ঢাকা, সোমবার 4 June 2018, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ১৮ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

তৃতীয় দিনে কমলাপুর স্টেশনে টিকিট প্রত্যাশীদের উপচে পড়া ভীড়

ট্রেনে অগ্রিম টিকেটের জন্য কমলাপুর স্টেশনে টিকেট প্রত্যাশীদের ভিড়। গতকাল রোববার তোলা ছবি -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : ঈদে ঘরমুখো যাত্রীদের জন্য কমলাপুরে তৃতীয় দিনের মতো বিক্রি হয় রেলের অগ্রিম টিকিট। মহাসড়কগুলো বেহাল হওয়ার কারণে এবার শুরু থেকেই বাড়তি চাপ সামাল দিতে হচ্ছে রেল কর্তৃপক্ষকে। এবার সড়কপথের চেয়ে রেলপথের টিকিটের চাহিদা বেশি। কমলাপুরে টিকিট সংগ্রহ করতে গিয়ে গত দুই দিন তেমন কোনো অভিযোগ না থাকলেও অনেক যাত্রীর মুখে শোনা গেছে অভিযোগের কথা। টিকিট দেওয়ায় ধীরগতি এবং এসি টিকিট না পাওয়ার অভিযোগ করেন তারা।
পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঘরমুখী মানুষের কাছে শুক্রবার থেকে ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল রোববার তৃতীয় দিনের মতো দেয়া হয় ১২ জুনের ট্রেনের অগ্রিম টিকিট। টিকিট প্রত্যাশীরা শনিবার মধ্যরাত থেকে কমলাপুর রেলস্টেশনে এসেছেন, আবার কেউবা এসেছেন সেহেরি খাওয়ার পরে।
কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, বিপুলসংখ্যক টিকিট প্রত্যাশী সেখানে জড়ো হয়েছেন। কাক্সিক্ষত টিকিট পাওয়ার জন্য তারা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন। সেই সারি টিকিট বিক্রির কাউন্টার থেকে প্লাটফর্ম ছাড়িয়ে রাস্তায় এসে পড়ে। কাক্সিক্ষত টিকিট পেয়ে তৃপ্তির হাসি হাসছেন অনেকে।
 রেলওয়ে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সকাল আটটা থেকে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে ২৬টি কাউন্টারে একসঙ্গে টিকিট বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে সামরিক বাহিনীর জন্য একটি এবং দুটি কাউন্টার শুধু নারীদের জন্য রাখা হয়েছে। রোববার কাউন্টারে টিকিট বিক্রি শুরুর ১৫-২০ মিনিটের মধ্যেই শেষ হয়ে যায় এসি ও কেবিনের টিকিট। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে এসি কিংবা কেবিনের টিকিট না পেয়ে অনেক যাত্রীরা হতাশ। আর রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে, এসি ও কেবিনের স্বল্পতার কারণেই যাত্রীরা টিকিট পাচ্ছেন না।
তবে সাধারণ কাউন্টারের একাধিক যাত্রীর অভিযোগ, অল্প সময়ের মধ্যেই এসি ও কেবিনের টিকিট শেষ হয়ে যাচ্ছে। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে টিকিটের জন্য লাইনে দাঁড়ানো মানুষের সংখ্যা কমে প্রায় অর্ধেক হয়েছে। টিকিট থাকা সাপেক্ষে সবাই টিকিট পাবেন বলে জানান স্টেশন মাস্টার সিতাংশু।
দিনাজপুরের দ্রুতযান এক্সপ্রেসের টিকিটের জন্য প্রায় ১৯ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মো. শাহিন। তিনিসহ আরও তিন চারজন এসি টিকিট পেয়েছেন। শাহিন বলেন, আমাদের তিন চারজনকে এসি টিকিট দিয়েছে, কিন্তু আমার পরেই আর কেউ এসি টিকিট পায়নি। এসি নাকি শেষ।
অগ্রিম টিকিট প্রত্যাশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেকেই শনিবার রাতে কমলাপুরে এসেছেন। টিকিট যাতে কোনোভাবেই হাতছাড়া না হয়, সেজন্য তারা রাতভর স্টেশনে অবস্থান করেছেন। টিকিট বিক্রির অনেক আগেই তারা কাউন্টারের সামনে সারি ধরেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবির ইসলাম বলেন, সেহেরি খেয়ে টিকিটের জন্য এসে দাঁড়িয়েছি, সাড়ে ১১টার কিছু পরেই টিকিট পেলাম। তবে তাতেও তিনি সন্তুষ্ট।
ঢাকা থেকে রাজশাহীগামী পদ্মা এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রী আল ফাইদ। তার দুর্ভোগ অবশ্য বেশি। জানালেন, মা-বাবার সঙ্গে রাজশাহী যাবেন তিনি। সকাল পৌনে ছয়টার দিকে স্টেশনে এসে লাইনে দাঁড়িয়েছেন।
এসি ও কেবিনের টিকিটের বিষয়ে জানতে চাইলে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন ম্যানেজার সিতাংশু চক্রবর্তী বলেন, এসি ও কেবিনের টিকিটের স্বল্পতা রয়েছে। তবে মোট টিকিটের মধ্যে নির্দিষ্টসংখ্যক টিকিট লাইনে দাঁড়িয়ে পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে নারী লাইনে এসি টিকিট পাওয়া যাচ্ছে।
 রেল সূত্রে জানা যায়, আজ ৪ঠা জুন সোমবার দেয়া হবে ১৩ জুনের টিকিট, ৫ জুন পাওয়া যাবে ১৪ জুনের এবং সর্বশেষ ৬ জুন দেয়া হবে ১৫ জুনের টিকিট। গত ১ জুন থেকে ট্রেনের আগাম টিকিট বিক্রি শুরু হয়েছে। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত কমলাপুরে টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে। আগামী ৬ জুন পর্যন্ত যাওয়ার টিকিট বিক্রি হবে। একজন যাত্রী সর্বোচ্চ চারটি টিকিট কিনতে পারবেন।
অপরদিকে ঈদ উদযাপন শেষে কর্মস্থলে গমনেচ্ছু যাত্রীদের ১০ জুন দেওয়া হবে ১৯ জুনের টিকিট, ১১ জুন দেওয়া হবে ২০ জুনের, ১২ জুন দেওয়া হবে ২১ জুনের, ১৩ জুন দেওয়া হবে ২২ জুনের, ১৪ জুন দেওয়া হবে ২৩ জুনের এবং ১৫ জুন দেওয়া হবে ২৪ জুনের অগ্রিম ফিরতি ট্রেনের টিকিট।
কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন ম্যানেজার সিতাংশ চক্রবর্তী বলেন, বর্তমানে প্রতিদিন ২৩ হাজার ৫১৪টি করে টিকিট সরবরাহ করা হচ্ছে। এ টিকিটের ২৫ শতাংশ অনলাইনে সরবরাহ ছাড়াও ৫ শতাংশ রেলের কর্মচারী ও ৫ শতাংশ ভিআইপিদের জন্য বরাদ্দ। বর্তমানে যে পরিমাণ টিকিট প্রতিদিন দেয়া হচ্ছে এ সংখ্যা পর্যায়ক্রমে বাড়বে। ১৩-১৫ জুনের জন্য ৪-৬ জুন টিকিট বিক্রি করা হবে। ওই সময়ে মেইল, এক্সপ্রেস ও লোকাল মিলে প্রতিদিন ৬০ হাজার টিকিট দেয়া হবে।
এদিকে গতকাল হঠাৎ করে কমলাপুর স্টেশনে উপস্থিত হন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি টিম। অগ্রিম টিকিট বিক্রির সার্বিক বিষয়ে কোন অব্যবস্থাপনা বা যাত্রীদের কোন অভিযোগ আছে কিনা তা জানতে এবং সার্বিক বিষয় খোঁজ নিতে ১০ সদস্যের একটি টিম বেলা ১২টার দিকে কমলাপুর স্টেশনে আসেন। এবং দুদকের উপপরিচালক মাহমুদ হাসানের নেতৃত্বে এই টিমটি টিকিট কাউন্টারগুলোর সামনে গিয়ে অপেক্ষমান টিকিট প্রত্যাশীদের সঙ্গে কথা বলেন। তারা টিকিট ঠিকমত পাচ্ছে কিনা তা জানতে চাইলে সেখানে উপস্থিত এক টিকিট প্রত্যাশী বলেন, সাধারণ টিকিট পাওয়া যাচ্ছে তবে তবে সকাল থেকেই এসি টিকিট পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ জানান। এসময় তিনি অগ্রিম টিকিট প্রত্যাশী অন্য যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলেও সার্বিক বিষয় খোঁজ খবর নেন।
পরে দুদকের উপ-পরিচালক মাহমুদ হাসান সাংবাদিকদের বলেন, দুর্নীতি মুক্ত এবং ঝামেলাহীনভাবে ঈদের অগ্রিম টিকিট কিনতে পারে সে বিষয়গুলো নিশ্চিত করতেই আমাদের আসা। কিছু অভিযোগের প্রেক্ষিতে তা ক্ষতিয়ে দেখতে আমাদের টিম পরিদর্শনে এসেছে। অনেকের সঙ্গে কথা বলে ঘুরে দেখছি সার্বিক ব্যবস্থাপনা। দুর্নীতি মুক্ত ও ঝামেলাহীনভাবে যাত্রীরা টিকিট সংগ্রহ করতে পারে সে লক্ষ্যে দুদকের অবস্থান থেকে আমাদের যা যা করার দরকার তা করবো।
এর আগে কমলাপুর স্টেশন ম্যানেজার সিতাংশু চক্রবর্তীর রুমে দুদক টিম প্রবেশ করে তাকে সঙ্গে নিয়ে টিকিট কাউন্টারের ভিতরের অংশের কার্যক্রম ঘুরে দেখেন। পরে স্টেশন ম্যানেজার সিতাংশু চক্রবর্তী বলেন, ‘উনারা এসে টিকিট কাউন্টের ভিতরে, বাইরে ঘুরে দেখে সবার সঙ্গে কথা বলেছেন এবং সার্বিক বিষয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন।
কমলাপুর স্টেশন পরিদর্শনে আসা টিমে উপপরিচালক মাহমুদ হাসান ছাড়াও উপ-সহকারি পরিচালক সাইফুল ইসলামসহ ১০ জন সদস্য এ পরিদর্শনে অংশ নেন।
ঈদুল ফিতর উপলক্ষে অগ্রিম বাসের টিকিটের মূল্য বেশি নেয়ায় ও কাউন্টারে মূল্য তালিকা না থাকায় চার পরিবহনকে জরিমানা করেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- এমআর পরিবহন, এসপি গোল্ডেন এক্সপ্রেস, সুন্দরবন এক্সপ্রেস ও রয়েল কোচ। প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে মোট ৮০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
গতকাল রাজধানীর শ্যামলী বাস কাউন্টারে বিশেষ অভিযান চালিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়। অভিযানে সার্বিক তদারকি করেন ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের উপ-পরিচালক (উপসচিব) মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার। অভিযান পরিচালনা করেন অধিদফতরের ঢাকা জেলা অফিসের সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার ম-ল। আর অভিযানে সার্বিক সহযোগিতা করে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ান (এপিবিএন)-১ এর সদস্যরা।
উপপরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলেন, ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বাড়ি ফেরা মানুষের জন্য অগ্রিম বাসের টিকিট বিক্রি শুরু হয়েছে। অন্যান্য সময়ের তুলনায় টিকিটের দাম বেশি নিচ্ছে এমন অভিযোগে আজকে শ্যামলী বাস কাউন্টারে বিশেষ অভিযান চালানো হয়। এসময় অগ্রিম টিকিটের মূল্য বেশি রাখায় ঢাকা থেকে সাতক্ষীরা রুটের এম আর পরিবহনকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এছাড়া টিকিট কাউন্টারে মূল্য তালিকা না থাকায় একই রুটের এস পি গোল্ডেন এক্সপ্রেস ও সুন্দরবন এক্সপ্রেস ও ঢাকা-কলকাতা, ঢাকা-টেকনাফ রুটের রয়েল কোচকে জরিমানা করা হয়।
তিনি বলেন, বাস কাউন্টারে আজকে প্রথম অভিযান হয়েছে তাই জরিমানার পাশাপাশি সতর্ক করা হয়েছে। ভোক্তা সংরক্ষণ আইন যথাযথ পরিপালনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। পরবর্তীতে তারা এ নির্দেশনা না মানলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ