাসানীর চর হাই মাদরাসা তাঁর অন্যতম মহান অবদান। লক্ষ লক্ষ ভক্তের পীর হিসেবে তিনি প্রচুর অর্থ পেতেন আর এই অর্থ তিনি ব্যয় করতেন জনহিতকর কাজে। ভাসানীর চরের হাই মাদরাসাও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ঐ অর্থের সাহায্যে। ভাসানীর চরেও তাঁর নিজস্ব একটি সম্পত্তি ঠিক হামিদাবাদের সম্পত্তির মতই মাদরাসা পরিচালনার জন্য মওলানা ভাসানী ওয়াকফ করে দেন।
ভাসানী চরে অবস্থান কালেই মওলানা ভাসানী সক্রিয় ভাবে মুসলিম লীগের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করে পাকিস্তান আন্দোলনের পুরোভাগে এসে দাঁড়ান এবং তাঁর দুর্বার কর্মদক্ষতাবলে দেশজোড়া খ্যাতি লাভ করেন। গোড়ার দিকে তিনি ‘ভাসানী চরের মওলানা’ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে শুধু ‘ভাসানী’ বলেই মওলানা ভাসানীকে উল্লেখ করা হয়ে থাকে। মৃত্যু পূর্ব পর্যন্তও বৃদ্ধ বয়সেও মওলানা ভাসানীর শিক্ষা বিস্তারের আগ্রহ ঠিক আগের মতই ছিল। পাকিস্তান পিরিয়ডে কাগমারীতে প্রতিষ্ঠিত মওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজ তাঁরই নিদর্শন। এই কলেজ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে দলীয়-অদলীয় কত লোকের মত গঞ্জনা কত কুৎসা মওলানা ভাসানীকে পোহাতে হয়েছে তা’ সর্বজন বিদিত।
ভাসান চরের ঐতিহাসিক সম্মেলনে মুগ্ধ আসামের নির্যাতিত নিপীড়িত জনতা তাকে ভাসানী উপাধিতে অলংকৃত করেন। বৃটিশ কারাগার থেকে মুক্ত হয়েই মওলানা ভাসানী পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। শুরু হয় তাঁর রাজনৈতিক জীবনের নতুন অধ্যায়। সদ্য প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর অন্যায় আচরণের প্রতিবাদে ও বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ে সংগ্রামের সূচনা করেন এবং ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠা করে পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী দল আওয়ামী মুসলিম লীগ যা পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় পাকিস্তানের ইতিহাসের প্রথম বিরোধী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হলেন মওলানা ভাসানী। যদিও আজকের আওয়ামী লীগ ইতিহাস থেকে তাদের জন্মদাতার নামটিও বাদ দিতে কুণ্ঠিত হন না। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হলেন শামসুল হক। পরিতাপের বিষয় বর্তমানের আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব এই দুই প্রতিষ্ঠাতাকে জনগণের স্মৃতি থেকে মুছে দিয়ে এমন এক ব্যক্তিকে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে দেখাতে উদগ্রীব, যিনি আওয়ামী প্রতিষ্ঠা সম্মেলনে উপস্থিতই ছিলেন না। (সূত্র : মিলিত সংগ্রামের নাম মওলানা ভাসানী, এম গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া, দৈনিক নয়াদিগন্ত ১৭ নভেম্বর ২০১৪)
পাকিস্তানের স্বাধীনতা উত্তর যুগে সাধারণ মানুষের বাঁচার দাবী নিয়ে ভাসানীকে আন্দোলনের পথেই পা বাড়াতে হয়েছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ক্ষমতা মহে মত্ত হয়ে মুসলিম লীগ জাতীয় স্বার্থে জলাঞ্জলি দিয়ে যে ভাবে বিদেশী প্রভু তোষণে মেতে উঠেছিল তাতে মুসলিম লীগের মাধ্যমে দেশ সেবা কিছুতেই সম্ভব নয় এ সত্য মওলানা ভাসানী অতি পরিষ্কারূপেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। ভাসানী আরও উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে দেশের সার্বিক উন্নয়নের পথে সাম্রাজ্যবাদ এক বিরাট বাধা স্বরূপ। শুধু মাত্র রাজনৈতিক স্বাধীনতা দ্বারা সাম্রাজ্যবাদের শোষণমুক্ত হওয়া যায় না। তদুপরি তিনি এ বিষয়ে সম্পূর্ণ সচেতন ছিলেন যে বিংশ শতাব্দীতে সাম্রাজ্যবাদের নতুন রূপ পরিগ্রহ করেছে। প্রতিটি সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশে সাম্রাজ্যবাদের দোসর শ্রেণীর তৎপরতা লক্ষণীয়।
মিহীন কৃষকের বাঁচার দাবীর আন্দোলনে। মুসলিম লীগের পতাকা তলে সে আন্দোলন চালিয়ে ছিলেন মওলানা ভাসানী। পাকিস্তানের স্বাধীনতা উত্তর যুগে সাধারণ মানুষের বাঁচার দাবী নিয়ে ভাসানীকে আন্দোলনের পথেই পা বাড়াতে হয়েছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ক্ষমতা মহেমত্ত হয়ে মুসলিম লীগ জাতীয় স্বার্থে জলাঞ্জলি দিয়ে যে ভাবে বিদেশী প্রভু তোষণে মেতে উঠেছিল তাতে মুসলিম লীগের মাধ্যমে দেশ সেবা কিছুতেই সম্ভব নয় এ সত্য মওলানা ভাসানী অতি পরিষ্কারূপেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। ভাসানী আরও উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে দেশের সার্বিক উন্নয়নের পথে সাম্রাজ্যবাদ এক বিরাট বাধাস্বরূপ। শুধুমাত্র রাজনৈতিক স্বাধীনতা দ্বারা সাম্রাজ্যবাদের শোষণমুক্ত হওয়া যায় না। তদুপরি তিনি এ বিষয়ে সম্পূর্ণ সচেতন ছিলেন যে বিংশ শতাব্দীতে সাম্রাজ্যবাদের নতুন রূপ পরিগ্রহ করেছে। প্রতিটি সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত দেশে সাম্রাজ্যবাদের দোসর শ্রেণীর তৎপরতা লক্ষণীয়। মওলানা ভাসানীকে তাই আমরা দেখতে পাই পাকিস্তানে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আপোষহীন সংগ্রামের পুরোভাগে। এ সংগ্রামে তাঁর সুদৃঢ়তার দরুনই বহু বিশ্বস্ত সহকর্মীদের সঙ্গে মতানৈক্যের মোকাবেলা করতে হয়েছে। এমন কি প্রধানত এ প্রশ্নে তাঁরই হাতে গড়া আওয়ামী লীগের সাথেও সম্পর্কোচ্ছেদ করে তাঁকে ন্যাপের গোড়াপত্তন করতে হয়েছিল।
মওলানা ভাসানী নিজের জন্য লড়াই করেননি। তিনি নিরালস লড়াই করেছেন আপামর জনসাধারণের জন্য, দেশমাতৃকার জন্য। মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্যই তিনি ভারতে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু আকাক্সক্ষা অনুযায়ী ভূমিকা রাখতে পারেননি। কেন পারেননি তা কারও অজানা নয়। (সূত্র : রাজনীতির এক বিস্ময় পুরুষ মওলানা ভাসানী, কাজী সিরাজ, দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ ১৭ নভেম্বর ২০১৫)
স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের সঙ্গে মতবিরোধ ঘটলে মওলানা ভাসানী ১৯৫৭ সালে ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনের আহ্বান করেন এবং সেখান থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানীদের ‘আসসালামু আলাইকুম’ উচ্চারণের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায় ও স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেন। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপ গঠন করেন।
’৫২’র ভাষা আন্দোলন, ’৫৪’র যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন ও ২১ দফা সংগ্রাম, ’৬২’ শিক্ষা কমিশন আন্দোলন, ’৬৯’র আইয়ূব বিরোধী গণআন্দোলন, ’৭১’এ মহান মুক্তিযুদ্ধ, ’৭২ থেকে ’৭৫ আওয়ামী দুঃশাসন বিরোধী সংগ্রাম, ’৭৬’এ ভারতীয় পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ফারাক্কা লংমার্চে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিয়ে লাখো কোটি মানুষকে উজ্জীবিত করেছেন মওলানা ভাসানী।
মওলানা ভাসানী অসংখ্য মুরিদ রয়েছেন। সুযোগ পেলেই তারা সেবা করার কাজে লেগে যেতেন। এ কে এম শামছুল হক রেনু লিখেছেন, ‘....প্রতিনিয়ত মওলানা ভাসানীর কাপড়চোপড় ধোয়া, জুতা মোছা, পিকদানি পরিষ্কার করা নিয়ে নেতা-কর্মীদের মধ্যে কাড়াকাড়ি লেগে যেত এবং প্রতিযোগিতা চলত, কে আগে এ কাজগুলো করবে। একসময় যারা মন্ত্রী, এমপি ও বড়মাপের নেতা হয়েছিলেন, তাদেরও এ প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে দেখা গেছে। ঢাকা থেকে সপ্তাহে এক দিন বা আট-দশ দিন পর পর সন্তোষ যেতাম। শতবার চেষ্টা করেও পিকদানি পরিষ্কার, জুতা মোছা (তিনি জুতা পলিশ করাতেন না), মোজা বা কাপড় ধোয়া-এ কাজগুলো করার প্রতিযোগিতার ভাসানী হুজুরের সার্বক্ষণিক সেবাযত্নকারী নেতা-কর্মী ও ভক্তদের সাথে কুলিয়ে উঠতে পারতাম না। অবশেষে খুব চেষ্টা করে সিনিয়রদের মধ্যস্থতায় কে কখন কী কাজ করবে, এ জন্য রুটিন করা হয়। সে অনুসারে জুতা মোছা ও মোজা ধোয়ার কাজটি খুব চেষ্টা করে পেলাম.....মওলানা প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর সন্তোষ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার স্কুল, কলেজ, মাদরাসার ইট ও ঘাস থেকে শুরু করে সব কিছু দেখতেন। যেখানে ভুলভ্রান্তি থাকত, সেগুলোর সংস্কার, মেরামত করতে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ নিতেন। কোনো কোনো ব্যাপারে নিজেই কোদাল, খুন্তি, ছেনি ও হাতুড়ি-বাটাল নিয়ে কাজে লেগে যেতেন। নিজেই খামারের গরুদোহন করতেন এবং দুধ বিক্রির জন্য টাঙ্গাইল শহরে পাঠিয়ে দিতেন। হাঁটার সময় তার সাথে তোরাব আলী ফকির, ইরফানুল বারীসহ ৪০-৫০ জন লোক সব সময় থাকতেন। এটা নিয়েও প্রতিযোগিতা চললে তালিকা করে দেয়া হতো, ভোরে পালা করে কে কে সাথে থাকবে।
তার কাছ থেকে চড়থাপ্পড়, ধমক এবং সাথে থাকা লাঠির বাড়ি যে খেয়েছে, তার মতো আনন্দিত হতে কাউকে দেখা যায়নি....। (সূত্র : মওলানা ভাসানীকে যেমন দেখেছি, এ কে এম শামছুল হক রেনু, দৈনিক নয়াদিগন্ত ২১ নভেম্বর ২০১৪)
বাস্তবতার আলোকে মওলানা ভাসানী কাউকে কখনো সঠিক পরামর্শ দিতে কার্পণ্য করতেন না। এ বিষয়ে তাঁর সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ছিল গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক। যখনই বঙ্গবন্ধু কোন জটিল সমস্যায় পড়তেন, ছুটে যেতেন ভাসানী কাছে। বঙ্গবন্ধু দলীয় ও ক্ষমতার কোন্দল কোন কিছুতেই ঠেকাতে না পেরে অবশেষে আত্মীয়-স্বজনদের দলীয় ও ক্ষমতা অংশীদারিত্ব দেয়া শুরু করেছিলেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ