ঢাকা, রোববার 10 June 2018, ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২৪ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

তাকওয়া অর্জনে সিয়ামের ভূমিকা

হোসাইন মো: ইলিয়াস : মহান রাব্বুল আলামীন মানব জাতিকে আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর উদ্দেশ্য ব্যক্ত করে বলেন : “আমি জ্বীন ও ইনসানকে একমাত্র আমার ইবাদত করার জন্য সৃষ্টি করেছি” (আযযারিয়াত : ৫৬)।  ইবাদতের অপরিহার্য একটি বিষয় হলো তাকওয়া অর্জন। আল্লাহ তা’আলা বলেন : “হে মানব সম্প্রদায়! তোমরা ঐ আল্লাহকে ভয় করো, যিনি তোমাদেরকে এক আত্মা থেকে সৃষ্টি করেছেন” (সূরা নিসা : ০১)। আল্লাহ তা’আলা তাঁর এক মহা নেয়ামত হিসেবে রহমত, বরকত, মাগফিরাত ও জাহান্নামের শাস্তি থেকে মুক্তির  মাস রমাদানুল মোবারক তাঁর বান্দাদের দান করেছেন। তাই সকল মুমিনের উচিত এ মাসের প্রতিটা মুহুর্তকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো। সিয়াম সাধনার মূল লক্ষ্যই হলো তাকওয়া অর্জন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন: “হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা  হয়েছে, যেমনি ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, আশা করা যায় (এতে) তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারবে” (সূরা আল- বাক্বারা : ১৮৩)। উক্ত আয়াত পাঠান্তে আমরা আল্লাহ তা’আলার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা পাই। যথা: (ক) রমজান মাসের সিয়াম সাধনা সকল মুসলিমের জন্য আবশ্যক তথা ফরজ ইবাদত, (খ) এ সিয়ামের বিধান শুধু আমাদের  ওপর ফরজ করা হয়নি; বরং পূর্বের বহু জাতি-গোষ্ঠীর ওপরও ফরজ হিসেবে সাব্যস্ত ছিল এবং (গ) সিয়াম সাধনার মূল লক্ষ্যই হলো তাকওয়ার গুণাবলী অর্জন করা। ইসলামে রাজা-প্রজা, ধনী-গরীব, সাদা-কালো, ভাষা, জাতি.গোত্র ও বংশের মাঝে কোনো ভেদাভেদ নেই; বরং সকল মুসলমানের মাঝে সাম্যতা আনয়ন করেছে। তবে তাকওয়ার গুণাবলী একের উপর অন্যের শ্রেষ্ঠত্ব বিধান করে, তাকওয়ার গুণাবলি মানুষকে সবচেয়ে বেশি সম্মানিত করে এবং মর্যাদার আসনে  সমাসীন করে। যেমন আল্লাহ তা’আলার বাণী: “তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সেই ব্যক্তি অধিক মর্যাদা সম্পন্ন, যে বেশি তাকওয়াবান” (সূরা আল- হুজুরাত : ১৩)।
তাকওয়ার আভিধানিক অর্থ: তাকওয়া, আল্লাহর ভয়, পরহেজগারি, সংযম, রক্ষা, সাবধানতা অবলম্বন, ধার্মিকতা ইত্যাদি। পরিভাষায় : ইসলামের আদিষ্ট বিষয়গুলোর পালন, নিষিদ্ধ বিষয়গুলোর বর্জন ও আল্লাহ তা’আলার নিকট জবাবদিহিতার অনুভ’তিই তাকওয়া। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কুরআনুল মাজীদে ঘোষণা করেন–: “তোমাদের রাসূল যা কিছু নিয়ে এসেছেন, সেগুলো আঁকড়ে ধরো আর তিনি যেসব বিষয়ে নিষেধ করেছেন, সেগুলো  থেকে বিরত থাকো” (সূরা আল-হাশর : ৭)। মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে হালাল-হারাম,ন্যায়-অন্যায়, সত্য-মিথ্যা আর উচিত-অনুচিত ইত্যাদি বিষয়ে বস্তুনিষ্ঠ হতে পারার মধ্যে তাকওয়ার গুণাবলি নিহিত। কুরআনুল কারীমের একাধিক জায়গায় আল্লাহ তা’আলা এবিষয়ে নির্দেশনা প্রদান করেন, যেমন তিনি বলেন:   “হে বিশশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, ঠিক যতটুকু তাঁকে ভয় করা উচিত আর তোমরা পরিপূর্ণ মুসলমান না হয়ে মৃত্যু বরণ করো না” (সূরা আল-ইমরান : ১০২)। অন্যত্র বলেন:  “হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় করো (তাকওয়ার গুণাবলি অর্জন করতে পারো) তাহলে তিনি তোমাদের জন্য (অন্যদের থেকে) পার্থক্যকারী কিছু স্বতন্ত্র মর্যাদা দান করবেন, তোমাদের পাপ মোচন করবেন এবং কৃত অপরাধ ক্ষমা করে দেবেন” (আল-আনফাল :২৯।  অনুরূপভাবে তিনি বলেন: “সেসব জনপদবাসী যদি বিশ্বাস স্থাপন ও তাকওয়ার গুণাবলি অর্জন করতো তাহলে নভোম-ল ও ভূম-লের বরকতের সব দুয়ার আমি তাদের জন্য খুলে দিতাম”। (আল-আরাফ : ৯৬)। অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে: “(হে বিশ্বাসীরা) তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, আশা করা যায় যে তোমরা সফলতা লাভ করবে” (সূরা আল- বাক্বারা : ১৮৯)।
উপরোল্লেখিত প্রমাণাদি দ্বারা বুঝা যায় যে, রহমত, বরকত, মাগফিরাত, সফলতা ও মহান রবের সন্তুষ্টি লাভ করতে হলে আমাদের অবশ্যই তাকওয়ার গুণাবলি অর্জন করতে হবে । মাহে রমজান হচ্ছে সংযম ও আত্মশুদ্ধির মাস, স্বীয় অপরাধ ক্ষমা করিয়ে নেওয়ার মাস এবং তাকওয়ার গুণাবলিতে নিজেকে সমৃদ্ধ করার সর্বোৎকৃষ্ট সময়। রোজার প্রতিটি রীতি-নীতি ও কার্যকলাপে তাকওয়ার শিক্ষা রয়েছে। ক্ষুধা-তৃষ্ণার তীব্র চাহিদা থাকা সত্ত্বেও একজন রোজাদার সারাদিন খাদ্য বা পানীয় গ্রহণ করে না; কারণ সে আল্লাহকে  ভয় করে। এটি এজন্য নয় যে, সে খাদ্য গ্রহণ করলে কেউ দেখে ফেলবে; বরং রোজাদারের হৃদয়জুড়ে এ বিশ্বাস প্রবল যে, দুনিয়ার কেউ দেখুক আর না-ই দেখুক, সেই মহান আল্লাহ তা’আলা তাকে দেখছেন যিনি সকল কিছুর নিয়ন্ত্রক ও পর্যবেক্ষক, তাই পানাহার করা যাবে না, রোজার সাথে সাংঘর্ষিক কোনো কাজ করা যাবে না, তাঁর কোন আদেশ-নিষেধ অমান্য করা যাবে না। যেমন- হযরত আবু হুরাইরা (রা:) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ (সা:) ইরশাদ করেন : “যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখলো কিন্তু অশ্লীল কথা ও কাজ পরিহার করলো না তার পানাহার ত্যাগে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই” ( বুখারী )। আল্লাহ তা’আলার আদেশ- নিষেধ মেনে চলার এ অনুভ’তিই তাকওয়া, যা অর্জনের এক সর্বোৎকৃষ্ট সময় শাহরু রমাদান। মাসব্যাপী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে  অর্জিত তাকওয়ার এ গুণটি যদি কোনো ব্যক্তি রোজার পরেও লালন ও পালন করে , তাহলে তার পক্ষে মিথ্যা বলা, অন্যের হক নষ্ট করা, ঘুষ ও সুদ খাওয়া, আমানতের খেয়ানত করা,প্রতারণা করা, মালে ভেজাল দেওয়া, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অযৌক্তিকভাবে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করে জনসাধারণের ভোগান্তি বাড়ানো, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, ইভটিজিং, ধর্ষণসহ যে কোন অন্যায় কাজ করা ও দুর্নীতিপরায়ণ হওয়া সম্ভব নয়। কেননা সে সবসময় মনে করবে, আমি কোনো অন্যায় কাজ  করলে মহান আল্লাহ তা দেখবেন এবং এর জন্য আমাকে জবাবদিহি করতে হবে ও পরিণাম ভোগ করতে হবে। এ জন্যই হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা’আলা বলেন: “সাওম কেবল আমারই জন্য এবং এর প্রতিদান আমি নিজেই প্রদান করব”। রমজানে অর্জিত তাকওয়ার এ গুণাবলি মানবজীবনে ধারণ এবং চর্চা করলে সমাজে বিদ্যমান যাবতীয় অবিচার,অনাচার, অত্যাচার, মারা-মারি, হানা-হানি, প্রতারণা ও অনৈতিকতা, অপ্রাসঙ্গিকতা, পাশবিকতা ও অনৈসলামিক জীবনাচার দূরীভূত হয়ে অনাবিল সুখ-শান্তি ও নিরাপত্তার সমাজ বিনির্মিত হতো। যেমন মহান আল্লাহর বাণী: “যদি তোমরা ধৈর্য্য ধারণ করো এবং তাকওয়া অবলম্বন করো, তবে তাদের কোনো ষড়যন্ত্রই তোমাদের কোনো প্রকার ক্ষতি সাধন করতে পারবে না” (আল-ইমরান: ১২০)। 
তাকওয়ার এ সুফল পেতে আমাদের যেমনি ব্যক্তি পর্যায়ে সচেষ্ট হতে হবে, তেমনি সম্মিলিত প্রচেষ্টা বাড়াতে হবে, সকল বিষয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য এবং সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দিতে হবে। পরম করুণাময়ের বাণী: “অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, নিজেদের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় রাখো এবং প্রকৃত ঈমানদার হলে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো” (আনফাল: ০১)। তাই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যের মাধ্যমে জীবনের সকল স্তরে আমাদের তাকওয়া অবলন্বন করা অতি জরুরী। কেননা তাকওয়ার এ গুণাবলি মানুষকে সবচেয়ে বেশি সম্মানিত করে এবং সর্বোচ্চ মর্যাদার আসনে সমাসীন করে। মহান আল্লাহর কাছেও তাকওয়ার গুণাবলি স¤পন্ন মানুষ সবচেয়ে বেশি সম্মানিত। তাই এ গুণ আমাদের সকলের অর্জিত হোক এবং এর অধিক অধিক চর্চার মাধ্যমে ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন সফলতা নসীব হোক পরম করুণাময়ের নিকট এ তাওফিক কামনা করছি।
লেখক : উপাধ্যক্ষ, নিবরাস মাদরাসা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ