ঢাকা, শুক্রবার 1 June 2018, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ১৫ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ঈদের চাঁদাবাজি

এবারও যথারীতি ঈদের চাঁদাবাজির ধুম পড়ে গেছে। এই চাঁদাবাজি সাধারণত রমযানের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়। কিন্তু এ বছর শুরু হয়েছে রমযানেরও আগে থেকে। শুধু তা-ই নয়, পেশাদার চাঁদাবাজদের সঙ্গে পাড়া ও মহল্লাভিত্তিক মৌসুমী চাঁদাবাজরা তো বটেই, এবার এক শ্রেণীর পুলিশও পুরোদমে নেমেছে চাঁদাবাজিতে। অন্য চাঁদাবাজরা যেখানে ডিজিটাল নানা পন্থার প্রয়োগ করছে, পুলিশ সেখানে সরাসরি হামলে পড়ছে চাঁদাবাজির জন্য চিহ্নিত লোকজনের ওপর। পুলিশ এমনকি রাস্তার লোকজন তথা পথচারীদেরকেও ছাড় দিচ্ছে না। কোনো মানুষকে পছন্দ হলেই পুলিশ তার বা তাদের পকেটে জোর করে কিছু ঢুকিয়ে দিয়ে বলছে, তারা নাকি ইয়াবা ধরনের মাদক পণ্যের ব্যবসা করে এবং তাদের পকেটে নাকি ওই সব মাদক সামগ্রী রয়েছে! ইয়াবা বা অন্য কোনো মাদকসহ ধরা পড়লেই যেহেতু কথিত বন্দুকযুদ্ধে প্রাণ যেতে পারে সেহেতু পুলিশের টার্গেট ব্যক্তিরা সঙ্গে থাকা সম্পূর্ণ নগদ অর্থ পুলিশকে দিয়ে প্রাণ বাঁচাতে বাধ্য হচ্ছে। ওদিকে চাঁদার টাকায় পকেট ভারি হচ্ছে পুলিশের। 

পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে জানা যাচ্ছে, পুলিশের চাঁদাবাজির এই কর্মকান্ড প্রায় প্রকাশ্যেই চলছে এবং চাঁদাবাজ পুলিশ সদস্যরা এমনকি আইজিপি এবং ডিমপি কমিশনারের নির্দেশের প্রতিও বলে-কয়ে অবজ্ঞা দেখাচ্ছে। এ বিষয়ে পুলিশ বিভাগে বিভিন্নজনের লিখিত অভিযোগের তথ্য রয়েছে বলেও জানা যাচ্ছে গণমাধ্যমের রিপোর্টে। রাজধানীর বেশ কয়েকটি থানার ওসি, এসআই, এএসআই এবং কনস্টেবলদের নাম উল্লেখ করে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন, কতটা নিষ্ঠুরতার সঙ্গে নির্যাতন চালিয়ে এবং মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে বা জড়ানোর ভয় দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে এবং হয়েছে। কথিত বন্দুকযুদ্ধের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে পুলিশের চাঁদাবাজি এতটাই ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, প্রতিকারের আশ্বাস দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমনকি আইজিপি ও ডিএমপি কমিশনারের বিশেষ মোবাইল নাম্বার পর্যন্ত প্রচার ও প্রকাশ করা হচ্ছে। জানানো হচ্ছে,  আক্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত যে কেউ এসব নাম্বারে ফোন করে অভিযোগ জানাতে পারেন এবং অবগত হওয়া মাত্রই পুলিশ বিভাগের পক্ষ থেকে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। অভিযোগকারীদের পরিচিতি গোপন রাখারও আশ্বাস দেয়া হচ্ছে। 

এক শ্রেণীর পুলিশ যখন মাদক ব্যবসার ভীতি দেখিয়ে চাঁদাবাজি করছে পেশাদার ও মৌসুমী চাঁদাবাজরা তখন চাঁদাবাজির জন্য নানা রকমের ‘ডিজিটাল’ পদ্ধতি অনুসরণ করছে। গোপন পাসওয়ার্ড হ্যাক করা থেকে এটিএম কার্ডে টাকা ওঠানোর মতো কর্মকান্ড এরই মধ্যে অনেক পুরনো বিষয় হয়ে গেছে। নতুন একটি পন্থার ব্যবহার করতে গিয়ে চাঁদাবাজরা আজকাল নিজেদের হাতে ভয়ংকর ধরনের অস্ত্র ধরে অ্যান্ড্রয়েড মোবাইলে প্রথমে সেলফি তুলছে এবং তারপর সেসব সেলফিসহ চাঁদার দাবি জানিয়ে টার্গেট লোকজনের মোবাইলে পাঠাচ্ছে। সঙ্গে থাকছে জীবনের হুমকি। কেউ কেউ শুধু হুমকি দিয়েই থেমে থাকছে না, গুলি চালিয়ে হত্যার চেষ্টা করেও প্রমাণ দিচ্ছে যে, তারা যা বলে তা করে। রাজধানীর কোনো কোনো এলাকায় এরকম ঘটনা ঘটেছে বলেই চাঁদাবাজদের টার্গেট হওয়া কারো পক্ষেই এদিক-সেদিক করা সম্ভব হচ্ছে না। তারা তাই মোবাইলে ‘নোটিশ’ ও হুমকি পাওয়ার পর প্রথম সুযোগেই দাবি অনুযায়ী অর্থ চাঁদা হিসেবে দিয়ে জীবন বাঁচাচ্ছেন। পুলিশের ওপর ভরসা ও বিশ্বাস নেই বলে কেউ থানায় রিপোর্ট লেখাতে যাচ্ছেন না। 

এরকম নানাভাবেই এবার ঈদের প্রাক্কালে চাঁদাবাজি মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। বিক্রি এবং লাভ হোক-না হোক চাঁদা ব্যবসায়ীদের দিতে হচ্ছেই। চাঁদার পরিমাণও চমকে ওঠার মতো। সাধারণ সময়ে ফুটপাতের একটি দোকান থেকে যেখানে দেড়শ’ বা দুইশ’ টাকা চাঁদা ওঠানো হয় এবারের ঈদ উপলক্ষে সেখানে চাঁদার পরিমাণ হাজার-দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা এবং তাদের সমিতির নেতারা জানিয়েছেন, প্রায় সাড়ে তিন লাখ ক্ষুদে ব্যবসায়ীর কাছ থেকে প্রতিদিন ছয় থেকে সাত-আট কোটি টাকা পর্যন্ত  চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। এসবের বাইরে টহল পুলিশও যেখানে যেভাবে পারছে চাঁদা আদায় করছে। 

অর্থাৎ সব মিলিয়েই রাজধানীজুড়ে এবার চাঁদাবাজির মহোৎসব শুরু হয়েছে! পেশাদার সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজ, স্থানীয় গুন্ডা-মাস্তান এবং আওয়ামী হকার লীগ ধরনের সাইনবোর্ডসর্বস্ব সংগঠনের নেতারা তো রয়েছেই, তাদের সঙ্গে জোট বেঁধেছে সরকারি দলের এলাকাভিত্তিক নেতা-কর্মীরাও। পুরনো ঢাকার অলি-গলি থেকে শুরু করে গুলশান-বনানীর মতো অভিজাত এলাকা পর্যন্ত কোনো একটিকেও এবার ছাড় দেয়া হচ্ছে না। সব মিলিয়েই অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, যখন ব্যবসায়ী থেকে চাকরিজীবী ও সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সকলকেই প্রমাদ গুণতে হচ্ছে। তারা পুলিশের শরণাপন্ন হতেও ভয় পাচ্ছেন। কারণ নালিশ করলে উল্টো বিপদ বাড়তে পারে। থানায় জিডি করতে গেলে শুধু নয়, পুলিশের কাছে টেলিফোনে নালিশ জানাতে গিয়েও বহু মানুষকে উল্টো বিপাকে পড়তে হচ্ছে। মুহূর্তে বেড়ে যাচ্ছে চাঁদার পরিমাণ। অর্থাৎ থানা-পুলিশ তথা সরকারের কাছে কোনো সাহায্যই পাচ্ছেন না ব্যবসায়ী ও নাগরিকরা। 

বলার অপেক্ষা রাখে না, এবারের রমযানেও চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্য সামান্য কমেনি বরং সব দিক থেকে তারা অনেক বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ক্ষমতাসীনরা সময়ে সময়ে ‘কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার’ যে ঘোষণা দিয়ে থাকেন সে ঘোষণা বা ধমক পাত্তাই পাচ্ছে না। রাতের বেলায় র‌্যাবের প্রহরাকেও তোয়াক্কা করছে না চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীরা। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অনেকে এমনকি ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের দিকেও আঙুল তুলেছেন। তারা মনে করেন, ক্ষমতাসীনদের মদত ও যোগসাজশ না থাকলে কোনো গোষ্ঠীর পক্ষেই এভাবে চাঁদাবাজি করতে পারার কথা নয়। লাফিয়ে বেড়ে চলা ছিনতাই-রাহাজানি প্রসঙ্গেও একই কথা বলা হচ্ছে সকল মহলে। কোনো ব্যাপারেই সরকার তথা র‌্যাব ও পুলিশকে মোটেও তৎপর দেখা যাচ্ছে না। 

বর্তমান পর্যায়ে ভীতি-আতংক ও আপত্তির কারণ হলো, ছিনতাই-চাঁদাবাজি ধরনের অপরাধ দমনে লম্বা আশ্বাস শোনানোর বাইরে এমনকি পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠার পরও সরকারকে নড়াচড়া করতে দেখা যাচ্ছে না। এজন্যই জনগণও লাভবান বা উপকৃত হতে পারছে না। আমরা মনে করি, মুসলিমদের সবচেয়ে বড় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে ব্যবসায়ীরা যাতে চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসী ও পুলিশের অত্যাচার থেকে মুক্তি পেতে পারেন এবং সাধারণ মানুষ যাতে মার্কেট ও শপিং মলগুলোতে নির্বিঘেœ গিয়ে কেনাকাটা করতে পারে তার আয়োজন এখনই নিশ্চিত করা দরকার। অর্থনীতির এই সহজ কথাটা বুঝতে হবে যে, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে যে টাকা চাঁদার নামে আদায় করা হয় সে টাকা ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বাড়িয়ে ক্রেতা তথা সাধারণ মানুষের ঘাড়ে চাপিয়ে দেন। অর্থাৎ চাঁদাবাজি আসলে জনগণের কাছ থেকেই করা হচ্ছে। এমন অবস্থা চলতে দেয়া যায় না। আমরা আশা করতে চাই, ঈদের আগের বাকি কয়েকদিনে সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নেবে। চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি পুলিশকেও ছাড় দেয়া চলবে না।  

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ