ঢাকা, সোমবার 4 June 2018, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ১৮ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ঈদ যাত্রার আগেই বেড়ে গেছে সড়ক দুর্ঘটনা

ইবরাহীম খলিল : ঈদ যাত্রা শুরু হতে আরও এক সপ্তাহের বেশি সময় বাকী। কিন্তু তার আগেই বেড়ে গেছে সড়ক দুর্ঘটনা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সড়ক দুর্ঘটনা এদেশে অনেকটা মহামারীর মতো। গতকাল আধা বেলায় সিরাজগঞ্জ, শরীয়তপুর, হবিগঞ্জ,  বগুড়া ও নোয়াখালীতে সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছে। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরো ১৪ জন। গত তিন মাসের পর্যালোচনা বলছে, দুর্ঘটনার ব্যাপকতা বেড়েছে। বর্তমানে পর পর কয়েকটি ঘটনায় এটি অনেক বেশি নজরে এসেছে। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, বিচারের মুখোমুখি করতে না পারার কারণে এবং ক্ষমতাবানদের ছত্রচ্ছায়ায় চালকরা পার পেয়ে যাওয়ায় কমছে না সড়ক দুর্ঘটনা।
বেসরকারি সংগঠন নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির নিয়মিত মাসিক জরিপ ও পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে সড়ক  দুর্ঘটনার তথ্য তুলে ধরা হয়। তাতে বলা হয় সারা দেশে গত পাঁচ মাসে এক হাজার ৯২৬টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে  ১ হাজার ৯ শ’ ৯৫ জন নিহত হয়। আহত হয় ৪ হাজার ৭৭২ জন। নিহতদের মধ্যে ২৫১ জন নারী ও ২৫৮ শিশু রয়েছে। ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত জাতীয় মহাসড়ক, আন্তঃজেলা সড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে এসব প্রাণঘাতি দুর্ঘটনা ঘটে। ২২টি জাতীয় দৈনিক, ১০টি আঞ্চলিক সংবাদপত্র এবং আটটি অনলাইন নিউজপোর্টাল ও সংবাদ সংস্থার তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। ৩১ মে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে ধান বোঝাই ট্রাক উল্টে নিহত হন তিন শ্রমিক।
তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, জানুয়ারিতে ৪০৩টি দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ৫৪ নারী ও ৩০ শিশুসহ ৪২৫ জন নিহত হয়। আহত হয় ৯৩৩ জন। ফেব্রুয়ারিতে ৩৭৩টি দুর্ঘটনায় ৫৩ নারী ও ৫৮ শিশুসহ নিহত হয় ৪১৩ জন। আর আহত হয় ৯৯৫ জন। মার্চে দুর্ঘটনা হয়েছে ৩৭৯টি। এতে ৫৩ নারী ও ৭৯ শিশুসহ কমপক্ষে ৩৮৫ জনের প্রাণহানি ঘটে। আর আহত হয় ৯৭১ জন। এপ্রিলে দুর্ঘটনা ঘটে ৪০৮টি। এতে ৫০ নারী ও ৫০ শিশুসহ ৩৮৯ জন নিহত এবং এক হাজার ৩২ জন আহত হয়। মে মাসে ৩৬৩টি দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত হয় যথাক্রমে ৩৮৩ ও ৮৪১ জন। নিহতদের মধ্যে ৫৯ নারী ও ২৬ শিশু রয়েছে।
বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির সড়ক দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণ সেলের তথ্যমতে, সারাদেশে এ বছরের জানুয়ারি থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার মাসেই এক হাজার ৭৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় এক হাজার ৮৪১ জনের মৃত্যু ও পাঁচ হাজার ৪৭৭ জন আহত হয়েছেন। পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন ২৮৮ জন।
আগের বছর ২০১৭ সালে চার হাজার ৯৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন সাত হাজার ৩৯৭ জন। ২০১৬ সালে চার হাজার ৩১২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ছয় হাজার ৫৫ জন নিহত ও ১৫ হাজার ৯১৪ জন আহত হয়েছিলেন। বিগত বছরের তুলনায় ২০১৭ সালে দুর্ঘটনা বেড়েছে ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ। নিহত ২২ দশমিক ২ শতাংশ এবং আহত ১ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
যাত্রীকল্যাণ সমিতি বলছে, বর্তমানে সারাদেশে নিবন্ধিত ৩১ লাখ যানবাহনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অনিবন্ধিত, ভুয়া নম্বরধারী ও অযান্ত্রিক যান মিলে প্রায় ৫০ লাখ যানবাহন রাস্তায় চলছে; যার ৭২ শতাংশের ফিটনেস নেই। অন্যদিকে, সারাদেশে ৭০ লাখ চালকের মধ্যে বিআরটিএর লাইসেন্স আছে মাত্র ১৬ লাখ চালকের হাতে। রাজধানীতে ৮৭ শতাংশ বাস-মিনিবাস ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করে বেপরোয়া চলাচল করে। ফলে বাড়ছে দুর্ঘটনা, হতাহতের সংখ্যা।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, গত কয়েকমাসে সড়ক দুর্ঘটনার হার বেড়েছে। হাইওয়ে ও শহরের মধ্যে দুর্ঘটনার ধরণ-কারণ ভিন্ন। শহরের দুর্ঘটনার বিষয়ে প্রথমেই বলতে হবে গণপরিবহনের কর্মীদের দায়িত্বহীনতার কথা। গণপরিবহনের যে মান থাকার কথা, তা নেই। যখন গণপরিবহন করপোরেট কালচার নিয়ে এগোবে, চালক ও বাস মানসম্পন্ন হবে, বাস চলাচলের জন্য স্পেশাল লেন থাকবে, তখন এ ধরনের দুর্ঘটনা হয় না। অথচ আমাদের এখানে প্রশিক্ষণ নেই, মুনাফা বাড়ানোর জন্য চুক্তিভিত্তিক গাড়ি চালায়, ১৬ ঘণ্টা টানা বাস চালাচ্ছে, বেতন কাঠামোর ঠিক নেই। এরকম একটি বড় সিটিতে এ ধরনের পরিবহন ব্যবস্থা চালানো হলে দুর্ঘটনা ঠেকানো যাবে না।
তিনি আরও বলেন, ঢাকার মতো আয়তনের দ্বিতীয় কোনও সিটি খুঁজে পাবেন না, যেখানে ৫০ কোম্পানি মুনাফার দিকে নজর দিয়ে পরিবহন  চালাচ্ছে। পরিকল্পিত বাস অপারেশনের অনুপস্থিতির কারণেই ঢাকায় এই দুর্ঘটনাগুলো ঘটছে।
সড়কে সমস্ত অব্যবস্থাপনা ও বিশৃঙ্খলা জিইয়ে রেখে নৈরাজ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছে উল্লেখ করে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী  বলেন, নগরীর প্রতিটি বাস-মিনিবাসের ব্যবসা মূলত চালকরা নিয়ন্ত্রণ করছেন।  দৈনিক চুক্তিভিক্তিক ইজারায় মালিকরা তাদের বাস চালকের হাতে তুলে দেন। এ কারণেই চালকরা যাত্রী ধরার জন্য সড়কে ভয়ঙ্কর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। গণপরিবহন পরিচালনায় এ ধরনের ব্যবস্থা আর কোনও দেশে নেই। এই অরাজকতা বন্ধ করা না গেলে নগরে দুর্ঘটনা কমানো যাবে না।
সড়ক দুর্ঘটনা সহনীয় মাত্রায় নামিয়ে আনাসহ এই খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নেয়ার কথাও বলা হয়েছে পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে। সেগুলো হলো- টার্মিনালসহ সড়ক-মহাসড়কে চাঁদাবাজি বন্ধ করা। সম্ভাব্য স্বল্পসময়ের মধ্যে সব সড়কের সংস্কার। জাতীয় মহাসড়ক ও আন্তঃজেলা সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলো চিহ্নিতকরণ। ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি চলাচল বন্ধ ও জাল লাইসেন্সধারী চালকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া। শ্রমিক-কর্মচারীদের নিয়োগপত্র ও সাপ্তাহিক ছুটি প্রদান। বেতন-ভাতা বৃদ্ধি ও দৈনিক কর্মঘণ্টা নির্ধারণ। চালক ও সহকারীদের সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ দেয়া। বিদ্যমান মোটরযান চলাচল আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করা।
জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে বলেন, এবার ঈদে ঘরমুখো মানুষের নিরাপদ যাতায়াতে সরকারকে বিগত বছরগুলোর তুলনায় অধিকতর কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ একদিকে ভরা দুর্যোগ মৌসুম, অন্যদিকে দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মহাসড়কের নাজুক অবস্থা। তাই সরকার কঠোর না হলে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি- দুটিই বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ