ঢাকা, বুধবার 6 June 2018, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২০ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ইতিকাফ

-শাহাবুদ্দিন আহমদ চৌধুরী (সেলিম)

১। শুরুর কথা : ইবাদাতের বসন্তকাল হচ্ছে রমাদান মাস। রহমত, মাগফিরাত ও মুক্তির সুমহান বার্তা নিয়ে প্রতি বছর আমাদের মাঝে হাজির হয় মাহে রমাদান। রমাদানের মর্যাদাকে কাজে লাগিয়ে কদর রাত প্রাপ্তির সুনিশ্চিত প্রত্যাশায় মহান আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার একান্ত সান্নিধ্য লাভের জন্য রমাদানের শেষ ১০ (দশ) দিনের ইতিকাফকে সুন্নাত করা হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনার জীবনে প্রায় প্রতি বছর রমাদানের শেষ ১০ (দশ) দিন নিয়মিতভাবে ইতিকাফ করেছেন।
পবিত্র রমাদানের বিভিন্ন ইবাদাত বান্দেগীর মধ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে সকল কাজ বা ইবাদাতকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন ইতিকাফ তার মধ্যে অন্যতম। অনেক নফল কাজ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো করেছেন, কখনো ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্ত মদীনায় হিজরত করার পর যত দিন তিনি বেঁচে ছিলেন কখনো রমাদানের শেষ ১০ (দশ) দিনের ইতিকাফ ছাড়েননি।
২। ইতিকাফ কি? ইতিকাফ বলতে কি বুঝায় : ইতিকাফ একটি আরবী শব্দ। এটি আরবী ‘আকফ’ ধাতু থেকে উদ্গত। আকফ শব্দের অর্থ হচ্ছে অবস্থান করা। ইতিকাফ মানে মসজিদে নিজেকে আটকে রাখা। ইতিকাফের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে কোন স্থানে আটকে যাওয়া বা থেমে যাওয়া, অবস্থান করা আবদ্ধ হয়ে থাকা। প্রচলিত অর্থে রমাদানের শেষ ১০ (দশ) দিন জাগতিক কাজ কর্ম ও পরিবার পরিজন থেকে অনেকটা বিছিন্ন হয়ে শুধুমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলাকে রাজি খুশি করার নিয়তে একটি নির্দিষ্ট স্থানে ইবাদত করার উদ্দেশ্যে অবস্থান করা, স্থির থাকা, আবদ্ধ হয়ে থাকাকে ইতিকাফ বলে। যিনি ইতিকাফ করেন তাকে মু’তাকিফ বলে।
৩। কুরআন ও হাদীসে ইতিকাফ সম্পর্কে কোন উল্লেখ আছে কি : ইতিকাফ শরীয়া সম্মত একটি আমল হওয়ার ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। যেমন:
“আমি ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে আদেশ দিয়েছিলাম যেন তারা আমার ঘর (কাবা) কে তাওয়াফকারীদের জন্য, ইতিকাফকারীদের জন্য ও (সর্বোপরি তাঁর নামে) রুকু-সিজদাহ কারীদের জন্য পবিত্র রাখে।” (সূরা বাকারা: ১২৫)।
“আর মসজিদে যখন তোমরা ইতিকাফ অবস্থায় থাকবে তখন স্ত্রী-সম্ভোগ থেকে বিরত থেকো। সিয়ামের ব্যাপারে এগুলোই হল আল্লাহ্’র সীমারেখা।” (সূরা বাকারা, আয়াত: ১৮৭)।
আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি রমাদানে শেষ ১০ (দশ) দিন ইতিকাফ করতেন। কিন্তু যে বছর তিনি ইন্তিকাল করেন, সে বছর তিনি ২০ (বিশ) দিন ইতিকাফ করেছেন। (বুখারী ও মুসলিম)।
মা আয়শা (রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি বছর রমাদানের শেষ ১০ (দশ) দিন ইতিকাফ করতেন। ইন্তিকালের আগ পর্যন্ত তিনি এই নিয়ম পালন করেন। তাঁর ইন্তিকালের পর তাঁর স্ত্রীগণ এই নিয়ম জারি রাখেন। (বুখারী)।
৪। ইতিকাফের গুরুত্ব ও তাৎপর্য: মা আয়শা (রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা) থেকে বর্ণিত, যখন রমাদানের শেষ ১০ (দশ) দিন আসত তখন নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোমর বেঁধে নামতেন অর্থাৎ বেশি বেশি ইবাদত করার প্রস্তুতি নিতেন এবং রাতে জেগে থাকতেন ও পরিবার পরিজনকে জাগিয়ে দিতেন। (বুখারী)।
মদীনায় অবস্থানকালীন সময়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজে লিপ্ত থাকা সত্বেও রমাদানের ইতিকাফ কখনো ছাড়েননি। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে নিয়মিতভাবে ইতিকাফ করেছেন এবং সাহাবীগণকেও উৎসাহিত করেছেন। মসজিদকে বলা হয় আল্লাহ্’র ঘর। তাই এটি মুত্তাকীদের কাছে অধিক প্রিয় জায়গা। যে ব্যক্তি ইবাদাতের উদ্দেশ্যে মসজিদে অবস্থান করবে আশা করা যায় আল্লাহ্- তায়ালা তার প্রতি শান্তি ও রহমত বর্ষণ করবেন।
রমাদানের শেষ ১০ (দশ) দিনের কোন এক বেজোড় রাতেই লাইলাতুল কদর রয়েছে। আর কদরের রাত্রি শুধুমাত্র রমাদানের শ্রেষ্ঠ রাতই নয়; বরং এটি বছরের মধ্যেও শ্রেষ্ঠ রাত। প্রচলিত হিসাব অনুযায়ী এই রাতের ইবাদাত তিরাশি বছর চার মাস ইবাদাত করার চেয়েও উত্তম। তাই ক্ষমা প্রাপ্তি ও পুরষ্কারের আশায় তথা কদর প্রাপ্তির আশায় ইতিকাফকে গুরুত্ব দেয়া আমাদের সবার উচিত।
প্রকৃত অর্র্থে ইতিকাফ হচ্ছে পার্থিব সকল কাজ অর্থাৎ পরিবার, সংসার, ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত সবকিছু থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর সাথে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপনের জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু কাজের মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ করে নেয়া। এর মাধ্যমে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সম্পর্কে বান্দার জানার পরিধি বাড়ে, হৃদয়ে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার মহব্বত আরও সুদৃঢ় হয় এবং আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ডাকে সাড়া দিতে দুনিয়ার আকর্ষণ তার জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।
৫। ইতিকাফ কেন করব : ইতিকাফ করব এই জন্য যে, এর মাধ্যমে ইসলামের একটি শিক্ষা অনুশীলন করে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সাথে সম্পর্ক আরো মজবুত করে নেয়া যায়।
ইতিকাফ সকল অপ্রয়োজনীয় কাজ থেকে মু’তাকিফকে দূরে রাখে। সিয়ামের মাধ্যমে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর বান্দাদেরকে অতিরিক্ত পানাহার, যৌনাচার ও পশুবৃত্তির অনুগামী হওয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখেন। ইতিকাফের বিধান মানার মাধ্যমে মন্দ সংস্পর্শ, অধিক ঘুম ও আজে-বাজে কথা থেকে বান্দা নিজেকে হেফাজত করে চলে।
এর মাধ্যমে লাইলাতুল কদরের সৌভাগ্য ও মহিমা অনুসন্ধান করা বান্দার জন্য সহজ হয়ে যায়, মসজিদে অবস্থানের অভ্যাস গড়ে উঠে এবং দুনিয়ামুখী মানসিকতা ত্যাগ ও বিলাসিতা থেকে দূরে থাকা যায়। সর্বোপরি ইতিকাফের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছ থেকে ক্ষমা এবং পুরষ্কারের আশা করতে পারে।
৬। ইতিকাফ কত প্রকার ও কি কি : ইতিকাফ মূলত তিন প্রকার: ওয়াজিব ইতিকাফ, সুন্নাত ইতিকাফ ও মুস্তাহাব বা নফল ইতিকাফ।
ক. ওয়াজিব ইতিকাফ : মান্নতের ইতিকাফকে ওয়াজিব ইতিকাফ বলে। কেউ যদি ইতিকাফ করার জন্য মান্নত করে তবে তাকে তা পূরণ করতেই হবে। ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু) একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, হে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাহেলি যুগে আমি হারামে (কাবায়) এক রাত ইতিকাফ করার মান্নত করেছিলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “তুমি মান্নত পূরণ কর”। (বুখারী)।
খ. সুন্নাত ইতিকাফ : রমাদানের শেষ ১০ (দশ) দিন যে ইতিকাফ করা হয় তাকে সুন্নাত ইতিকাফ বলে। যা আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণ করেছেন। সুন্নাত ইতিকাফ সিয়াম পালনরত অবস্থায় করতে হয়।
গ. মুস্তাহাব বা নফল ইতিকাফ : রমাদানের শেষ ১০ (দশ) দিন ছাড়া অন্য যে কোন সময় যে ইতিকাফ করা হয় তাকে মুস্তাহাব বা নফল ইতিকাফ বলে। এটি বছরের যে কোন সময়, যে কোন মাসে, যে কোন দিনে করা যায়।
৭। ইতিকাফের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য:
ইতিকাফের অন্যতম লক্ষ্য হল লাইলাতুল কদরের রাতের যে অগণিত ফজিলত রয়েছে তা অর্জন করা এবং কদরের মর্যাদাময় রাত যেন কোনক্রমে বাদ না পড়ে সে জন্য নিজেকে সদা ইবাদাতে নিয়োজিত রাখা। নিশ্চিতভাবে লাইলাতুল কদর রমাদানের শেষ ১০ (দশ) দিনের মধ্যে রয়েছে যা নিরবচ্ছিন্নভাবে রাত্রি জাগরণের মাধ্যমে পাওয়ার চেষ্টা করতে হয়। মোট কথা কোনক্রমেই যেন লাইলাতুল কদর হাতছাড়া না হয়।
ইতিকাফের প্রধান উদ্দেশ্য হল, মহান আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সাথে গভীর ভালবাসার সম্পর্ক সৃষ্টি করা। তথা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করে নেয়া; এটি এমন এক ইবাদাত যার মাধ্যমে বান্দা সমস্ত সৃষ্টি থেকে আলাদা হয়ে নিবিষ্ঠমনে, একান্ত নির্জনে তাঁকে স্মরণ তথা ভালবাসা ও ইবাদাত করার মাধ্যমে তাঁর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য হাসিলের চেষ্টা করে।
৮। ইতিকাফ কারা করতে পারবে? ইতিকাফের পূর্বশর্ত:
ক. ইতিকাফকারীকে অবশ্যই মুসলিম হতে হবে। খ. তাকে সুস্থ মানসিকতাসম্পন্ন স্বাভাবিক মানুষ হতে হবে। কোন পাগল বা উন্মাদ ইতিকাফ করতে পারবে না। গ. তাকে জ্ঞান সম্পন্ন ও প্রাপ্তবয়স্ক হতে হবে। ঘ. এই সময় সে অপবিত্র অবস্থায় থাকবে না। ঙ. তাকে (সুন্নাত ইতিকাফকারী) সিয়াম পালনকারী হতে হবে।
৯। ইতিকাফের উপকারিতা ও সুবিধা সমূহ:
ক. নিশ্চিতভাবে রমাদানের শেষ ১০ (দশ) দিনের যে কোন বেজোড় রাতের একটি রাত হচ্ছে লাইলাতুল কদর বা কদরের রাত, তাই ইতিকাফকারীর সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে তার পক্ষে কদর রাতের সন্ধান করা সহজ হয়ে যায়।
খ. ইতিকাফের ফলে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সাথে বান্দার সম্পর্ক সুদৃঢ় করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। এতে দিন ও রাতের অধিকাংশ সময় অবনত মস্তকে ইবাদাতে মশগুল থাকার প্রকৃত পরিবেশ তৈরি হয়।
গ. ইতিকাফকারী মসজিদে অবস্থানের কারণে এক সালাতের পর আরেক সালাতের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু) বর্ণিত একটি হাদীস থেকে জানা যায়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “এই অপেক্ষার কারণে ফেরেশতারা তোমাদের জন্য দোয়া করতে থাকে। তারা বলে, হে আল্লাহ্, তুমি তাদের ক্ষমা করে দাও এবং তাদের প্রতি দয়া কর।”
ঘ. ইতিকাফকারী মসজিদে অবস্থানের কারণে মসজিদের প্রতি তার ভালবাসা তৈরি হতে থাকে। এভাবে সে সালাতের প্রতি যত্নশীল হয় এবং সালাতের মাধ্যমে হৃদয়ে প্রশান্তি অনুভব করে।
ঙ. ইতিকাফকারী একমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার উদ্দেশ্যে নিজেকে আবদ্ধ করে নেয় বলে তার অন্তর থেকে কঠোরতা দূরীভূত হয়।
চ. দুনিয়ার প্রতি তার মোহ অনেকাংশে কমে যায় এবং আত্মিক উন্নতির উঁচুস্তরে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়।
ছ. এ’ সময় মন আল্লাহ্মুখী থাকার কারণে অন্যের প্রতি ভালবাসা ও ক্ষমা করে দেয়ার মানসিকতা তৈরি হয়।
জ. তাহাজ্জুদ সালাতে অভ্যস্ত হওয়ার জন্য ইতিকাফ একটি ফলপ্রসূ কর্মশালা।
ঝ. একাগ্রচিত্তে, বিনম্রভাবে এবং একান্তে আত্মসমালোচনা ও তওবা করার সুযোগ তৈরি হয়।
ঞ. কুরআন তেলাওয়াত, তাফসীর, নবী-রাসূল এবং সাহাবীদের জীবনী পড়া ও ইসলামের উপর গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি হয়। [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ