ঢাকা, সোমবার 4 June 2018, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ১৮ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বৃহত্তর কুষ্টিয়ায় গরু-মহিষের গাড়ি বিলুপ্তির পথে

“ওকি গাড়িয়াল ভাই, হাঁকাও গাড়ী তুই চিলমারির বন্দরে--- বিখ্যাত এ গান এখনো কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে শোনা গেলে হৃদয়ে ভেসে উঠে গরু-মহিষের গাড়ী হাঁকিয়ে যাওয়ার দৃশ্য। কিন্তু গান থাকলেও, নেই সেই আগের গরু মহিষের গাড়ী, নেই গাড়িয়াল। নেই হৈ হৈ রৈ রৈ হাক ডাক, নেই গাড়ির চাকার ক্যাচ ক্যাচ শব্দ। গরুর হাম্বা অথবা গলা ঝোলানো ঘন্টার টুং টাং আওয়াজ। গরুর গাড়ির পরিবর্তে যান্ত্রিক নছিমন, করিমন, আগলামন, বাস, ট্রাকসহ বিভিন্ন যন্ত্র যানের কারণে আজ জাদুঘরে স্থান হতে চলেছে গরুর গাড়ী। বংশ পরম্পরায় গাড়িয়ালরা জীবন জীবিকার তাগিদে পরিবর্তন করেছে পেশা। এদের কেউ শহরে মজুর খাটছে, আবার কেউবা রিক্সার হেন্ডেল ধরেছে, কেউ অন্যকোন পেশায় নিয়োজিত।
বৃহত্তর কুষ্টিয়া অঞ্চলে গরু মহিষের গাড়ির প্রচলন আদিকাল থেকেই। গরুর গাড়িতে বিয়ে, বরযাত্রী, মালামাল পরিবহন, নাইয়রি আনা নেয়া ইত্যাদি এক সময় হতো খুব জাঁকজমকের মধ্য দিয়ে। এছাড়া প্রায় প্রতিটি বাড়ির আঙ্গিনায় শোভা পেতো এই দু’ চাকার গাড়িটি। এক সময় বৃহত্তর কুষ্টিয়ার যে কোন গ্রামে অবশ্যই চোখে পড়তো গরু কিংবা মহিষের গাড়ী। সেই দৃশ্য খুব একটা এখন চোখে পড়ে না।
প্রতœতাত্বিক গবেষণা গ্রন্থ ও বাংলা বিশ্বকোষ সূত্রে জানা গেছে, ব্রোঞ্জ যুগের পূর্বে গোলার্ধে কুমারের চাকা এবং গাড়ির শঠিন কাষ্ঠ নির্মিত চাকাটির মতো চাকা সর্বপ্রথম মানুষ ব্যবহার শুরু করে। মিশরীয় ব্যবিলন এবং ভারতের সভ্যতায় চাকাওয়ালা গাড়ি ছিল। এ থেকে ধারণা করা যায় চাকার প্রাথমিক আবিস্কার ৬ হাজার বছর আগে। ৬ হাজার বছর আগে কাঠ, পাথর, মালপত্র এবং অন্যান্য জিনিসপত্র বয়ে নিয়ে যাওয়া হতো ঢালু পথে গোলাকৃতি কাঠের গুঁড়ির ওপর দিয়ে। এই কাঠের গুঁড়ি থেকে মানুষের মাথায় চাকার ধারণা আসে। একটি বসবার জায়গা তৈরি করে তার দুদিকে দুটো চাকা জুড়ে দিয়ে তৈরি করা হয় গাড়ির প্রচলন। এক সময় গাড়ি টানার জন্য ব্যবহৃত হতো গরু, মহিষ, ঘোড়া, কুকুর ও মানুষ। এ সময় গরুর গাড়ির চাকায় লৌহ আবরন ছিল না কেবল কাঠ দ্বারা নির্মিত হতো। দ্রাবিড় যুগে যখন এ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে তখন থেকে লোহার ব্যবহার চালু হয়। ১৬৪৬ সালে বাই সাইকেলের আবিস্কার, ১৮২৬ সালে রেল ইঞ্জিন আবিস্কার, এর পরে মটর গাড়ি বাস, ট্রাক, মটরসাইকেল শ্যালো চালিত যান ইত্যাদি আবিস্কার হলে পুরনো যানবাহনের যায়গা দখল করে নেয়।
কিছুদিন আগেও এ অঞ্চলে গরুর গাড়ির ক্যাচ ক্যাচ শব্দে মুখরিত ছিল চার পাশ। গরুর খুড়ার ধুলি গৃহস্থলের হাক ডাক ছিল নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার।
চাকা তৈরি কারিগর মিজান শেখ জানান, আগে হাটে চাকার চাহিদা অনেক ছিল। বিভিন্ন এলাকা থেকে চাকা কিনতে আসত । কিন্তু একযুগ ধরে এই চাকার চাহিদা কমে যায়। এখন যান্ত্রিক যুগের কারণে গরুর গাড়ির চাকা বিক্রি হয় না।
মিজান শেখ এখন দিন মজুরির কাজ করে। গরু মহিষের গাড়ি এখন আবহমান গ্রাম বাংলা থেকে বিলীন হয়ে যেতে বসেছে। গরু মহিষের গাড়ি দেখানোর জন্য আগামী প্রজন্মকে জাদুঘরে যেতে হতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ