ঢাকা, মঙ্গলবার 5 June 2018, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ১৯ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নিম্ন আদালতের জন্য হাইকোর্টের ১৫ দফা নির্দেশনা

স্টাফ রিপোর্টার : গাইবান্ধার দায়রা জজ আদালতের একটি মামলার রায়ে নিম্ন আদালতের প্রতি ১৫ দফা নির্দেশনা দিয়ে হাইকোর্ট বলেছেন, অবসরে যাওয়ার আগে এ দেশের অনেক সরকারি কর্মকর্তা তাদের দায়িত্ব পালনের প্রতি অনীহা দেখানোর প্রবণতা ধারণ করে এবং ঢিলেঢালা স্টাইলে কাজ শুরু করে। বিজ্ঞ জেলা ও দায়রা জজদের ওই ধরনের মানসিকতা ধারণ করা যাবে না।
রায়ে আদালত বলেন, সাধারণ জনগণ আদালতের দুর্বল ও শ্লথগতির কারণে কোনো মামলার তদন্ত অথবা বিচার বিলম্ব হচ্ছে বলে কেউ যেন দোষারোপ করতে না পারে।
এক রায়ে নিম্ন আদালতের প্রতি এমন নির্দেশনা দিয়ে ১৫ দফার নীতিমালায় এসব কথা বলেছেন হাইকোর্ট।
গাইবান্ধার দায়রা জজ আদালতের একটি সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে দেওয়া রায়ে বিচারপতি রেজাউল হক ও বিচারপতি মোহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ ১৫ দফা নির্দেশনা সংবলিত এই নীতিমালা দিয়েছেন।
গতকাল সোমবার সুপ্রিম কোর্টের স্পেশাল অফিসার মোহাম্মদ সাইফুর রহমান ১৫ দফা নীতিমালা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
হাইকোর্টের দেওয়া ওই ১৫ দফা নীতিমালায় বলা হয়েছে, দায়রা জজদের জন্য-
১. দায়রা আদালতের বিচারকদের ফৌজদারি রিভিশনের ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে অধীনস্ত আদালতের রায় পুনর্বিবেচনায় (রিভিশন) শুধুমাত্র সম্মত বা অসম্মত উল্লেখ করেই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না।
২. সংশ্লিষ্ট মামলার বিষয়বস্তুর সঙ্গে জড়িত আইনগত প্রশ্নের গভীরে ঢুকে অনুসন্ধান এবং তারপর তাদের মেধা ও দক্ষতা অনুযায়ী নিজস্ব মতামতের প্রতিফলন ঘটাতে তারা কাঠামোগতভাবেই বাধ্য।
৩. তাদেরকে অবশ্যই বিচারিক মনোভাবাপন্ন হতে হবে এবং যেকোনও আদেশের বিরুদ্ধে দায়ের করা রিভিশনাল বিষয়গুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। যাতে করে সাধারণ জনগণ আদালতের দুর্বল ও শ্লথ গতির কারণে কোনও মামলার তদন্ত, অথবা বিচার বিলম্ব হচ্ছে বলে দোষারোপ করতে না পারে।
৪. অবসরে যাওয়ার আগে এদেশের অনেক সরকারি কর্মকর্তা তাদের দায়িত্ব পালনের প্রতি অনীহা দেখানোর প্রবণতা ধারণ করেন এবং ঢিলেঢালাভাবে কাজ করেন। বিজ্ঞ জেলা ও দায়রা জজদেরকে ওই ধরনের মানসিকতা ধারণ করা যাবে না। উপরন্তু, দায়িত্ব পালনে তাদের আরও গুরুত্ব দিতে হবেÍ যাতে করে অধস্তন সহকর্মী, সুপ্রিম কোর্ট, আইনজীবীরা এবং আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শ্রদ্ধার সঙ্গে তাদের চিরদিনের জন্য স্মরণ করে।
৫. সৎ, মেধাবী, সজাগ এবং দক্ষ অফিসারদের দিয়ে পরিচালনার মাধ্যমে বিচার বিভাগকে রাষ্ট্রের সবচেয়ে গতিশীল ও দেশপ্রেমী অঙ্গ হিসেবে জনগণের স্বীকৃতি আদায়ের জন্য তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে।
৬. মুখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম) এবং মুখ্য বিচারিক হাকিমের (সিজেএম) সহযোগিতায় সব বিচারক এবং হাকিমদের নিয়ে জেলা/মহানগর দায়রা জজের অফিসে মাসে কমপক্ষে একবার জুডিশিয়াল কনফারেন্স (বিচারিক সভা) করতে হবে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে দায়িত্ব পালনে তাদের কী ধরনের সমস্যা, সেটা জানা এবং এরপর দেওয়ানি বিধি ও আদেশ এবং ফৌজদারি বিধি ও আদেশ অনুযায়ী তার সমাধান বের করা। ওই সম্মেলনে সিএমএম এবং সিজেএমদের জন্য একটি বিশেষ অধিবেশন রাখতে হবে, যাতে দেশের ব্যবহারিক আইন (প্রসিডিউরাল ল’স), যেটা সর্বোচ্চ আদালতে নিষ্পত্তি হয়েছে, এমন বিষয়ের ওপর তারা তাদের ব্যাখ্যা শেয়ার করতে পারেন।
বিচার বিভাগীয় অনুসন্ধানকারী ম্যাজিস্ট্রেটের জন্য
৭. নালিশি /নারাজি পিটিশনে যেসব সাক্ষীর নাম উল্লেখ করা হয়, তাদের কাছ থেকে বক্তব্য নেয়া হচ্ছে বিচার বিভাগীয় অনুসন্ধানকারী হাকিমের (ম্যাজিস্ট্রেট) প্রাথমিক দায়িত্ব। তবে যেসব সাক্ষীকে প্রাসঙ্গিক মনে হবে, তাদের বক্তব্যও নিতে হবে।
৮. যদি নালিশি/নারাজি পিটিশনে করা অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় মনে হয়, তাহলে বিচার বিভাগীয় অনুসন্ধানকারী হাকিমকে সম্ভব হলে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে হবে।
৯. বিচার বিভাগীয় অনুসন্ধানকালে একজন হাকিমের কাছে যদি কোনও বিষয় গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়, অনুসন্ধান প্রতিবেদনে কোনও মতামত বা ফাইন্ডিংস যোগ করতে হয়, তাহলে ওই হাকিমকে বিচারিক সাক্ষীদের আচরণ/মানসিক অবস্থা রেকর্ড করতে হবে।
১০. একজন বিচার বিভাগীয় অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তাকে অবশ্যই যথাসম্ভব কম সময়ের মধ্যে তার অনুসন্ধান শেষ করতে হবে।
আমলে গ্রহণকারী ম্যাজিস্ট্রেটের জন্য 
১১. আমলে (অভিযোগ) নেওয়ার ক্ষেত্রে একজন হাকিমকে প্রসিকিউশন মেটিরিয়ালস (বিচার্য বিষয়) যেমন এফআইআর, স্কেচ ম্যাপ, ইনডেক্স, সিজার লিস্ট, মেডিক্যাল সার্টিফিকেট, পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট, বিচার বিভাগীয় অনুসন্ধান প্রতিবেদন, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ও ১৬৪ ধারায় সাক্ষীদের দেওয়া জবানবন্দী, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী, কেস ডায়েরি গভীরভাবে নীরিক্ষা করতে হবে। যদি সেখানে কোনও বিচার বিভাগীয় অনুসন্ধান থাকে, তাহলে আমলে নেওয়া হাকিমকে ওই বিচার বিভাগীয় অনুসন্ধান প্রতিবেদনের সব বিষয়ে অবশ্যই পরীক্ষা-নীরিক্ষা করতে হবে।
১২. একটি সিআর মামলার ক্ষেত্রে যখন একজন ম্যাজিস্ট্রেট ফৌজদারি কার্যবিধির ২০০ ধারায় বক্তব্য নেন, তখন তাকে সংক্ষিপ্তভাবে বাদীর বক্তব্য রেকর্ড করতে হবে, যাতে যে কেউ সহজেই অভিযোগের ধরণ বুঝতে পারেন।
১৩.ফৌজদারি কার্যবিধির ২০০ ধারায় নেওয়া বক্তব্য থেকে একজন ম্যাজিস্ট্রেটকে সন্তুষ্ট হতে হবে যে, তাতে  অপরাধ আমলে নেওয়ার মতো যথেষ্ট প্রাথমিক উপাদান রয়েছে।
১৪. নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় মামলা হলে ম্যাজিস্ট্রেটকে অবশ্যই ‘আলেয়া ভার্সেস স্টেট’ মামলায় দেওয়া গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে।
১৫. যেকোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধ আমলে নেয়ার আগে একজন হাকিমকে অবশ্যই আমলে নেওয়ার ব্যাপারে সন্তুষ্ট হতে হবে। আমলে গ্রহণকারী হাকিমকে বিচার বিভাগীয় অনুসন্ধানকারী হাকিম বা মামলার তদন্ত কর্মকর্তার প্রস্তাব বা সুপারিশের মধ্যে আবদ্ধ রাখলে চলবে না। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বা বিচার বিভাগীয় অনুসন্ধানকারী হাকিমের প্রতিবেদনে কোনও অভিযুক্তের নাম সুপারিশ না করে থাকলেও আমলে গ্রহণকারী হাকিম উক্ত অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অপরাধ আমলে নেওয়ার ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকবেন। কোনও আসামির বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল হলে, অথবা বিচার বিভাগীয় অনুসন্ধানকারী হাকিম সুপারিশ করলে, আমলে গ্রহণকারী হাকিমের ওই আসামিকে বাদ দেয়ার কোনও ক্ষমতা থাকবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ