ঢাকা, সোমবার 4 June 2018, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ১৮ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

উত্তরাঞ্চলে আবিষ্কৃত কয়লার মজুদ ৩ হাজার ১ শত ৯৭ মিলিয়ন টন

মোঃ আফজাল হোসেন, (ফুলবাড়ী) দিনাজপুর : দেশের উত্তরাঞ্চলে আবিষ্কৃত ৫টি কয়লা খনিতে মজুত ৩১৯৭ মিলিয়ন টন কয়লা দেশের জ্বালানী খাতে বিপ্লব ঘটাতে পারে। প্রয়োজন যুগোপযুগী অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও টেকসই পদক্ষেপ।
বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানী সবচেয়ে বড় সমস্যা। অর্থনৈতিক কারণে বাহিরের দেশ থেকে জ্বালানি আমদানি করতে হচ্ছে। এতে বিপুল পরিমাণ দেশের অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। সেই কারণে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও এক মাত্র গ্যাস নির্ভর। দেশের গ্যাস মজুদ যেহেতু অফুরন্ত নয় তাই আগামী দিনে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে কয়লার সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে । আমাদের দেশে আবিষ্কৃত কয়লা ৫৩টি টিসিএফ গ্যাসের সমতুল্য। যা দেশে এ পর্যন্ত আহরিত গ্যাসের প্রায় ৪ গুণ বেশী। উত্তরাঞ্চলের দিনাজপুরে ৩টি কয়লা খনি আবিষ্কৃত হয়েছে। এর মধ্যে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি ১৯৯৪ সালে আবিষ্কৃত হলেও বর্তমানে পুরোদমে এক যুগ ধরে উৎপাদন করছে। এর মধ্যে ফুলবাড়ী, দিঘিপাড়া, জয়পুরহাটের জামালগঞ্জ এবং রংপুরের খালাশপীর। দেশের উত্তরাঞ্চল মূলত কৃষি নির্ভর। দিনাজপুরের অর্থনীতি কৃষির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ফলে ছোট খাট কলকারখানা গড়ে উঠেছে। ভারি কোন কলকারখানা এ অঞ্চলের স্বাধীনতার পর থেকে অর্থনৈতিক কারণে গড়ে উঠেনি। বর্তমানে দিনাজপুরে আবিষ্কৃত ৩টি কয়লার খনি বিশ্বে এই জেলাকে খনিজ সমৃদ্ধ হিসেবে পরিচিতি এনে দিয়েছে। শুধু দিনাজপুরেই আবিষ্কৃত কয়লা খনিতে মজুদ রয়েছে ১৪৬২ মিলিয়ন টন। এর মধ্যে পার্বতীপুর উপজেলায় ১৯৮৫ সালে আবিষ্কৃত বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে বর্তমান ভূ-গর্ভস্থ পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন চলছে। ৬.৬৮ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে কয়লা ক্ষেত্রে ১১৮ থেকে ৫০৬ মিটার গভীরতায় ৬টি স্তরে কয়লা মজুদ ৩৯০ মিলিয়ন টন। এখানে উৎপাদিত কয়লায় সালফারের পরিমান ০.৫৩%। ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে বড় পুকুরিয়া খনি থেকে কয়লা উৎপাদন করা হচ্ছে। ২০০৫ সালে খনির অভ্যন্তরে প্রধান কোন ফেইজ ১১১০ নম্বরে বিষাক্ত কার্বন মনোঅক্সাইড গ্যাস ও মিথেন গ্যাস নিঃসরণের কারণে উত্তর সিল করে দেয়া হয়। একই সাথে কারিগরি বিপর্যয়ের কারণে কয়লা উৎপাদনে ঐ সময় ধ্বস নামে। অনেক চেষ্টা করে অবশেষে খনিটিকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে খনিটিকে চালু করা হয়। বাণিজ্যিক উৎপাদনের পর থেকেই খনিটিতে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বার্ষিক ১ মিলিয়ন টন উৎপাদন পার হয়ে গেছে। এই কয়লার ওপর নির্ভর করে পাশেই প্রায় ২০০ একর জমির উপরে ২৫০ মেগাওয়াট কয়লা ভিত্তিক তাপবিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়াতে ২০১৭ সালে অপর আর একটি ২৭৫ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদন কেন্দ্র নির্মান করা হয়। বর্তমান কয়লা সরবরাহের জন্য নর্থ এবং সাউথ এলাকায় নতুন কূপ খননের জন্য জরিপ শুরু হয়েছে। ২০২২ সালের মধ্যে এই দুটি কূপ থেকে কয়লা উৎপাদনের লক্ষ্য মাত্রা ধরা হয়েছে। দুটি ইউনিটে প্রতিদিন ৬ হাজার মেট্রিকটন কয়লার চাহিদা রয়েছে। সে কারণে নতুন কূপ থেকে কয়লা উৎপাদন করা হবে বলে জানাযায়। ১৯৮৫ সালে বিওএইচপি নামক একটি বিদেশী প্রতিষ্ঠান ফুলবাড়ী, বিরামপুর ও নবাবগঞ্জ উপজেলার কিছু অংশ নিয়ে জরিপ চালিয়ে দুটি কয়লা খনি আবিষ্কার করেন। ১৯৯৭ সালে লন্ডন ভিত্তিক  একটি বিদেশি কোম্পানি যার নাম এশিয়া এনার্জি এই বহু জাতিক কোম্পানি উল্লেখিত এলাকায় ১০৭টি কূপ খননের মাধ্যমে পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নতমানের কয়লা সমৃদ্ধ এই খনি আবিষ্কার করে। এখানে ৬.৩ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় ৫৭২ মিলিয়ন টন মজুদ নিদ্ধারণু করা হয়। ভৌগলিক কারনে ফুলবাড়ী এলাকার কিছু অংশ এবং পার্বতীপুরের একটি ইউনিয়, নবাবগঞ্জে দুটি ইউনিয়ন ও বিরামপুরে একটি ইউনিয়ন নিয়ে পূর্ব অঞ্চলে এই কয়লার বিশাল মজুদ রয়েছে। কিন্তু উন্মুক্ত পদ্ধতি ফুলবাড়ীর খনি বাস্তবায়নে বিরোধিতার কারণে খনি বাস্তবায়ন এর কাজ বন্ধ রয়েছে। শুরু হয়েছে বড়পুকুরিয়ার নর্থ এবং সাউথে যার সীমানা উত্তরে বর্ণমালা স্কুল ও দক্ষিণে বৈগ্রামসহ মোট ২৩টি গ্রাম খনি হওয়ার কারনে চলে যাবে। যার কার্যক্রম অতি দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে।
দিনাজপুরের দক্ষিন অঞ্চলের নবাবগঞ্জ  উপজেলার দিঘি পাড়া কয়লা খনিটি ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ ভূত্বতিক জরিপ অধিদ্প্তর এই খনিটি জরিপ চালিয়ে আবিষ্কার করে এবং ৫টি কূপ খনন করা হয়। ৫টি কূপে ৫০০ মিলিয়ন টন কয়লা মজুদ রয়েছে বলে প্রাথমিক ভাবে জরিপ বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। বর্তমান এই খনিটি বাস্তবায়ন করতে চীনা বিশেষজ্ঞ বীদরা সেখানে জরিপ চালাচ্ছেন। ৩ বছরের মধ্যে জরিপের প্রতিবেদন পাওয়ার পর খনিটি বাস্তবায়নে প্রস্তুতি নিবেন সরকার। উত্তর অঞ্চলের ৪র্থ কয়লা খনিটি হচ্ছে জয়পুর হাটের জামালগঞ্জ। ১৯৬৫ সালে ভূগর্ভের ৯০০ থেকে ১০০০ গভীরে ১৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে উন্নত মানের ১০৫০ মিলিয়ন টন কয়লার মজুদ নির্ধারন করা হয়। কিন্ত এটি অধিক গভিরতা হওয়ায় উত্তোলন লাভ জনক হবে কিনা তা নিয়ে এই খনির ভবিষ্যৎ ঝুলে আছে। পঞ্চম খনিটির অবস্থান হচ্ছে রংপুরের পীরগঞ্জের খালাশপীর নামক স্থানে। ১৯৯৫ সালে আবিস্কৃত ১১ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ২৫৭ থেকে ৪৮৩ মিটার গভীরতায় কয়লার মজুদের পরিমান ৬৮৫ মিলিয়ন টন। যা দেশের একটি কোম্পানি বাস্তবায়নে প্রক্রিয়া চালিয়ে কাজ থেমে আছে। উত্তরাঞ্চলের এসব খনি বাস্তবায়ন হলে অর্থ সামাজিক অবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি জ্বালানী সংকট মোকাবেল করে জ্বালানী খাতে বিপ্লব ঘটাতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ