ঢাকা, রোববার 3 June 2018, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ১৭ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আসন সংকটে ব্যাংকিং খাত॥ চলছে ছাঁটাই ॥ আতংক

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : দেশের ব্যাংক ব্যবস্থায় অস্থিরতা চলছে। একদিকে খেলাপি ঋণের বোঝা অন্যদিকে মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে অধিকাংশ বেসরকারি ব্যাংক। ফলে বড় ঋণ পেতে বেগ পেতে হচ্ছে গ্রাহকদের। অর্থসংকটে পড়া ব্যাংকগুলোর সংকট নিরসনে ব্যাংক মালিকদের সকল আবদার পূরণ করেছে সরকার। ঋণের সুদের হার কমানোর শর্তে ব্যাংকগুলোর সিআরআর কমানোসহ কয়েকটি সিদ্ধান্তে অর্থপ্রবাহের দরজা খুলে দেয়া হয়। এ সকল সুবিধা দেয়া সত্ত্বেও ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় সে সংকটকে আরও ঘনিভূত করেছে। এমতাবস্থায় বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) গবেষণা প্রতিবেদনে ব্যাংকের কর্মী ছাঁটাই ও গ্রাহক কমে যাওয়ার তথ্য বিশেষজ্ঞদের ভাবিয়ে তুলেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যাংকিং খাতে নীতিবান নেতৃত্বের অভাবে এ অবস্থা তৈরী হয়েছে।
ব্যাংক খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনার মধ্যে সম্প্রতি বিআইবিএম এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে ব্যাংক হিসাব বন্ধের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বিআইবিএমের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাংকের উপর গ্রাহকদের অসন্তুষ্টির কারণে গত বছর রেকর্ড পরিমাণ ব্যাংক হিসাব বন্ধ করে দিয়েছে গ্রাহকরা। অন্যদিকে গত এক বছরে ব্যাংকিং খাতে কর্মী ছাঁটাই হয়েছে ৯ হাজার। এ ছাড়া ব্যাংকগুলো মানবসম্পদ উন্নয়নের বাজেট কমিয়েছে। কমিয়েছে প্রশিক্ষণ ব্যয়। ফলে ব্যাংকাররা তাদের গ্রাহকদের সাথে সম্পর্কের উন্নয়নের ঘটাতে পারছেন না। আবার নির্দিষ্ট অর্থ বরাদ্দ থাকলেও এক-তৃতীয়াংশ ব্যাংক তাদের মানবসম্পদ উন্নয়নে কোনো টাকাই ব্যয়  করেনি। 
প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রাহকরা অসন্তুষ্ট হয়ে ২০১৭ সালে ১৬ লাখ ৫২ হাজার ৮৮১টি ব্যাংক হিসাব বন্ধ করে দিয়েছে যা দেশের মোট ব্যাংক হিসাবের সাড়ে ১২ শতাংশ। এর আগে ২০১৪ সালে মোট গ্রাহকের ৮ দশমিক ৬০  শতাংশ অসন্তুষ্ট হয়ে ব্যাংক হিসাব বন্ধ করে দিয়েছিল বলে পরিসংখ্যান দেওয়া হয়। এরপর ২০১৫ সালে  এ একাউন্ট বন্ধের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। ২০১৬ সালে এই সংখ্যা আরও বেড়ে ১১ দশমিক ৬৪ শতাংশে দাঁড়ায়। আর ২০১৭ সালে সে রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেল।
বিআইবিএমের ‘সাসটেইনেবিলিটি ইন সার্ভিস কোয়ালিটি অ্যান্ড কাস্টমার্স কনফার্মিটি : ড্রাইভার্স অব কাস্টমার্স লয়ালিটি টু ব্যাংকস’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে জানানো হয় ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের আস্থা দিন দিন কমে যাচ্ছে। এ থেকে উত্তরণ জরুরী।
এ ব্যাপারে বিআইবিএমের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, প্রতিবছর গ্রাহকরা ব্যাংক হিসাব বন্ধ করলেও ৫৬ শতাংশ ব্যাংকে এ বিষয়ে গ্রাহকদের কোনো সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়নি। এমনকি বন্ধ হয়ে যাওয়া এসব ব্যাংক হিসাবধারীর কোনো ট্র্যাক রেকর্ডও সংরক্ষণ করা হয় না। গ্রাহকদের আস্থা চলে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধান করে তা থেকে উত্তরণের উপায় বের করতে হবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে।
বিআইবিএমের চেয়ার প্রফেসর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. বরকত-এ- খোদা বলেন, অর্থনীতিতে গ্রাহক সন্তুষ্টি সাফল্য অর্জনের অন্যতম নিয়ামক। ব্যাংকিং খাতেও ভালো পণ্যের সঙ্গে ভালো সেবা প্রদান করতে হবে।
এদিকে গ্রাহকদের অভিযোগ, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেন না।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ব্যাংকিং খাতে কর্মীদের কিছু সৌজন্য শেখাতে হবে ফাউন্ডেশন প্রশিক্ষণেই।
ব্যাংকিং খাতে মানব সম্পদে চলছে চরম অব্যবস্থাপনা। প্রতিনিয়তই বাড়ছে কর্মী ছাঁটাই ও পদত্যাগ। এতে কর্মকর্তাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে আতঙ্ক। সাম্প্রতিক কয়েকটি ব্যাংকে কর্মী ছাঁটাই নিয়ে চলছে বেশ আলোচনা-সমালোচনা। গত এক বছরেই ব্যাংকিং খাতে ৯ হাজার কর্মী ছাঁটাই ও পদত্যাগের ঘটনা ঘটেছে।
বিআইবিএমের প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাংকিং খাতে গত এক বছরে কর্মী কমেছে ৯ হাজারেরও বেশি। ২০১৬ সালে ব্যাংক কর্মী ছিল ৯০ হাজার ২৬৫ জন। ২০১৭ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৮১ হাজার ২৪৫ জনে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছর কর্মীসংখ্যা কমার একটি বড় কারণ উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মীর পদত্যাগ। বাকিদের অনেকের চাকরি হারাতে হয়েছে।
অন্য এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৬ সালে ন্যাশনাল ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স (এনসিসি) ব্যাংকের কর্মীর সংখ্যা ছিল দুই হাজার ৩১০ জন। ২০১৭ সালে ব্যাংকটির কর্মীসংখ্যা কমে দুই হাজার ১৪৬-এ নেমেছে।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৬১ শতাংশ ব্যাংকার মনে করেন, ব্যাংকিং খাতে নীতিবান নেতৃত্বের অভাব রয়েছে। ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম এবং দুর্নীতির ঘটনা সংঘটিত হচ্ছে। এ কারণে ব্যাংকিং খাতের নীতিবান নেতৃত্ব দরকার বলে ব্যাংকাররা জানিয়েছেন।
এদিকে মানবসম্পদের উন্নয়নের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। বলা হয়, ব্যাংকের অপারেটিং খরচ যদি ১০০ টাকা হয় তাহলে এর মধ্যে মানবসম্পদ উন্নয়নে ব্যয় হয় মাত্র ২৫ পয়সা। যা খুবই হতাশাজনক। শুধু তাই নয়, প্রশিক্ষণে বাজেটও কমিয়েছে ব্যাংকগুলো। ব্যাংকগুলো কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং উন্নয়নে ব্যয় ৫০ শতাংশ কমিয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে অপারেটিং খরচের ২ থেকে ৩ শতাংশ ব্যয় করা হয়। একই সঙ্গে এক-তৃতীয়াংশ ব্যাংক তাদের মানবসম্পদ উন্নয়নে ব্যয় করতে ব্যর্থ হয়েছে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আহমেদ জামাল বলেন, ব্যাংকিং খাতের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অর্থমন্ত্রণালয় বেশ কিছু সার্কুলার জারি করেছে। এসব সার্কুলার যথাযথ পরিপালনের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নজরদারি করা হয়। তিনি বলেন, ব্যাসেল-৩ বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে। এতে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ইয়াছিন আলি বলেন, ব্যাংকের পরিচালকদের একটি অংশ ব্যাংক কর্মীদের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করতে হবে তা জানে না। এজন্য ব্যাংক পরিচালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বর্তমানে অনেক ব্যাংকেই এখন পুরানো কর্মকর্তা পাওয়া যাবে না। অধিকাংশ ব্যাংকেই ১৮ বছর হয়েছে এমন কর্মকর্তা পাওয়া যাবে না। অনেক ব্যাংকে পদ খালি রয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকেই ১৬ হাজার পদ খালি রয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ