ঢাকা, রোববার 10 June 2018, ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২৪ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ঢাকার ফুটপাত ও অভিজাত শপিংমলে ঈদবাজার জমজমাট

মুহাম্মদ নূরে আলম : ঈদ মানে আনন্দ ঈদ মানে খুশি। সেই ঈদে নিজের ছেলে, মেয়ে, ভাই, বোনসহ স্বজনদের মুখে হাসি ফুটাতে ব্যস্ত থাকে পরিবাবের কর্তারা। কর্তার পকেটে টাকা আছে বা নাই তা দেখার সময় নেই স্বজনদের। গরিব হোক কিংবা ধনী হোক সবার চিন্তা এখন একটাই কিভাবে তাদের সন্তান ও আত্মীয়দের খুশি করা যায়। নি¤œবিত্ত পরিবারের পক্ষে একসঙ্গে টাকা জমিয়ে ঈদ মার্কেট করা কষ্টকর। তাই তারা ধীরে ধীরে তাদের মার্কেট করতে শুরু করে দিয়েছে। আর দাম কম হওয়ার কারণে তাদের প্রথম পছন্দ ফুটপাতের মার্কেটগুলো। পুরান ঢাকার সদরঘাট, ওয়াইজঘাট, পাটুয়াটুলী, নবাববাড়ি, বাবুবাজারসহ সব ফুটপাতে ঈদের আমেজ দেখা গেছে। নিম্নবিত্ত এবং অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের পছন্দের বাজার হচ্ছে ফুটপাত। যেখান থেকে তাদের আয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজের পছন্দের কেনাকাটা করতে পারে। যদিও ঈদ আসতে বাকি আরো ৬ দিন। তবে ঈদের অনেকদিন আগেই জমে উঠেছে পুরান ঢাকার ফুটপাতগুলো।
পুরান ঢাকায় রাস্তাঘাটে লোকের যাতায়াত অনেক বেশি থাকে সব সময় । কিন্তু পুরান ঢাকার অভিজাত আবাসিক এলাকা ওয়ারীর র্যাংকিন স্ট্রিটে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। উত্তরে জয়কালী মন্দির থেকে শুরু করে দক্ষিণে টিপ সুলতান রোড পর্যন্ত প্রচ- যানজট। যানবাহনের ফাঁক দিয়ে রাস্তায় নানা বয়েসী মানুষ চলাচল করছে। কারও হাতে নতুন কাপড়ের ব্যাগ, কেউ খালি হাতে ছুটছে। নারীর সংখ্যাই বেশি।
দুপুর ১২টায় লক্ষ্মীবাজার এলাকায় গিয়ে দেখা যায় একই চিত্র। অগণিত মানুষ আর যানবাহনে ঠাসা। ফুটপাত থেকে রাজপথ কোথাও স্বাভাবিক গতিতে পায়ে চলারই উপায় নেই। অথচ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য খ্যাত এই এলাকার বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানে ছুটি চলছে। ওয়ারী ও লক্ষ্মীবাজারে গতকাল শনিবার যানজটময় দিনের এ রকম পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে মূলত ঈদবাজারের কারণে। রমজানের শুরু থেকেই এখানকার বিপণিবিতানগুলোতে ঈদের বেচাকেনা জমে উঠেছে। বিগত কয়েক বছরে গড়ে ওঠা এ দুই এলাকা এখন পুরাতন ঢাকাবাসীর কেনাকাটার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
আবাসিক এলাকায় অভিজাত বিপণিকেন্দ্র: ছিল পুরোদস্তুর আবাসিক এলাকা। বলা হয়ে থাকে ঢাকার প্রথম অভিজাত এলাকা। এখন বেশ খানিকটা বদলে গেছে ওয়ারীর দৃশ্যপট। অন্তত ওয়ারীর মূল সড়ক র্যাংকিন স্ট্রিটে গেলে এমনটিই মনে হবে। বাগানের বিলাসিতা ঘুচেছে বহুকাল আগেই। হয়েছে সুউচ্চ সব ভবন। পুরান ঢাকার অন্য এলাকার চেয়ে ওয়ারীর রাস্তাগুলো কিছুটা চওড়া। তা সত্ত্বেও ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পথ উপচানো যানবাহনের জটলা। বিগত ১০ বছরে দ্রুতই বদলে গেছে এলাকাটি। এখন এটি বিপণিবিতান স্ট্রিটে পরিণত হয়েছে।
অপরদিকে ২০ রমজানের পরে বড় মার্কেট বা ফুটপাত সব জায়গায় থাকে প্রচ- ভিড়। যেখানে প্রবেশ করা খুবই দুষ্কর। তাই সেই কষ্ট থেকে বাঁচতে অনেকেই আগে থেকে শুরু করে দিয়েছেন তাদের ঈদ মার্কেট। ঈদ কাছাকাছি এলে মার্কেটগুলোতে গিয়ে নিজেদের পছন্দমতো বাজার করাটা হয়ে ওঠে কঠিন। তখন প্রচ- ভিড়ের কারণে কোনো জিনিস ভালোভাবে দেখা ও দরদাম করা যায় না। দোকানদার যা বলে তা দিয়েই কিনতে হয় ক্রেতাকে। তাই মার্কেটে প্রচ- ভিড়ের কথা চিন্তা করে অনেক পরিবারের লোকজন আগেই মার্র্কেট করতে ভিড় জমিয়েছে ফুটপাতগুলোতে।
স্থানীয় সিলভারডেল স্কুলের পাশের ভবনে আড়ংয়ের বিক্রয়কেন্দ্র খোলা হয় তখন। তখন ওয়ারীতে অভিজাত প্রতিষ্ঠানের পোশাকের দোকান ছিল গুটি কয়েক। আর এখন দুই কদম ফেলতেই মিলবে শহরের নামজাদা ফ্যাশন হাউসগুলোর শাখা। কী নেই এখানে! আড়ং, নবরূপা, ক্যাটস আই, গ্রামীণ, ইউনিক্লো, ইয়েলো, সাদা-কালো, অঞ্জন’স, এসটাসি, চৈতি, রূপসী বাংলা, এডিশন, আবর্তন, বৈশাখী থেকে শুরু করে জুতার বিক্রয় প্রতিষ্ঠান বাটা, এ্যাপেক্স, শিশুদের জন্য সুপ্ত কিডস, কিডস ক্লাবসহ নানা প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি অনেক মার্কেটও চালু হয়েছে সম্প্রতি।
মধ্যবিত্তদের প্রিয় রাজধানী মার্কেট ও সদরঘাট: এখন পর্যন্ত পুরান ঢাকার সবচেয়ে বড় বিপণিকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত রাজধানী সুপার মার্কেট। এখানে সব শ্রেণির ক্রেতারা কেনাকাটা করেন। ক্রেতারা বলেন, এখানে দাম তুলনামূলক কম। এখানে সব বয়সী নারী-পুরুষ ও শিশুদের পোশাকের ব্যাপক আয়োজন লক্ষ করা গেছে। এ ছাড়া জুতা, অলংকার, থান কাপড়সহ সংসারের টুকিটাকি জিনিসও পাওয়া যায়। লালমোহন সাহা স্ট্রিটের মঞ্জুর রহমান তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে গতকাল শনিবার দুপুরে এসেছেন ঈদের বাজার করতে। তিনি বললেন, ‘আগে আমাদের মৌচাক কিংবা গাউসিয়া মার্কেটে যেতে হলেও এখন আর অত দূর যাওয়া লাগে না। এখানেই সব পাওয়া যায়। দামও তুলনামূলক কম।’ গৃহিণী শাহানা বলেন, ‘অন্য কোনো মার্কেটে এতটা স্বস্তি পাই না। বাসার কাছে বলে এখানে বাজার করলে সময়ও বেঁচে যায়।’ অন্যদিকে সদরঘাটে আসেন মূলত গেন্ডারিয়া ও ইসলামপুর এলাকার বাসিন্দারা।
নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ফুটপাত: সদরঘাট এলাকায় দেখা গেল ফুটপাতের ব্যবসা বেশ জমজমাট। নতুন জামার পাশাপাশি ওয়াইজঘাট এলাকায় পুরান জামা-কাপড়ের সমাহার দেখা গেল। বেচাকেনাও বেশ ভালো। ওয়াইজঘাটে জামা কিনতে আসা রিকশাচালক রহিম মিয়া জানান, তাঁর ছেলের জন্য ১৩০ টাকায় একটি পাঞ্জাবি কিনেছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী বাজার এখানেই করতে পারি। তাই চলে আসি এখানে।’ লক্ষ্মীবাজারের মুসলিম হাইস্কুলের সামনে থেকে শুরু করে বেশ খানিকটা এলাকায় ফুটপাতে নানা ধরনের পণ্য নিয়ে বসেছেন অস্থায়ী ব্যবসায়ীরা। নাসিমা বেগম পেশায় একজন শ্রমিক। সে জুতার কারখানায় কাজ করে জিনজিরা। সন্ধ্যার পর মার্কেট করতে আসছে সদরঘাটের ফুটপাতে। তার স্বামীকে বলছে তুমি কি কিন বা? স্বামী উত্তরে বলে আমার তো কিছু কেনার দরকার নেই। গত বছরের শার্টটা এখনো নতুন। ওইটাই ইস্ত্রি করলে একদম নতুন হয়ে যাবে। স্ত্রী আরে কি যে বল না ওটাতো পুরাতন হয়ে গেছে। একটা নতুন শার্ট কিন।
এমন সময় আমি জিজ্ঞাসা করলাম আপনারা কি বিষয় নিয়ে কথা বলছিলেন? স্ত্রী বলে আমরা ব্যক্তিগত কথা বলছি। সাংবাদিক পরিচয় দিলে কথা বলতে রাজি হয়। নাসিমা বেগম বলে আমরা তো ধনী মানুষ না। তাই বড়লোকদের মতো বড় মার্কেটে গিয়ে ঈদ বাজার করার ক্ষমতা আমাদের নেই। আমরা যে গরিব এটাতো আর বাচ্চারা বুঝবে না। তাই বাচ্চাদের বুঝ দিতে আমাদের সাধ্যনুযায়ী এই ফুটপাত থেকেই কেনাকাটা করছি। কি কিনছেন জানতে চাইলে বলেন, দুই ছেলের জন্য পাঞ্জাবি কিনছি আর মেয়ের জন্য একটা কামিজ কিনছি। আর বাচ্চার বাবার জন্য একটা শার্ট কিনতে চেয়েছিলাম কিন্তু উনি কিনবেন না। আপনার জন্য কিছু কেনেননি- প্রশ্ন করলে নাসিমা বলেন, আমার আছে। আর আমিতো কোথাও যাব না। ঈদের দিন ঘরেই থাকব। বাচ্চারা খুশি হলেই আমরা খুশি। এত আগে মার্কেট করার কথা জানতে চাইলে তারা বলেন, গত মাসে যে বেতন পেয়েছি তা দিয়ে মার্কেট করছি। আর এই মাসে অর্ধেক বেতন ও বোনাস পাব তা দিয়ে বাড়ি আসা যাওয়ার ভাড়া ও ঈদে চুলার বাজার করব। এভাবেই চোখের জল মুছে মুছে নিজের অসহায়ত্বের কথা ব্যক্ত করছিলেন নাসিমা বেগম। এ থেকে বুঝা যায় ঈদ কারো জন্য খুশি আবার কারো জন্য খুশির মাঝেও কষ্ট।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ব্যবসা ভালোই হচ্ছে। পুরোপুরি ব্যবসা এখনো শুরু হয়নি। পুরোদমে শুরু হবে ২০ রমজানের পর। তখন আমরা একেকদিন ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকা বেচাকেনা করব। এখন কেমন হচ্ছে জানতে চাইলে ব্যবসায়ীরা বলেন, ৩০-৪০ হাজাররের মতো হয় দৈনিক। তবে জুতার ব্যবসার মার্কেট এখনো জমেনি বলে জানিয়েছেন জুতা ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি আগামী সপ্তাহ থেকে শুরু হবে তাদের বেচাকেনা। এ ব্যাপারে সদরঘাটের জুতা ব্যবসায়ী মু. আকবর হোসেন জানান, চায়না জুতা বেশি চলে। দেশি জুতা চলে তবে একটু কম। তিনি গড়ে দৈনিক ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা বিক্রি করেন। তবে গত বছরের চেয়ে এবার ব্যবসা ভালো হবে বলে আশা প্রকাশ করেন। মার্কেট ঘুরে দেখা যায়, বাচ্চাদের টি-শার্ট, থ্রি কোয়াটার, মেগি হাতা গেঞ্জি চলছে বেশি। তিনি বলেন, এবারের বেচকেনা গত বছরের চেয়ে ভালো তবে আগামী সপ্তাহ থেকে আরো ভালো হবে। তাহের ক্লথের স্বত্বাধিকারী শামিম জানালেন, এবারের ঈদে ভালো বেচাকেনা হবে। এখন থেকেই এটা বুঝা যাচ্ছে। এখনই দৈনিক ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা বেচা বিক্রি হচ্ছে। তবে ২০ রমজানের পর এটা ১ লাখ থেকে ১ লাখ ২০ হাজারে দাঁড়াবে।
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাচ্চাদের কাপড়ের চাহিদা বেশি। অভিভাবকরা নিজেদের চেয়ে বাচ্চাদের প্রতি গুরুত্ব বেশি দেন তাই বাচ্চাদের কাপড় বেশি চলছে। এ ব্যাপারে সদরঘাটের ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম জানান, তার দোকানে ০ থেকে ১২ বছরের বাচ্চাদের কাপড় পাওয়া যায়। ঈদের বেচাকেনা ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে তবে পুরোদমে শুরু হতে সময় লাগবে আরো কয়েকদিন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ