ঢাকা, বৃহস্পতিবার 7 June 2018, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২১ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

টুটুলের ‘ব্রাজিল বাড়ি’ এখন বিদেশেও আলোচনায়

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : জয়নাল আবেদীন টুটুল। বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরীর পাশাপাশি তিনি একজন ক্রীড়ামোদীও। বিভিন্ন খেলার সাথে জড়িত থাকলেও তার ধ্যানে জ্ঞানে শুধুই ফুটবল। দেশের হারানো ফুটবল ঐতিহ্যকে আবারো ফিরিয়ে আনতে তিনি তৃণমূল থেকে কাজ শুরু করেছেন। তবে এই মূহুত্বে টুটুলের একটিই চিন্তা। আগামী বিশ্বকাপ ফুটবল। ব্রাজিলের একজন অন্ধ সমর্থক তিনি। তবে তাকে শুধু সমর্থক বললেই হবেনা। ব্রাজিলের সাথে নিজেকেও যেন হারিয়ে দিয়েছেন এই ব্রাজিলের ভক্ত। তার এই পাগলামি আজকালের নয়। গত একযুগেরও বেশী সময় ধরে ব্রাজিলের পক্ষে প্রচার প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। নিজের বাড়ির রং ফুটবলের ইতিহাসের সবচেয়ে সফলতম দল ব্রাজিলের পতাকার মতো সাজিয়ে শিরোনামে এসেছিলেন জয়নাল আবেদিন টুটুল। বিশ্বকাপ ফুটবল আসলেই তার বাড়িটি চলে আসে আলোচনায়। ‘ব্রাজিল বাড়ি’র আলোচনা এখন শুধু বাংলাদেশেই নয় সারাবিশ্বে পরিচিতি পেয়েছে। প্রতিদিনই দেশী-বিদেশী ব্রাজিল সমর্থকরা তার বাড়ি দেখতে সমাগত হচ্ছেন। সাম্বা ফুটবলের এই ভক্তের পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের প্রতি ভালোবাসা দেখে ঢাকায় নিযুক্ত ব্রাজিল দূতাবাস থেকে যোগাযোগ করা হয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এই কর্মকর্তার সঙ্গে। সেই সুবাদে ব্রাজিলের উপ-রাষ্ট্রদূত জুলিও সিজারের সঙ্গে দেখা করলেন সেলেকাওদের এই সমর্থক। দেশটির একটি প্রতিনিধি দলও ব্রাজিল বাড়ি সমর্থনের ঘোষণা দিয়েছেন। সেই সাথে তাকে ব্রাজিলে যাবার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। টুটুল জানান, আমার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। আমি শুধু ব্রাজিল যেতে চাইনা। আমার স্বপ্নের খেলোয়াড়দের সাথে দেখা করতে চাই। তাদের সাথে আমার অনুভূতিগুলো শেযার করতে চাই।
ফতুল্লা লঞ্চঘাট থেকে পূর্ব দিকে তাকাতেই চোখে পড়বে চাঁদের উপর উড়ছে ব্রাজিলের পতাকা। তবে এটি বিশ্বকাপ ফুটবলকে সামনে রেখেই এই আয়োজন। শুধু পতাকাই নয়, বাড়িটিও ব্রাজিলের পতাকায় সাজানো। যারাই সেখানে যাচ্ছেন কেউই ভবনের সামনে থেকে চোখ সরাতে পারছেনা। অনেকের মতো আমিও ভাবছিলাম, বাংলাদেশেই তো ছিলাম-এখন কি ব্রাজিলে! কিছুক্ষণ পর দৃষ্টি সরিয়ে দেখি, না দেশেই আছি। এটি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা লঞ্চঘাট। বহুতল ভবনের পুরোটাই ব্রাজিলের জাতীয় পতাকায় রাঙ্গানো হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার লালপুরে অবস্থিত বাড়িটির ছাদে উঠছে ব্রাজিলের ছোট-বড় বেশ কয়েকটি পতাকা। যে কারোরই দু’চোখ সেদিকে গেলেই মনে হবে এটি কোনো ‘ব্রাজিলীয় এলাকা’। তবে এলাকাবাসী এই ভবনটিকে ‘ব্রাজিলের বাড়ি’ বলেই জানেন। ফতুল্লার লালপুরে অবস্থিত এই বাড়িটি যেন ‘এক খন্ড ব্রাজিল’!
শীতলক্ষ্যা বিধৌত জেলা নারায়ণগঞ্জ স্বরণাতীত কাল থেকে প্রসিদ্ধ এক জনপদ। আলোচনার পাশাপাশি সমালোচনাও কম হয় না এ জেলাকে ঘিরে। চাঞ্চল্যকর সাত খুনের ঘটনায় দেশে-বিদেশে ব্যাপক আলোচিত-সমালোচিত এই জেলাটি। ঘটনার প্রায় চার বছর সময় অতিবাহিত হলেও এখনো প্রতিদিন মিডিয়ার শিরোনাম হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের নানা খবর। হত্যা, গুম, অপহরণের জন্য আতংকের শহর নারায়ণগঞ্জ। তবে বিশ্বকাপকে সামনে রেখে এখানে ফুটবল প্রেমিদের মাঝে চলছে উৎসবের আমেজ। আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল সমর্থকরা আয়োজন করছে মিছিল- র‌্যালীর। প্রতিটা বাসার ছাদে শোভা পাচ্ছে নিজ পছন্দের দেশের পতাকা। তবে ব্যতিক্রম কেবল মো: জয়নাল আবেদীন টুটুলের ক্ষেত্রে। যিনি শুধু পতাকাতেই ক্ষান্ত হননি, ভক্ত তালিকায় সবার উপরে থাকতে নিজের বাড়িটাকেই ব্রাজিলের রঙ্গে রাঙ্গিয়ে ফেলেছেন তিনি। ফলে নারায়ণগঞ্জ নিয়ে যাদের নীতিবাচক মনোভাব ছিল তাদের অবস্থান পরিবর্তন হয়েছে। ব্রাজিল বাড়ি এখন শুধু নারায়ণগঞ্জ নয়, পুরো বিশ্বেই আলোচনার কেন্দ্র ভূমিতে। দেশী বিদেশী মিডিয়াতে ‘ব্রাজিল বাড়ি’ নিয়ে প্রতিবেদন প্রচার করছে।
জন্ম নোয়াখালীতে হলেও পিতার চাকরীর সুবাদে এখানেই বড় হয়েছেন ফুটবল দুনিয়ায় নেতৃত্ব দেয়া দেশ ব্রাজিলের অন্ধ ভক্ত টুটুল। ছোটকাল থেকেই স্বাম্বার দেশ ব্রাজিলের একনিষ্ঠ ভক্ত। ব্রাজিলের খেলায় এতটাই মুগ্ধ থাকেন যে, ব্রাজিলের খেলা মানেই তার কাছে উৎসব। খেলায় জিতলে তো কথাই নেই। এবার যেহেতু ব্রাজিলেই বিশ্বকাপের আয়োজন, তাই তার উৎসবটাও যেন বেশী। ফুটবল বিশ্বকাপ উপলক্ষে ব্রাজিলের সব ক’টি খেলা তার বাসায় ছাদে প্রজেক্টরের মাধ্যমে দেখানো হবে। খেলা চলাকালীন সমর্থকদের উৎসাহ দিতে থাকবে চা-বিস্কুকের আয়োজন।
দুয়ারে কড়া নাড়ছে ফুটবলের মহাযজ্ঞ রাশিয়া বিশ্বকাপ। ২০১৪ বিশ্বকাপের চরম দুঃস্বপ্ন ভুলে গিয়ে শিরোপা জয়ের স্বপ্ন দেখছে ব্রাজিল। সেই স্বপ্নের মাঝে নতুন করে হেক্সা মিশনের স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশের ব্রাজিল ফুটবল প্রেমী মোহম্মদ জয়নাল আবেদিন টুটুল। স্থাপনার ঘিঞ্জিতে স্পষ্ট ঘনবসতিপূর্ণ নগরীর চিত্র। তবে বিবর্ণ ইমারতের ভিড়েও সহজেই যে কারোরই নজর কাড়বে সবুজ-হলুদের ভালোবাসা মোড়ানো ব্রাজিল বাড়ি নামক এই সুউচ্চ দালানটি। যার ছাদজুড়ে উড়ছে সেলেসাওদের নিশান। আর উপরে সগর্বে উড়ছে বাংলাদেশের লাল-সুবজের পতাকা। আর বাড়ির ভেতরে প্রবেশ মাত্র চোখে পড়বে একই ফ্রেমে ক্যানারিদের পাঁচ বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ককে। বাড়ির সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে উঠতে মনে হবে আপনি সত্যিই ব্রাজিলের কোন জাদুঘরে আছেন। দেয়ালের রং, ফ্রেমবন্দী ছবি, এমনকি রুম নাম্বারসহ সব কিছুতেই ব্রাজিল প্রেম।
সম্প্রতি তার ফতুল্লার বাসায় আলাপ হয় ‘ব্রাজিল প্রেমিক’ টুটুলের সাথে। জানতে চাই, তার ব্যতিক্রমধর্মী আয়োজনের বিষয়ে। জবাবে টুটুল বলেন, আমি খুব ছোট কাল থেকেই ব্রাজিলের সমর্থক। শুধু সমর্থক বললে ভুল হবে, আমি তাদের খেলার অন্ধ ভক্ত। তাদের খেলায় আমি মুগ্ধ। ব্রাজিলের খেলা মানেই বাড়তি উন্মাদনা-টেনশন। তিনি জানান, বিশ্বকাপ উপলক্ষে তিনি এক সময় বড় পতাকা উড়াতেন। বাসায় ছাদেও সেটি উড়ানোর ব্যবস্থা করতেন। তার দেখাদেখি অন্যরাও পতাকা উড়াতে থাকে। পরে নিজেকে সবার থেকে আলাদা করতে ব্যতিক্রম কিছু করার চিন্তা করেন। সেই চিন্তা থেকেই বিশ্বকাপ উপলক্ষে বাড়িটা ব্রাজিলের পতাকার রঙ্গে রাঙ্গানোর সিদ্ধান্ত। তিনি জানান, ভক্ত তালিকায় সবার শীর্ষে থাকতেই তার এই ব্যতিক্রমী আয়োজন।
টুটুল জানান, বাড়িটা নির্মাণ করার সময়েই তিনি এটিকে ব্রাজিলের পতাকার ডিজাইনে তৈরী করতে একটি আবহ সৃষ্টি করেন। বাড়িটির আর্কিটেক্ট ছিলেন প্রকৌশলী আরমান। টুটুলের পছন্দ মতই তিনি বাড়িটির ডিজাইন করেন।
জয়নাল আবেদিন টুটুল জানালেন বাড়ির নামকরণের ঘটনা। আমার বাবাও ব্রাজিলের ভক্ত ছিলেন। ১৯৯৮ সালে আমি আমাদের এলাকায় ব্রাজিলের অনেক পতাকা উড়াই। এরপর ২০০২ সালে যখন বিশ্বকাপ আসল অনেকেই অনেক পতাকা উড়াতো। কিন্তু তখন আমি চাইলাম আমি এমন পতাকা উরাবো যাতে আমারটাই সবচাইতে বড় হবে, কারণ আমি আমার দলকে অনেক ভালোবাসি তাই আমার পতাকাটিই বড় হবে। এরপর পরবর্তী বিশ্বকাপ ২০০৬ যখন আসল তখন দেখি আমার এলাকায় অন্য বাড়িতে আমার মত বড় পতাকা লাগিয়েছে আর্জেন্টিনার সর্মথকরা। তখন থেকে চিন্তা করলাম ২০১০ সালে আমাকে এমন কিছু করতে হবে যেটা এখন পর্যন্ত কেউ করেনি। সেই চিন্তা থেকে আমি আমার বাড়িটিকে ব্রাজিলের রঙ্গে সাজাই। পরর্বতীতে মানুষ এই বাড়িটিকে ব্রাজিল বাড়ি নামেই ঢাকা শুরু করে তখন আর কি এই বাড়ির নামকরণ করি ‘ব্রাজিল বাড়ি’। তখন আমাদের বাড়ি ছিল দুই তলা পরবর্তীতে আমরা বাড়িটি বেঙে ছয়তালা করে রঙ করলাম ব্রাজিলের পতাকার রঙে এরপর নাম দেই ‘ব্রাজিল বাড়ি’। এখন সবাই কিন্তু আমাকে চিনে না আমার ব্রাজিল বাড়িকে চিনে।
পরিবার থেকে উৎসাহ পান কি-না এমন প্রশ্নে টুটুল জানান, তার স্ত্রী মাহিনুর আক্তার সব সময় তাকে উৎসাহ দিয়ে থাকেন। সে নিজেও ব্রাজিলের সমর্থক। এখন সাথে যোগ হয়েছে একমাত্র সন্তান আবদুল কাদের শান্ত। টুটুল জানান, তার মত সন্তান শান্তও ব্রাজিলের দারুণ ভক্ত। তিনি জানান, বাসার ভাড়াটিয়ারাও ব্রাজিলের সমর্থক। তার বাসায় অন্য কোনো দলের পতাকা উড়েনা। দেশের পতাকার পাশাপাশি শুধু ব্রাজিলের পতাকাই শোভা পায়। বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে নিয়ে তার উচ্ছ্বাসটা অনেক বেশী। তিনি মনে করেন, এবার নেইমারদের হাতেই বিশ্বকাপের ট্রপি উঠবে। আবেগতাড়িত কন্ঠে বলেন, এবার ব্রাজিলই চ্যাম্পিয়ন হবে। তিনি নিজেই মাঠে উপস্থিত থেকে নিজ দলকে উৎসাহ দিতে চান। সেজন্য রাশিয়া বিশ্বকাপে খেলা দেখতে চান তিনি।
আলাপকালে এলাকাবাসী জানান, প্রতিবারই বিশ্বকাপকে সামনে রেখে টুটুল ব্যতিক্রমী কিছু করে থাকে। এলাকায় ক্রীড়ামোদী হিসেবে তার পরিচিতি রয়েছে। এছাড়াও এলাকার মানুষের সুখে-দুখে সবসময় তাকে পাশে পাওয়া যায়। ব্রাজিলের পাগল এই ফুটবল প্রেমীর ঘরে প্রবেশের পর বিস্ময় আরো বেড়েছে। চাবির রিং, টিস্যু বক্স, মোবাইল কাভার, শো-পিছ সবকিছুতেই ব্রাজিল প্রেম। সাথে আছে বিশ্বকাপ রেপলিকা ট্রফি, আর পেপারকাটিংও। ঘরের আসবাবে প্রতীয়মান ব্রাজিল অনুরাগ। কাপ-সসার মগ, ঘড়ি, ব্রেসলেট এমন কি জুতাও স্থান পেয়েছে তার সংগ্রহে। সযতেœ সংরক্ষিত, হলুদ-সবুজে রাঙানো পুরনো আর নতুন বাড়ির মডেল দুটিও দৃষ্টি এড়ায় না। জয়নাল আবেদিন টুটুলের গোটা বাড়ি ঘুরে এটুকু নিশ্চিত- সত্যিই মানুষটা মনে প্রাণে ভালোবাসে লাতিন আমেরিকার এই দেশটিকে। আর তাদের অনন্য ফুটবল শৈল্পিকে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ