ঢাকা, শনিবার 9 June 2018, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২৩ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বিদায়হজের খুতবাই বিশ্বমানবতার প্রকৃত মুক্তিসনদ

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : জুমাবার। ৯ জিলহজ। ১০ হিজরি। হজের দিন। পবিত্র মক্কা নগরী থেকে কয়েক মাইল দূরে অবস্থিত আরাফাত ময়দানে মধ্যাহ্নের পর বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (স) লক্ষাধিক সাহাবার উপস্থিতিতে সকল মানুষের কল্যাণভাবনায় যে ঐতিহাসিক খুতবা প্রদান করেন, সেটাই ইসলামের ইতিহাসে বিদায়হজের ভাষণ বা বিশ্বমানবতার সর্বোত্তম মুক্তিসনদ হিসেবে খ্যাত। প্রকৃত অর্থে নানাবিধ ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ পৃথিবীতে মানবতার মহান কল্যাণে এমন গুরুত্ববহ ও তাৎপর্যমন্ডিত বক্তৃতা মুহাম্মদ (স) এর আগে এবং পড়ে আর কোনও নেতা বা মহাপুরুষ দিতে পারেননি। আর কেউ পারবেনও না।
আল্লাহ রব্বুল আল আমিনের তারিফ করে তিনি বলতে শুরু করেন-
“হে মানুষ !
তোমরা আমার কথা শোনো। এর পর এই স্থানে তোমাদের সঙ্গে আর একত্রিত হতে পারবো কিনা জানি না!
হে মানুষ !
আল্লাহ বলেন, হে মানবজাতি তোমাদের আমি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের নানা সমাজ ও গোত্রে ভাগ করে দিয়েছি ; যেন তোমরা পরস্পরের পরিচয় জানতে পারো। অতএব শুনে রেখো মানুষে মানুষে কোনও ভেদাভেদ নেই। আরবের ওপর কোনও অনারবের, অনারবের ওপর কোনও আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই। তেমনই সাদার ওপর কালোর বা কালোর ওপর সাদার কোনও শ্রেষ্ঠত্ব নেই। তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী যে আল্লাহকে ভালোবাসে।
হে মানুষ !
শুনে রেখো অন্ধকার যুগের সকল বিষয় ও প্রথা আজ থেকে বিলুপ্ত হলো। জাহিলি যুগের রক্তের দাবিও রহিত করা হলো।
হে মানুষ !
শুনে রেখো, অপরাধের দায়িত্ব কেবল অপরাধীর ওপরই বর্তায় । পিতা তার পুত্রের জন্য আর পুত্র তার পিতার অপরাধের জন্য দায়ী নয়।
হে মানুষ!
তোমাদের রক্ত তোমাদের সম্মান, তোমাদের সম্পদ পরস্পরের জন্য চিরস্থায়ীভাবে হারাম অর্থাৎ পবিত্র ও নিরাপদ করা হলো। আজকের এই মাস এবং এই শহর সকলের জন্য পবিত্র ও নিরাপদ ঘোষণা করা হলো।
হে মানুষ!
তোমরা ঈর্ষা ও হিংসা-বিদ্বেষ থেকে দূরে থাকবে। কারণ ঈর্ষা ও হিংসা মানুষের সকল সদগুণ ধ্বংস করে ফেলে।
হে মানুষ!
নারীদের সম্পর্কে আমি তোমাদের সতর্ক করে দিচ্ছি। তাদের সঙ্গে নিষ্ঠুর আচরণ করো না। তাদের ওপর যেমন তোমাদের অধিকার রয়েছে; তেমনই তোমাদের ওপর তাদেরও অধিকার রয়েছে। সুতরাং তাদের কল্যাণের দিকে সবসময় খেয়াল রেখো।
হে মানুষ!
অধীনস্থদের সম্পর্কে সতর্ক হও। তোমরা নিজেরা যা খাবে তাদেরও তা খাওয়াবে। নিজেরা যা পরবে তাদেরও তা পরাবে। শ্রমিকের শরীরের ঘাম শুকাবার আগেই তার মজুরি পরিশোধ করবে ।
হে মানুষ!
ঈমানদার সেই ব্যক্তি যার হাত ও মুখ থেকে অন্যের সম্মান, ধন এবং প্রাণ নিরাপদ। সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে অন্যের জন্যও তাই পছন্দ করে।
হে মানুষ!
ঈমানদাররা পরস্পরের ভাই। সাবধান! তোমরা একজন আরেকজনকে হত্যা করবার মতো কুফরি কাজে লিপ্ত হবে না।
হে মানুষ!
শুনে রেখো আজ থেকে বংশগত শ্রেষ্ঠত্ব বা কৌলিন্যপ্রথা বিলুপ্ত করা হলো। কুলীন বা শ্রেষ্ঠ সেই যে ঈমানদার এবং মানুষের উপকার করে।
হে মানুষ!
ঋণ অবশ্যই ফেরত দিতে হবে। বিশ্বস্ততার সঙ্গে প্রত্যেকের আমানত রক্ষা করতে হবে। কারুর সম্পত্তি কেউ যদি স্বেচ্ছায় না দেয়, তবে তা অপর কারুর জন্য হালাল নয় । তোমরা কেউ দুর্বলের ওপর অবিচার করবে না।
হে মানুষ!
বিদ্বানের কলমের কালি শহীদের রক্তের চেয়েও মূল্যবান। জ্ঞান অর্জন প্রত্যেক নর-নারীর জন্য ফরয। কারণ জ্ঞান মানুষকে সঠিক পথ দেখায় । জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রয়োজন হলে তোমরা চিনেও যাবে।
হে মানুষ!
তোমরা তোমাদের রবের ইবাদত করবে। সালাত কায়েম করবে। যাকাত আদায় করবে। সিয়াম পালন করবে। হজ সম্পন্ন করবে আর সংঘবদ্ধভাবে নেতাকে অনুসরণ করবে। তাহলে তোমরা জান্নাতে দাখিল হতে পারবে।
হে মানুষ!
শুনে রেখো। একজন কুশ্রী-কদাকার ব্যক্তিও যদি তোমাদের নেতা মনোনীত হয়, যদ্দিন পর্যন্ত সে আল্লাহর কিতাব অনুসারে তোমাদের পরিচালিত করবে, তদ্দিন তার আনুগত্য করা তোমাদের ফরজ বা অবশ্য কর্তব্য।
হে মানুষ !
শুনে রেখো। আমার পর আর কোনও নবী নেই । হে মানুষ, আমি তোমাদের কাছে দুটি আলোকবর্তিকা রেখে যাচ্ছি, যদ্দিন তোমরা এ দুটো অনুসরণ করবে তদ্দিন তোমরা সত্যপথে থাকবে। এর একটি হলো: আল্লাহর কিতাব। অন্যটি হলো: আমার সুন্নাহ বা জীবনদৃষ্টান্ত।
হে মানুষ!
তোমরা কস্মিনকালেও দীন নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না। কারণ অতীতে বহু জাতি দীন নিয়ে বাড়াবাড়ির কারণে ধ্বংস হয়েছে।
হে মানুষ!
প্রত্যেককেই শেষবিচারের দিন সব কাজের হিসেব দিতে হবে। অতএব সাবধান হও।
হে মানুষ !
তোমরা যারা এখানে হাজির আছো, আমার এই কথাগুলো সবার কাছে পৌঁছে দেবে।”
গুরুগম্ভীর ও আবেগমথিত বক্তৃতার পর তিনি সমবেত জনতার উদ্দেশে হাত উঁচিয়ে আবারও জিজ্ঞেস করলেন, “হে মানুষেরা ! আমি কি তোমাদের কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছে দিয়েছি?”
উপস্থিত সকলে সমস্বরে জবাব দিলো, “জী হ্যাঁ।” এরপর নবীজী (স) বললেন, “ইয়া আল্লাহ ! তুমি সাক্ষী থেকো। আমি আমার সকল দায়িত্ব সম্পন্ন করেছি।”
# উল্লেখ্য, ইসলাম শুধু বিশেষ কোনও মানবগোষ্ঠীর জীবনশৈলী নয়। মক্কাবাসী, মদিনাবাসী কিংবা মুহাম্মদ (স) এর বংশধরদের জন্য নির্দিষ্ট নয়। ইসলাম সমগ্র মানবজাতির জন্য শ্রেষ্ঠ জীবনাদর্শ। তাই এ সনদে কোনও জাতি বা সম্প্রদায়কে উদ্দেশ করা হয়নি। বারবার উদ্দেশ করে বলা হয়েছে, ‘হে মানুষ !’ নবী সাহেব (স) তাঁর বংশধরদের, কুরাইশদের, মক্কা কিংবা মদিনার লোকদের অথবা শুধু তাঁর অনুগামীদের উদ্দেশ করে বলতে পারতেন। কিন্তু না, তিনি তা করেননি। তিনি বলেছেন পৃথিবীর সমস্ত মানুষকে লক্ষ্য করে। এতেই বোঝা যায় এ সনদের গভীরতা ও মহান তাৎপর্য।
# প্রথমেই আল্লাহর বাণী উদ্ধৃত করে বলেন,  মানুষকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। অতএব সব মানুষ সমান। ছোট-বড় ভেদাভেদ নেই। সাদা-কালোর মধ্যে কোনও ফারাক নেই। আরব-অনারবে কোনও তফাত নেই। কারুর প্রতি কারুর প্রাধান্য নেই। মানুষের মধ্যে সেই বেশি সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী যে আল্লাহকে ভালোবাসে।
# মহানবী (স) এর আরাফাতে দেয়া এ ভাষণ ছিল এমনই হৃদয়গ্রাহী এবং বিশ্বব্যাপী যে, এর তুলনা আগে ও পরের কোনও নেতার দেয়া ভাষণের সঙ্গে তুলনীয় নয়। অন্য সকল নেতার ভাষণে ছিল নিজদেশ, সমাজ ও নিজস্ব মানুষের কথা। সুখ ও দুঃখের কথা। মুহাম্মদ (স) এর এ ভাষণে ছিল নিজদেশ, সমাজ ও গ-ির সীমা-পরিসীমা অতিক্রম করে দুনিয়ার সমগ্র মানবজাতির কল্যাণ এবং মহামুক্তির বারতা।
# এ সনদের প্রতিটি কথা স্পষ্ট এবং ব্যাপক। বলা যায়, এটি সমগ্র কুরআনেরই নির্যাস। এতে ঋণ পরিশোধে গড়িমসি করতে মানা করা হয়েছে। মানুষ হত্যা অবৈধ ও কুফরি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ছেলের অপরাধ পিতার ওপর এবং পিতার অপরাধ ছেলের ওপর চাপাতে নিষেধ করা হয়েছে। অথচ অনেক দেশে এখনও পিতার অপরাধে ছেলেকে এবং ছেলের অপরাধে পিতাকে শাস্তি দেবার ঘটনা ঘটছে। আমাদের দেশে এমন দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা প্রায়শ ঘটতে দেখা যায়।
# ইসলামে সব মানুষের অধিকার সমান। কেউ বড়, কেউ ছোট নয়। মসজিদে যে আগে আসবে সেই প্রথম কাতারে বসতে পারবে। ধনী-গরিব সবাই এক কাতারে পায়ের সঙ্গে পা মিলিয়ে সালাতের জন্য দাঁড়াতে পারবে। বড়লোক দম্ভভরে সামনে কিংবা গরিব কাচুমাচু করে পেছনের কাতারে দাঁড়াবে এমন নয়। এর চেয়ে সাম্য আর কী হতে পারে? এই চির সাম্যের আহ্বানই জানানো হয়েছে বিদায়হজের মর্মস্পর্শী খুতবায়।
# নারীর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করতে আল্লাহর রসুল (স) কঠোরভাবে মানা করেছেন। নারীর কাছে পুরুষের যেমন অধিকার আছে ; তেমনই পুরুষের কাছে নারীরও। শুধু তাই নয়, নারীদের ব্যাপারে পুরুষদের যত্নবান হতেও নির্দেশ দেয়া হয় বিদায়হজের ভাষণে। কাজেই যারা বলেন, ইসলামে নারী অধিকার নেই বা তাদের ছোট করা হয়েছে ; তারা অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়তে পারঙ্গম।
# অধীনস্থদের সম্পর্কে হুঁশিয়ার করে বলা হয়েছে, তোমরা যা খাবে এবং পরবে, তাদেরও তা খাওয়াবে ও পরাবে। দেহের ঘাম শুকোনোর আগেই পারিশ্রমিক পরিশোধ করবে। এ নীতি আমাদের শিল্পপতিরা প্রায়শই মানে না। শ্রমিকদের ন্যয্যমুজরিতো দেয়া হয়ই না; অনেক শ্রমিককে খালিহাতে বিদায় করে দেবার মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের দেখতে হচ্ছে। কেন?
# বিদায়হজের বাণী বা বিশ্বমানবতার মুক্তি সনদ সমাজে বাস্তবায়ন এখনও করা গেলে মানুষে মানুষে যে বৈষম্য তা যেমন থাকবার কথা নয়, তেমনই সামাজিক বিবাদ বিসম্বাদের সিংহভাগই দূর হয়ে মানবসমাজ সুখ-সমৃদ্ধিতে ভরে যেতে পারে খুব সহজে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ