ঢাকা, শুক্রবার 8 June 2018, ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২২ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

দ্বিপার রোজা রাখা

শাহীন রায়হান : দ্বিপা খুব দুরন্ত ও মেধাবী। পড়াশুনা ও দুষ্টমিতে ওর জুড়ি মেলা ভার। ওর দুষ্টমিতে এক কথায় সবাই খুব অতিষ্ট। সেই সাথে আছে ওর খাই খাই স্বভাব। এটা খাই তো সেটা খাই। ওর খাওয়া দেখে দাদু ওর নাম দিয়েছে ক্ষোকস দ্বিপা।

এখন মধুমাস। প্রচন্ড গরমে আম কাঁঠাল ও লিচু পাকা শুরু হয়েছে। কাঁঠাল পাকার গন্ধে চারদিক ম ম করছে। পাকা আমের রং চোখ ভরিয়ে দিচ্ছে। আর আনারস বাড়িয়ে দিচ্ছে লোভ।

দ্বিপাদের বাড়িটা খুব বড়। সেই সাথে নানান ফলের গাছ দিয়ে ভরা। গাছে গাছে ঝুলছে মৌসুমী ফল। এ ফলগুলো দ্বিপাকে খুব টানে। ও আম খেতে খুব ভালোবাসে। পছন্দ করে অন্যান্য ফলও। তাই সারাদিন চড়ে থাকে এ গাছের ডালে তো ও গাছের ডালে।

ঠিক এই ফল ভরা মৌসুমেই এবার হাজির  রহমত মাগফিরাত ও নাজাতের মাস মাহে রমজান। রমজান মাসে সকল ধর্মপ্রাণ মুসলমান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রোজা রাখে। 

দ্বিপার বয়স আট বছর। ও বয়সের তুলনায় খুব দুরন্ত বলে কারো কথাই শুনতে চায় না। যা ইচ্ছা হয় তাই করে যা ইচ্ছা হয় তাই খায়।

দাদু দ্বিপাকে খুব ভালোবাসে। বাজারে গেলেই এটা সেটা কিনে দেয়। তাই দ্বিপাও দাদুকে ভালোবাসে। দাদুর কথা একটু আধটু শোনেও।

রোজার আগের দিন বিকাল বেলা। দ্বিপা দাদুর কাছেই বসে ছিল। দাদু বলল-“দ্বিপা দাদু মনি, এ বছর ঈদে তুমি কি কিনবে?” ঈদের কথা শুনে দ্বিপার চোখে মুখে যেন খুশির ঝিলিক ছড়িয়ে পড়ল। দ্বিপা দাদুকে বলল-“নতুন ড্রেস, নতুন জুতা, নতুন মেকাপ বক্স সব সব সব কিনব। তুমি আমাকে কিনে দিবে দাদু?” দাদু বলল-“তুমি তো এক বছরও রোজা রাখ না। রোজা না রেখে শুধু শুধু ঈদ করলে কি ঈদ হয়, দাদু মনি!” দ্বিপা দাদুর কথায় বলল-“দাদু আমি তো ছোট। ছোটদের কি রোজা রাখতে হয় ?” দাদু বলল- “তুমি এখন আর ছোট নও দাদুমণি। তোমার মতো বয়সে আমিও রোজা রেখেছি।” দাদুর কথায় দ্বিপা বলল-“দাদু তাহলে আমাকেও কি রোজা রাখতে হবে?” দাদু বলল-“ হ্যাঁ, দাদুমণি। তোমাকেও রোজা রাখতে হবে। রোজা আল্লাহ আমাদের উপর ফরজ করে দিয়েছেন।” দ্বিপা বলল-“ ফরজ কি দাদু?” দাদু বলল- “ফরজ আল্লাহর অবশ্য পালনীয় হুকুম। ফরজ পালন না করলে পাপ হয়। আর পাপ করলে হয় শাস্তি। আমরা যদি আল্লাহর আদেশ পালন না করি, নামাজ না পড়ি, রোজা না রাখি, ভালো কাজ না করি তাহলে আল্লাহ আমাদের শাস্তি দিবেন।”

দাদুর মুখে শাস্তির কথা শুনে দ্বিপার মুখ কালো হয়ে গেল। দ্বিপা বলল-“ আমিও নামাজ রোজা ও ভালো কাজ করতে চাই।” কিন্তু রোজা রাখলে কি আমি ফল খেতে পারব দাদু?” দাদু বলল-“আমার বোকা দাদুমণি! তুমি সেহ্রী ও ইফতারে অনেক ফল খেতে পারবে।”

ফল খাবার কথা শুনে দ্বিপা খুব খুশি হয়ে বলল-“দাদু তাহলে কালকে থেকে আমিও তোমার সাথে রোজা রাখব।” দ্বিপার কথায় দাদু ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল-“এই তো আমার দাদুমণি।”

দাদুর সাথে আলাপের পর দ্বিপার যেন আর সময় কাটতে চাইছিল না। ওর ভাবনা জুড়ে রইল কখন সেহ্রী হবে কখন রাখবে রোজা।

রাত দশটা। সবাই রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু একি দ্বিপার যে কিছুতেই ঘুম আসছে না। ও যে শুধু রোজার কথাই ভাবছে। এভাবে ভাবতে ভাবতে রাত তিনটা। বাড়ির পাশের মসজিদে মাইক বেজে উঠল মুয়ায্যিনের ডাকে। মাইকের শব্দ শুনে দ্বিপা লাফ দিয়ে বিছানা থেকে উঠে তাড়াতাড়ি গিয়ে দাদুকে ডেকে তুলল। দাদু বলল-“কি রে দাদুমণি, রাতে ঘুমাও নি।” দ্বিপা বলল-“না দাদু, এক সাথে সেহ্রী খেয়ে ঘুমাব।” কাল রোজা রাখবনা! দ্বিপার কথা শুনে সবাই তো অবাক। কি বলে  মেয়ে!

মা টেবিলে খাবার দিলেন। দ্বিপা দাদুর সাথে সেহ্রী খেল। সাথে প্রিয় আম ও দুধ খেতেও ভুলল না। সেহ্রী খেয়ে নামাজ পড়ে দাদুর সাথেই ও ঘুমিয়ে পড়ল।

পরদিন সকাল দশটা। দাদুর ডাকে ঘুম ভাঙল দ্বিপার। ঘুম থেকে জেগেই ওর মনে হল নাস্তা করার কথা। ওর যে খুব ক্ষিধে লেগেছে, সাথে পেয়েছে প্রচন্ড পানির তৃষ্ণা। এমন সময় দাদু ডাকল-“দ্বিপা, শুনে যাও দাদুমণি।” দ্বিপা দাদুর কাছে ছুটে যেতেই দাদু বলল-“কি দাদুমণি, রোজা রেখেছ তাহলে?” দাদুর কথায় দ্বিপার রোজার কথা মনে পড়ে গেল। ও তো রোজার কথা ভুলেই গিয়েছিল। রোজা রাখলে তো কোন খাবারই খাওয়া যায় না। দ্বিপা বলল-“ জ্বি, দাদু।” দাদু বলল-“দাদুমণি, জীবনে প্রথম রোজা রেখেছ, দেখ এ রোজা যেন আবার ভঙ্গ করো না। প্রথমে একটু আধটু কষ্ট হবে কিন্তু পরে ঠিক হয়ে যাবে।” দাদু আরও বলল-“দাদুভাই আল্লাহর ইবাদত কষ্ট করেই করতে হয়। আর আল্লাহ আমাদেরকে ইবাদত করার জন্যই সৃষ্টি করেছেন।” দ্বিপা দাদুর কথা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনল কিন্তু কিছু বলল না।

দুপুর বেলা। দ্বিপাকে দাদু বলল-“দাদুমণি, গোসল করে এস নামাজ পড়বে। দ্বিপা দাদুর কথা মতো গোসল করে দাদুর সাথেই নামাজ আদায় করল। নামাজ শেষে দাদু বলল-“দ্বিপা দাদুমণি, আমার কাছে বসো।” দ্বিপা দাদুর  কাছে বসলে দাদু বলল-“মানুষকে বেঁচে থাকার জন্য যেমন খাবার খেতে হয় খাবার না খেলে যেমন মানুষ বাঁচে না তেমনই আল্লাহর ইবাদত না করলে শাস্তি তো আছেই। তাই তুমি কখনও নামাজ রোজা ছাড়বে না এবং সব সময় ভালো কথা বলবে ভালো কাজ করবে। তাহলে আল্লাহ তোমাকে ইহকালে শান্তি ও পরকালে পুরষ্কার দিবেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ