ঢাকা, বৃহস্পতিবার 7 June 2018, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২১ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

চার শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু

খুবই দুর্ভাগ্যজনক হলেও গুম, হত্যা এবং কথিত বন্দুক যুদ্ধ ও সড়ক দুর্ঘটনাসহ নানা কারণে অপমৃত্যু বহুদিন ধরেই বাংলাদেশে ‘স্বাভাবিক’ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সে কারণে কোনো ধরনের কোনো অপমৃত্যুই আজকাল মানুষকে মর্মাহত করে না। আন্দোলিত তো করেই না। কিন্তু তা সত্ত্বেও চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার রান্ধুনিমুড়া গ্রামের এক অপমৃত্যুর খবরে সারাদেশে আলোড়ন উঠেছে। মানুষ মাত্রই ভীষণ কষ্ট পেয়েছে। এর কারণ, সেখানে অপমৃত্যুর শিকার হয়েছে চারজন শিশু।
গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে, রান্ধুনিমুড়ার একই পিতার দুই ছেলে এবং ওই বাড়ির অন্য এক ছেলেসহ শাহরাস্তি উপজেলার বোচ্চা গ্রামের এক ছেলেকে সোমবার দুপুরের পর থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। তাদের বয়স ছিল ১১ থেকে ১৩ বছর। প্রথমে শোনা গিয়েছিল, চার শিশু রান্ধুনিমুড়া গ্রামের বৈষ্ণব বাড়ির পুকুরে গোসল করতে গেছে। এভাবে প্রায় প্রতিদিনই তারা ওই পুকুরে গোসল করতে যেতো এবং বহুক্ষণ ধরে পুকুরে সাঁতার কাটতো। দাপাদাপিও যথেষ্টই করতো।
পুকুরে যাওয়া এবং সাঁতার কাটা তাদের প্রাত্যহিক ব্যাপার ছিল বলে চার শিশুর অনুপস্থিতির বিষয়টি প্রথমে কারো নজরে পড়েনি। কেউ খেয়ালও করেনি। কিন্তু দুপুরের পর বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা এবং তারও পর রাত হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও চার শিশুর কেউই বাড়িতে না ফেরায় তাদের পিতামাতা এবং স্বজনেরা খোঁজ-খবর শুরু করে। বৈষ্ণব বাড়ির পুকুরেও গেছে অনেকে। কারণ, চারজনকে ওই পুকুরে গোসল করতে যেতে দেখেছিল গ্রামের লোকজন। কিন্তু পুকুরে বা গ্রামের অন্য কোথাও তাদের খোঁজ পাওয়া যায়নি। এক শিশুর মা অবশ্য পরে জানিয়েছেন, তিনি নাকি সন্ধ্যার দিকে খোঁজ করতে গিয়ে পুকুর পাড়ে তার নিজের সন্তানের এবং অন্য একজন শিশুর জামা ও জুতা পড়ে থাকতে দেখেছেন। কিন্তু তা দেখেও তার মনে কোনো সন্দেহ জাগেনি। তিনি বরং ওই জামা ও জুতা নিয়ে বাড়িতে ফিরে গিয়েছিলেন। গ্রামবাসীরা জানিয়েছে, ওই শিশুর মা যদি  জামা ও জুতা সম্পর্কে সঙ্গে সঙ্গে জানাতেন তাহলেও হয়তো শিশু চারজনকে বাঁচানোর চেষ্টা চালানো সম্ভব হতো।
অন্যদিকে কিছুই না জানার ফলে গ্রামবাসীরা আশপাশের গ্রামে খোঁজ-খবর করেছে। গভীর রাতে মাইকযোগে নিখোঁজ সংবাদও প্রচার করা হয়েছে। কিন্তু শিশুদের ব্যাপারে কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। প্রথম খোঁজ পাওয়া গেছে পরদিন ভোর রাতে। সেদিন সাহরির পর শুকু কমিশনারের বাড়ির ইবরাহীম নামের এক ছেলে ফজরের নামাজ পড়ার আগে অজু করার জন্য বৈষ্ণব বাড়ির পুকুরে গিয়ে কিছু একটা ভেসে থাকতে দেখে। তার সন্দেহ হলে সে অন্যদের খবর দেয়। তখন গ্রামবাসীরা পুকুরে নেমে পড়ে। তারা চার শিশুকেই মৃত অবস্থায় ভাসতে দেখতে পায়। কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, চারজনের মধ্যে তিনজনকে পাওয়া গেছে হাত ধরাধরি করা অবস্থায়। অর্থাৎ ওই তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে এক সঙ্গে। চতুর্থ শিশুকে পাওয়া গেছে কিছুটা দূরে।
বিষয়টি নিয়ে গ্রামবাসীর মধ্যে সন্দেহ-সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, চার শিশুই সাঁতার জানতো। তারা বৈষ্ণব বাড়ির ওই পুকুরেই প্রতিদিন গোসল করতো। অনেকক্ষণ ধরে দাপাদাপিও করতো। সুতরাং পানিতে ডুবে তাদের অপমৃত্যু ঘটার কথা নয়। তিনজন কেন হাত ধরাধরি করে রয়েছে- সে প্রশ্নের উত্তর নিয়েও আলোচনা কম হয়নি। কেউ কেউ এমনকি হত্যাকান্ডের সম্ভাবনার কথাও বলেছেন। সে কারণে পুলিশ লাশগুলোর ময়নাতদন্ত করতে চেয়েছিল। কিন্তু শিশুদের স্বজনেরা রাজি হয়নি। তারা স্বাভাবিক নিয়মে চার শিশুর জানাযা ও দাফনের কাজ সম্পন্ন করেছে। থানায় কোনো হত্যা মামলাও হয়নি।
বলার অপেক্ষা রাখে না, চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জের গ্রামে পুকুরের পানিতে ডুবে চার শিশুর অপমৃত্যু নিঃসেন্দহে অত্যন্ত মর্মান্তিক। সাধারণ মানুষের মতো আমরাও এজন্য গভীর শোক প্রকাশ করি। তাই বলে আমরা কিন্তু বিষয়টিকে ‘স্বাভাবিক’ বলে মনে করতে পারি না। এই অপমৃত্যুর মধ্যে শিশুদের ব্যাপারে দায়িত্ব পালনের দিকটি এসেছে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে। মাত্র ১১ থেকে ১৩ পর্যন্ত বয়সের শিশুদের তাদের ইচ্ছা ও মর্জি মতো যেখানে সেখানে এবং যখন তখন ঘুরে বেড়াতে দেয়ার মধ্যে আর যা-ই হোক, অভিভাবকদের দায়িত্বজ্ঞানের প্রমাণ মেলে না। এ সত্যই বরং প্রতিষ্ঠিত হয় যে, কোনো অভিভাবকই শিশু সন্তানদের প্রতি যথেষ্ট মনোযোগ দিতেন না। পিতামাতাসহ অভিভাবকদের এই দায়িত্বজ্ঞানহীনতা কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অন্যদিকে দুর্ভাগ্যজনক হলেও কঠিন সত্য হলো, হাজীগঞ্জের রান্ধুনিমুড়া গ্রামের অভিভাবকরা শুধু নন, সাধারণভাবে সারাদেশের অভিভাবকরাও সন্তানদের প্রতি দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে অবহেলা দেখিয়ে চলেছেন। একই কারণে শিশু বয়স থেকেই ছেলে-মেয়েরা নিঃসঙ্গতার শিকার হচ্ছে। তারা নষ্টও হয়ে যাচ্ছে।
আমরা আশা করতে চাই, হাজীগঞ্জের অপমৃত্যুর মর্মান্তিক ঘটনা থেকে পিতামাতা ও অভিভাবকরা শিক্ষা নেবেন এবং সন্তানদের একাকী ছেড়ে দেবেন না। বরং তাদের জন্য যথেষ্ট সময় দেবেন। আমরা চাই, দেশের আর কোথাও যেন আর কোনো শিশুর অপমৃত্যু না ঘটে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ