ঢাকা, বৃহস্পতিবার 7 June 2018, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২১ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

জার্সি আর পতাকা নিয়ে বিশ্বকাপ উন্মাদনা

অরণ্য আলভী তন্ময় : বাঙ্গালীর ফুটবলপ্রেম নতুন নয়। কখনো বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ বাংলাদেশ পাবে কিনা সেই সম্ভাবনা একেবারে শুন্যের কোঠায়। কিন্তু বিশ্বকাপ আসলেই মাতামাতিতে একে অপরের সাথে শুরু হয় টক্কর দেওয়া। কে কার চেয়ে বড় পতাকা বানাতে পারে সেই প্রতিযোগিতায় মত্ত থাকে। তবে বহু বছর ধরে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল এই দুই দলের ভক্তদের মাতামাতিটা বেশি লক্ষ্য করা গেছে। এই যেমন মাগুড়া জেলার আমজাদ আলী। তার নাম ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপের কল্যানে অনেকেই জেনেছিলেন। চার বছর আগে সাতে ৩ কিলোমিটার লম্বা জার্মান পতাকা বানিয়ে সারাদেশে হৈ চৈ ফেলেদিয়েছিলেন। সে সময় বাংলাদেশে নিযুক্ত জার্মান রাষ্ট্রদ্যুত তার এই কীর্তি দেখার জন্য ঢাকা থেকে ছুটে গিয়েছিলেন। জেলা স্ট্রেডিয়ামে এটি প্রদর্শিত হয়েছিল।
পরে তাকে জার্মান ফ্যান ক্লাবের সদস্য করা হয়। এবার গত অসরের চেয়ে চেয়ে ২ কিলোমিটার বেশি বানিয়ে ৫ কিলোমিটার পতাকা বানিয়েছেন। জার্মান বিটি হোমিও ঔষুধ খেয়ে অসুখ ভাল হওয়ার পর জার্মান দলের সমর্থক হয়ে যান। এছাড়া গত ২৬ মে বাগেরহাট জেলার সদর উপজেলার বাদোখালী এলাকায় ’বাদোখালী আর্জেন্টিনা সমর্থক গোষ্ঠী’র ব্যানারে এক বিরাট র‌্যালি বের করা হয়। সেখানে লিওনেল মেসির দেশের আটশ ফুট পতাকা নিয়ে সমর্থকরা প্রিয় দলের শুভকামনা জানিয়েছেন। এই র‌্যালিতে পাঁচ শতাধিক সমর্থক অংশগ্রহন করে। এছাড়া ম্যাচের দিসও আর্জেন্টিনার সমর্থকরা এমন র‌্যালির আয়োজন করবে বলে জানিয়েছেন সমর্থকরা।
র‌্যালিতে সমর্থক হিসেবে যারা অংশ নিয়েছে তাদের প্রায় সবার গায়ে ছিল আর্জেন্টিনার জার্সি। এখানে পতাকার সাথে জার্সির ব্যবসাকে বিশ্বকাপের হিসেবে আনতে হচ্ছে। বিশ্বসেরার আসর শুরু হতে আর মাত্র কয়েক দিনের অপেক্ষা। তবে যেন তর সইছেনা সর্মকদের। বাংলাদেশের একটা সময় এক নাম্বার খেলা ছিল ফুটবল। কিন্তু জাতীয় দলের পারফরম্যান্স এখন আর খেলাটি নিয়ে স্বপ্ন দেখাচ্ছেনা। তবে খেলাটি নিয়ে কমেনি উন্মাদনা। বিশ্বকাপ আসলেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়। পাওয়া যাচ্ছে এবারো। ১৪ জুন রাশিয়ার লুঝনিকি স্টেডিয়ামে স্বাগতিক রাশিয়া ও সৌদি আরবের মধ্যকার ম্যাচ দিয়ে মাঠে গড়াবে বিশ্ব ফুটবলের মহাযজ্ঞ ফিফা বিশ্বকাপ ২০১৮। রাশিয়া বাংলাদেশ থেকে বহুদূরের পথ। ৫ হাজার কিলোমিটার দূরের এই দেশ থেকে উত্তেজনার প্রতিটা ফোটাই বাংলাদেশে চলে আসবে। কিন্তু তারপরেও বিশ্বকাপের উত্তাপ বেশ জোরোসোরেই এদেশে এসে লেগেছে। লাল সবুজ প্রতিনিধিদের জন্য এটা নতুন কোন অভিজ্ঞতা নয়। যতবারই বিশ্বকাপের আসর বসেছে ততোবারই অন্য সব ফুটবল পাগল দেশের মতো বিশ্বকাপ জ্বরে কেঁপেছে ছোট এই দেশের কোটি কোটি ভক্ত। যার প্রধান দুই অনুষঙ্গ বা উপকরণ পছন্দের দেশের জার্সি ও পতাকা। খেলা দেখতে বসার আগে হৃদয়ে প্রিয় দেশ, হাতে পতাকা, গায়ে জার্সি থাকাটা যেন অনেকটাই নিয়মে পরিণত হয়েছে।
বিশ্বকাপ উন্মাদনার ষোলকলা পূর্ণ হতে এই দুই উপকরণ থাকা চাই ই চাই। ভক্তদের বিশ্বকাপ উন্মদনার পরিপূর্ণতা অঅনতে পতাকা, জার্সি বিক্রেতা ও দর্জিরা ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের রাস্তায় বের হলেই এর প্রমাণ মেলে। বাশে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া দলের পতাকার পাশাপাশি ছোট পতাকা ও মাথার ব্যান্ড। যদিও হেঁটে হেঁটে বিক্রি করা পতাকার সাথে মেলেনা জার্সি। সেটা পেতে হলে আপনাকে ছুটতে হবে স্পোর্টসের দোকানে। সারাদেশেই দেখা মেলে মৌসুমী কিছু বিক্রেতার। বিশ্বকাপ শুরুর কয়েখমাস আগে থেকেই দর্জির দোকানীদের ব্যস্ততা বেড়ে যায় কয়েকগুন।
এছাড়া সামনেই পবিত্র ঈদ উল ফিতর হওয়ায় যেন দম ফেলার ফুসরত নেই। দর্জির বানানো ছোট-বড় পতাকা কাঁধে নিয়ে বয়ে বেড়াচ্ছেন ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি ও ফ্র্যান্সসহ অন্যান্য দেশের। রাজধানী ছাড়া দেশের একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও জার্সি পৌঁছে দিতে দিন রাত কাজ করে যাচ্ছেন। কারণ আরেকটি বিশ্বকাপ আসতে আসতে আরো চার বছরের অপেক্ষা। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে ঈদের পোশাকের চেয়ে বেশি বিশ্বকাপ নিয়ে উন্মাদনা চোঁখে পড়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এ অথ্চলে রাস্তার দুপাশের ফুটপাতে দোকানিরা পতাকার পসরা সাজিয়ে বসেছেন। যেখানে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও জার্মানির পতাকার আধিক্যই চোঁেখ পড়েছে। তিন দেশের ছোট-বড় জার্সিও অনেকটা জায়গা জুড়ে ছিল। আর অ্যাভিনিউর সমবায় টুইন টাওয়ারের পতাকা তৈরির কারখানায় গিয়ে দেখা গেল পতাকা সেলাই, প্রিন্ট, কাটা ও জার্সি তৈরির ধুম লেগে গেছে। সেখানে দেশের বানানো জার্সির চেয়ে বিদেশী জার্সির কদর বেশি বলে জানা গেছে। সেখানে নিপুণ হাতে দর্জি জার্সিতে রং ও নম্বর বসাচ্ছেন দর্জি। বেলাল হোসেন নামক এক দর্জি নিজের ব্যভস্ততার কথা বলতে গিয়ে বলেন, ’আমি এবার নিয়ে চতুর্থবার বিশ্বকাপের পতাকা বানাচ্ছি।
বছরে অন্যান্য সময়ে যেখানে রাত আটটার বেশি কাজ করতে হয়না, সেখানে এখন বলতে পারেন সারারাতই কাজ করতে হচ্ছে। নাওয়া খাওয়া সব এক হয়ে গেছে আমার। পাশে থাকা অন্যদের ঠিক একই অবস্থা। এই ব্যস্ততা বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার মাঝামাঝি সময়ে কিছুটা কমে আসবে’। রাজধানীর খেলাধুলার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র গুলিস্তানে যারা পতাকা আর জার্সি বানাচ্ছেন তাদের কাছে আর্জেন্টিনার নামটা একটু বেশি শোনা গেছে। বিশেষ করে দলের সুপারষ্টার ফুটবলার লিওনেল মেসির নাম ও জার্সি নম্বর বসাতে বসাতে তাদের ক্লান্ত অবস্থা। তাদের কথা ভেবেই দর্জি ও বিক্রেতাদের এমন নিরলস পরিশ্রম। সেটা নিছক এমনি এমনি নয়। বিশ্বকাপ সামনে রেখে আয়ের দারুণ একটা সুযোগও তারা পাচ্ছেন। কারণ বাংলাদেশ বিশ্বসেরার এই আসরে অংশ না নিলেও উত্তাপটা নিতে এতটুকু ভুল করেনি। গত দুই দশক আগেও বাংলাদেশের প্রধান কেলা ছিল ফুটবল। দেশের মাঠেও খেলোয়াড়রদের নৈপুণ্য দেখার জন্য গালারীতে হাজার হাজার সমর্থক উপস্থিত থাকত। তারকায় ভরপুর দেশের ফুটবলের সেই অবস্থা এখন সূদুর অতীতে স্থান করে নিয়েছে। তরুন প্রজন্মের কাছে ক্রিকেট সেই জায়গাটি নেওয়ায় ফুটবল এখন কিছুটা বেকায়দা অবস্থায় রয়েছে। তবে দেশের ফুটবলের স্থলে এখন জায়গা করে নিয়েছে বিদেশের ফুটবল। রাত জেগে ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবের খেলা দেখাটা অনেকটাই অভ্যাসে পরিণত করে ফেলেছেন তারা। বিশ্বকাপ আসলে সেই উল্লাস আর উল্লাস পায় নতুন মাত্রা। সেই তাপটা দেশের যে কোন অঞ্চল থেকেই টের পাওয়া যায়। মাঠের খেলায় সাফল্যেল কারণে এখন ক্রিকেটের অবস্থা বেশ ভাল। আর জাতীয় দল খেললেও ফুটবলে দর্শক আসেনা, গ্যালারী থাকে ফাঁকা। এক সাকিব আল হাসানকে নিয়ে দর্শকদের যে উন্মাদনা সেটা এখন ফুটবলের জন্য হাহাকারের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। চার বছর পর পর দুয়ারে হাজির হওয়া ওই সময়টুকু শুধুই বিশ্বকাপের।
ক্রিকেট বা অন্য কোনো খেলা এই সময়টাও যেন পাত্তা পাওয়ার অবস্থায়ও থাকেনা। হাজার হাজার মাইল দুরে থেকেও আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল বাংলাদেশের মানুষের কাছে আপনের আপন হয়ে যায়। বাড়ি ছাদে কে কত বড় পতাকা টানাতে পারে সেই প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে এবারো। ফুটবলের হাত ধরে সেই আর্জেন্টিনা, ব্রাজিলই হয়ে গেছে বাংলাদেশের অতি আপন দুটি দল। আর্জেন্টিনা যেখানে ১৯৮৬ সালে সর্বশেষ কাপ জিতেছিল সেখানে ব্রাজিল ২০০২ সালে। তবুও এই দু’দলের ভক্ত আর সমর্থখদের উন্মাদনার যেন কোন শেষ নেই। নীল-আকাশি আর হলদে রঙের জার্সি দুটোতে যেন প্রাণ খুঁজে পান লাল-সবুজের দেশের মানুষরা। আর সে কারণেই উন্মাদনাটা শুরু হয়ে গেছে বিশ্বকাপ শুরুর প্রায় এক মাস আগ থেকেই। বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশের শহরগুলো যেন সেজে ওঠে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকা দিয়ে। গ্রামগুলোতেও লাগে সবুজ আর আসমানি পতাকার ধুম। আর দুদলের সমর্থকদের মধ্যকার ‘কে সেরা’ নিয়ে বাকবিতন্ডা ছাড়া যেন পূর্ণতা পায়না বিশ্বকাপ।
গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই দু’দেশের পাশাপাশি আরো কিছু ভক্ত তৈরি হয়েছে। জার্মানী, স্পেন, ফ্রান্সও এখন বিশ্বকাপে সময় বাংলাদেশী সমার্থক হয়ে যায়। এছাড়া সময়ের বিবর্তনে এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো ঘিরে রেখেছে আমাদের সবাইকে। বিশ্বকাপ নিয়ে উত্তেজনা এখন বরং ওই ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম আর টুইটারেই দেখা যায় বেশি।
প্রায় প্রতিটি দলেরই রয়েছে বাংলাদেশি ফেসবুক ফ্যান গ্রুপ। লিওনেল মেসির ভক্তরা তাঁর গুণগান গেয়ে যদি করে পোস্ট, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো কিংবা নেইমার সমর্থকরাও বিলম্ব না করে পাল্টা জবাব দেয়। বিশ্বকাপ নিয়ে এই উন্মাদনাটা যে চলতেই থাকবে সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। বিশ্বকাপ নিয়ে আমাদের এই উন্মাদনায় নতুন প্রাণ পেত যদি বাংলাদেশ খেলতে পারত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ