ঢাকা, শনিবার 2 June 2018, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ১৬ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ফল খেতে সাবধানতা চাই

বাংলার মধুমাস বলে খ্যাত জ্যৈষ্ঠ বিদায়ের পথে। এখন আম, লিচু, জামরুল কাঁঠাল, জাম প্রভৃতি রসালো ফলের মওসুম। যদিও একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অতি মুনাফার লোভে এসব অপুষ্ট ফল ক্ষতিকর বিভিন্ন রাসায়নিক দিয়ে পাকিয়ে বাজারজাত করে। গ্রাহকদের ঠকায়। এসব ফল ছোটবড় সবার অতিপ্রিয়। তাই রাসায়নিকে পাকানো অপরিপক্ব বিষাক্ত ফল খেয়ে মানুষ নানা অসুখে আক্রান্ত হতে পারে। এমনকিমৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। বিশেষত লিচু, রামবুতান শিশুদের দারুণ প্রিয়। রামবুতান অবশ্য আমাদের দেশীয় ফল নয়। এটি থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন থেকে আমদানি হয়। দেখতে এবং খেতে স্বাদ লিচুর মতোই প্রায়। গায়ে খাঁড়াখাঁড়া শেকড় থাকে। ঢাকায় সুপারশপে অনেক দামে বিক্রি হয় এ ফল।
উল্লেখ্য, আম, লিচু, জাম ইত্যাদি ফল পাকলে গাছ থেকে এমনিতে নিচে পড়ে যায়। আবার কোনও পাখি ঠোকর দিলেও ঝরে পড়ে। তখন শিশুরা দৌড়ে গিয়ে পড়া ফল কুড়িয়ে নেয় এবং খেয়ে ফেলে। বিপদ ঘটে তখনই। অনেকের নিশ্চয়ই মনে থাকবার কথা। বছর তিনেক আগে উত্তরের জনপদ দিনাজপুরে লিচু খেয়ে ১১ শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছিল। প্রথমে ধারণা করা হয়, গাছে কীটনাশক দেয়া পড়া লিচু খেয়েই ওরা মারা যায়। কিন্তু পরে পরীক্ষানিরীক্ষা করে ধরা পড়ে যে, শিশুরা কীটনাশক দেয়া লিচু খেয়ে মারা যায়নি। মৃত্যুর জন্য দায়ী লিচুতে থাকা ‘হাইপোগ্লাইসিন’ নামক এক ঘাতক রাসায়নিক। শিশুরা সকালে খালিপেটে লিচু খেলে শর্করা হঠাৎ করে কমে যায়। ফলে শরীরে হাইপোগ্লাইসিনের বিষক্রিয়ায় মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটতে পারে। একই বছর ভারতের বিহার রাজ্যেও ৩৯০ শিশু লিচু খেয়ে অসুস্থ হলে হাসপাতালে ভর্তির পর তাদের মধ্যে ১২২ জন মারা যায়। কারণ একই। বিহারের শিশুরাও খালিপেটে লিচু খেয়েছিল। থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কাসহ ক্যারিবীয় অঞ্চলেও খালিপেটে লিচুর মতো ফল খেয়ে শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে বলে গবেষকরা জানিয়েছেন।
শুধু লিচু খেয়েই শিশুরা মারাত্মক রোগে ভোগে বা দুঃখজনকভাবে মারা যায় তা নয়। আম, কাঁঠাল, জাম, জামরুল, পেয়ারা খেয়ে শিশু, কিশোর এমনকি বড়রাও অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। শুধু তাই নয় শীতকালে গাছে লাগানো হাড়িতে বাদুড়ে খাওয়া খেজুরের রস খেয়ে রিটা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে এ দেশে। ভারতেও ঘটেছে। তবে এমন মৃত্যুর সব ঘটনা আলোর মুখ দেখে না। গাছে কাঁঠাল, আম, কলা, ডাওয়া ইত্যাদি ফল পাকলেও বাঁদুর, কাকসহ অনেক পাখিতে খায়। বিশেষত কাঁঠাল গাছে পাকলে বাঁদুড়, কাকসহ শেয়াল, কাঠবেড়ালি সবার আগে টের পায় এবং পাকা কাঁঠালে ভাগ বসায়। গ্রামের অনেকে না বুঝে কাকপক্ষী বা বন্যজন্তুতে মুখলাগানো ফল বাড়িতে এনে সবাই মিলে দিব্যি খেয়ে ফেলেন। এটা যে কত ভয়ানক হতে পারে কেউ চিন্তাও করেন না। বুঝতে যখন পারেন, তখন অনেক ক্ষতি হয়ে যায়। এছাড়া বাগানে বা গাছতলায় পড়ে থাকা পাকা ফলে মাছি বসে, অনেকরকম পোকামাকড় মুখ দেয়। এ ফল কুড়িয়ে খেলে নানাবিধ অসুখ বা জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হবার আশঙ্কা থাকে। তবে ফল যদি অক্ষত থাকে তাহলে ভালোভাবে ধুয়ে নিয়ে খেলে সাধারণত সমস্যা হবার কথা নয়।
সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে বাগানের আম ভাঙার সময় বেঁধে দিলেও আগাম ভেঙে এবারও অনেকে বিপদে পড়েছেন। রাসায়নিকে পাকানো হাজার হাজার মণ অপরিপক্ক আম নষ্ট করে দেয়া হয়েছে। এ উদ্যোগকে অবশ্যই সাধুবাদ জানাতে হবে। কারণ ফলের নামে বিষের দলা কাউকে গলাধঃকরণ করতে দেয়া যায় না। যাই হোক, এ মধুমাসের রসালো ফলের মধুর রসে আমরা কমবেশ সবাই মুখ রঙিন করি। তবে আজকাল প্রায় সবরকম ফলে ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশিয়ে এমন সুন্দর ও সুস্বাদু এবং ভিটামিন সমৃদ্ধ ফল বিষাক্ত করে ফেলা হয়। তাই ফল আর উপাদেয় থাকে না। ফল হয় বিষময় এবং জীবনবিনাশী। আর এমনটা করে একশ্রেণির কা-জ্ঞানহীন মানুষ। এদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেবার কথা বলা হয়। কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয় না রহস্যজনকভাবে।
একটা বিষয় অভিভাবকদের খেয়াল করা উচিত। সেটা হলো: শিশুরা যাতে খালিপেটে লিচু জাতীয় ফল না খায় সেদিকে নজর দিতে হবে অভিভাবকদের। বড়দেরও ফল খেতে হবে। তবে সেফল যাতে বিষমুক্ত ও নিরাপদ হয়। এছাড়া ফল শুধু খেলেই হবে না। খালিপেটে লিচু খেয়ে দিনাজপুর ও বিহারে শিশু মৃত্যুর ঘটনা প্রমাণ করে সবরকম ফল খালিপেটে খাওয়া উচিত নয়। খেলে তা হতে পারে প্রাণঘাতী এবং বিয়োগান্ত। তাই ফল খাওয়ার নিয়মকানুন শিশুদের শেখানো দরকার। আর এটা শুরু করা যেতে পারে স্কুল থেকে। বাসায় অভিভাবকরাও এ ব্যাপারে যত্নবান হতে পারেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ