ঢাকা, বুধবার 6 June 2018, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২০ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

পোশাক শিল্পের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : বর্তমানে দেশের তৈরি পোশাক শিল্প অনেক বেশি সুসংহত। শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এগিয়ে যাচ্ছে এ দেশের সর্ববৃহৎ বৈদেশীক মুদ্রা অর্জনকারী খাতটি। অর্থনৈতিকভাবে বিকশিত এ খাতটির উপর শকুনের নজর পড়েছে। অর্থনীতির চাকা সচলকারী এ খাতটির বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছে একটি কু-চক্রী মহল। পরিকল্পিতভাবে পোশাক শিল্পের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। শ্রমিক অসন্তোষ ঘটিয়ে কারখানা বন্ধ করে সুকৌশলে মালিকানা হাতিয়ে নিচ্ছে বিদেশীরা। বিষয়টি সরকারের মন্ত্রীরাও স্বীকার করেছেন।
এ ব্যাপারে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেন, বহির্বিশ্বে স্বার্থান্বেষী মহলের নেতিবাচক প্রচারণা সত্ত্বেও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পখাতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প নিয়ে অতীতে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ছিল, এখনও আছে। এখাতে বাংলাদেশের রফতানি প্রবৃদ্ধি ঠেকাতে প্রতিযোগীরা তৎপর রয়েছে। তবে কোনো অপতৎপরতা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পখাতের অগ্রগতি ব্যাহত করতে পারবে না। শিল্পমন্ত্রী বলেন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয় ছিল ৩৪ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ২৮ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে।
২০১৩ সালের রানা প্লাজা ধসের পর পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ সম্পর্কে ব্যাপক নেতিবাচক প্রচারণা চালায়। এতে করে বায়াররা বাংলাদেশের অনেক অর্ডার বাতিল করে। আর এ সময়টি ছিলো দেশের পোশাক শিল্পের জন্য দুর্যোগকালীন সময়। এই একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্বার্থান্বেষী মহল ফায়দা লুটতে পরিকল্পিতভাবে কারখানাগুলোকে অস্থির করে তোলে। দুই একটি কারখানার সমস্যা গোটা পোশাক কারখানার সমস্যা বলে উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা চালায়। এরপর কারখানার সেফটি নিশ্চিত করতে বিদেশী বায়ার তথা ইউরোপীয় ও দক্ষিণ আমেরিকার ক্রেতাজোট অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স নামে দুটি সংগঠন কাজ শুরু করে। এতে করে অনেক মালিক ভীত হয়ে কারখানা না চালিয়ে ব্যবসা বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে নারায়ণগঞ্জ, আশুলিয়া, সাভারসহ রাজধানীর বেশ কয়েকটি কারখানাতে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দেয়। বকেয়া বেতনের দাবিতে রাস্তায় নেমে আসে শ্রমিকরা। আন্দোলন ঠেকাতে পুলিশ তৎপর হলে আন্দোলনকারীদের সাথে সংঘর্ষ বাধে। আর এটাকে মোক্ষম সুযোগ হিসাবে নেয় প্রতিবেশি দেশ ভারতের ব্যবসায়ীরা। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তারা ভালো ভালো কারখানাগুলোতেও শ্রমিক অসন্তোষ তৈরিতে ইন্ধন যোগায়। পরিকল্পিতভাবে শ্রমিকদের লেলিয়ে দিয়ে বন্ধ কারখানার পাশাপাশি রানিং কারখানাতেও ভাংচুর ও অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটানো হয়। মালিকদের বেতন পরিশোধের আশ্বাসেও আন্দোলন থামানো যায়নি। মালিকরা দেশের ভাবমূর্তি রক্ষায় শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করার ওয়াদা করেন। এতে তাৎক্ষণিক টাকা পরিশোধ করতে কারখানা বিক্রি করতে বাধ্য হন মালিকরা। আর এ সুযোগটি নেয় ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। তারা প্রকাশ্যে কিংবা কারো মাধ্যমে দরকষাকষি করে বন্ধ কারখানার মালিকানা কিনে নেয়। এক্ষেত্রে অনেক কারখানা সম্পূর্ণ আবার কিছু কিছু কারাখানার অর্ধেক অথবা আংশিক মালিকানায় ব্যবসা করতে সম্মত হয়। এরমধ্যে ভারতের পাশাপাশি শ্রীলংকার ব্যবসায়ীরাও রয়েছেন। এরপর তাদের ইচ্ছামতো মেশিন বসিয়ে বাংলাদেশের শ্রমিক ছাঁটাই করে তাদের দেশের শ্রমিকদের এনে কাজ করায়। এতে বেকার হয়ে পড়ে হাজার হাজার শ্রমিক। আর এ কাজটি সহজ হয়েছে এ কারণে যে পোশাক শিল্পের মধ্যম শ্রেণির কর্মকর্তাদের অধিকাংশ ভারতীয়। খোঁজ নিয়ে যানা যায়, ভারতীয় মালিকানায় যাওয়া বেশির ভাগ কারখানা আশুলিয়া ও সাভারে অবস্থিত।
এদিকে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে পোশাক কারখানা গড়ে তোলায় তা বিক্রি করতে এ দেশে বায়িং হাউজ খুলেছে। বর্তমানে রাজধানীর বেশিরভাগ বায়িং হাউজের মালিক ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। বিজিএমইএ সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে তাদের তালিকাভুক্ত বায়িং হাউজের সংখ্যা ৮৯১টি। এর বাইরে আরো কয়েকশ' বায়িং হাউস আছে। বায়িং হাউজগুলোর ৮০ থেকে ৯০ ভাগই নিয়ন্ত্রণ করেন ভারতীয় নাগরিকরা। সূত্র আরো জানায়, দেশের প্রায় ৫ হাজার গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির মধ্যে বিশ্বমন্দা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে দেড় হাজার কারখানা ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। এসব কারখানা ভারতীয়রা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্রয় করে নিয়েছে। এভাবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বাজার চলে যাচ্ছে ভারতের হাতে। বাংলাদেশ ভারতীয় পণ্যের কলোনিতে পরিণত হচ্ছে।
বর্তমানে শ্রমিকদের জন্য কল্যাণমুখী বেশ কিছু কাজ হয়েছে। ন্যূনতম মজুরী থেকে শুরু করে কারখানার কর্মপরিবেশ অনেক উন্নত করা হয়েছে। এ খাতে কর্মরত পুরুষ শ্রমিকেরা গড়ে ৭ হাজার ২৭০ টাকা ও নারী শ্রমিকেরা ৭ হাজার ৫৮ টাকা মজুরি পান। অগ্নি বির্বাপক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করা হয়েছে। গড়ে তোলা হয় ট্রেড ইউনিয়নের মতো শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের সংগঠন। এর মাধ্যমে শ্রমি ও মালিকরা এখন আরও কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। বিভিন্ন সমস্যার কথা শ্রমিকরা সরাসরি মালিকদের বলতে পারছেন। মালিকরা শ্রমিক সংগঠনগুলোর সাথে কথা বলে সমস্যা সমাধান করছেন। তারপরও শ্রমিক অসন্তোষ ঘটিয়ে বাংলাদেশের পোশাক কারখানা হাতিয়ে নেয়ার বিদেশীদের মিশন এখনো অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি কয়েকটি কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ ও আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। গত ৩০ মার্চ রাজধানীর মিরপুরের কাফরুল এলাকার পূর্ব কাজীপাড়ার সাদিক এমব্রয়েডারি নামে একটি পোশাক কারখানায় আগুন লেগে তিনজন দগ্ধ হয়। গত ২৯ এপ্রিল রাজধানীর রামপুরার ওয়াপদা রোডের এমএল ১২ তলা টাওয়ারের ছয়তলায় পোশাক আসিয়ানা গার্মেন্টস কারখানায় আগুনের ঘটনা ঘটে। কারখানার ছয় তলায় থাকা কাপড়ের গুদামে আগুন লাগায় কাপড় পুড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
এদিকে গত ১৮ মে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে কাঞ্চন দক্ষিণ বাজার এলাকায় ফেব্রি মার্ক বিডি নামে এক কারখানা শ্রমিকরা বকেয়া বেতনের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও রাস্তা অবরোধ করে। গত ৩১ মে বকেয়া বেতন-ভাতার দাবিতে রামপুরার হাজীপাড়া এলাকায় আশিয়ানা গার্মেন্টসের কয়েকশ’ শ্রমিক সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা সড়কের দুই দিকই বন্ধ করে দেয়। গত ৩ জুন বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধের দাবিতে নারায়ণগঞ্জ শহরের টানবাজার এলাকার রিতীকা নীটওয়্যার লিঃ এর শ্রমিকরা কারখানার মালিকের বাড়ি ঘেরাও করে বিক্ষোভ সমাবেশ ও নগরীতে মিছিল করে। আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে উপস্থিত ছিলেন গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটি। কারখানার মালিক বেতনের আশ্বাস দিলে শ্রমিকরা ফিরে যায়।
আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে শ্রমিক অসন্তোষ ঘটতে পারে। আর এ আশঙ্কা খোদ পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর। গত ২৯ মে সচিবালয়ে পোশাক শিল্পসহ অন্যান্য শিল্পে অসন্তোষ দূরীকরণ, ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট বিষয়ক কোর কমিটি’র বৈঠকে শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টির চেষ্টা হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে বিজিএমইএ। বৈঠকে কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর জানায়, ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে সব মিলিয়ে ২৮২টি গার্মেন্টস কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা রয়েছে। এ কারখানাগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি থাকবে বলেও জানানো হয়। ঈদুল ফিতরের আগে বেতন-ভাতা পরিশোধে সমস্যা হতে পারে এমন সাতটি কারখানার তালিকা দেওয়া হয় সংগঠনের পক্ষ থেকে।
এ ব্যাপারে শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, যার অবস্থা ভালো না এ রকম মালিকের বউয়ের অলঙ্কার বিক্রি করে, ফ্যাক্টরির মেশিন বিক্রি করে, জায়গা বিক্রি করেও আমরা কিন্তু বেতনের ব্যবস্থা করেছি এবং এইটা আমরা মনে করি, বিজিএমইএ মনে করে, বিকেএমইএ মনে করে। মানে আমরা এতগুলো সংস্থা এত সজাগ যে কেউ যদি নাও পারে তাকে আমরা হেল্প করি। প্রবলেম হয় না। হইলে ফেস করি, তারপরও হতেই পারে। সেটা খুব মাইল্ড।
জানা যায়, বাংলাদেশে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত কাঁচা পাট ও পাটজাত দ্রব্য মোট রফতানির ৫০ শতাংশ ছিল। যা সেই সময়ের সব পণ্য রফতানির শীর্ষে ছিল পাটের অবদান। বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির যে চমকপ্রদ উত্থানটি ঘটেছে তার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে পোশাক শিল্প। আশির দশকের শেষ ভাগে বাংলাদেশে প্রসার ঘটে পোশাক শিল্পের। দেশের বৈদেশীক মুদ্রার আয়ের বড় একটি অংশ আসে পোশাক রফতানির মাধ্যমে। বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাকের প্রথম চালানটি রফতানি হয় ১৯৭৮ সালে। এই চালানটিতে ছিল শুধুমাত্র ওভেন শার্ট। এরপর পরই বিদেশী ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের পোশাকের কদর বাড়তে থাকে আর রফতানির চাহিদা বেড়ে যায়। ১৯৯৯ সালে এই শিল্পের ব্যাপক উত্থান ঘটে। ঐ সময় পোশাক শিল্প খাতে সরাসরি কর্মসংস্থান হয় ১.৪ মিলিয়ন বেশি মানুষের। এই কর্মজীবী শ্রম শক্তির ৮০ শতাংশই নারী। বর্তমানে প্রায় ৮০ শতাংশ বৈদেশীক রফতানির আয়ের যোগানদার এই শিল্পটি।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফেকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) তথ্যে দেখা গেছে, ১৯৭৮ সালে ৮ লাখ টাকা দিয়ে যাত্রা শুরু হওয়া বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের রফতানি বর্তমানে ৯০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। কর্মসংস্থান ৪০ হাজার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ লাখে। ৪০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে তিলে তিলে গড়ে ওঠা এ শিল্পখাত জিডিপিতে ১৪ শতাংশ অবদান রাখছে।
কিন্তু বিকাশমান এ খাতটি নিয়ে দেশী বিদেশী নানা ষড়যন্ত্র চলছে। বাংলাদেশের গার্মেন্টস সেক্টর দখলে আঁটঘাট বেঁধে নেমেছে বিদেশী একটি চক্র। তাদের নিজস্ব এজেন্টদের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে দিয়ে একে একে দখল করে নেয়া হচ্ছে বড় বড় গ্রুপের পোশাক কারখানাগুলো। কোনোটির আংশিক মালিকানা আবার কোনোটির পুরো মালিকানা কিনে নিচ্ছে বিদেশীরা। পোশাক খাতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পরিকল্পিতভাবে দেশের পোশাক খাত হাতিয়ে নিতে সক্রিয়ভাবে মাঠে নেমেছে বিদেশীরা।
এরই মধ্যে পোশাক খাতের বড় বেশ কয়েকটি কারখানা চলে গেছে বিদেশীদের হাতে। মালিকরা বলেছেন, সঙ্কটের কারণে তারা কারখানা চালাতে না পেরে বিক্রি করে দিয়ে দায়মুক্তি নিয়েছেন। বিক্রীত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে এসকিউ গ্রুপ, ক্রিস্টাল গার্মেন্টস, শান্তা গার্মেন্টস, শাহরিয়ার ফেব্রিক্স, মাস্টার্ড গার্মেন্টস, ফরচুন গ্রুপ, ইউনিয়ন স্পোর্টস ওয়্যার, রোজ ফ্যাশন, রোজ নিটিং, এজাক্স সুয়েটার প্রভৃতি। শুধু এই কয়েকটি কারখানা নয়, গত কয়েক বছরে এ ধরনের শতাধিক কারখানার মালিক হয়েছেন বিদেশীরা। বিদেশী মালিকদের প্রায় সবাই প্রতিবেশী দেশ ভারতের। শ্রীলঙ্কার কয়েকজন উদ্যোক্তাও অবশ্য এ তালিকায় আছেন।
জানা গেছে, পোশাক শিল্পে মাঝারি পর্যায়ের ব্যবস্থাপনায় কর্মরত কর্মকর্তাদের ৮০ শতাংশই বিদেশী এবং এর ৭০ ভাগই ভারতীয়। এসব কর্মকর্তাই এখন এ শিল্পের জন্য ভয়ানক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শিল্প মালিকরা জানিয়েছেন, কমপ্লায়েন্স কারখানাগুলোর শ্রমিকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে তাদের উস্কে দিয়ে ভাংচুর করা হচ্ছে বড় বড় কারখানায়। আর এতে সরাসরি ইন্ধন দিচ্ছেন এসব বিদেশী কর্মকর্তা। বিজিএমইএ সূত্র জানায়, দেশে এখন পর্যন্ত দক্ষ ফ্যাশন ডিজাইনার ও মার্চেন্ডাইজার তৈরির কোনো সরকারি ইন্সটিটিউট নেই। বিজিএমইএ'র নিজস্ব একটি ইন্সটিটিউট থেকে বছরে আড়াই হাজার প্রশিক্ষিত ফ্যাশন ডিজাইনার ও টেকনিশিয়ান বের হলেও চাহিদা রয়েছে এর দ্বিগুণ। ফলে বাধ্য হয়েই বিদেশী ফ্যাশন ডিজাইনার নিতে হয় গার্মেন্টস মালিকদের।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কারখানায় বর্তমানে ২২ হাজারেরও বেশি বিদেশী গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত আছেন। এদের মধ্যে দেড় হাজারের বেশি ভারতীয়। যোগাযোগ, মার্কেটিং, গুণগত মানসহ সব দিক থেকে দক্ষ হওয়ায় বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্প মূলত তাদেরই নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উদ্যোক্তারা পরিচালিত হন তাদের তৈরি করা ছক অনুযায়ী। এলডিসি বা স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশ যে ভারতের তুলনায় বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে তার সবই ভারতীয়দের নখদর্পণে। তারাই মূলত ছক আঁকেন বাংলাদেশের সেরা কারখানাগুলোকে ভারতীয়দের দিয়ে কিনিয়ে নেয়ার। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে শ্রমিকদের উস্কে দিয়ে কারখানায় ভাংচুর চালিয়ে উদ্যোক্তাদের মনোবল নষ্ট করেন তারা। পাশাপাশি বিদেশে অবস্থানরত ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের ব্যবসায়িক সম্ভাবনাগুলো সম্পর্কে ধারণা দিয়ে কারখানা কিনিয়ে দেন। মালিকানা পরিবর্তন হওয়ার আগে বিভিন্ন অজুহাতে কারখানাগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। নতুন মালিকরা এসে এগুলোর আধুনিকায়ন করেন উন্নত মেশিনারি দিয়ে। এসব কারখানা থেকে ৮০-৯০ ভাগ বাংলাদেশী শ্রমিককে নানাবিধ মিথ্যা অভিযোগে ছাটাই করাও হয়েছে। এখানে নিয়োগ দেয়া হয় ভারতীয় শ্রমিকদের। পরিকল্পিতভাবে অস্থিরতার মাধ্যমে বন্ধ থাকা আরো শতাধিক কারখানা ভারতীয় বংশাদ্ভূত ব্যবসায়ীরা কিনে নিচ্ছে বলেও একটি সূত্র জানিয়েছে।
সম্প্রতি আশুলিয়ায় ঘটে যাওয়া গার্মেন্টস কর্মীদের নামে যে নৈরাজ্য হয় সেই আন্দোলনের সময় গার্মেন্টস কর্মীদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোন দাবী ছিল না। এমনকি এই আন্দোলনে গার্মেন্টস শ্রমিকদের প্রায় নব্বই শতাংশ মহিলার কেউই ছিলনা এবং পুরুষদের অধিকাংশই আন্দোলনে অংশ নেয়নি। ভাংচুরে অংশগ্রহণ করেছিল বহিরাগত কিছূ যুবক। আর খোলা গার্মেন্টস ছাড়াও বন্ধ গার্মেন্টস, ঔষধ, সিরামিক, ব্লেড, প্লাস্টিক, পানীয়সহ অন্যান্য শিল্প কারখানাতে হামলা করা হয়। এ জাতীয় হামলা শুধু আশুলিয়া নয় গাজীপুর, সাভার, মিরপুর, নারায়নগঞ্জ সহ বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ঘটতে দেখা যায়।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিগত কয়েক বছর ধরে সাভার, আশুলিয়া, জয়দেবপুর ও কাঁচপুর এলাকায় গার্মেন্টস কারখানাগুলোয় শ্রমিক অসন্তোষ ও নাশকতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। নিয়মিত বেতন-ভাতা পরিশোধ করে এবং কাজের পরিবেশও বেশ ভালো, এমন সব কারখানা ভাংচুরের শিকার হয়েছে। এসব ভাংচুরের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কারখানার জেনারেল ম্যানেজার, প্রোডাকশন ম্যানেজার, এ্যাকাউন্টস ম্যানেজার, মার্চেন্ডাইজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতারও প্রমাণ মিলেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের মোট রফতানি আয়ের প্রায় ২০ শতাংশ আয়ই আশুলিয়া এবং কাঁচপুরের পাঁচ শতাধিক গার্মেন্টস কারাখানার উৎপাদিত পণ্য রফতানি করে অর্জিত হয়। আর টাকার অংকে এর পরিমাণ হবে সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ। আর এ কারণেই পার্শ্ববর্তী ভারতসহ আরো কয়েকটি দেশ আমাদের এই অঞ্চলের গার্মেন্টস শিল্পকে টার্গেট করেছে। এই দু'টি অঞ্চলের গার্মেন্টসগুলো বন্ধ বা অস্থিরতার মধ্যে রাখতে পারলেই স্বার্থ হাসিলের বন্দোবস্ত হবে ঐ সকল বিদেশী মালিকদের। এছাড়া আশুলিয়াতে গড়ে উঠেছে বেশকিছু বিশ্বমানের গার্মেন্টস কারখানা। আর এসব কারখানায় উৎপাদিত পণ্য এখন অপ্রতিদ্বনদ্বী হিসেবে চড়া মূল্যে ইউরোপ আমেরিকাতেও রফতানি হচ্ছে। একারণেই বিদেশীদের টার্গেটে পরিণত হয়েছে আশুলিয়া শিল্প এলাকা।
গয়েন্দা রিপোর্টের বরাত দিয়ে একটি সূত্র জানায়, বাংলাদেশ থেকে গার্মেন্টস শিল্প সরিয়ে নিতে তৎপরতা চালাচ্ছে ৩টি বিদেশী শক্তি। দু'টি দেশের গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা এখানে ছদ্মবেশে তৎপরতা চালাচ্ছে। গার্মেন্টস ব্যবসার আড়ালে তারা এ শিল্পকে এদেশ থেকে সরিয়ে দিতে তৎপরতা চালাচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে যাবতীয় তথ্য তারা পাচার করছে। এছাড়া বিদেশী কয়েকটি সংস্থা তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্য আমাদের দেশের অভ্যন্তরে কিছু শ্রমিক সংগঠনকেও অর্থায়ন করছে। এসব শ্রমিক সংগঠন পরিকল্পিতভাবে দফায় দফায় শিল্পে অস্থিরতা তৈরি করছে।
বিজিএমইএ'র সভাপতি নিজে মালিক সংগঠনের অন্য নেতৃবৃন্দকে সাথে নিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করে এরকম কয়েকটি শ্রমিক সংগঠনের কথা জানিয়েছেন। এর মধ্যে ওয়্যার এ্যান্ড ওয়্যার নামের একটি সংগঠনের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যমূলক তৎপরতায় জড়িত থাকার তথ্য জানানো হয়। বিজিএমইএর এক নেতা বলেন, যোগ্য লোকের অভাবে বেশিরভাগ কারখানার মালিককেই ম্যানেজমেন্ট চালাতে হয় বিদেশীদের দিয়ে। আর এ কারণেই মূলত শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণও থাকে তাদের হাতে।
সম্প্রতি কয়েকটি সংবাদ মাধ্যম জানিয়েছে নানা কৌশলে দেশের তৈরি পোশাকের আন্তর্জাতিক বাজার দখলে নিতে আমাদের প্রতিবেশী দেশ নানাভাবে তৎপরতা চালাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে বাংলাদেশের তুলনামূলক কম উৎপাদন খরচের সুবিধা নিতেই মূলত তারা এই তৎপরতা চালাচ্ছে। ভারতীয় উদ্যোক্তাদের মতে, বাংলাদেশ কম উৎপাদন খরচের পাশাপাশি স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) হিসেবে ইউরোপের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের সুযোগ পায়। এর ফলে বাংলাদেশ ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কমে পোশাক রফতানির সুবিধা নিতে পারছে। বিনিয়োগ বোর্ডের তথ্যানুযায়ী গত কয়েক মাসে ভারতীয় নাগরিকেরা বাংলাদেশের ৩৫টি তৈরি পোশাক কারখানায় ৮ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে। ভারত বাংলাদেশের বাজারে ক্রীম, টুথপেষ্ট, ব্রাশ, শাড়ী, তৈল, চাল, ডাল, পেয়াজ, রসুন, মুরগী, গরুসহ প্রায় সব গুলো বাণিজ্যিক দিক দখল করে নিয়েছে। কিছুটা বাকী আছে শুধু পোষাকের ক্ষেত্রে। এখন সেই জায়গাটা দখল করার জন্যই তাদের এজেন্টদের দিয়ে এই ধ্বংসলীলা চালাতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন। দেশের সবছে সম্ভাবনাময় খাত গার্মেন্টস শিল্পকে ধ্বংস করার অনৈতিক কাজে কারা অর্থ, বুদ্ধি, লোকবল, সমর্থন যুগিয়ে যাচ্ছে তাদের বের করে দৃষ্টান্তমুলক শাস্তির দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ