ঢাকা, রোববার 10 June 2018, ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২৪ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

যাকাত পরিশোধের গুরুত্ব ও সঠিক হিসাব পদ্ধতি

মোঃ আব্দুল ওয়াকিল : যাকাত ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের মধ্যে অন্যতম একটি স্তম্ভ। নেসাব পরিমান মালের অধিকারী হলেই প্রত্যেক নর-নারী মুসলিমের উপর তা পরিশোধ করা ফরজ হয়ে যায়। জ্ঞানগত দুর্বলতার কারণে যাকাতকে অন্যান্য দান খয়রাতের সাথে একিভূত করে ফেলা হয়। যা অত্যন্ত দু:খজনক ও বেদনাদায়ক। সালাত ও সাওম যেমনি ফরজ, তেমনি  ফরজ করা হয়েছে যাকাতও। সুতরাং যাকাত পরিশোধ  ও দান খয়রাত প্রদানকে একিভুত করার কোন সুযোগ নেই। যাকাত যদি পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে কেউ  হিসাব করে পরিশোধ না করে তবে তার উপর ফরজ দায়িত্ব পালন না করার গুনাহ অর্পিত  হবে। যাকাত হিসাব করাটাও ফরজ। হিসাব ছাড়া কেউ যদি লক্ষ লক্ষ টাকা দান করে তবে যাকাত আদায় হবে না। আর যদি হিসাব করে যথাযথভাবে পরিশোধ করে তবে তা আল্লাহর কাছে গ্রহনযোগ্য হবে। যাকাত পরিশোধ করা ফরজ ও যাকাত ছাড়া অন্য যে কোন ধরনের দান খয়রাত নফল। যাকাত হিসাবের একটি পদ্ধতি নিম্নে প্রদান করা হল। যা অনুসরন করলে সঠিক ভাবে যাকাত পরিশোধ করা হবে।
যাকাত হিসাব পদ্ধতি
     সম্পদ    টাকা
১. হাতে নগদ    ---
২. স্বর্ণালংকার    ---
৩. ব্যবসায়ে মজুদ মালামাল    ---
৪. ব্যাংকে জমা টাকা    ---
৫. প্রভিডেন্ট ফান্ড (চাকুরিজীবীদের জন্য)    ---
৬. সম্ভাব্য আদায়যোগ্য পাওনা    ---
    দেনা : যা বিয়োগ যোগ্য
১. দেনার পরিমাণ    ---     (ব্যক্তির নিকট)
২. দেনার পরিমাণ    ---     (ব্যাংকের নিকট)
৩. সম্ভাব্য পরিশোধ যোগ্য দেনা    ---
    যাকাত যোগ্য নেট সম্পদ    ---
যাকাত কোন অনুগ্রহ, দয়া বা অনুকম্পা নয়। এটা হচ্ছে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতদের অধিকার বা হক, কারও নিকট কেউ যদি কোন ভাবে টাকা পাওনা থাকে তা পরিশোধ করা ও যাকাত পরিশোধ করা তেমনই সমান। সাথে সাথে যাকাত গ্রহনকারীকে কোন রকম অবহেলা অনাদর করারও কোন সুযোগ নেই। তাদেরকে সম্মানের সাথে প্রদান করতে হবে। যাকাতের টাকা বা কোন সামগ্রী গ্রহন কতে গিয়ে মৃত্যু পথে পতিত হওয়ার ঘটনা আমাদের দেশে অনেকবার ঘটেছে। যা কোন ভাবেই কাম্য নয়। এ বিষয়ে সুরা বাকারার ২৬৪ নং আয়াতে সুষ্পস্ট ভাবে বর্নিত আছে  আল্লাহ তায়ালা বলেন: হে ঈমানদারগন তোমরা খোঁটা ও কষ্ট দেয়ার মাধ্যমে তোমাদের সাদাকা (যাকাত) বাতিল বা  ক্ষতিগ্রস্থ করো না। (এ ব্যাপারে যথাযথ কর্তৃপক্ষ নজরে আনবেন বলে আশা করি)। ইসলামী শরীয়াহর বিধান মোতাবেক যাকাত সরকারী ভাবে প্রত্যেক ব্যক্তি থেকে সংগ্রহ করে প্রকৃত খাতে ব্যয় করতে হবে। এ ব্যাপারে সুরা তাওবার ৬০ নং আয়াতে সুষ্পস্ট ভাবে বর্নিত আছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন: নিশ্চয়ই (এসব) সাদাকা (যাকাত) হচ্ছে ফকীর মিসকিনদের জন্য, এর (ব্যবস্থাপনায় কর্মরত) কর্মচারীদের জন্য, যাদের অন্ত:করণ দ্বীনের প্রতি অনুরাগী করা প্রয়োজন তাদের জন্য, কোন ব্যক্তিকে গোলামী থেকে আযাদ করার জন্য, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিদের ঋণ মুক্তির জন্য, আল্লাহ তায়ালার পথে জিহাদকারী ও মুসাফিরের জন্য এ অর্থ ব্যয় করা যাবে। এটা আল্লাহ তায়ালার নির্ধারিত ফরজ, নিঃসন্দেহে  আল্লাহ তায়ালা সবকিছু জানেন তিনিই হচ্ছেন বিজ্ঞ কুশলী। (সুরা তাওবা আয়াত নং ৬০) 
ব্যক্তিগত ভাবে যাকাত পরিশোধ করার কারণে বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সৃস্টি হয়। যাকাতের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের মুসলিম সমাজ  বর্তমানে ৩ ভাগে বিভক্ত। অর্থাৎ যাকাত দাতা , গ্রহীতা ও যাকাত নিরপেক্ষ। যাকাত নিরপেক্ষ বলতে তাদেরকে বুঝাচ্ছি যারা হিসাব করেননা এবং যাকাতের টাকা গ্রহনও করেননা। শুধু তাই নয় যাকাত দাতা ও যাকাত গ্রহিতাদের ব্যাপারে কোন রকম উৎসাহও তাদের নেই। যাকাতের সম্পদ পবিত্র সম্পদ এব্যাপারে পবিত্র কুরআনে এশরাদ হয়েছে।
“তাদের ধন সম্পদে রয়েছে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতদের অধিকার (হক)” (সুরা আয যারিয়াত -১৯)
মনে রাখতে হবে যাকাত গ্রহণের কেউ উপযুক্ত হলে তিনিও তা কদর করে আল্লাহর নেয়ামত মনে করে নিবেন। এটা তার অধিকার এখানে লজ্জা শরমের কিছু নেই।
পবিত্র হাদীস শরীফে বর্নিত হয়েছে- “যাকাত হচ্ছে মালের উপর বঞ্চিদের অধিকার (হক)” (সহীহ আল মুসলিম)।
সহীহ  মুসলিম  শরীফে বর্নিত আছে- যে জাতি যাকাত দিতে অস্বীকার করবে আল্লাহ তাদের কঠিন ক্ষুধা ও দুর্ভিক্ষে নিমজ্জিত করে দিবেন। (সহীহ আল মুসলিম)
ইসলামের মূল স্পিরিট হলো সরকার কর্তৃক যাকাত সংগ্রহ করা ও তা সঠিক খাতে ব্যয় করা তাহলেই যাকাতের মূল উদ্দেশ্য যেমন দারিদ্র্য বিমোচন, সমাজের সকল নাগরিকের সমতা বিধান ও সম্প্রীতির অটুট বন্ধন প্রতিষ্ঠা করা যাবে। ব্যক্তিগতভাবে যাকাত আদায় করার কারণে নানা রকম সমস্যার সৃষ্টি হয়। যাকাত দাতারা যাদেরকে যাকাত দিচ্ছে তাদের উপর নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করে যা সামাজিক অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে যাকাত গ্রহীতারাও নিজেদেরকে যাকাত দাতাদের কাছে হীন ও নিচু মনে করে যা কোনভাবেই কাম্য নয়।
পরিশেষে সমস্ত মুসলিম উম্মাহ বিশেষ করে আমার প্রিয় বাংলাদেশের মুসলিম ভাই বোনদের প্রতি বিশেষ ভাবে অনুরোধ যাকাত বছরের ১ টি নির্দিষ্ট দিনে পুঙ্খানুপুঙ্খ  রুপে হিসাব করুন  এবং  হিসাব অনুযায়ী যাকাত পরিশোধ করুন।তাতে প্রত্যেকর সম্পদ বৃদ্ধি পাবে এবং সমাজের সকলেই সচ্ছল ভাবে জীবনযাপন করতে পারবে। এটাই আল্লাহর ঘোষনা।
লেখক: এল.এল.বি, এম.এ ও কামিল, (হাদিস), বিশিষ্ট ব্যাংকার ও ইসলামিক ব্যক্তিত্ব।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ