ঢাকা, মঙ্গলবার 5 June 2018, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ১৯ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

পাবলিক পরীক্ষার আগে ও পরে করণীয়

রহিমা আক্তার মৌ : গত ৬ মে রবিবার ২০১৮ সালের এসএসসি পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ পায়। চারপাশে এখন পাশ-ফেল, ভালো-মন্দ, নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। নিজের দুই রিলেটিভ পরীক্ষার দিয়েছে, একজন কুড়িগ্রাম জেলা স্কুল থেকে, আরেকজন কামালপুর মোঃ হাশেম উচ্চবিদ্যালয়, চাটখিল, নোয়াখালী থেকে। দুজনেই জিপিএ ৫ পেয়েছে, শুকরিয়া। পরিচিত এক শিক্ষার্থী ৩.৬৭ পেয়ে পাশ করেছে। পাশের খবর পেয়েই সবাই শুকরিয়া আদায় করেছে। কারণ মেয়েটা পাশ করবে এটা নিয়ে পরিবার চিন্তায় ছিলো। মিষ্টি বিতরণ কেক কাটা সব করেই মেয়েটাকে উৎসাহ দেয় পরিবারের সবাই। শ্রদ্ধা ভালোবাসা সেই পরিবারের জন্যে।
৭মে সোমবার স্কুলের প্রস্তুতিমূলক পরীক্ষার বিষয়ভিত্তিক খাতাগুলো অভিভাকদের দেখানো হয়। আগে শিক্ষার্থীদের দেখিয়েছে, রেজাল্টও দেয়া হয়েছে। খাতাগুলো বাবা মা বা কারো বড় ভাই বোন দেখতে এসেছে। সবার সাথে আমিও যাই অভ্রর খাতা দেখতে। আমার কাজ শুধু খাতা দেখা নয়, আমি অভিভাবকদেরকে ও দেখি। একটু দেখলেই অনেক কিছু বুঝে যাই। ওনাদের ভাব বুঝতে চেষ্টা করি। সকাল ৮টা থেকে ক্লাস হয়েছে ১১টা পর্যন্ত, এরপর খাতা দেখার সময়। তৃণার আম্মু নিজেই এসেছেন মেয়ের খাতা দেখতে। উনার পাশে তৃণাকে না দেখেই জিজ্ঞেস করি-
- ভাবী তৃণা আসে নি।
- না ভাবী। ও জানে খাতা দেখার সময় আসলে সবার সামনেই মাইর খাবে, তাই আসেনি।
- আপনি একা দেখে লাভ কি? মেয়ে সাথে থাকলে ওকে ভুলগুলো ধরিয়ে দিতেন।
এভাবে ভিন্ন ভিন্ন ক্লাসে যাচ্ছি, খাতা দেখছি। দেখছি অভিভাকদের অবস্থা। ইংরেজী খাতা দেখতে গিয়ে শুনি ইরার আম্মু স্যারকে বলছেন—
- খাতায় তো কোন লাল দাগ দেন নি। তার মানে সবই ঠিক আছে। তাহলে নাম্বার কম কেনো?
স্যারের জবাব-
- প্রশ্নে যা চেয়েছে সে তা বুঝে জবাব দেয়নি পুরো। আরেকটু গুছিয়ে লেখা দরকার ছিলো।
- স্যার ক্লাসে অমনোযোগী হলে প্রয়োজনে মাইর দিয়েন।
এই বলে ইরার মা বেরিয়ে গেলেন।
বাংলা রচনায় অভ্র ৫ মার্ক পেয়েছে ১০ নাম্বারের প্রশ্নে। ও বলে-
- ৫ পেইজ লিখলাম, মাত্র ৫ নাম্বার দিয়েছে, তার মানে দিদি প্রতি পেইজে এক নাম্বার করে দিয়েছে।
দিদিকে খাতা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করি রচনায় আরো ভালো নাম্বার পেতে কি করতে হবে। যদিও আমি জানি পয়েন্ট বাড়াতে হবে। দিদি বললেন-
- মাত্র ৫ টা পয়েন্ট দিয়েছে। পয়েন্ট বাড়াতে হবে। আর যাই লিখেছে সে খুব ঘন করে লিখেছে। লাইনের মাঝে আরো ফাকা রাখতে হবে। উপরের ক্লাসের রচনার বই পড়তে হবে।
(উল্লেখ্য ঘরে আমি উপরের ক্লাসের বাংলা ও ইংরেজি কয়েকটা আছে, যা আমি ওদের পড়তে বলি।)
অভ্রর সব খাতাই ভালো করে দেখলাম, গ্রামারে তেমন ভালো করেনি সে। সাথে সাথে বললাম-
- এখন সময় করে গ্রামার মানে অবজেকটিভ প্রশ্ন বেশি পড়তে হবে। প্রয়োজনে আলাদা খাতায় লিখতে হবে। এতে আমি তোমায় সহায়তা করবো।
ঘুরতে ঘুরতেই দেখা প্রধান শিক্ষীকার সাথে। উনি অভ্রর খাতা হাতে নিয়ে বললেন-
- লেখা আরো সুন্দর করতে হবে।
- সিস্টার ওর বাসার খাতার লেখা কিন্তু সুন্দর, এতে বুঝা যাচ্ছে সে বাসার লেখাতে সময় নেয় বেশি। এখন বাসায় ও তাকে সময় বেঁধে লিখতে হবে।
সাথে সাথে তিনি বলেন-
- জানো মেয়েরা, আমার হাতের লেখা খুব সুন্দর। আমি এইচএসসি পরীক্ষার বাংলা ১ম পত্রের পরীক্ষায় লেখা সুন্দর করতে গিয়ে পুরা সময়ের মাঝে মাত্র ৪০ নাম্বারের উত্তর লিখতে পারি। এরপর বাসায় গিয়ে আমার ঘুম নেই সেই টেনশানে। অতপর সব পরীক্ষা এতই ভালো করেছি। শুধু বাংলা ১ম পত্রে আমি ৩৪ কি ৩৫ পেয়েছি। এখান থেকেই আমি শিখেছি, পরে আর কখনোই এমন হয়নি।
আমরা সবাই হেসে উঠি। অভ্রর আরো ২/৩ টি বান্ধবী সহ ওদের বুঝালাম কি করে সামনে ভালো করা যাবে। এখনো সময় আছে, এবারের ভুলগুলো থেকেই ঘুরে দাঁড়াতে বলেছি। বলেছি, চেষ্টা করলেই তোমরা পারবে। তবে সামনে যখন পাবলিক পরীক্ষা আছে একটু বেশিই চেষ্টা করতে হবে। তবে তোমাদের সবাইকে বলে রাখতে হবে পরীক্ষার খাতার মেকাব যেনো ভালো হয়। শিক্ষক যখন তোমার খাতা দেখবে, খাতায় চোখ দিতেই যেনো উনি খুশি হয়ে যান। কাটাকাটি কম করবে। অতপর সবাই বাসায় ফিরি। পুরো দিনে যা দেখলাম ৫ম শ্রেণী, ৮ম শ্রেণী আর ১০ম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের মায়েদের টেনশান উত্তেজনা ছিলো বেশি। কারণ উনাদের বাচ্চারা পাবলিক পরীক্ষা দিবে সামনে।
সাংবাদিক জয়নাল আবেদিন নিজের ফেইসবুক আইডিতে লিখেন-
“এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট দেওয়া হলো। আজকের রাতে তারা ঘুমাতে পারছে না। কেউ পাশ করে আনন্দে আটখানা, কেউ ফেল করে হতাশার তলানিতে। এই দুটো পক্ষের বাইরে আছে আরও একটি পক্ষ। আমি বলছি রংপুরের রোকেয়া বেগমের কথা। যে মেয়েটি ফেল করার হতাশা সইতে না পেরে বেছে নিয়েছে আত্মহণনের পথ! আত্মহণন করতে গিয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে রংপুরের আরও নয়জন কিশোরী! পরীক্ষায় ফেল করার পরে আত্মহত্যার খবর নতুই কিছু না। কিন্তু অবাক লাগে, এই আধুনিক যুগেও, যে ছেলেমেয়েরা এখন অবাধ তথ্যপ্রযুক্তির দুনিয়ায় বিচরণ করছে, যারা বোঝে ফেল করা মানেই বাতিলের খাতায় চলে যাওয়া নয়; সেই যুগের মেয়ে-ছেলেরা কেন এমন কাপুরুষোচিত পথে পা বাড়ায়?
প্রতিযোগিতার এই বাজারে রোকেয়ারা ফেল করলে জীবন থেকেই হারিয়ে যাওয়ার জন্যে তাদের মা বাবারাও কম দায়ী না। তারা সন্তানের মাথায় পাশ কিংবা এ প্লাসের জুজু ঢুকিয়ে দেয়। বেশিরভাগের তো সন্তান এ প্লাস কেন পেলো না-সেই কষ্টেও ঘুম হারাম! মানুষের পৃথিবীতে এ প্লাসই সব না, কিংবা পাশও সব না। আগে তো ঘর থেকে ওদের নৈতিকতা শিক্ষা দিন। সন্তানদের নিজের জীবনকে ভালোবাসার দীক্ষা দান করুন। তারপর না হয় পাশ কিংবা জিপিএ-৫ লাভের প্রত্যাশা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, আত্মহণনের পথে ফেল করা একজন মেয়েই বেশি আগ্রাসী, যতটা না একজন ছেলে। এর কারণ কী? সমাজে এখনও মেয়েদেরকেই বোঝা মনে করা হচ্ছে!? ছেলে একবার পাশ না করলে বহুবারের চেষ্টায় করবে। আর মেয়ে একবার ফেল মানেই সব গেলো!
পাশের বাড়ির রাবেয়া পাশ করলো, তুই কেন পারলি না; আমার মান-ইজ্জত সবই গেলো- এ ধরনের মানসিকতার অভিভাবক আমাদের সমাজে এখনও অনেক। বান্ধবী ফেল করেনি, আমি কেন করলাম- এ চক্ষু-লজ্জায়ও ভোগে অনেক মেয়ে! আমাদের ইতিবাচক মানসিকতার উন্নতি খুবই জরুরি। নইলে পাশ করতে না পারা রোকেয়াদের জীবন ফেল হতেই থাকবে!”
স্কুলের ৫ম শ্রেণী, ৮ম শ্রেণী আর ১০ম শ্রেণী শিক্ষার্থীদের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রতিবছর এই তিন ক্লাসের অভিভাবকদের ২/৩ বার করে স্কুলে ডাক পড়ে। শিক্ষার্থী অভিভাবক আর শিক্ষকদের মাঝে মত বিনিময় হয়। পড়ালেখা নিয়ে আলোচনা হয়, কি করলে ওরা আরো ভালো করবে ইত্যাদি ইত্যাদি। অবশ্য এ ছাড়াও যখন যে অভিভাবকদের প্রয়োজন হয় উনারা আসেন শিক্ষকদের সাথে কথা বলেন। প্রয়োজন হলে অভিভাকদের ডাকেন শিক্ষকরাও। বলছি ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত তেজগাঁও, ফার্মগেট এলাকার বটমলী হোমস বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের কথা। বিগত ১৮ বছর যাবত আমি এই স্কুলের সাথে জড়িত, শিক্ষক হিসাবে নয় অভিভাবক হিসাবেই। শিক্ষকদের সাথে মতবিনিময় করার জন্যে আমাদের ডাকা হয়। শিক্ষকরা নিজেরা যে যা বলার বললেন। এবার ঘোষণা দিলেন-
“অভিভাবকরা কেউ কিছু বলতে চাইলে বলতে পারেন, জিজ্ঞেস করতে চাইলে করতে পারেন।”
অনেকেই জানেন আমি ঠিক যাবো। আমাকে বিভিন্ন বিষয় বলতে শুরু করলেন ফিস ফিস করে। আমি সব শুনে সামনে গেলাম। আমার আগে আরো দুজন বলেছেন। উনারা লেখাপড়া নিয়ে অনেক কিছুই বললেন। কিন্তু আমি তো লেখাপড়া নিয়ে বলতে যাই নি। আমি গিয়েছি শিক্ষার্থী আর অভিভাবকদের কাউন্সিলিং করতে। আমরা সবাই চাই আমাদের সন্তান ভালো ফলাফল করুক ক্লাসে প্রথম হোক। আমিও চাই আমার সন্তান ভালো করুক, আমার সন্তান প্রথম হোক তা আমি কখনোই চাইনি। কারণ ক্লাসে প্রথম হয় একজনেই।
স্টেইজে গেলাম, ডায়াস হাতে বলতে শুরু করি -
আপনার আমার সন্তান স্কুলে আসছে লেখাপড়া করতে, যে যেমন পড়ালেখা করবে সে তেমন ফলাফল করবে। যার মেধা যেমন সে তেমন ফলাফল করবে। কোন কোন শিক্ষার্থী অল্প পড়েই অনেক পারে, বুঝতে হবে তার ব্রেন অনেক ভালো। পাশাপাশি ওর পাশের শিক্ষার্থীটি সকাল সন্ধ্যা অনেক পড়েও তেমন ফলাফল করতে পারে না। তখনি আমরা অভিভাবকগণ তেলে বেগুনে জ্বলে উঠি, “ও পারে তুই পারিস না কেন? ও ৮০ নাম্বারের উপরে পাইলো তুই ৫০ নাম্বার কেন? ও ভাত খায় তুই কি ভাতের মাড় খাস।”
এখানে শিক্ষার্থীর দোষ কোথায়? আপনি নিজেই জানেন ও অনেক পড়েছে তাহলে ওকে দোষ দিচ্ছেন কেনো?  আচ্ছা ধরে নিলাম সে ঠিক ভাবে লেখাপড়া করেনি বলে ফলাফল খারাপ করেছে। তাহলে বলতেই হয়, যে লেখাপড়া করেনি তার কাছে আপনি ভালো ফলাফল আশা করেন কেনো?  আপনাকে তো ধরেই নিতে হবে সে যা করেছে তার ফল পাবে। কথার এর মাঝেই হাততালি পড়ে।
এবার আমি বলতে শুরু করি অন্য কথা। আপনি সব সময় চান মেয়েটা ভালো ফলাফল করুক। আপনি কি চান না আপনার সন্তান ভালো মানুষ হয়ে উঠুক? যদি তাই চান, তাহলে সন্তানের চলাফেরায় নজর দিন, ও কার সাথে মিশে, স্কুল ছুটির কত পরে সে বাসায় ফিরলো। প্রাইভেট পড়ার সময়ের কত আগে সে বের হলো। আপনার সন্তান বাসা থেকে বের হতে কি ধরণের পোষাক পরলো। ধরে নিলাম আপনারা দুজনেই চাকুরীজীবী, তাহলে নিশ্চই আপনার বাসায় কেউ আছে বা থাকে, তাকে নজর দিতে বলুন। তাও বলি যদি আপনার ঘরে তেমন কেউ না থাকে, তাহলে মাসে বা ১৫ দিনে হঠাৎ নিজে একবার অফিস সময়ে চলে আসুন। বলছিনা সন্তানকে সন্দেহ করতে, বলছি না সন্তানকে পাহারা দিতে, বলছি সচেতন হতে, বলছি সন্তানের ভবিষ্যত ভালো থাকার জন্যে ভাবতে।
আপনার সন্তান একা চলাফেরা করে, ওর জন্যে একটা মোবাইল দিচ্ছেন, দিন, তবে মোবাইলটা সাধারণ থাকুক। আপনি ওর অভিভাবক, আপনার ঘরে একটা ওয়াইফাই কানেকশন আছে। সারাদিন অনেক পরিশ্রম করেছেন তাই ঘুমিয়ে পড়েছেন। আপনি কি জানেন আপনার সন্তান ইন্টারনেট এ কি করছে। স্কুল কলেজ পড়ুয়া বাচ্চাটার রাতে নেট কানেকশন কি প্রয়োজন?
বলছি না সব বাচ্চার কথা, বলছিনা সব শিক্ষার্থী একই। কিন্তু আপনি একজনের অসচেতনতার ফলে আপনার সন্তান বখে যেতে পারে। আপনার সন্তানের জন্যে আরো বাচ্চারা বখে যেতে পারে। বলছি না সন্তানকে সন্দেহ করতে, বলছি সচেতন হতে। আমি নিজেই কয়েকটি শিক্ষার্থীকে দেখেছি স্কুল ছুটির পর অন্য স্কুলের ছেলেদের সাথে আড্ডা দিতে, তাই বলে বলছি না ওরা সবাই এই ক্লাসের। কিন্তু সচেতন হলে সমস্যা কি?  এটা আপনার জন্যেই ভালো আপনার সন্তানের জন্যেই ভালো।
আপনার সন্তান কয়েক ঘন্টার জন্যে স্কুলে আসে, এই সময়ের জন্যে ওর কত টাকার প্রয়োজন হতে পারে। স্কুলের লেনদেন এর খবর তো আপনিই জানেন। তাহলে খুব বেশি হলে ওকে ৫০/ পঞ্চাশ টাকা দিতে পারেন। বাসার টিফিন দিলে তাও দেয়ার দরকার নেই। ওর দৈনিক ভাড়া (যদি লাগে) আর টিফিনের টাকাই যথেষ্ট। অথচ আমি এমনও দেখেছি ৫’শত টাকার নোট নিয়ে স্কুলে আসে। প্রশ্ন আমার-
টাকাটা কি আপনি দিয়েছেন ? আপনি না দিলে সে এই টাকা কোথায় পেলো? এর খবর আপনাকেই রাখতে হবে। বলতে পারেন বাচ্চাটা বান্ধবীদের খাওয়াতে এনেছে। তাহলে বলতেই হয় আপনাকে সাথে করে নিয়েই খাওয়ানো দরকার ছিলো।
আপনি সারা বছর খোঁজ নিলেন না, সে কি পড়লো, সে কি ভাবে চললো, কার সাথে মিশলো,  অথচ পরীক্ষার পর ফলাফল দেখে তাকে চোখে মুখে ঠোঁটে এমন তুলা ধূনা দিলেন সে জীবন সম্পর্কের সব জ্ঞান হারিয়ে ফেললো। আপনি কি একবারও ভেবে দেখেছেন ঠিক এই বয়সে আপনি কি করেছেন। ধরে নিলাম আপনি খুবই সচেতন ছিলেন, খুবই ভালো ফলাফল করেছেন, তাহলে সেই আগের কথা বলতেই হয় আবার। সবার মেধা কি এক? আর আপনি সারাবছর ওকে তার নিজের মতো চলতে দিয়েছেন তাহলে এখন এতটা আশাহত হচ্ছেন কেনো ? পুরো হল রুমে হাততালি পড়ে গেছে।
এভাবে বলার পর শুরু করেছি শিক্ষকদের আর শিক্ষার্থীদের নিয়ে কিছু কথা। ওরা প্রতিদিন ৭/৮ টি বিষয়ের ক্লাস করে। ধরি ৭ বিষয়, তাহলে ৭ বই, ৭ খাতা, ডায়রি সহ ওর বইয়ের ব্যাগের ওজন কত হতে পারে। তা কি হিসাব করেছেন। আপনারা নিয়ম করুন খাতা আনবে মাত্র একটি (রাফ খাতা) আর যত বিষয়ের বাড়ীর কাজ থাকবে তা তারা সিটে করে আনবে। এতে করে ব্যাগের ওজন কমবে। (উল্লেখ্য “মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়, জাতীর মেরুদন্ড সোজা করতে গিয়ে আমাদের সন্তানদের মেরুদন্ড বাঁকা করার অধিকার কিন্তু কারো নেই” এই শিরোনামে আমার একটা লেখা আছে। গুগুলে আমার নাম আর এই শিরোনাম দিলেই লেখাটা পড়তে পারেন।)
টেস্ট পরীক্ষায় আপনার সন্তান ভালো ফলাফল করেনি, স্কুল কর্তৃপক্ষ আপনাকে ডাকলেন। আপনি খুবই নমনীয় হয়ে প্রধান শিক্ষকের হাতে ধরে তাকে ফাইনালের জন্যে দিতে বললেন। এই আপনিই কিন্তু সারাবছর খোঁজ করেননি। আর আপনার অনুরোধে শিক্ষকরা ওকে পরীক্ষা দিতে দিলো। সে ফলাফল খারাপ করলো, এটা কার ব্যর্থতা? আপনার, শিক্ষার্থীর নাকী স্কুলের?
ফলাফল বের হবে আপনি ওকে আগেই বলে দিলেন খারাপ হলে মান সম্মান যাবে, কাউকে মুখ দেখাতে পারবো না। বড় সন্তান খুব ভালো করেছে, তুই না করলে এই হবে সেই হবে। আজ যদি আপনার সন্তান রংপুরের রোকেয়ার মতো করে তাহলে এর দায় কার? ওর নিজের নাকি আপনার? বরং পরীক্ষার পর আপনি ওকে মানসিক সহযোগিতা করেন, যেনো আশানুরূপ ফলাফল না করলে সে মানসিক ভাবে সুস্থ থাকে।
মঞ্চ থেকে নেমে এসেও শিক্ষকদের সাথে অনেক কথা হয়।
শুধু এই বছর নয়, শুধু রোকেয়া আর এই নয় শিক্ষার্থীইই নয়। প্রতিবছর সব পাবলিক পরীক্ষার পর এমন অনেক প্রাণ অকালে ঝরে যায়, যা মোটেই আমাদের কাম্য নয়, এমন কি কারোই কাম্য নয়।সে সন্তানদের জন্যে আমরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলছি, যে সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সকাল সন্ধ্যা পরিশ্রম করি। তাদের একটা ভুল, একটা পরাজয়কে কেনো এতটাই ধিক্কারের ভাষা প্রকাশ করে তাকে দুরে সরিয়ে দিবো। ওরা কখনোই অন্যের দেয়া আঘাতে নিজেকে শেষ করে দেবার কথা ভাবে না। ওরা কাছের খুব কাছের মানুষের দেয়া আঘাত সহ্য করতে না পেরে এমন কাজ করে ফেলে।
এখনো সময় আছে আমাদের ঘুরে দাড়ানোর। যদি মনে করেন সে লেখাপড়ার চাপ সইতে পারছে না, তাকে ধীরে ধীরে উপরে উঠতে বলেন। একবার ভালো করে ভেবে দেখুনতো সিঁড়ি দিয়ে যখন আমরা উপরে উঠি সবাইকি একই গতিতে উঠতে পারি। সবাইকে উপরে উঠে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। নিশ্চই নয়, তাহলে একবার ভালো করেনি পরের বার করবে। তবুও তাকে অসময়ে চলে যেতে বাধ্য করবেন না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ