ঢাকা, সোমবার 4 June 2018, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ১৮ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

প্রাক বাজেট এডিপি বাস্তবায়ন ও উন্নয়ন

ড: মিহির কুমার রায় : আগামী ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট আসন্ন। বিশ্বস্ত সুত্র থেকে জানা গেছে আগামী ৭ই জুন ২০১৮ ইং তারিখে সংসদে বর্তমান সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে শেষ বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত অর্থমন্ত্রী। বর্তমান বছরের শেষ প্রান্তে কিংবা আগামী বছরের পহেলা জানুয়ারীতে সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা আছে যার ফলে অনেকেই ত্রই বাজেটকে নির্বাচনী বাজেট হিসাবে আখ্যায়িত করছেন। এরই মধ্যে গত ৩০ শে এপ্রিল তারিখে অনুষ্ঠিত অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্পদ কমিটির সভায় বিভিন্ন বিষয়ে পর্যালোচনা শেষে বাজেট খসড়া আকার নির্ধারন করা হয় ৪ লাখ ৬৮ হাজার ২০০ কোটি টাকা যা জিডিপি এর ১৮.৪ শতাংশ। আবার চলতি অর্থবছরের বাজেটর ছেয়ে আগামী অর্থবছরের বাজেট বাড়ছে ৬৮ হাজার কোটি টাকা। এদিকে নির্বাচনী বছরের বাজেটে ১ লাখ ৮০ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট আসছে যার মূল বাষিক উন্নয়ন কর্মসূচি ( এডিপি ) ১ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা। এই অর্থের মধ্যে স্থানীয় উৎস থেকে যোগান দেয়া হবে ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে আসবে ৬০ হাজার কোটি টাকা।
এটি লক্ষণীয় যে বর্তমান চলতি বছরের এডিপির চেয়ে আগামী এডিপি এর আকার প্রায় ১৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বেশী এবং মূল এডিপির বাহিরে স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান গুলোর জন্য ৭ হাজার ৫৬৯  কোটি টাকা থাকেবে। গত ৩রা মে  পরিকল্পনা কমিশনের বর্ধিত সভায় আগামী বছরের এডিপিতে মোট ১ হাজার ৪৫১ টি প্রকল্প রাখার সিদান্ত গৃহীত হয়েছে যার মধ্যে বিনিয়োগ প্রকল্প ১ হাজার ২২৭ টি ,কারিগরি প্রকল্প ১১৭ টি,জাপান ঋন মওকুফ তহবিলের (জেডিসি এফ) এর আওতায় ২টি ও স্বায়ত্ত শাসিত সংস্থার ১০৫ টি প্রকল্প রয়েছে। পরিকল্পনাকমিশনের সুত্রে বলছে আগামী এডিবির বরাদ্দের ভিত্তিতে অগ্রাধিকার খাত গুলোর মধ্যে রয়েছেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয়, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রনালয়, সড়ক ও পরিবহন মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, রেলওয়ে ও কৃষি মন্ত্রণালয়। অভিজ্ঞতা বলছে চলতি অর্থ বছরের শুরুতে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৮৫ কোটি  টাকার এডিপি পাস করা হয়েছিল যা পরিবর্তীতে ৬ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে সংশোধিত এডিপির বরাদ্দ দাঁড়ায় ১ লাখ ৫৭ হাজার ৫৯৪ কোটি ৩৯ লক্ষ টাকা কিন্তু চলতি আর্থিক বছরের ৯   মাসে(জুলাই থেকে মার্চ) ব্যয়িত হয়েছে ৭১ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা যা মোট বরাদ্দের মাত্র ৪৫ শতাংশ। বাকি তিন মাসে (এপ্রিল-জুন) বরাদ্দের ৫৫ শতাংশ খরচ করতে হবে যা সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আগামী অর্থ বছরের বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদন( জিডিপি)এর প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৭.৮ শতাংশ যা চলতি বছর ছিল ৭.৫ শতাংশ ।
 এর পাশাপাশি রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৪০ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকা যা জিডিপির ১৩.৪ শতাংশ এবং চলতি  বছরের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৫৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা বেশি । এখন বিভিন্ন বিশ্লেষক বলছেন বাজেট বরাদ্দ ও বাস্তবায়নের প্রথম ছয় মাসে নির্বাচনী অনিশ্চয়তা থাকবে এবং তারপর যে নতুন সরকার আসবেন ও ক্ষমতাসীন হবেন তাদেরকে গুছিয়ে নিতে সময় লাগবে আরও কিছু দিন । আবার বাজেটের ছাড় হয় মন্ত্রণালয়  কেন্দ্রিক একটি প্রশাসনের মাধ্যমে যাদের প্রধান সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী অথচ উনারা বাজেটের অর্থ ছাড় / বাস্তবায়নের চেয়ে নির্বাচনী প্রচারণা নিয়ে বেশি ব্যস্ত  থাকবেন। এটাই বাস্তবতা কারণ ক্ষমতাসীন দলের অবশ্য একটি নির্বাচনী ইসতেহার থাকবে যার একটি বড় অংশ  জোরে থাকবে অর্থনৈতিক কর্মসূচি যার সাথে থাকবে বাজেট ঘোষণার একটি প্রত্যক্ষ সংযোগ যেমন অভ্যন্তরীণ উৎপাদন জিডিপি এর প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, জাতীয় আয়, মাথাপিছু আয়, দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, মূল্য স্ফীতির গতি প্রকৃতি ইত্যাদি । এখন প্রশ্ন দাঁড়ায় জিডিপি প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন বেসরকারি বিনিয়োগ অথচ নির্বাচনী বছরে উৎপাদনশীল খাতে এই সকল বিনিয়োগ ধীরে চল নীতির অনুসারি উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে বিশেষত: রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে । পরিকল্পনা কমিশন সুত্রে জানা গেছে আগামী অর্থ বছরের এডিপি তৈরিতে ৭ম পঞ্চবার্ষিকি পরিকল্পনা ও এসডিজির লক্ষ্য গুলোর সাথে সামজ্যস্ব রেখে অগ্রাধিকার খাত গুলোতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে । তাছাড়াও ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে এবং উন্নয়নশী ল দেশ উন্নীতি হওয়ার অগ্রযাত্রার বিষয়গুলোকে বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
আবার নতুন এডিপি প্রনয়ন এর ক্ষেত্রে সুষ্ট সম্পদের ব্যবহার ও কাঙ্খিত সুফল প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে নতুনের চেয়ে চলমান প্রকল্প সমাপ্ত করার দিকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এরি মধ্যে প্রাক বাজেট আলোচনা শুরু হয়ে গেছে বেশ কিছুদিন ধরে বিশেষত: দেশের ব্যবসায়ী সংগঠনের পক্ষ থেকে এবং তাদের অনেক গুলো দাবির মধ্যে একটি হলো আগামী বাজেটে ব্যক্তি শ্রেনীর করদাতার কর মুক্ত আয় সীমা দুই লাখ পঞ্চাশ হাজার থেকে ৩ লাখ উন্নীত করা, বর্তমানে প্রচলিত পোশাক শিল্প খাতের করপোরেট কর ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ নিয়ে আনা, রপ্তানী খাতে উৎস কর মওকুফ, অবকাঠামো খাতে গুরুত্ব দেয়া, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, দীর্ঘ মেয়াদে অর্থায়নের বিকল্প উৎস তৈরি করা ইত্যাদি ।
সরকার এমন একটি সময়ে বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে যার প্রায় দু’মাস আগে এপ্রিলের মাঝামাঝি জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভলপমেন্ট পলিসি(সিপিডি) দেশটিকে ২০২৪ সাল নাগাদ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে প্রবেশের ঘোষণা দিয়েছে সত্যি কিন্তু তিন বছর অন্তর ২০২১ ও ২০২৪ সালে সিপিডি বাংলাদেশ অবস্থান পর্যালোচনা করবে। আবার ২০৩০ সালে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ ও ২০৪১ সালে উন্নত দেশ হওয়ার স্বপ্নের আদলে দেশটি নিজেদের তৈরি করছে। ফলে বাজেট প্রনয়ন ও তাতে সম্ভাব্য আয় ব্যয় এমনকি ভর্তুকির বেলায় উৎপাদনশীল শিক্ষা ও মানব সম্পদের উন্নয়নের খাত গুলোকে প্রাধান্য দিতে হবে। এক প্রাক বাজেট আলোচনার শিক্ষা মন্ত্রী বলেছেন আগামী অর্থ বছরে বাজেট শিক্ষায় অবকাঠামো উন্নয়ন ও কারিগরি শিক্ষার উপর সবচেয়ে বেশি গুরুত¦ দেয়া হবে। সম্প্রতি প্রথম আলো কর্তৃক আয়োজিত কৃষি বিষয়ক আলোচনায় গণ মাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ বলেছেন দেশের কৃষি জমি অকৃষি কাজে ব্যবহার রুখতে আইন করতে হবে এবং আগামী কৃষি বৈচিত্র্যময় প্রযুক্তি নির্ভর হবে বিধায় দেশের কৃষকদের কি হবে?
 উদ্ভাবিত  প্রযুক্তি ও কৃষিবিষয়ক তথ্য কৃষকের কাছে পৗছাতে হবে,খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা ভবিষ্যতে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসাবে দেখা দিবে।আবার বীজ উৎপাদনের সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ বাড়াতে হবে। কৃষি উন্নয়ন গবেষণায় বেশী করে মনোযোগ ও বিনিয়োগ উভয়টি বাড়াতে হবে। আবহাওয়া ও আবহাওয়া অনুযায়ী করণীয় সম্পর্কিত তথ্য কৃষকদের কাছে পৌঁছাতে হবে। এই বিবেচনায় আগামী বাজেট কৃষি যান্ত্রীকরণশীল সহ সকল ক্ষেত্রে ভুতুকি অব্যাহত রাখতে হবে টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে তথা কৃষি উন্নয়নে বাজেট বাড়াতে হবে। আবার এই বাজেট বাস্তবায়নের স্বার্থে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উৎস থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের বেলায় সতর্ক পদক্ষেপ নিতে হবে। বাজেট হতে হবে ভারসাম্যমূলক, কার্যকর এবং সাবিক উন্নয়নের একটি প্রতিবিম্ব । কিন্তুু সাম্প্রতিক কালে দেখা যাচ্ছে যে উন্নয়নের সাথে সাথে বেকারত্ব ও আয় বৈষম্য ক্রমেই বেড়ে চলছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো( বিবিএস) এর তথ্য মতে ২০১৭-১৮  দেশে বেকার মানুষের সংখ্যা ২৬.৮০ লাখ এবং উচ্চ শিক্ষিত বেকারের হার মোট বেকারের ১১ শতাংশ  এবং প্রতি বছর ২০ লাখ মানুষ কর্মের বাজারে প্রবেশ করছে অথচ নতুন কর্ম সৃষ্টি হচ্ছে না।
 বাংলাদেশ দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাসকারি জনসংখ্যা অনুপাত ২৪.৩ শতাংশ এবং প্রতি বছর ১.২ শতাংশ হারে দারিদ্র্য কমছে এবং দারিদ্র্য হ্রাসের হার ক্রমেই শ্লথ হয়ে যাচ্ছে যার একটা বড় কারণ দেশে আয় বৈষম্য বেড়ে মারাত্মক আকার ধারন করছে যার পরিমান যিনি সহগ (২০১৬) অনুসারে ০.৪৮৩ যা (২০১০) সালে ছিল ০.৪৬৫ যা  একটি মহাবিপদ সংকেত আয়  বৈষম্যের ক্ষেত্রে। যে সব দেশের জিনি সহগ ০.৫০ পেরিয়ে যায় সে সব দেশকে উন্নয়ন তত্ত্বে উচ্চ আয়ের বৈষম্যের দেশ হিসাবে অবহিত করা হয় এবং বাংলাদেশ এর কাছাকাছি রয়েছে। আরও খবর পাওয়া গেছে আগামী বাজেট ভর্তুকি প্রনোদনা ও ঋন খাতে বরাদ্দ রাড়ছে যার পরিমান ৩০ হাজার ৭৫৪ কোটি টাকা হতে পারে যা চলতি বছরে আছে ২৭ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকা।
আবার শুধু ভর্তুকি বাবদ ১১ হাজার ৭৫৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়ার প্রস্তাব রয়েছে অর্থাৎ নুতন বাজেটে মোট জিডিপি এর ১.২ শতাংশ ভর্তুকি প্রনোদনা ও ঋন খাতে বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। সার্বিক পরিস্থিতির পর্যালোচনা বিবেচনায় সরকারের সামনে বাজেটের চ্যালেঞ্জগুলো বিবেচনায় বাজেট হউক উন্নয়ন ধর্মী  ,প্রয়োগ ধর্মী ও বৈষম্য নিরসনমূলক যা বর্তমান অর্থ মন্ত্রীর হয়ত সর্বশেষ বাজেট।
লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও ডিন, সিটি ইউনির্ভাসিটি, ও জ্যাষ্ট সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবীদ সমিতি, ঢাকা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ