ঢাকা, বৃহস্পতিবার 31 May 2018, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ১৪ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ভাসানীর ফারাক্কা আন্দোলন পানির দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল

জিবলু রহমান : [চার]
১৯৭২ এর ১১ নভেম্বর শেখ ফজলুল হক মনির নেতৃত্বে আওয়ামী যুবলীগ প্রতিষ্ঠা হয়। মনি সদ্য গঠিত দলের রাজনীতিতে পদার্পণের পর বঙ্গবন্ধু কাছে সবার চেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তি হিসেবে আবির্ভূত হন। তার গ্রহণযোগ্যতা বঙ্গবন্ধুর কাছে এতই প্রখর রূপ লাভ করে যার দরুণ মন্ত্রিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনে অনেককে তার দুয়ারে ধরণা দিতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর আরেক আত্মীয় সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সৈয়দ হোসেনের ভয়ে প্রশাসনের বড় বড় কর্তারা সব সময় সন্ত্রস্ত থাকতো। তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব সলিমুজ্জামান ছিলেন বঙ্গবন্ধুর আত্মীয়। তার প্রতাপে স্বাধীন সংবাদপত্র শিল্পের অবস্থা হয়ে উঠেছিল শোচনীয়। আর বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর বঙ্গবন্ধু পুত্র শেখ কামালের সশস্ত্র পদভারে হয়ে উঠতো প্রকম্পিত। এমনিভাবে দলের বিভিন্ন পর্যায়ে বঙ্গবন্ধুর আত্মীয়-স্বজনের প্রতাপ-প্রতিপত্তি ক্রমশই বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। এই অবস্থার দরুণ নেতৃত্বের কোন্দলে ছাত্রলীগ পুনরায় আক্রান্ত হয়। এই কোন্দলের ফলশ্রুতিতে মহসিন হলে এক রাতে সংঘটিত হয় ৯টি হত্যাকান্ড। অর্থাৎ কোন্দল সশস্ত্র সংগ্রামে রূপ নেয়। এসব রোধে বঙ্গবন্ধু পরমর্শের জন্য ভাসানীর শরনাপন্ন হতে কার্পণ্য করেননি।
স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর লাহোরে যে ইসলামিক সামিট হয়, ভারত চেয়েছিল সেখানে যেন বঙ্গবন্ধু না যান। এ অবস্থায় বঙ্গবন্ধু ছুটে যান ভাসানীর কাছে, কী করা উচিৎ তা জানতে। ভাসানীর সাফ জবাব ছিল-যদি তুমি স্বাধীন দেশের নেতা হও তবে যাও। আর যদি ভারতের আশ্রিত রাষ্ট্রের নেতা হও তবে যাবার দরকার নেই। বঙ্গবন্ধু ইঙ্গিতটা ঠিকই বুঝতে পেরে ঐ সামিটে যোগ দেন। (সূত্র : মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর প্রতি দায়সারা শ্রদ্ধা জ্ঞাপন, মোহাম্মদ আবদুল গফুর, দৈনিক ইনকিলাব ২০ নভেম্বর ২০১৪)
১৯৭২ সালের ১৯ অক্টোবর সন্তোষে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ কৃষক সমিতির সাংগঠনিক কমিটির সভায় মওলানা ভাসানীর ভাষণে অতীতের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছিলেন-‘....স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের অসংখ্য পত্র-পত্রিকার, নাটক, ড্রামার মাধ্যমে এবং অসংখ্য জনসভায় বহুবার প্রচারিত হয়েছে-এপার বাংলা-ওপার বাংলা এক বাংলা। এক দেশ, এক ভাষা, এক কৃষ্টি, এক ঐতিহ্য এক জাতিকে যারা ভাগ করে রাখতে চায়, মাতৃভূমিকে খন্ড-বিখন্ডিত করে রাখতে চায় তারা বাঙ্গালী জাতীর দুশমন।
আরো বলেন, একথা সকলেই স্বীকার করেছেন যে, বৃটিশ ভারতে সাম্রাজ্যবাদী শোষকরা এই দেশে তাদের শোষণ শাসনকে চিরস্থায়ী-পাকাপোক্ত করার জন্য হিন্দু-মুসলমান ‘‘দ্বিজাতিতত্ত্বকে’’ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল। বৃটিশ বেনিয়ারা ভারতে একমাত্র বাংলাকেই ভয় করতো কারণ, সহায় সম্পদে, পরিপূর্ণ ওজন বলে এমন শক্তিশালী বাংলাদেশ ও জাতিকে ভাগ করতে না পারলে, ভাংতে না পারলে এই দেশে কিছুতে টেকা যাবে না, বাংলার উপর তাদের কর্তৃত্ব থাকবে না এই কারণেই বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা এই দেশের কতিপয় মীরজাফর পোষ্য লাইট-নওয়াব বিশ্বাসঘাতকদের সহায়তায় বাংলাকে ভাগ করে দেয়।’
ভাসানী আরো বলেন, ১৯৪৬ সালে শেরে বাংলা, আমি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি, কিরণ সংকর রায়, বিধান চন্দ্র রায়, মওলানা আকরাম সহ ১৮৬ জন বাঙ্গালী একত্রিত হয়ে অখন্ড বাংলার দাবী তুলেছিলাম।
ভাসানী আরো বলেন, সেকুলারিজম বা ধর্মনিরক্ষরতার অর্থ রাজনীতিতে এক। তাই বলে সেকুলারিজমের নামে এক ধর্মের মানুষ কর্তৃক অন্য এক ধর্মের মানুষের ধর্মে কর্মে ব্যাঘাত সৃষ্টি করা নয়। ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ ধর্মহীনতা নয়। ভাসানী আরো বলেন, বাংলার জনগণের মধ্যে শত সহস্র বছরের একতা, বন্ধুত্ব, প্রেম, প্রীতি, ভালবাসা, আদান-প্রদান, মিল মহব্বতের চাইতে ২৫ বৎসরের (১৯৪৭ সাল থেকে) সাম্রাজ্যবাদী কৃত্রিম বিভাগ ও বিচ্ছেদ, বিভেদকে আমরা আরো বড় করে দেখতে চাই না।
ভাসানী আরো বলেন, আমি বিশ্বাস করি বাংলার মুসলমানের শত্রু হিন্দু নয়, হিন্দুর শত্র“ মুসলমান নয়। এপার বাংলা আর ওপার বাংলার মিলিত হিন্দু-মুসলমানের একমাত্র শত্র“ সাম্রাজ্যবাদী, সামন্তবাদ, পুঁজিবাদ, সম্প্রসারণবাদ ও ফ্যাসিবাদ। শোষকের কোনজাত নেই, কোন ধর্ম নেই এক মাত্র শোষণ করা ছাড়া। শোষক হিন্দুই হোক আর মুসলমানই হোক, কৃষক শ্রমিক সর্বহারা মজলুম জনগণের হাতে তার কোন রেহাই নেই, কোন নিস্তার নেই।
ভাসানী আরো বলেন, ঐতিহাসিক বাস্তব কারণেই আমি বিশ্বাস করি অতীতে যেমনি বাংলার সাধারণ মানুষ মিলিত হিন্দু মুসলমান মোগল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাংলার স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছে, বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, হিন্দু-মুসলমান মিলিতভাবে ক্ষুদিরাম, সূর্যসেন, সুভাস-তীতুমিরের নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলার জন্য সংগ্রাম করেছে, জীবন দিয়েছে, যেমনি বাংলার মিলিত হিন্দু মুসলমান পিন্ডির শোষকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে ঠিক তেমনি নিখিল বাংলার হিন্দু-মুসলমান কৃষক-শ্রমিক, মেহনতি জনগণ দিল্ল¬ীর সম্প্রসারণবাদী শোষকদের বিরুদ্ধে লড়াই করবেই করবে। (সূত্র : সমাজতান্ত্রিক কর্মী শিবিরের পক্ষে-শামসুল হক কর্তৃক প্রকাশিত এবং প্রেমরঞ্জন দেব কর্তৃক প্রচারিত। নবযুগ মুদ্রায় ২২, হাজী মঈনউদ্দিন রোড, ঢাকা-১ হইতে মুদ্রিত, ১৯৭২)
মওলানা ভাসানীর জীবদ্দশায় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাঁকে যে সম্মান দিয়েছেন, যারা জিয়া সরকারের এবং পরবর্তী সময়ে খালেদা জিয়ার সরকারের মন্ত্রী-মিনিস্টার হয়েছেন, তারাও ‘হুজুর মওলানা’কে সে সম্মান দেননি। মৃত্যুর পরও তার লাশ কাঁধে নিয়ে প্রেসিডেন্ট জিয়া তাঁকে যে অপার সম্মান দিয়েছেন, তাতে জিয়া নিজেও জাতির কাছে সম্মানিত হয়েছেন। জিয়াকে সমর্থন করেছিলেন মওলানা ভাসানী, প্রাণভরে আশীর্বাদ জানিয়েছিলেন তাকে। (সূত্র: রাজনীতির এক বিস্ময় পুরুষ মওলানা ভাসানী, কাজী সিরাজ, দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ ১৭ নভেম্বর ২০১৫)
মৃত্যুর কয়েকমাস আগে মওলানা ভাসানীর ১৯৭৬ সালের ১৬ মে-এর লং মার্চ ছিল বাংলাদেশে ভারতের পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লাখো জনতার এক বজ্রনির্ঘোষ প্রতিবাদ যা দিল্লীর মসনদেও কাঁপন ধরিয়ে দেয়। ওই দিন রাজশাহীর মাদরাসা ময়দান থেকে লং মার্চ শুরু হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে গিয়ে শেষ হয়। দিনটি ছিল রোববার। সকাল ১০টায় রাজশাহী থেকে শুরু হয় জনতার পদযাত্রা। হাতে ব্যানার আর ফেস্টুন নিয়ে অসংখ্য প্রতিবাদী মানুষের ঢল নামে রাজশাহীর রাজপথে। ভারতবিরোধী নানা স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠে পুরো জনপদ। বেলা ২টায় লাখো মানুষের গোদাগাড়ীর প্রেমতলী গ্রামে গিয়ে পৌঁছায়। সেখানে মধ্যাহ্ন বিরতির পর আবার যাত্রা শুরু হয়। সন্ধ্যা ৬টায় লং মার্চ চাঁপাইনবাবগঞ্জ কলেজ মাঠে পৌঁছায়। কলেজ মাঠেই রাত যাপনের পর সোমবার সকাল ৮টায় আবার যাত্রা শুরু হয় শিবগঞ্জের কানসাট অভিমুখে। ভারতীয় সীমান্তের অদূরে কানসাটে পৌঁছানোর আগে মহানন্দা নদী পার হতে হয়। লাখ লাখ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দেন এই লং মার্চে। তারা নিজেরাই নৌকা দিয়ে কৃত্রিম সেতু তৈরি করে মহানন্দা নদী পার হন। কানসাট হাইস্কুল মাঠে পৌঁছানোর পর সমবেত জনতার উদ্দেশে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী তার জ্বালাময়ী ভাষণ দেন। মওলানা ভাসানী ভারতের উদ্দেশে বলেন, ‘তাদের জানা উচিত বাংলার মানুষ এক আল্লাহকে ছাড়া আর কাউকে ভয় পায় না। কারো হুমকিকে পরোয়া করে না।’ তিনি বলেন, ‘আজ রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও কানসাটে যে ইতিহাস শুরু হয়েছে তা অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি করবে।’
 মওলানা ভাসানী এখানেই লংমার্চের সমাপ্তি ঘোষণা করেন। বাংলাদেশ সীমানার মধ্যে লং মার্চ সমাপ্ত হলেও সে দিন জনতার ভয়ে ভীত ভারতীয়রা সীমান্তে প্রচুর সৈন্য মোতায়েন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করে। ১৯৭৬ সালে মওলানা ভাসানীর ঐতিহাসিক প্রতিবাদ পদযাত্রা গোটা জাতির চেতনাকে শাণিত করে।
ফকির আলমগীর যথার্থাই লিখেছেন, (অবিস্মরণীয় মওলানা ভাসানী, ১৭ নভেম্বর ২০১৫) ‘.....গোটা দেশের মানুষ তাকে এখনও সেভাবেই চেনে। ক্ষমতার মোহ তাকে গ্রাস করতে পারেনি কখনও, কাগমারী সম্মেলন, আসামের লাইন প্রথা আন্দোলন, উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন, আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, ইত্তেফাক প্রতিষ্ঠা, যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ৬৯-এর মহান গণঅভ্যুত্থান, বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন কিংবা স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণের আন্দোলনের কথা এবং ফারাক্কা মিছিলের কথা মনে হলেই মওলানা ভাসানীর কথা মনে পড়বে সর্বাগ্রে....।’ (সূত্র : অবিস্মরণীয় মওলানা ভাসানী, ফকির আলমগীর, ১৭ নভেম্বর ২০১৫)
নদীমাতৃক বাংলাদেশের তৎকালীন পূর্ববঙ্গের যে দৃশ্যাবলী রবিঠাকুর তার ছিন্নপত্রাবলী থেকে উপন্যাস, গল্প, কবিতায় বিভিন্ন আঙ্গিকে এনেছেন— সেটি স্বচক্ষে তিনি দেখেছিলেন। যেমন ‘পোস্টমাস্টার’ কিংবা ‘ছুটি’ গল্পে নদীর যে বর্ণনা সেই বর্ণনার সঙ্গে আজকের জীবিত কোনো নদীর বর্ণনা কিছুতেই মিলবে না। সমগ্র বাংলাদেশের ছোট বড় কয়েক হাজার নদী ইতিমধ্যে মারা গিয়েছে।
বাংলাদেশের ২ কোটি ক্ষুদ্র কৃষকের ৮০ শতাংশেরও বেশী কৃষক প্রধান খাদ্যশস্য ধান উৎপাদনে নিয়োজিত এবং এজন্য তারা ভারতের উপর দিয়ে আসা নদ-নদীর পানির উপর নির্ভরশীল। গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রসহ প্রধান প্রধান নদী থেকে বিপুল পরিমাণ পানি প্রত্যাহারের ভারতীয় পরিকল্পনা ভাটিতে বাংলাদেশের ১০ কোটিরও বেশী মানুষের জীবিকার প্রতি সরাসরি হুমকি স্বরূপ। ১৯৭৬ সাল থেকে ভারত গঙ্গা নদীর পানি প্রত্যাহার করায় বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল ইতোমধ্যে শুকিয়ে যেতে শুরু করেছে। এখন ভারত অভিন্ন ৫৪টি নদীর অনেকটিতেই ফারাক্কার মত বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। অভিন্ন এসব নদীর পানি প্রবাহের উপর বাংলাদেশ পুরোপুরি নির্ভরশীল।
ফারাক্কা বাঁধের কারণে পশ্চিমবঙ্গের মালদহ-মুর্শিদাবাদ প্রভৃতি জেলা ও তার অধিবাসীরা যে ক্ষতি ও বিপর্যয়ের শিকার হয়েছে বাংলাদেশের উত্তর ও দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা ও তার অধিবাসীদের তার চেয়ে অনেক বেশী ক্ষতি ও বিপর্যয়ের শিকার হয়েছে। ফারাক্কায় বাঁধ দিয়ে অভিন্ন নদী গঙ্গার পানি অপহরণ করে ভারতের এই একতরফা ও নিষ্ঠুর আচরণে সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ জনপদে আজ হাহাকার। ফারাক্কা বাঁধের কারণে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ক্ষতি পরিমান কয়েক হাজার কোটি টাকা। ফারাক্কা বাঁধের ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া পড়েছে প্রাকৃতিক ব্যবস্থা, মানবিক কাজকর্ম এবং আর্থ-সামাজিক অবস্থার ওপর। ফারাক্কা বাঁধের কারণে মরু ও লবণাক্ততার বিস্তার ঘটেছে। ভুগর্ভস্থ পানির স্তর নীচে নেমে গেছে। নদী ও পানি ব্যবস্থা ইতোমধ্যেই ভেঙ্গে পড়েছে। নদীর গতি ও প্রকৃতি পরিবর্তিত হয়ে গেছে। ভূমি গঠন ব্যাহত হয়েছে, ভূমির উর্বরা শক্তি হ্রাস পেয়েছে। ভূমি গঠন ব্যাহত হয়েছে, ভূমির উর্বরা শক্তি হ্রাস পেয়েছে। বন্যা ও নদী ভাঙ্গন অবর্ণনীয় বিপর্যয়কর রূপ নিয়েছে। আবহাওয়াও চরম হয়ে পড়েছে। কৃষি কাজ, ভূমি ব্যবহার, মৎস্য চাষ, পশুপালন হুমকির মধ্যে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। শিল্পের অস্তিত্ব ও নানাভাবে আক্রান্ত হয়েছে। জনসংখ্যা, জনবসতি, জনস্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রায় মাত্রাহীন প্রতিকূল প্রভাব পড়ছে। ব্যবসা-বাণিজ্য বিশেষ করে নৌ-বাণিজ্য বন্ধ হতে বসেছে। গৃহচ্যুতি, দারিদ্র, বেকারত্ব, সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পাচ্ছে। মোট কথা, ফারাক্কা বাঁধের কারণে এক অপরিমেয় ক্ষতি ও বিপন্নতার মধ্যে নিক্ষিপ্ত হয়েছে বাংলাদেশ ও তার জনগণ। ফারাক্কারূপী দানবের আগ্রাসনে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত কৃষি, মৎস্য ও শিল্পখাতে ক্ষতি হয়েছে ৪৬ হাজার ৩শ’ ২০ কোটি টাকার মতো। প্রত্যক্ষভাবে বাংলাদেশের প্রায় ৪০ শতাংশ এলাকা এবং পরোক্ষভাবে আমাদের গোটা অর্থনীতি এই মরণ ফাঁদের শিকার।
ফারাক্কার অনিবার্য পরিণামে তিন’দশকে উর্বর বাংলাদেশের ৪০% এলাকা হয়ে উঠেছে ঊষর। সাংবাৎসরিক বন্যা-খরার আঘাতের পাশাপাশি চলছে দক্ষিণে লবণাক্ততা ও উত্তরে মরুপ্রবণতার আগ্রাসন। বিশেষত রাজশাহী ও খুলনা বিভাগে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বা জীব বৈচিত্র হারিয়ে পরিবেশ মহাবিপর্যয়ের কবলে। মিত্ররূপী শক্রর নির্মিত বাঁধ কেড়ে নিয়েছে অনন্তত ৪ কোটি মানুষের হাসি-আনন্দ, শান্তি ও স্বস্তি। বাংলাদেশ গাঙ্গেয় পানিতে গঠিত, পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপ। তাই গঙ্গার কয়েক হাজার বর্ষ প্রাচীন প্রবাহ তার প্রাণ তার জীবনী শক্তি। এই স্বাভাবিক স্বতঃস্ফুর্ত পানি প্রবাহকে   প্রতিষ্ঠিত করেছিল  বাঁধের বন্ধনে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলায় ভাটিতে নেমে এসেছে অবর্ণণীয় দুর্যোগ। ফারাক্কা বাঁধ দানবীয় পৈশাচিকতায় যে, ধ্বংসকা- ঘটিয়েছে এই সোবার বাংলায়, তার প্রকৃত মাত্রা নির্ধারণ সহজ নয়। তবুও বিভিন্ন সময়ে এ ব্যাপারে প্রয়াস পেয়েছেন অনেকেই। এসব উদ্যোগের মধ্য দিয়ে ক্ষয়-ক্ষতির যে চিত্র ধরা পড়েছে, তাতে এই ভয়াবহ সংকটের বিস্তুৃতি ও গভীরতা দেশ খানিকটা আঁচ করা যায়।
এবারও শুষ্ক মৌসুম শুরুর আগেই শুকিয়ে যাচ্ছে পদ্মাসহ রাজশাহী অঞ্চলের ১২টি নদী। শুকাচ্ছে খাল-বিল ও পুকুর-দীঘি। আগেভাগেই শুকিয়ে গেছে বিভিন্ন নালা-নর্দমা। এ অঞ্চলের ভূগর্ভস্ত পানির স্তর দ্রুত নেমে যাচ্ছে। গভীর নলকূপে পানি উঠছে আগের চেয়ে অনেকাংশে কম। অকেজো হয়ে পড়ছে হস্তচালিত নলকূপ। ফলে দেখা দিয়েছে সেচ ও পানীয় জলের সঙ্কট। এতে কৃষি, সেচ, মৎস্য ও পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। তাসত্ত্বেও এ অঞ্চলে পানি সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেই। ৩০ বছরেও পানি সংরক্ষণের জন্য চলনবিল ও উত্তর রাজশাহী সেচ প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি। এ নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে বিভিন্ন মহলে। (সূত্র : দৈনিক আমার দেশ ২৩ মার্চ ২০১৪)। রাজশাহী শহরের পাশেই স্রোতস্বিনী পদ্মা নদীতে জেগে উঠা বিশাল বিশাল চরে বিভিন্ন ফসল চাষ হচ্ছে। এক সময় এখানেই ছিল পদ্মার মূল স্রোতধারা। উজানের নদীকেন্দ্রিক কর্মপরিকল্পনাগুলোর প্রভাবে বিশাল বিশাল চর জেগে যাওয়ায় পদ্মার মূল স্রোতধারা প্রায় ৬-৭ কিলোমিটার ভারতের দিকে সরে গেছে। ফলে এ অঞ্চলে বিরূপ প্রভাব দেখা দিয়েছে। পদ্মা সংযুক্ত ১২টি নদী মরা খালে পরিণত হয়েছে। এ অঞ্চলের হাজার হাজার জেলে ও মাঝি বেকার হয়ে পড়েছেন।
পানি প্রত্যাহারের জন্য ভারত ফারাক্কা বাঁধ ছাড়াও বেশ কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। ভাগীরথী নদীর ওপর জঙ্গিপুরের ৩৯ কিলোমিটার দীর্ঘ ফিডার ক্যানেল। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ফারাক্কা পয়েন্টের ৪০ হাজার কিউসেক পানি হুগলী ও ভাগীরথী নদীতে সরিয়ে নেয়া হয়। এর ফলে হুগলী নদীর নাব্য যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি সারা বছর সচল থাকে কলকাতা নদীবন্দর

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ