ঢাকা, সোমবার 4 June 2018, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ১৮ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মৎস্য চাষ করে কুষ্টিয়ার শত শত বেকার যুবক এখন স্বাবলম্বী

খালিদ হাসান সিপাই (কুষ্টিয়া) : মাত্র ৮/৯ বছরের আগেও বেকারত্ব আর দারিদ্র্যতার নির্মম কষাঘাতে দিন কেটেছে শতশত বেকার ও হতদরিদ্র মানুষের। জীবন জীবিকা নির্বাহে যাদের সংসারে ছিল অমানিশার অন্ধকার। এসব হতাশাগ্রস্তদের কেউবা ছিল বিভিন্ন কাজে। কিন্তু তাদের পরীবারে আনতে পারেনি স্বচ্ছলতা। এখন ওদের দিন পাল্টেছে। দুঃখের দিন শেষ হয়েছে। জীবনে ওকি দিয়েছে সোনালি দিনের স্বপ্ন। এখন ওদের কাজ থাকে সারাদিন।
 ক’বছরের ব্যবধানে বদলে গেছে কুষ্টিয়ার শত শত বেকার যুবক ও হতদরিদ্র্য মানুষের জীবন।। প্রাকৃতিক দুর্যোগে আর অসংখ্য সম্যসার সাথে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে বদলে গেছে কুষ্টিয়ার আর্থ-সামাজিক অবস্থার চাল চিত্র। বদলে গেছে হত দরিদ্র্য এলাকার মানুষের জীবন ধারা। এ পরীবর্তন অভাবী দরিদ্র্য জনপদের আতœ-কর্মসংস্থানের। এ অঞ্চলের জীবন ধারা আর ভোগ রচিত বহু মাত্রিক পরিবর্তন এনে দিয়েছে মাছের চাষ। এতে স্বচ্ছলতার বর্ণিল অভাব আলোকিত হচ্ছে কুষ্টিয়ার জনপদ। কুষ্টিয়াতে মৎস্য অঞ্চল গড়ে তোলার উজ্জল সম্ভাবনা থাকলেও জলাশয়গুলোতে সারা বছর পানি না থাকায়, সরকারি জলাশয় লীজের ব্যাপারে অনিয়ম, তুলনামূলক উচ্চ মূল্যে ব্যাহত হচ্ছে মাছের উৎপাদন। অথচ উৎপাদিত মাছ স্থানীয়ভাবে চাহিদা মিটিয়েও দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা মূল্যের মাছ রফতানি হচ্ছে।
এ ছাড়াও যাদের মাছ চাষের সুযোগ সুবিধা থাকা সত্ত্বেও পুজি ও টেকনিক্যাল প্রযুক্তির অভাবে মাছ চাষ করতে পারছেনা তাদের মাঝে প্রশিক্ষণ, টেকনিক্যাল প্রযুক্তি সরবরাহসহ সঠিক তদারকি হলে প্রতি মাসে বৃদ্ধি পাবে মৎস্য পুকুরের সংখ্যা। কুষ্টিয়া হতে পারে দেশের অন্যতম মৎস্য এলাকা। মাছ চাষের আলোকিত এ জনপদের উন্নয়নের বিল্পব ঘটতে পারে এলাকার মানুষের। এলাকাবাসী, মৎস্য খামার মালিক ও উপজেলা মৎস্য অফিসসহ বিভিন্ন সূত্রে এসব পাওয়া গেছে।
মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় ৫ শতাংশের উপরে ব্যক্তি মালিকানা পুকুরের সংখ্যা ৪ হাজার ২শ ৭টি। যার আয়তন ১২ হাজার ৪৩ দশমিক ৪ একর। উপজেলার সরকারি জলাশয় ৩টি। তন্মধে জলকেশররায় (মিরকি বিল) ১শ ২১ একর, কালিদহ সাগর ৪২ একর ও সিংগীদানি বিল ৮ একর। খাল রয়েছে ৬০ কিলোমিটার। রেনুসহ এসব পুকুর ও জলাশয় থেকে বছরে কমপক্ষে ২৫/৩০ কোটি টাকার মাছ উৎপাদন হচ্ছে।  
শ্রীবরদী মৎস্য অফিস সূত্রমতে, মৎস্য চাষে নারীদের সম্পৃক্ততা একেবারেই কম। তবে ক’বছর ধরে উপজেলা মৎস্য অফিস, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, সমবায় অফিস, কৃষি ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক ও এনজিও’র মধ্যে এডিপি, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ, বীজ ও উন্নয়ন সংঘের সোহার্দ্য এলাকায় মৎস্য চাষে উদ্বোধন করছে। এসব সরকারি ভাবে মৎস্য খামার মালিকদের পরামর্শ দান, ঋণদান, উপকরণ ও রেনু সংগ্রহে সহযোগিতা করে আসছে। এ অফিসের আওতায় জাতীয় কৃষি প্রযুক্তি প্রকল্পের প্রতি ইউনিয়নে ৫জন নারীসহ ১৫ জন খামার মালিককে গ্রুপ করে দু’গ্রুপে ৩০ জনকে মাছ চাষের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। কাকিলাকুড়া মোস্তাফিজুর রহমান জানান, উপজেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে একমাস প্রশিক্ষণের পর এখন মাছ চাষ করছেন। ওর মতো মাছ চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে অনেকে।
উপজেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর ১৯৮৫ সাল থেকে বেকার যুবকদের মৎস্য চাষের প্রশিক্ষণ দিয়ে ঋণ প্রদান করছে। পুকুর মালিকদের সাথে আলাপ করে জানা যায় রুই, কাতলা, মৃগেল, কাল বাউশ, থাই স্বরপুটি, মিনাল কার্প, সিলভার কার্প ও পাঙ্গাশের চাষই বেশি হচ্ছে। এ ছাড়াও তেলাপিয়া, নাইলেটিকা, দেশি হাইব্রীড মাগুর, কইসহ বিভিন্ন জাতের মাছের চাষও বর্তমানে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব মাছের বীজ ক্রয় করে আনছে জামালপুর বা ময়মনসিংহ এলাকা থেকে। স্থানীয়ভাবে মাছের বীজ উৎপাদন কেন্দ্র না থাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মূল্যে মাছের বীজ ক্রয় করে বাড়তি খরচ দিচ্ছে বলে জানান অনেক পুকুর মালিক। তবে এদের মধ্যে মাছের মিশ্র চাষই বেশি হচ্ছে। বালিজুরির সৈয়দ মাহতাব উদ্দিন শিপার, মালাকোচার মোশারফ হোসেন, নইলের পাড় গ্রামের কেরামত উল্লাহ সহ অনেকে জানান, কম সময়ে স্বল্প খরচে বেশি লাভ জনক বলে এ পেশায় ঝোকে পড়েছে অনেকে। তাদের মতে, ১ টাকা বিনিয়োগে ৩ টাকা আসে। তারা জানান, যেহেতু বাইরের বা ক্রয় করা খাবার কম ব্যাবহার করে এবং গৃহস্থালীর উৎপাদিত দ্রব্য সামগ্রী খাবার হিসেবে বেশি ব্যবহার করা হয় এজন্য খরচ হয় কম। লাভ হয় বেশি। মৎস্য খামার মালিকদের হিসাব মতে শতাংশে কুড়া গোবর, মুরগীর বিষ্ঠা, কচুরি পানাসহ অন্যান্য খাদ্যের জন্য খরচ হয় প্রায় ৩শ টাকা। আয় হচ্ছে কমপক্ষে ১২শ টাকা। তবে মাছের খামার মালিকদের এখনো রয়েছে নানা সমস্যা। স্থানীয়ভাবে মাছ সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় আইসক্রীম মিল দিয়ে চলছে সংরক্ষণের কাজ। এসব বাজার করণের ক্ষেত্রে আধুনিক কোনো যানবাহন নেই। রয়েছে রিা, ভ্যানও স্থানীয় যানবাহন।
অনেক জেলের অভিযোগ, সরকারি জলমহাল গুলোতে ইজারা দাররা নিজস্ব লোক দিয়ে মাছ ধরে। ফলে বহু জেলে মাছ ধরার সুযোগ পাচ্ছে না। তাদের মতে, উপযুক্ত পুজি ব্যবস্থা করা, ইজারা ব্যবস্থা ও উৎপাদনে সমাজ ভিত্তিক করা এবং সকল মৎস্য জীবিকে মাছ ধরার সুযোগ করে দেয়া, এমনকি আধুনিক পদ্ধতিতে মাছ আহরন ও বাজারজাত করণের বিষয়ে প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা করা জরুরি। এতে মানুষের আয় বাড়বে। বাড়বে কর্ম সংস্থানের পথ। কমবে বেকারত্ব। জলাশয় গুলোর ব্যবহার হবে সঠিক। পাশাপাশি দারিদ্র্য বিমোচনে করবে ব্যাপক সহায়তা।
সম্প্রতি মৎস্য খামার দেখতে গেলে কথা হয় উপজেলার দহেরপাড় গ্রামের মৃত খোশমামুদের ছেলে আবু শামার সাথে। তিনি জানান, তার সাফল্যের কাহিনী। তিনি ৮/৯ বছর আগেও ছিলেন একজন হতদরিদ্র লোক।। বাজারের এক মাছ ব্যাবসায়ীর পরামর্শে তার কাছ থেকে ৭৫ টি দেশি হাইব্রীড মাগুর মাছের পোনা কিনে এনে পুকুরে ছেড়েদেন তিনি। মাত্র ২ শতাংশ জমিতে এসব মাগুর মাছের চাষ করে সেখানে ব্যাঙ্গ, চেরা, উলি, মৃত পশু পাখি, গোবর, কচুরি পানাসহ বিভন্ন খাদ্য দেন মাছের জন্য। মাত্র ৯০ দিন পর  এতে তার লাভ হয় ৩ হাজার ৫শ টাকা। এ সাফল্য দেখে তিনি এক একর জমিতে পুকুর করে মাছ চাষ করে আসছেন। এবার তিনি পুকুরে রুই, কাতলাসহ ৮/৯ জাতের মাছ চাষ করেছেন। তার পুকুরে মাছ রয়েছে শতাংশে ৪৫/৫০ টি। এতে প্রতিদিন খরচ হচ্ছে ১ শ হতে ১শ ৩০ টাকা। আগামি মাঘ মাস পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ টাকা খরচ হতে পারে বলে তিনি জানান। তার প্রত্যাশা সংসারের মাছের চাহিদা মিটিয়েও এবার কমপক্ষে ২ লাখ টাকা লাভ হবে।
তিনি বলেন, আমার মাছ চাষ দেখে এলাকার শাজাহান, মজিদ, রুহুল আমিন, পাগারু, করিম, জিন্নাহসহ অনেকে মাছ চাষ করছে। তাদের সংসারে এসেছে স্বচ্ছলতা। এখন তিনি যেখানেই যান সেখানেই তাকে ঘিরে ধরে লোকজন। শোনেন মাছ চাষের কাহিনী।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম বলেন, মাছ চাষে উদ্যোগী করতে ব্যাপকভাবে প্রশিক্ষণ, পরামর্শ, এ কর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা, সরকারি বিল গুলি পুন:খনন, বিল গুলিতে সমাজ ভিত্তিক মাছ উৎপাদন ব্যবস্থা করা দরকার। এমন কি মৎস্য চাষীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঋণ সুবিধা দেয়া হলে শ্রীবরদী গড়ে উঠতে পারে দেশের অন্যতম মৎস্য এলাকা।
উপজেলা চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম ফর্সা বলেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা গুলো এগিয়ে আসা প্রয়োজন। আমিষ জাতীয় খাদ্যের চাহিদা মেটাতে এখই প্রয়োজন মৎস্য খামার গড়ে তুলতে সর্বস্তরের উদ্যোগ।
মৎস্য অভিজ্ঞদের মতে, শ্রীবরদীর উত্তরে সোমেশ্বরী নদীর দু‘ পাশে বাঁধ নির্মাণসহ একাধিক রাবার ড্যাম ও দক্ষিণে ব্রক্ষপুত্র নদীর পানির প্রবেশ পথে সুইচ গেইট করা হলে বন্যামুক্ত হবে শ্রীবরদী। রক্ষা পাবে শ্রীবরদীর নিম্নাঞ্চলের শতশত পুকুরের মাছ ও ফসলের ক্ষেত। অচীরেই গড়ে উঠতে পারে মৎস্য অঞ্চল।
শ্রীবরদীর মৎস্য অঞ্চল হিসেবে পরীচিত কুড়িকাহনিয়ার নইলারপাড় গ্রাম। এ গ্রামে ঘুরতে গেলে দেখা যায় পুকুর আর পুকুর। মাছের রেনু চাষ করা হচ্ছে এসব পুকুরে । ওই গ্রামে ৪/৫ শ পরীবারের মধ্যে প্রায় সবাই মৎস্য চাষের সাথে কোনো না কোনো ভাবে জড়িত। এ গ্রামে মাছ চাষে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে বিপ্লবী যুবক মাহবুব আলম।
তিনি বলেন, প্রতিদিন উপজেলার খাসপাড়া, কাকিলাকুড়া, গেরামারা, তাতিহাটি, রানিশিমুল, ভটপুরসহ কমপক্ষে ৪০টি গ্রামের মৎস্যজীবীরা ঝাঁকে ঝাঁকে এসে মাছের রেনু নিয়ে যাচ্ছে। এখন তার পুকুরের সংখ্যা ৬টি। প্রতিদিন রেনু বিক্রি করছেন ২৫/৩০ হাজার টাকা। তিনি বলেন, বছরের শুরুতে মাত্র ৫০ হাজার টাকার বীজ এনে বিক্রি করেছে প্রায় ২ লাখ টাকা।
এ গ্রামের বেকার যুবকরা ক‘ বছর ধরে মাছের চাষ করে এখন স্বাবলম্বী। মাহবুব আলমের স্বপ্ন মৎস্য হ্যাচারী গড়ে তোলা যার মাধ্যমে শত শত বেকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি এ উপজেলার মোট জন সংখ্যার ৪০/৪৫ ভাগ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে মৎস্য চাষের সাথে জড়িত বলে তাদেরও হবে ব্যাপক উন্নয়ন। এদিকে মাছের চাষকে কেন্দ্র করে মাছের খাদ্য, ওষুধ প্রভূতি বিক্রির জন্য গড়ে ওঠেছে শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।
সচেতন মানুষের ধারনা, মৎস্য চাষীদের সরকারি ভাবে সহযোগিতা করা হলে উৎপাদিত মাছ এলাকার চাহিদা পুরন করে দেশের বিভিন্ন স্থানে বছরে কোটি কোটি টাকা মাছ রফতানি করতে পারবে । হ্রাস পাবে বেকারের। পুরন হবে আমিষ জাতীয় খাদ্যের ঘাটতি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ