ঢাকা, শুক্রবার 8 June 2018, ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২২ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ফররুখ আহমদের হাতেমতাই : সৃজনের পূর্ব প্রেক্ষাপট

খুরশীদ আলম বাবু : চল্লিশের দশকের পর বাংলা কবিতাঙ্গনে একধরণের বাজে প্রচারনা শুরু হয়েছিল এই বলে যে, এ যুগে মহাকাব্য সৃজনের ধারা সমাপ্তির পথে। যদিও এই দশকের কিছুকাল আগে আমাদের সাহিত্যে বিশিষ্ট কবি কায়কোবাদ মহাশ্বশান নামে একটি মহাকাব্য লিখে ফেলেছিলেন। বলা বাহুল্যঃ সেটাই ছিলো বাঙালি মুসলমানের শেষ লেখা মহাকাব্য। তবুও ফররুখ আহমদ একজন আধুনিক কবি হয়ে হাতেমতায়ীকে নতুন করে যথাক্রমে কাব্যনাট্য ‘নৌফেল ও হাতেম’ ও পরবর্তিতে হাতেমতায়ী নামে একটি নাতিদীর্ঘ মহাকাব্য সৃজন করলেন কেন? সেটাই আমাদের আজকের প্রবন্ধের জরুরী বিবেচ্য বিষয়। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, ফররুখ আহমদের  প্রাথমিক কবিতাবলিতে হাতমেতায়ীকে কেন্দ্র করে কোন কবিতা নেই, যদিও সিন্দবাদের কথা তার একটি কবিতাতে সামান্য উল্লেখ থাকলেও; সেটা প্রবল হয়ে উঠলো তার বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ সাত সাগরের মাঝি প্রকাশের পর। এর নেপথ্যে কাজ করেছিল তাঁর অগ্রজ কবিদের প্রভাব। ইংরেজি সাহিত্যের মেধাবী ছাত্র হিসেবে পারসি বুশি শেলি ও জন কিটস্ এর রোমান্টিক কবিতা যেমন আপ্লুত করেছিল- পাশাপাশি টি এস এলিয়টের ঐতিহ্য চর্চা তাঁকে একসময় আরো সংহত করে দেয়। তবে আমাদের বিবেচনায় রোমান্টিকতার সাথে ধ্রুপদি চেতনার সংমিশ্রণ আর এই সংহত চেতনার পেছনে কয়েকটা কারণও কাজ করেছিল। সেই কারণগুলি বলছি সূত্রাকারে :-

ক. ফররুখ কখনো একই ধরণের প্রকরণের মধ্যে আবদ্ধ থাকতে সন্তুষ্ট হননি। সেই কারণে দেখা গেছে এক বিষয় থেকে আরেক বিষয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে গেছেন। যেমন উদাহরণ হিসেবে Ñ তাঁর প্রিয় কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের মত প্রহসন নাটক রাজ রাজড়া নামে রচনার পাশাপাশি নৌফেল ও হাতেম নামে কাব্যনাট্য রচনা করে ফেলেন। আবার গীতলতার মাধুর্য দিয়ে লিখেছেন দীর্ঘ কবিতা। সবশেষে এসে থামলেন মহাকাব্যে।

খ. এলিয়ট ভক্ত হিসেবে কাব্যনাট্যে এলিয়টের সাফল্য তাঁর অজানা ছিলো না। এটা ধারণা করা অমূলক হবে না যে, ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র হিসেবে এলিয়টের বিখ্যাত কাব্যনাট্য Murder in cathedral    বা Re-Union বারবার পড়েছিলেন। সেই কারণে প্রয়াত কবি ও সমালোচক আবদুল মান্নান সৈয়দ মনে করতেন, তাঁর কাব্যনাট্য এলিয়টি। তবে আমার ব্যক্তিগত ধারণা সর্বক্ষেত্রে তিনি টি এস এলিয়টকে অনুসরণ করেছেন এমনটা মনে হয় না। একটা উদাহরণ দেয়া যাক; এলিয়ট কাব্যনাট্যের অন্যতম শর্ত হিসেবে  মনে করতেন- 

A mixture of prose and verse in the same play is generally to be avoided. . 

অবশ্য এর পরে আবার আরেকটি উপদেশ দেন এই বলে :Ñ

Each transition the make the editor Author aware a  jolt of the medium .(critic on  assay, Publisher: Faber and Faber, London-1967 )    

কিন্তু ফররুখ আহমদ নৌফেল ও হাতেমতায়ী কাব্যনাট্য ও হাতমেতায়ী শিরোনামে মহাকাব্যে এমন এক ধরণের মুসলমানী ভাবধারার ভাষার আবির্ভাব ঘটালেন যা ছিল অভাবণীয়। যেমন নৌফেল ও হাতেমতায়ী কাব্যনাট্য থেকে তুলে আনা যাক -

 

মুসাফির! খোশ আমদেদ জানাই তোমাকে

একবার কবে যে পুরা সাখাওতি করে যে জাহানে

সঠিক জবান যার, তায়ী পুত্র সে দরাজ দিল

হাতেমের দেশ থেকে এলে যদি দোস্তের ডেরায়

দাওয়াত কবুল করো। 

                         ( নৌফেল ও হাতেম)

যদিও এ ভাষার ব্যবহার নিয়ে ফররুখ আহমদ বরাবরই এক শ্রেণির বামবাদী সমালোচকদের কাছে ঘোরতর সমালোচিত হয়েছেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো  এই, তাঁরা এটা বিবেচনা করেন না যে, এদেশের বাঙালি মুসলমানদের মুখের ভাষা এতকাল যাবৎ অন্য সম্প্রদায়ের কবি সাহিত্যিকদের কাছে কখনোই ব্যবহারের উপযুক্ত মনে হয়নি। তাই গত শতাব্দীর বাঙালি মুসলমান জাগরণের অন্যতম কবি কাজী নজরুল ইসলামের আবির্ভাবের আগে এই ভাষাটা এতটা প্রবল ভাবে সাহিত্যে প্রয়োগ দেখা যায়নি। তিনি বাঙালি  মুসলমানদের ভাষা ব্যবহারের জোর দিয়ে যে কাব্য ভাষা তৈরি করলেন তারই ধারাবাহিকতা ফররুখ আহমদ  অনুসরণ করলেন। হাতেমতায়ী মহাকাব্য সৃজনের মাধ্যমে আমাদের জানান দিলেন যে, কোন রুপদক্ষ কবির সৃজনশীল হাতে এই ভাষার আলাদা মাধুর্য রয়েছে।  এই ভাষা দিয়ে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি ষাট দশকে প্রকাশিত হলো মহাকাব্য হাতেমতায়ী। অবশ্য অনেক সমালোচক এই হাতেমতায়ী কে মহাকাব্য বলে আখ্যায়িত  করতে নারাজ। এর কারণ হিসেবে বলেছেন :-

সাত সাগরের মাঝি কাব্যগ্রন্থে যা ছিলো মধূরতম- পরবর্তীকালে ফররুখ আহমদ তারই বেড়াজালে আবদ্ধ হয়েছেন। যেমন সৈয়দ আলী আহসান মনে করেন : Ñ 

“শব্দের উপর কবি তার অধিকার প্রমাণ করেননিÑ শব্দই কবি উপর আপন অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেছে।” 

এরপর আরো চমকপ্রদ মন্তব্য করেছেন- 

“হাতেমতায়ী কাব্যের বাণীভঙ্গী শব্দের  বন্ধন দশায় কবির আর্তনাদের স্বর। (আধুনিক বাংলা কবিতা, পৃ. ৭৯)

এখন আমাদের খুঁজে বের করা দরকার কি এমন ঘটনা ঘটলো যে ফররুখ আহমদের মত রোমান্টিক কবি হঠাৎ করে কাব্যনাট্য ও মহাকাব্য সৃজনে নিজেকে নিয়োজিত করলেন। আমাদের স্মরণে রাখা প্রয়োজন ফররুখ আহমদ তার যৌবনের শুরুতে বাঙালি মুসলমানদের পৃথক স্বাধীন ভূমি অর্জনের লড়াইয়ে অন্যান্য বাঙালি মুসলমান কবিদের মত নিবিড় ভাবে জড়িয়ে পড়েছিলেন। সেই দিক থেকে নতুন রাষ্ট্র এই প্রতিভাবান কবির হৃদয়ে যে প্রত্যাশার সঞ্চার করেছিলো-মূলতঃ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তা অবলুপ্ত হয়ে যায়। ফলে হৃদয়ের মাঝে যে প্রসন্নতা ছিলো তাও ক্রমান্বয়ে বিলুপ্ত হতে থাকে। তাঁর অনুজ কবি আবু হেনা মোস্তফা কামাল ঠিকই ধরেছিলেন :- 

“এটা লক্ষ্য করেছিলাম চল্লিশের দশকে তার কবিতার যে মাদকতা ছিলো; ছিলো “ডাহুক” সৃষ্টির আশ্চর্য ক্ষমতা তা যেন ক্ষীণ  হয়ে যাচ্ছে অনেক বড় কিন্তু গদ্যময় কাব্য সংগঠনে। আটোসাটো সনেট অথবা দীর্ঘ গীতি কবিতায় কবির আসক্তি তখন নেই বললেই চলে। এলিয়টের  কাব্য নাটকের দিকে সেই সময় গভীর ভাবে ঝুকে পড়েছেন। নৌফেল ও হাতেম তার উজ্জ্বল উদাহরণ। সাহিত্য সম্পর্কে তার ধ্যান ধারণা  সঠিক ছিলো কিনা- তা নিয়ে মুখোমুখি কথা বলার সাহস আমাদের ছিলোনা। 

(মর্যাদা বোধের প্রতীক; ফররুখ আহমদ : ব্যক্তি ও কবি, শাহাবুদ্দিন আহমদ সম্পাদিত)

তবে প্রয়াত আবু হেনা মোস্তফা কামাল একজন আপাদমস্তক সুকবি বলেই তাঁর ধ্যান ধারণা ও বিশ্লেষণ কবিতার পথেই (According to low of poetry)  গেছে। পাশাপাশি এটা বললে ভুল হবে না যে সাত সাগরের মাঝি তে কবি ফররুখ আহমদ যে অপূর্ব সৃজনশীল ক্ষমতা দেখিয়ে ছিলেন তাঁর অন্য কোন কাব্যগ্রন্থে দেখা যায়নি। সেটাই স্বাভাবিক। কারণ, যে উত্তাল সময়ের ভেতর দেশে এই সমস্ত কবিতাবলি সৃজন করেছিলেন; সেই রকম পরিবেশ ফররুখ আহমদ পরবর্তীকালে আর পাননি। আমরা খেয়াল করিনা যে, ফররুখ আহমদ আপাদমস্তক সৃজনশীল কবি বলেই তিনি তার চিন্তা চেতনাকে আলাদা আঙ্গিকে পাঠকদের সামনে তুলে ধরার জানবাজি চেষ্টা করেছিলেন। এই বিষয়ে অগ্রজ সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক আবুল ফজল সংগত মূলক মন্তব্য করেছিলেন। সেটা শোনা যাক :Ñ

কবি ফররুখ আহমদ শুধু যে এক বিশেষ ঐতিহ্যানুসারী ছিলেন তা নয়, সেই সঙ্গে ঐতিহ্যসন্ধানীও ছিলেন। চেয়েছিলেন বাংলা কাব্যে নতুন ঐতিহ্য নির্মাণ করতে। তাই ইসলামের হারানো ইতিহাস আর নানা কাব্য ও কল্পকাহিনীতে তিনি তার ধ্যান আর কবিতার উপজীব্য খুঁজেছেন এবং তার সৃজনশীলতাকে তাতেই রেখেছিলেন অনেকখানি সীমিত। সিন্দাবাদ, হাতেম ও নৌফেল ইত্যাদি নাম-চরিত্র এ কারণে তাঁর কাব্যের অনুষঙ্গ হয়েছে বারবার। (আবুল ফজল, প্রসঙ্গকথা : শ্রেষ্ঠকবিতা, আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত, প্রকাশকাল Ñ জুন ১৯৭৫)

প্রয়াত সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক আবুল ফজলের মন্তব্য থেকে একটা পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাচ্ছে, তিনি ছিলেন বাংলা কবিতার স্বতন্ত্র ধারার নির্জন পথিক। সেই পথের কোন যাত্রা সঙ্গী ছিলো না, এখনো নেই। আর এটা আমরা কখনোই চিন্তা করি না যে মধ্যযুগীয় মুসলমান কবিরা এই  ধারা অব্যাহত রেখে তাদের কাব্য চর্চা চালিয়ে গেছেন। ইসলামী চেতনা তাঁরা ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন আত্মত্যাগী মনোভাব সম্পন্ন ব্যক্তিকে নায়ক করে। তবে এ পথে ফররুখ আহমদকে আসতে বিবর্তন ধারায় অগ্রসর হতে হয়েছে। কারণ ফররুখ নিজেই এ ঐতিহ্য নিয়ে এক সময় ঘোর সংশয়ের মধ্যে ছিলেন। ফররুখ আহমদ যখন বামধারার পন্থার অনুসারী ছিলেন- এই ঐতিহ্য অনুসন্ধানে কোন বালাই তাঁর ছিলোনা। কারণ তাঁকে চাকরী করতে হয়েছে সাধারণ কেরানীর মত। ফাইলের নাড়াচাড়ায় দিনাতিপাত করেছেন। সেই দিক থেকে বিবেচনা করলে ফররুখ আহমদ কোনদিনই সমসাময়িক চল্লিশের বামধারার কবিদের ঝান্ডা তোলার ডাক দেননি। যা বলেছেন প্রতীকের আড়ালে- শোনা যাক কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত নবযুগ পত্রিকায় প্রকাশিত কবি জীবনের প্রথম পর্বের কবিতার কয়েকটি স্মরণীয় পঙ্তিমালাÑ

 

যান্ত্রিক চাপের নীচে সে স্বপ্ন ভাঙিয়া পড়ে জানিনা কখন,

আখরোট বন ছেড়ে দুঃস্বপ্নের মত জেগে ফাইলের বন;

এখানে সমস্ত দিন প্রবল বর্ষায় ভিজে পাহাড়ী কিশোর

শতাব্দীর ব্যর্থতায় রাজপথে ঘুরে ঘুরে ছাতা-সারানোর

  তোলে তিক্ত সুর...

                  পটভূমি, শ্রেষ্ঠ কবিতা, আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত 

 

বলা বাহুল্যঃ এই কবিতায়  রাজ পথে ঘুরে ঘুরে ছাতা সরানোর স্বর-এর ডাক দিয়েছেন   প্রতীকের আড়ালে আবডালে। সমসাময়িক কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় এর মত বলেননি, প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য।

এটা বলতেই হয় যে প্রতীক উপমার পাখায় ভর করে তিনি আজীবন কাব্যচর্চা করে গেলেন। আর যেখানে উপার্জিত হয়েছে কাল সংলগ্ন বাংলা কবিতার ধ্রুপদী ঐতিহ্যের ব্যতিক্রমোজ্জ্বল ‘কবির কারুকৃত’ শিরোপা। বলতে দ্বিধা নেই পঞ্চাশের দশকে জীবনানন্দ দাশের মত বড় কবির পাশাপাশি তিনি ছিলেন অসংখ্য তরুণদের উপর প্রভাব সঞ্চারী কবি। সেই সময়কার পত্রপত্রিকার তরুণ কবিদের কবিতা পড়লে বোঝা যাবে। এই বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা করার সুযোগ এখানে নেই। বিষয়টি নিয়ে ফররুখ অনুরাগী কবি সমালোচকরা ভাবতে পারেন। একজন  কবি তিনি মূলতঃ একক জগতের সষ্ট্রা। তাঁর সৃজিত কবিতার জগতে তিনিই ক্ষমতাধর স¤্রাট। ইকবালের সাথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাজুষ্য খোঁজার কোনই অর্থ হয় না। খোঁজাও ঠিক নয়। তাই ফররুখ আহমদকে বেছে নিতে হয়েছে এমন একটি  পথ, যা আমাদের কাব্য জগতে পূর্বে ছিল না। তিরিশের অবিশ্বাসী ধারার পথে (কবি অমিয় চক্রবর্তী বাদে) চল্লিশের কোন কবিকে পাওয়া যাবে না। আধুনিক কবিতার কাব্য আন্দোলনে বসবাস করে অন্যের সাথে নিজেকে না মিশিয়ে একক তৎপরতায় কাব্যচর্চা চালিয়ে গেছেন। জুটেছে সফলতার শিরোপা। আবুল ফজলের ভাষায় : Ñ

আমরা যারা কিছুটা বিপরীত পন্থী তাঁর কবিতায় ধর্মীয় চেতনা ও ঐতিহ্যের অনাবিল স্বাদ পেয়ে থাকি।  (আবুল ফজল, প্রসঙ্গকথা : শ্রেষ্ঠকবিতা, আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত)

সাত সাগরের মাঝি  শিরোপা সফল কবিতামালা সৃজন করার পরপরই হাতেমতায়ীর উপর তীব্র আকর্ষণ বোধ করেন। মূলত সেটা ঘটেছে পুঁথি সাহিত্য পাঠের মাধ্যমে। হাতেমতায়ী ইসলাম পূর্ব যুগের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক চরিত্র। আমাদের মহানবী (সা.) তাঁর নাম শুনেছেন তার প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাবোধ ছিলো। তবে এটা  ঠিক যে আমাদের পুঁথি সাহিত্যে এক ধরনের বাস্তবতা-অবাস্তবতার সংমিশ্রণ ঘটেছে, ফররুখ অবশ্য সব কিছুকে নির্দ্বিধায় গ্রহণ করেছেন তাও বলা যায় না। যে ঘটনার মধ্যে ইসলামী আদর্শ ও ঐতিহ্যের রূপায়ন দেখতে পেয়েছেন সেটাই তিনি নির্ভর গ্রহণ করেছেন। তবে সেই চিন্তা চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল অনেক আগেই। হাতেমতায়ীকে নিয়ে লেখা একটা সনেট কবিতায় Ñ

 

‘ঘুরেছি অনেক আমি’ তায়ী পুত্র হাতেমের সাথে

হাবেদার মাঠ থেকে বাদগর্দ হাম্মাম অবধি,

দেখেছি অশেষ পথে জীবন-মুত্যুর দুই নদী

বয়ে যায় এক সাথে কোন্ এক অজ্ঞাত বাসাতে।

সন্ধ্যার পাখীরা নীড়ে ফিরে আসে, উন্মুখ ডানাতে

রৌদ্রের উত্তপ্ত স্পর্শ,- উষ্ণ বৃক্ষ তৃষ্ণাতপ্ত শ্বাসে

রাত্রির কোমল স্বপ্ন গড়ে তোলে নিশ্চিত বিশ্বাসে;

সূর্যের স্বর্ণাভা নিয়ে উড়ে যায় প্রথম প্রভাতে।

 

অকস্মাৎ এক দিন আসে ডাক গিরিশৃঙ্গ থেকে

(কি নাম সে পাহাড়ের? কোহে-নেদা কাছে কিম্বা দূরে,

কেউ এলে বলে নাই, রহস্যের সেই অন্তঃপুরে

কে ডাকে, কেন সে ডাকে এ জীবনে মৃত্যু-চিহ্ন এঁকে)।

চকিতে হারায় পাখী ক্ষণিকের তপ্ত স্পর্শ রেখে

সবচেয়ে সুদূরের তারকার চেয়ে আরও দূরে।

হাতেম তায়ী, মুহূর্তের কবিতা

 

এই সনেটের মধ্যে ফররুখ আহমদের হাতেম তায়ী কে নিয়ে কাব্যনাট্য ও মহাকাব্য লেখার একটা প্রেক্ষাপট খুঁজে পাওয়া যায়। আশা করি পাঠকদের সেটা বুঝতে অসুবিধা হবে না। পরবর্তীতে কল্যাণবতী ও অসমসাহসী তায়ীকে দেখেছেন এই ভাবে-

 

বাঁধ মুক্ত দরিয়ার টানে

ক্ষীণ ঝর্ণাধারা,

নদী ছুটে আসে আনন্দে যেমন 

তেমনি দারাজ দিল হাতেমের শাখঅওতী আর

সূরাত, হিম্মৎ দেখে এলা কাছে জনতা মজলুম;

এলা নির্যাতিত প্রাণ। কেননা সে বান্দা এলাহির

ঈমানের দীপ্ত শিখা যার দিলে, মহব্বত মনে 

যার আবারিত দান পৃথিবীতে, প্রেমে ও সেবায়

পুরায় পার্থির চাওয়া যে মুমিন এলহির নামে; 

জেগে ওঠে মনুষ্যত্ব তার তপ্ত জিগরের খুনে

আরক্তিম ( আন্ধকার শেষে যেন আফতাব নূতন

জাগায় জাহান সারা অকৃপণ রশ্মি বিনিময়ে)।  

  পরিচিতি, হাতেমাতায়ী

উপরের কয়েকটি বিতর্কিত প্রশ্নের উত্তর অবতারণার মধ্যে দিয়ে এই প্রবন্ধ শেষ করবো। বিষয়টি হলো :- এক. হাতেমতায়ী মহাকাব্য কিনা? দুই. এই বিষয়ের অবতারণা করে ফররুখ আহমদ বাংলা কবিতার জগতে অনাধুনিকতার চর্চা করেছেন কিনা? এর উত্তরে এটা বলা যায় Ñফররুখ আহমদ হলেন সেই কবি, যিনি অতীতে বারবার প্রত্যাবর্তন করলেও; বর্তমানের জন্যই প্রত্যাবর্তন করেছেন। যে ভাবে জীবনানন্দ দাশ “বনলতা সেন” ও “জার্মানীর পথে” কবিতায় অতীতে প্রত্যাবর্তন করেছেন। অথচ আশ্চর্যের বিষয় সমালোচকরা এই বিষয়ে জীবনানন্দ দাশের কোন সমালোচনায় লিপ্ত হননা। যদিও অনেক কবি ও সমালোচক (এদের মধ্যে প্রয়াত অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান উল্লেখযোগ্য) মনে করেন একে মহাকাব্য না বলে ফররুখ আহমদের কাব্যচর্চার শ্রেষ্ঠ ফসল বলে আখ্যায়িত করাই উত্তম। আমাদের দূর্ভাগ্য যে, মার্লামেপন্থী কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের মত কোন প্রজ্ঞাবান সমালোচকের অস্তিত্ব থাকলে বিরোধী পক্ষের সমালোচকদের উত্তর দেওয়া আরো সহজতর হত। পাশাপাশি আবার আবদুল মান্নান সৈয়দ মনে করেন, ফররুখ আহমদের হাতেম তায়ী হল এ যুগের বাংলা সাহিত্যের একটি মহাকাব্য। বিরোধী পক্ষের সব মতামত খ-ন করে তাঁর পরিষ্কার মন্তব্য হলো, বিংশ শতাব্দীতে গ্রিক কবি ও কথাশিল্পী নিকোস কাজান জাকিস মহাকাব্য লিখে সুনাম কুড়াতে পারেন; ফররুখ সেই শতাব্দীতে মহাকাব্য লিখে সফলতা উপার্জন করার পথে কোন বাঁধা দেখিনা। মান্নান সৈয়দ আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন এই বলে :Ñ

বিশ্বসাহিত্যের  অন্যতম চরিত্র লক্ষণ হলো একটা যাত্রা-অভিযাত্রা ও ভ্রমণ। ফররুখ আহমদের সর্বশেষ নায়ক হলো সিন্দবাদ থেকে হাতেমতাই।

এই মন্তব্যের সূত্রধরে আমরা আরো একটি তথ্য যোগ করতে চাই, সেটি হলো এই অভিযাত্রা ও ভ্রমণ তিরিশ পরবর্তী কোন কবির কবিতায় এত জোরালো ভাবে পাওয়া যাবে না। যদিও ভ্রমণের বা যাত্রার প্রেরণা কবি প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবিতা থেকেই (তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রথমা দিকে লক্ষ্য করেই এ মন্তব্য করা হলো। কারণ তার একটি কবিতার নামই রয়েছে “বেনামী বন্দর”। যা ফররুখের একটি প্রিয় কবিতা ছিলো।) পেয়েছিলেন। প্রকৃত অর্থে আমাদের আজকের বিবেচনায় তিনি তাকেও  (প্রেমেন্দ্র মিত্র) ছাড়িয়ে গিয়েছেন অন্যান্য সফলতায় ও স্বতন্ত্রে। দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, ফররুখ আহমদ অবশ্যই আধুনিক কবি। আধুনিকতা বিহীন কোন কাব্য ভাষা বাংলা কবিতার জগতে আনয়ন করেননি। আমাদের বামবাদী ফররুখ বিরোধী সমালোচকরা এটা খেয়াল করেন না যে, কবিতার বিষয়বস্তু পরিবেশ অনুযায়ী কবিতার ভাষা নির্ধারিত হয়ে যায়। ফররুখ আহমদ পুঁথি সাহিত্যের ভক্ত পাঠক হলেও তিনি সেটাকে আধুনিকতার পালিশের মোড়কে তাঁর সুষমা বাড়িয়েছেন । সেটোই ছিলো এলিয়ট কথিত বিনির্মাণ ( জব-পড়হংঃৎঁপঃরড়হ ) ও প্রকৃত কবির কাজ। কারণ তিনি মধ্যযুগীয় কবিদের মত একই ধাঁচের ছন্দে কবিতা লেখেননি।  হাতমতায়ী কাব্যগ্রন্থে  স্বরবৃত্ত ছন্দেরও ব্যবহার রয়েছে। যা মাইকেল মধুসূদন দত্তের মত মহাপ্রতিভাধর কবিরাও কস্মিনকালেও ব্যবহারের কল্পনাও করেননি। আমাদের আলোচ্য মহাকাব্যধর্মী গ্রন্থে কবি ফররুখ আহমদ ্একাধিক ছন্দের ব্যবহার করেছেন। এই কারণে তার হাতেমতাই আলাদা মাত্র পেয়েছে। যদিও সাম্প্রতিক কালে একজন কবি ও সমালোচক মাহবুব সাদিক ফররুখ আহমদের আধুনিকতা বিষয়ে দীপ্র সংশয় ব্যক্ত করেছেন। শোনা যাক তাঁর সেই মন্তব্য :-

“এ কাব্যে ব্যবহৃত ভাষাও তাঁরই ব্যক্তিবৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। আর একথাও নির্দ্বিধায় উচ্চারণ করা যায় বিশেষ একটি ভাবনাবৃত্তে আবদ্ধ হয়ে না পড়লে ফররুখ আহমদই হতেন আমাদের প্রথম আধুনিক।” (ভূমিকা অংশ, ফররুখ আহমদের নির্বাচিত কবিতা, মাহবুব সাদিক সম্পাদিত, প্রকাশকাল : এপ্রিল ২০১৬, প্রকাশক : বাংলা একাডেমি)

তাঁর বক্তব্যের উত্তরে বলা যায়, আধুনিকতা বলতে তিনি যে একমাত্রিক(বামঘোরনার) বিধিবিধান ও চিত্তবৃত্তি কে বোঝেন বলেই অন্যায় ভাবে এ ধরেনের মন্তব্য করেছেন। কারণ ফররুখের কবিতায় যে চিত্তবৃত্তি এসেছে তা পুরোপুরি ভাবে ইসলাম কেন্দ্রিক চিন্তা চেতনা থেকেই এসেছে। অথচ সে আধুনিকতার সুর মাহবুব সাদিক কথিত সমাজচেতনা ফররুখ আহমদের কবিতায় প্রথম থেকেই ছিলো যখন তিনি ছিলেন শুধু মানবতাবাদী ধারার কবি। যখন পড়ি অক্ষরবৃত্তের আট ছয় মাত্রার অমিল দীর্ঘ কবিতা :-

 

কৃষ্ণা দ্বাদশীর পা-ু ক্ষয়মান চাঁদ

আরক্ত ঊষার প্রান্তে এল শেষ হয়ে,

দিগন্তে স্বর্ণাভা : দূরে আলোর ইংগিত।

থামাও মৃত্যুর সুর শোন জীবনের 

অনুধ্বনি : মেঠো পথ, পায়ে-চলা পথ

কাঁকর বিছানো পথ : মজুরের আর

নিঃস্ব জনতার পথ টানিছে আমাকে।

     পথ, শ্রেষ্ঠ কবিতা, আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ