ঢাকা, শুক্রবার 8 June 2018, ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২২ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আমাদের ঈদ অর্থনীতি

ভারতের বিভিন্নস্থানে, বিশেষ করে বাংলাদেশ সংলগ্ন রাজ্য পশ্চিম বঙ্গের রাজধানী কলকাতায় ঈদের বাজার জমে উঠেছে। প্রচুর বিক্রি হচ্ছে জামা-কাপড়, শাড়ি ও জুতা-স্যান্ডেল। মার্কেট ও শপিং মলগুলোতে ভিড় জমছে হাজার হাজার ক্রেতার। দেশটি হিন্দুপ্রধান হলেও পশ্চিম বঙ্গের জনসংখ্যার  ৩০ শতাংশের বেশি মুসলিম হওয়ায় ঈদের বাজার জমে ওঠার খবরে বিস্ময়ের কোনো কারণ থাকা উচিত নয়। কিন্তু ভারতীয় মুসলিমরা নয়, কলকাতায় বাজার জমিয়ে তুলেছে বাংলাদেশি নারী-পুরুষেরা। 

গতকাল দৈনিক সংগ্রামের এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, হাজার হাজার নয়, লাখেরও বেশি বাংলাদেশি গিয়ে হাজির হয়েছে কলকাতায়। প্রতিদিনই আরো অসংখ্য বাংলাদেশি যাচ্ছে ঈদের কেনাকাটা করতে। এরকম অনেকের বক্তব্য উদ্ধৃত করে কারণ জানাতে গিয়ে রিপোর্টে বলা হয়েছে, ঢাকাসহ বাংলাদেশের সকল মার্কেটও ভারতের পণ্যসামগ্রীতেই ছেয়ে গেছে। শাড়ি ধরনের দু’-চারটি মাত্র পণ্য ছাড়া কোনো মার্কেটে বাংলাদেশি কোনো পণ্য পাওয়া যায় না বললেই চলে। শুধু তা-ই নয়, কলকাতায় ঢাকা ও বাংলাদেশের যে কোনো মার্কেটের তুলনায় দামও অনেক কম। অর্থাৎ একই ভারতীয় পণ্য বাংলাদেশে অনেক বেশি দামে কিনতে হয়। পাশাপাশি রয়েছে বৈচিত্র্য ও তুলনামূলক মান যাচাই করতে পারার মতো বিষয়গুলো। 

অন্য একটি বিশেষ কারণের কথাও জানা গেছে। বর্তমান সরকারের কথিত উন্নয়ন কর্মকান্ডের কারণে বহুদিন ধরেই রাজধানী ঢাকা বাস্তবে অচল ও স্থবির এক নগরীতে পরিণত হয়েছে। ঢাকার যে কোনো এলাকায় যাতায়াত করার অর্থই হলো কয়েকটি ঘণ্টার এবং বিপুল পরিমাণ টাকার অপচয় করা। এজন্যই অনেকে বলেছেন, ঢাকায় সময় ও অর্থের অপচয় করার চাইতে কলকাতায় যাওয়াটাকেই তারা অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কারণ, কোনোভাবে বিমান বন্দরে পৌঁছানো গেলেই এক ঘণ্টারও কম সময়ে কলকাতায় যাওয়া যায়। বাড়তি ব্যয় শুধু বিমান ভাড়া এবং কলকাতায় থাকা ও খাওয়ার খরচ। কিন্তু ঢাকার দামের সঙ্গে কলকাতার দামের বিরাট পার্থক্য যোগ-বিয়োগ করলে দেখা যায়, কলকাতায় গিয়ে আসলে ক্ষতির চাইতে লাভই বেশি হচ্ছে। ভারতীয় ব্র্যান্ডের পণ্যই যদি কিনতে হয় তাহলে আর অনেক বেশি দাম দিয়ে ঢাকায় বা দেশের অন্য কোনো স্থানের মার্কেটে গিয়ে কেনা কেন, ভারতে গিয়ে কেনাটাই ভালো ও লাভজনক বলে মনে করেন অনেকে। মাঝখান দিয়ে বিদেশ সফরের বাড়তি আনন্দটুকুও পাওয়া যায়। হোক না সেটা কলকাতা, অন্য দেশ ভারতেরই বড় একটা নগরী তো সেটা!

দৈনিক সংগ্রামের রিপোর্টে আরো জানানো হয়েছে, বাংলাদেশিদের কলকাতা তথা ভারতে যাতায়াতের বিষয়টিকে সহজ ও আকর্ষণীয় করে তোলার দূরপ্রসারী উদ্দেশ্য নিয়ে ভারতের পক্ষ থেকেও নানামুখী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ঢাকায় অবস্থিত ভারতীয় হাই কমিশন জানিয়েছে, ২৪টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও চেকপোস্ট দিয়ে যাতায়াতকারী বাংলাদেশি নাগরিকদের ভিসায় প্রবেশ ও প্রস্থানে নিষেধাজ্ঞা অপসারণ করেছে ভারত। দেশটির ভিসাপ্রাপ্তি সহজতর করার লক্ষ্যে ঢাকার বাইরে বেশ কয়েকটি বড় শহরে ভিসা সেন্টার খোলা হয়েছে। রাজধানীতেও কয়েকটি ভিসা সেন্টার খুলেছে ভারত। এর ফলে ভারতের ভিসা পাওয়া আজকাল সময়ের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এমন অবস্থার সুযোগও নিচ্ছে লাখ লাখ মানুষ। জানা গেছে, এবারের রমযান মাসের শুরুতেই দেড় লাখের বেশি বাংলাদেশি ভারতের ভিসা নিয়েছে। এর বাইরে মে পর্যন্ত চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ভিসা গ্রহণকারীদের সংখ্যা পাঁচ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ ঈদের কেনাকাটার জন্য তো বটেই, এমনিতেও বিশেষ করে চিকিৎসার জন্য ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ও শহরে যাচ্ছে বাংলাদেশিরা।

এরই ধারাবাহিকতায় ঈদ এই সময়ের একটি উপলক্ষে পরিণত হয়েছে। আমরা কিন্তু ঈদের কেনাকাটা করতে যাওয়ার বিষয়টিকে অত্যন্ত আশংকাজনক মনে করি। কারণ, এর সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতি জড়িত রয়েছে প্রত্যক্ষভাবে। ঈদের কেনাকাটার জন্য লাখ লাখ বাংলাদেশির কলকাতাসহ ভারতের অন্যান্য স্থানে যাওয়ার অর্থই হলো, এই বিরাট সংখ্যক বাংলাদেশি বাংলাদেশের পণ্য কিনবে না। তারা কিনবে, বাস্তবে এরই মধ্যে কিনেছেও, ভারতীয় পণ্য। টাকার পরিমাণও চমকে ওঠার মতো। হাজার হাজার কোটি টাকার পণ্য কিনছে বাংলাদেশিরা। সে কারণে একদিকে বাংলাদেশি পণ্যের বিক্রি হাজার হাজার কোটি টাকা কমে গেছে ও যেতে থাকবে, অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে বৈধ ও অবৈধ উভয় পথেই ভারতে চলে যাবে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা।

আমাদের আপত্তি ও প্রতিবাদের কারণ হলো, এমন অবস্থা চলছে বহু বছর ধরেÑ প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতার পর থেকেই। ভারতীয় পণ্যে ছেয়ে গেছে বাংলাদেশের সমগ্র পণ্যের বাজার। কিন্তু কোনো সরকারের আমলেই ভারতীয় পণ্যের এই আগ্রাসন ও একচেটিয়া রাজত্বের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বর্তমান সরকার তো সম্পূর্ণ বাংলাদেশকেই ভারতীয় পণ্যের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে। অথচ বিশ্বব্যাপি অর্থনীতির স্বীকৃত সাধারণ নিয়ম হলো, জাতীয় পুঁজির বিকাশকে বাধামুক্ত করার জন্য সব দেশকেই নিরাপত্তা তথা প্রটেকশনের ব্যবস্থা নিতে হয়। বাস্তবে ভারতসহ সব দেশ অমন ব্যবস্থা নিয়েও থাকে, যাতে ওই দেশের পণ্য অন্য কোনো দেশের পণ্যের কারণে বিক্রি কম না হয়। সেদেশের পণ্য যাতে মার না খায়। 

এক্ষেত্রেই বাংলাদেশে চলছে সম্পূর্ণ বিপরীত এক ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ড। ভারতীয় পণ্যের একচেটিয়া দখলের কারণে দেশি পণ্যের বিক্রি তো প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছেই, উৎপাদনের কারখানাগুলোও একের পর এক বন্ধ ও ধ্বংস হয়ে গেছে। একই কারণে অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যখন লাখ লাখ বাংলাদেশি এমনকি ঈদের কেনাকাটা করতেও ভারতে ছুটে যাচ্ছে। 

আমরা মনে করি, জাতীয় পুঁজিসহ জাতীয় অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর এমন অবস্থার অবসান ঘটানো দরকার। এজন্য জাতীয় পুঁজির বিকাশকে বাধামুক্ত করার এবং দেশীয় পণ্যের উৎপাদন ও বিক্রি বাড়ানোর জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে। জাতীয় পুঁজি ও শিল্পকে সর্বাত্মকভাবে নিরাপত্তা বা প্রটেকশন দিতে হবে। তেমন দেশপ্রেমিক ব্যবস্থা নেয়া গেলেই ঈদের কেনাকাটার জন্য বাংলাদেশিদের কলকাতায় তথা ভারতে যাওয়া কমানো এবং পর্যায়ক্রমে একেবারে বন্ধ করা সম্ভব। বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে সে লক্ষ্যেই পদক্ষেপ নিতে হবে অনতিবিলম্বে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ