ঢাকা, বৃহস্পতিবার 7 June 2018, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২১ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বিশ্বকাপের অঘটনে সেরা পাঁচ ম্যাচ

মাহাথির মোহাম্মদ কৌশিক : খেলাধুলার কোন বৈশ্বিক আসরের অপেক্ষাটা একটু বেশিই করতে হয় ক্রীড়াপ্রেমী দর্শকদের। নানা কারণেই বিশ্বের সেরা দেশগুলোর মধ্যকার এই আসরকে আলাদা চোখে দেখা হয়। আর সেটা যদি হয় বিশ্বকাপ ফুটবল তাহলে তো কথাই নেই। ’গ্রেটেষ্ট শো অন আর্থ হিসেবে পরিচিত রয়েছে এটি। বিশ্বকাপের সাথে সাথে অনেকটা আষ্টেপৃষ্ঠে লেগে আছে অঘটনের বিষয়টি। এছাড়া আগের আসরের চ্যাম্পিয়ন দলের পরের আসর থেকে বিদায় নিয়েছে প্রথম পর্ব থেকেই। আর এটা হয়েছে অঘটনের মাধ্যমে। সে কারণে একেকটা আসরের অঘটনের জন্য অনেক ফুটবল ভক্তই অপেক্ষায় থাকেন। বিশ্বকাপ ফুটবলকে বলা হয় ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’। ১৪ জুন শুরু হতে যাচ্ছে এবারের আসরের। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানী, স্পেন, ফ্রান্স, ইংল্যান্ডের মতো প্রবল জনপ্রিয় ও নামধারী দলগুলোর সাথে চমকে দেয়া কিছু দল যেমন আছে তেমনি বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়েছে ৪বারের শিরোপা জয়ী ইতালিকেও। টোটাল ফুটবলের জনক বলা হয় যে দেশকে সেই নেদারল্যান্ডও এবার বাদ পড়েছে বাছাইপর্ব থেকে। গত কয়েকটি বিশ্বকাপজুড়ে দেখা গেছে বড় দলগুলোকে জিততেও কতটা কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। পুরো ৯০ মিনিট ভাল খেলেও ছোট দলের কাছে পরাজিত হওয়ার রেকর্ডও রয়েছে। কেমন ছিল বিশ্বকাপের ইতিহাসে পাঁচটি ম্যাচ, যেগুলোকে আলাদা মূল্যায়ন করা হয় অঘটনের ম্যাচ হিসেবে। দেখে নেওয়া যাক কেমন ছিল সেই ম্যাচগুলো। যেখানে অঘটনগুলো এখনো দাগ কেটে আছে।
১৯৫০ বিশ্বকাপ : যুক্তরাষ্ট্র ১-০ ইংল্যান্ড
বিশ্বকাপে খেলাটা অনেক বিরতি দিয়েই হয়ে থাকে বিশ্বে সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশটির। সচরাচর বিশ্বকাপে খেলা হয়ে ওঠেনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। তবে ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বপ্রথম বড় কোন অঘটনের সাথে জড়িয়ে গেছে মোড়ল এই রাষ্ট্রের নামটি। ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে হারানোর ম্যাচটি দেশটির ফুটবল ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠতম জয়। ম্যাচটি যেন তাদের জন্য স্বর্গের দুয়ারেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আমেরিকার ফুটবল দল তখনকার সময়ে আনকোরা দলগুলোর বাইরে আর কিছুই নয়। অন্যদিকে ইংল্যান্ড ফেবারিট হিসেবেই শুরু করেছিল বিশ্বকাপ। ওই আসরের প্রথম ম্যাচে আবার হেরে বসেছিল যুক্তরাষ্ট্র। তারা ৩-১ গোলে স্পেনের কাছে পরাজিত হয়েছিল। পরের ম্যাচে ইংলিশদের বিপক্ষে পরাজয় যে স্বাভাবিক ঘটনা হতে যাচ্ছে এটি আগে থেকেই অনুমিত ছিল। বেলো হরিজেন্তের এস্টাডিও ইন্ডেপেন্ডেনসিয়ায় আরেকটি পরাজয় দেখছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু সেসব ধারনাকে পায়ে মাড়িয়ে ঠিকই অঘটনের জন্ম দিয়ে ফেলে তারা। ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমনে ব্যতিব্যস্ত রেখেছিল যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষনভাগকে। একের পর এক আক্রমণে যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণভাগকে বড় পরীক্ষাই দিতে হয়েছে। কিন্তু বাদ সাধে একজন তিনি হলেন যুক্তরাষ্ট্রের গোলরক্ষক ফ্রাঙ্ক বোরঘি। তার অসাধারন সেভগুলোই যেন আমেরিকার বাকি খেলোয়াড়দের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে এলো। ৩৭ মিনিটের মাথায় জয় গায়েতজেন্সের গোলে ১-০তে এগিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র। এরপর ম্যাচে ফিরতে ইংল্যান্ড প্রানপণ চেষ্টা করেও আর পারেননি ফিরতে। এই ম্যাচটি বিশ্বকাপ ইতিহাসে সেরা অঘটনের ম্যার হিসেবে রেকর্ড হয়ে আছে।
১৯৫০ বিশ্বকাপ : উরুগুয়ে ২-১ ব্রাজিল
প্রথম বিশ্বকাপ জিতলেও উরুগুয়ে তখনো শক্তিশালী দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। ১৯৫০ বিশ্বকাপে ব্রাজিল দুর্দান্ত দল হিসেবে আবির্ভুত হয়েছিল। সাম্বা ফুটবল সৌন্দর্য দিয়ে উরুগুয়ে ম্যাচের আগেই ফুটবলপ্রেমীদের মোহিত করেছিল। ফাইনাল রাউন্ডের আগে প্রতিপক্ষের জালে ১১ গোল দিয়ে নিজেদের অপ্রতিরোধ্য প্রমাণ করেছিল তারা। এই ম্যচের আগে শিরোপা উৎসবও করে ফেলেছিল ব্রাজিল। ফাইনাল রাউন্ডের শেষ ম্যাচে ড্র করলেই শিরোপা নিশ্চিত হয়ে যেত তাদের অন্যদিকে জয় ব্যতীত অন্য কোনো উপায় ছিল না উরুগুয়ের। আক্ষরিক অর্থে ফাইনালে পরিণত হওয়া ওই ম্যাচে আক্রমণাত্মক ব্রাজিলের বিপরীতে উরুগুয়ে কিছুটা ডিফেন্সিভ মুডে খেলা শুরু করে। প্রথমার্ধে কোনো দল গোল না পেলেও দ্বিতীয়ার্ধের প্রথম মিনিটেই স্বাগতিক ব্রাজিল ফ্রিয়াকার গোলে এগিয়ে গেলে মারাকানার ২ লক্ষ দর্শক প্রথম শিরোপা জয়ের উৎসবের আয়োজন প্রায় শুরুই করে দিয়েছিল। কিন্তু নিয়তি যে তখন ভিন্ন কিছুই লিখে রেখেছিল ব্রাজিলিয়ানদের কপালে! ৬৬ মিনিটের মাথায় উরুগুয়েকে সমতায় ফেরান শিয়াফিনো। এরপর দিগুন শক্তিতে বলীয়ান হয়ে উরুগুয়ে ৭৯ মিনিটের মাথায় ঘিগিয়ার গোলে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায়। শেষ সময় পর্যন্ত ব্রাজিল নিজেদের আধিপত্য প্রমানের চেষ্টা করলেও আর গোল করতে পারেনি। ব্রাজিলের ইতিহাসে প্রথমবার শিরোপা জয়ের তুমুল সম্ভাবনা হাত ছাড়া হওয়ার পর অনেকেই বলেন, স্টেডিয়ামেই আত্মহত্যা করেছিল ৫০ জনের বেশি মানুষ। কেউ কেউ বলেন হার্ট অ্যাটাকে শতাধিক সমর্থক মারা গিয়েছিলেন। যেটাকে মারাকানা ট্রাজেডি হিসেবেই চেনে সবাই। তাই এটিকে অঘটন ছাড়া আর কি বলবেন দশকরা।
১৯৫৪ বিশ্বকাপ : পশ্চিম জার্মানি ৩-২ হাঙ্গেরি
বর্তমান সময়ে জার্মানী সুপার পাওয়ার কিংবা পাওয়ার হাউজ হলেও সাত দশক আগের প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। তখনো পশ্চিম জার্মানী এতটা ভাল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। অন্যদিকে ১৯৫৪ বিশ্বকাপে হাঙ্গেরির যে দলটি খেলেছিল, তাদেরকে বলা হয় বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম সেরা দল। ফেরেঙ্ক পুসকাস, স্যান্ডর ককসিস কিংবা হিদেকুটিদের মত সর্বকালের সেরা ফুটবলাররা ছিলেন হাঙ্গেরির তখনকার দলটিতে। গ্রুপ পর্বে পশ্চিম জার্মানিকে ৮-৩ গোলে হারিয়ে নিজেরা কতটা শক্তিশালী সেটা জানান দিয়েছিল। কিন্তু সেই পশ্চিম জার্মানির বিরুদ্ধে ফাইনালে হেরে বসে হাঙ্গেরি। ফুটবল ইতিহাসে অতি আশ্চর্যজনক চমকগুলোর মধ্যে নিশ্চিতভাবেই এটা থাকবে শীর্ষে। হাঙ্গেরির এই পরাজয় দুটি দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। এই একটি ম্যাচ জিতলে পুসকাসের নাম নেয়া হত পেলে-ম্যারাডোনা-ডি স্টেফানোদের সাথে। দ্বিতীয়ত, এই একটি শিরোপা জয় হয়তো হাঙ্গেরির ফুটবল ইতিহাসকেই পাল্টে দিত। হয়তো বা এই সময়ে জার্মানি, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা কিংবা ইতালির সঙ্গে উচ্চারিত হতো তাদের নামও। টপ ফেবারিট হাঙ্গেরি ৪ বছর অপরাজিত থেকে বিশ্বকাপে অংশ নেয়। গ্রুপ পর্বে পশ্চিম জার্মানিকে ৮-৩ গোলে বিধ্বস্ত করার পর ফাইনালেও সবাই ভেবেছিল জার্মানরা উড়ে যাবে হাঙ্গেরির সামনে। কিন্তু হয়েছে ঠিক উল্টোটা।
১৯৬৬ বিশ্বকাপ : উত্তর কোরিয়া ১-০ ইতালি
ক্রিকেটে যেমন তেমন ফুটবল এখনো দুরের বাতিঘর এশিয়ার জন্য। ফুটবলে এশিয়ার কোন দলের বড় সাফল্য নেই। কিন্তু ১৯৬৬ সালে উত্তর কোরিয়া যা করতে পেরেছে পরে কোন দলই এই অর্জনে নিজেকে সামিল করতে পারেনি। এশিয়ান মহাদেশ থেকে প্রথম কোনো দল হিসেবে ১৯৬৬ সালের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে অংশ নেয় উত্তর কোরিয়া। বিশ্বকাপে নাম লেখানোর পরই যেন নিজেদের প্রমাণ করার মিশণে নামে উত্তর কোরিয়ানরা। ওই বিশ্বকাপে টপ ফেবারিট হিসেবে শিরোপা জয়ের লক্ষ্য নিয়ে ইংল্যান্ড এসেছিল ইতালি। চিলিকে প্রথম ম্যাচে ২-০ গোলে হারানোর পর উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি ড্র হলেই পরের রাউন্ডে উত্তীর্ণ হবে আজ্জুরিরা। এমন সমীকরণ সামনে রেখেই উত্তর কোরিয়ার মুখোমুখি হয় ইতালি। ইউরোপ মাতানো ইতালির মহাতারকাদের সামনে উত্তর কোরিয়া শুধু অংশগ্রহণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে বলেই ধারনা করেছিল। অনেকেই মনে করেছিল, উত্তর কোরিয়া হয়তো বড় ব্যবধানে পরাজিত হবে। এমন ম্যাচেই কি না বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম সেরা অঘটনটির জন্ম দেয় কোরিয়ানরা। প্রথমার্ধের ৪২ মিনিটে প্যাক ডু ইকের একমাত্র গোলে ইতালি পিছিয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত এই গোলেই ম্যাচের ফলাফল নির্ধারিত হয়ে যায়।
১৯৮২ বিশ্বকাপ : আলজেরিয়া ২-১ পশ্চিম জার্মানি
নিজেদের শক্তিটাকে জানান দেওয়ার পরই এমন পরাজয় মেনে নিতে হয় তাদের। ১৯৫৪ বিশ্বকাপে হাঙ্গেরীকে হারিয়ে যে অঘটনের জন্ম দিয়েছিল পশ্চিম জার্মানী ঠিক একই রেকর্ড গড়ে আলজেরিয়া। ১৯৮২ বিশ্বকাপে আফ্রিকান দেশটি মাঝারি মানের হলেও ঐতিহাসিকভাবে বিখ্যাত জার্মানির বিরুদ্ধে তেমন কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে বলে ফুটবল বোদ্ধারা ধারনা করতে পারেননি। তবে সবাইকে অবাক করে দিয়ে আলজেরিয়া জার্মানির বিরুদ্ধে ২-১ এর জয় তুলে নেয়। পশ্চিম জার্মানির বিরুদ্ধে এমন ঐতিহাসিক জয়ও দ্বিতীয় পর্বে যেতে আলজেরিয়ার জন্য যথেষ্ট হয়নি। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে অস্ট্রিয়া ও পশ্চিম জার্মানির মধ্যকার ম্যাচের সমীকরণ ছিল, পশ্চিম জার্মানির ১ বা ২ গোল ব্যবধানের জয় আলজেরিয়াকে সরিয়ে তাদের দুই দলকেই পরের পর্বে নিয়ে যাবে। আলজেরিয়াকে দ্বিতীয় পর্বে না তুলতে জার্মানি এবং অস্ট্রিয়া কুট কৌশলের আশ্রয় নেয়। জার্মানরা প্রথম ১০ মিনিটেই ১-০ গোলে এগিয়ে থাকার পর বাকি ৮০ মিনিটে কোনো দলই কাউকে আক্রমণ না করে ম্যাড়ম্যাড়ে একটি ম্যাচের প্রদর্শনী শুরু করে। দুই দলের এমন কান্ডে ফিফা শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের নিয়ম পরিবর্তন করে ফেলে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ