ঢাকা, বৃহস্পতিবার 31 May 2018, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ১৪ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রাজধানীর ছিনতাই পরিস্থিতি

বহু বছর ধরে প্রতিদিনের স্বাভাবিক বিষয় হলেও বিগত কিছুদিনের মধ্যে রাজধানীতে হঠাৎ করে ছিনতাই অনেক বেড়ে গেছে। ছিনতাইকারী দুর্বৃত্তরা আজকাল শুধু মানুষের টাকা, স্বর্ণালংকার ও মোবাইল ফোনের মতো সম্পদই ছিনতাই করছে না, পিস্তল ও ছুরিসহ নানা অস্ত্রের আঘাতে তাদের ক্ষতবিক্ষতও করছে। অনেককে হাত-পা বেঁধে ফেলে রেখে যাচ্ছে ডাস্টবিনসহ রাস্তার যেখানে-সেখানে। প্রায় প্রতিটি ঘটনার শিকার নারী-পুরুষকে রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যেতে হচ্ছে। কারো কারো এমনকি মৃত্যু পর্যন্তও ঘটেছে।
এসব ঘটনা দৈনিক ঘটছে বলে গুরুত্বও কিছুটা কম দেয়া হচ্ছে। কিন্তু এর মধ্যেও গত ২৮ মে রাতের একটি ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রীতিমতো ‘ভাইরাল’ হয়েছে। প্রচন্ড রকমের আলোড়ন তুলেছে। খবরে জানানো হয়েছে, সেদিন রাতে এশিয়ান টেলিভিশনের সিনিয়র নিউজ প্রোডিউসার আহসান মাহবুব তার কর্মস্থল থেকে ফেরার পথে বাসে ছিনতাইকারীরা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। রাত হয়ে যাওয়ায় নিরাপদে যাওয়ার আশায় ওই সাংবাদিক একটি যাত্রীপূর্ণ বাসে উঠেছিলেন। কিন্তু ওঠার পরই তাকে বুঝতে হয়েছিল, বড় ধরনের ভুল করে ফেলেছেন তিনি। বাসে যাত্রীরা তো বটেই, কন্ডাক্টর ও হেল্পার হিসেবে যারা ছিল তাদের প্রত্যেকেই ছিল পেশাদার ছিনতাইকারী। নিজের পরিচয় দেয়ার এবং কোনো কথা বলার সুযোগ পর্যন্ত না দিয়ে ছিনতাইকারীরা ওই সাংবাদিককে সোজা মারধোর শুরু করেছে। ছুরিকাঘাতও করেছে। মানিব্যাগ ও টাকা হাতিয়েও থেমে পড়েনি তারা,  দামী মোবাইল ফোনের পাশাপাশি তার একাধিক ব্যাংকের এটিএম কার্ডও ছিনতাই করেছে।
এরপরই শুরু হয়েছিল ভয়ংকর নিষ্ঠুরতার পালা। ছিনতাইকারীরা প্রথমে আগেই সঙ্গে নিয়ে আসা দড়ি ও লোহার শিকল দিয়ে সাংবাদিকের হাত-পা বেঁধেছে। তার মুখে কাপড় গুঁজে দিয়েছে, যাতে তিনি কথা বলতে বা চিৎকার দিতে না পারেন। অস্ত্রের মুখে হুমকি দিয়ে তার এটিএম কার্ডের পিন নাম্বার লিখিয়ে নিয়েছে। তাকে বাসে শুইয়ে রেখেই ছিনতাইকারীরা একাধিক এটিএম বুথ থেকে বেশ কয়েক হাজার টাকা উত্তোলন করেছে। সবশেষে হাত-পা ও মুখ বাঁধা অবস্থাতেই সাংবাদিককে ফেলে গেছে একটি ডাস্টবিনের ভেতরে। সারারাত ওই সাংবাদিক ডাস্টবিনের ভেতরেই থেকেছেন। পরদিন ভোরের দিকে তার গোঙানির শব্দ শুনে পথচারীরা তাকে উদ্ধার করেছেন।
প্রাণে মেরে না ফেললেও একজন সাংবাদিকের জীবনে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত ভীতিকর। বড় কথা, এটাই একমাত্র ঘটনা নয়। এর চাইতেও ভয়ংকর অনেক ছিনতাইয়ের ঘটনা প্রায় প্রতিদিন রাজধানীতে ঘটে চলেছে। এসব বিষয়ে খবরও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। আরো কিছু ঘটনার উল্লেখসহ গণমাধ্যমের রিপোর্টে জানানো হয়েছে, রাজধানীর ৪৯টি থানার অন্তত ১৩৫টি এলাকায় ছিনতাইকারীদের বেপরোয়া তৎপরতা চলছে। প্রতিটি এলাকায় একাধিক প্রধান গ্রুপ ছাড়াও তৎপর রয়েছে বয়সে তরুণ নতুন নতুন কয়েকটি পর্যন্ত গ্রুপের ছিনতাইকারীরা। মোটর সাইকেল তো বটেই, প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাসও ব্যবহার করছে তারা। দিনের বেলাতেও মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। লুণ্ঠন করছে ব্যাংক থেকে তুলে আনা কোম্পানির বেতনের লক্ষ লক্ষ টাকা। দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের তারা উত্তরা থেকে মাইক্রোবাসে উঠিয়ে কুড়িল বিশ্ব রোডে ফেলে যাচ্ছে। যাওয়ার আগে আঘাতও এমনভাবেই করছে, যাতে তাদের পক্ষে সঙ্গে সঙ্গে শোরগোল করা এবং পুলিশ বা মানুষকে জানানো সম্ভব না হয়। আরো অনেক কৌশলেও ছিনতাই করা হচ্ছে।
অন্যদিকে আইন-শৃংখলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ যথারীতি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে দাবি জানিয়ে চলেছে। ছিনতাইয়ের যেসব ঘটনা ঘটছে সেগুলো নাকি বিচ্ছিন্ন ঘটনা এবং সংখ্যার দিক থেকেও নাকি উল্লেখযোগ্য নয়! বিচিত্র ধরনের বিভিন্ন পরিসংখ্যানও অবশ্য পুলিশের দাবিকেই সমর্থন যোগাচ্ছে। যেমন একটি সাম্প্রতিক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, ছোট-বড় মিলিয়ে প্রতিদিন কয়েকশ’ পর্যন্ত ছিনতাই ঘটলেও রাজধানীর থানাগুলোতে কোনো মামলা হয় না বললেই চলে। এ সংক্রান্ত উদ্ভট ধরনের পরিসংখ্যানও জানা যাচ্ছে পুলিশের মাধ্যমে। এসব তথ্য-পরিসংখ্যানের আড়াল নিয়ে পুলিশের কর্মকর্তারা দাবি করে চলেছেন, রাজধানীতে এখন নাকি আগের মতো ছিনতাই হয় না! একথা পর্যন্তও শোনানো হয়েছে যে, পুলিশের ‘জোর তৎপরতার কারণে’ ছিনতাই এখন নাকি হয় না বললেই চলে!
অন্যদিকে গণমাধ্যমের খবরেই আবার জানানো হচ্ছে, শুধু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই প্রতিদিন গড়ে পাঁচ থেকে সাতজন পর্যন্ত আহত লোকজন চিকিৎসা নিতে আসছেÑ যাদের সকলে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েছিল। বাস্তবে ছিনতাইও অনেক বেড়ে গেছে। কিন্তু যেহেতু পুলিশের সাহায্য পাওয়া যায় না এবং খাতায় লিখলেও পুলিশ কোনো কিছু উদ্ধার করে অন্তত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে ফিরিয়ে দেয় না সে কারণে আক্রান্তদের খুব কম সংখ্যকই থানায় গিয়ে অভিযোগ করেন।
এ অবস্থারই সুযোগ নিচ্ছে ছিনতাইকারীরা। ফলে রাজধানীর কোনো কোনো স্পটে একই রাতে ৩০/৪০টি পর্যন্ত ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে স্পটের তথা পাড়া-মহল্লার মানুষও বিপন্নদের সাহায্যে এগিয়ে আসার সাহস পাচ্ছে না। ওদিকে পুলিশের কর্মকর্তা বলে চলেছেন, তারা চাইলেই চিহ্নিত ছিনতাইকারীদের গ্রেফতার করতে পারেন। মাঝেমধ্যে করেনও। কিন্তু কোর্টে গেলেই ছিনতাইকারীরা জামিন পেয়ে যায় এবং বেরিয়ে এসেই আবারও ছিনতাই শুরু করে। সুতরাং পলিশের পক্ষে ছিনতাই ‘একেবারে বন্ধ করা’ সম্ভব হয় না। তা সত্ত্বেও পুলিশের অভিযান নাকি অব্যাহত রয়েছে এবং অব্যাহত থাকবে বলেও আশ্বাসের কথা শুনিয়েছেন কর্তা ব্যক্তিরা। উদ্বেগের একটি বড় কারণ হলো, সরকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে বলে এলিট ফোর্স র‌্যাবের ‘সুনাম’ও অনেক নিচে নেমে এসেছে। ছিনতাইকারীরা আজকাল র‌্যাবের প্রহরাকে সামান্য তোয়াক্কা পর্যন্ত করছে না। ফলে ছিনতাইয়ের সঙ্গে চুরি-ডাকাতি ও খুনের মতো অপরাধও কেবল বেড়েই চলেছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, সব মিলিয়েই ছিনতাই পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপদজনক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এটা আসলেও সরকারের ব্যর্থতা নাকি পর্দার অন্তরালে ক্ষমতাসীনরা প্রশ্রয় দিচ্ছেন বলেই জনগণের জীবন নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছে- এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর কিন্তু সরকারের পক্ষে যাবে না। কারণ, ছিনতাই-চাঁদাবাজি শুধু নয়, খুন ও গুমের মতো ভয়ংকর অপরাধও বেড়ে আসছে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে। সাম্প্রতিক সময়ে কথিত বন্দুকযুদ্ধ তো সাধারণ মানুষের মধ্যেও ভীতি-আতংক ছড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু কোনো পর্যায়েই সরকার ছিনতাই প্রতিরোধের জন্য ফলপ্রসূ কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এজন্যই মানুষকে ছিনতাইকারীদের খপ্পড়ে পড়তে হচ্ছে।
আমরা মনে করি, সরকারের অন্তত ছিনতাই প্রতিরোধের ব্যাপারে এখনই মনোযোগ দেয়া উচিত। কারণ, পবিত্র রমযান মাস চলছে। এরই মধ্যে ঈদের কেনাকাটাও শুরু হয়ে গেছে। সুতরাং রাজপথে নারী ও শিশুসহ মানুষের চলাচল যেমন বাড়ছে তেমনি বাড়ছে ছিনতাই-রাহাজানিও। একই কারণে পুলিশেরও উচিত দ্রুত তৎপর হয়ে ওঠা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ