ঢাকা, রোববার 10 June 2018, ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২৪ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

অনুপম রজনী লাইলাতুল কদর

মুফতি মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম : দিবস- রজনী, মাস-বছর সবই আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টি। তারপরও এসবের মধ্যে কিছু কিছু পার্থক্য বিদ্যমান। যেমন ঈদের রজনী, মি’রাজের রজনী, লাইলাতুল কদর, জুমাবার, ঈদের দিন, রমজান মাস বিশেষ মর্যাদা ও তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে লাইলাতুল কদর  অন্যান্য ও অনুপম মর্যাদার অধিকারী। এ রাত প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা পৃথক একটি সূরা নাযিল করেন। “অবশ্যই আমি একে (কুরআনকে) কদরের রজনীতে নাযিল করেছি।(হে রাসূল (স)!) আপনি কি জানেন, কদরের রজনী কী? কদরের রজনী হচ্ছে এক হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। এ রাতে যাবতীয় কাজের জন্যে ফেরেশতাগণ ও রূহ (হযরত জিবরাঈল (আ) অবতীর্ন হন তাদের প্রতিপালকের নির্দেশক্রমে। এটা শান্তির রজনী বলে ঘোষনা করেন।  এ রজনীর বরকত ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকে (সুরা আল কদর)।
লাইলাতুল কদর নামের তাৎপর্য : লাইল অর্থ রাত বা রজনী আর কদর অর্থ সম্মান, মর্যাদা, ভাগ্য, নিয়তি, মূল্য ইত্যাদি। লাইলাতুল কদর অর্থ মর্যাদাপূর্ণ, সম্মানিত ও মহিমান্বিত রমনী। এ রাতকে লাইলাতুল কদর করে নাম করনের অনেক কারণ রয়েছে। ইমাম জুহুরী (র) বলেন, এ রাতকে লাইলাতুল কদর বলার অর্থ হলো এ রাত অতীব মূল্যবান, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন। শেখ আবু বকর ওয়াররাক বলেন-এ রজনীতে ইবাদতের মাধ্যমে এমন অনেক লোক মান-সম্মান অর্জন করেন, যাদের ইতিপূর্বে কোন মান-সম্মান ছিল না। কদরের আরেক অর্থ তাকদীর বা ভাগ্য নির্ধারন। এ রজনীতে আল্লাহ তায়ালা পরবর্তী এক বছরের অবধারিত বিধিলিপি ব্যবস্থাপক ও প্রয়োগকারী ফেরেশতাদের নিকট হস্তান্তর করেন, যাতে সকল মানুষের জন্ম, মৃত্যু, রিযিক, বৃষ্টি ইত্যাদির তারিখ ও পরিমান নির্দিষ্ট থাকে। এমনকি এ বছর কে কে হজ্জ করবে তাও লিখে দেয়া হয়। হযরত ইবন আব্বাস (রা) এর মতে যে চারজন ফেরেশতাকে এ সব দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়া হয় তারা হলেন, হযরত জিবরাঈল (আ), হযরত মীকাঈল (আ), হযরত ইসরাফীল (আ) ও হযরত আযরাঈল (আ) (কুরতুূবী)।
অনুপম রজনী : লাইলাতূল কদর এক অনুপম ও তুলনাহীন রজনী। এ রাতের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো সর্বশেষ আসমানী গ্রন্থ পবিত্র কুরআন মাজীদ সর্ব প্রথম এ রাতেই নাযিল হয়। ফলে এ রাতের ইবাদত হাজার মাসের (৮৩ বছর ৪ মাসের) ইবাদত অপেক্ষা উত্তম। এ রাতে সাইয়্যেদুল মালায়েকা হযরত জিবরাঈল (আ) ফেরেশতাদের এক বিরাট জামায়াত নিয়ে পৃথিবীতে আগমন করেন এবং বিশ্ববাসীর মধ্যে কল্যাণ ও প্রাচুর্য বিতরণ করেন। হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (র) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ গুনিয়াতুত তালেবীনে হযরত আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ করেছেন আল্লাহ তায়ালা লাইলাতুল কদরে হযরত জিবরাঈল (আ) কে সিদরাতুলমুনতাহার সত্তর হাজার ফেরেশতা নিয়ে পৃথিবীতে আগমন করার নির্দেশ দেন। হযরত জিবরাঈল (আ) আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী ফেরেশতাদের দল নিয়ে নূরের পতাকাসহ পৃথিবীতে আগমন করেন। তাঁরা পৃথিবীর  চার জায়গায় পতাকা উত্তোলন করেন। (১) কা’বা শরীফে (২) বায়তূল মুকাদ্দাসে (৩) মসজিদে নববীতে (৪) তুরে সীনা মসজিদে। তারপর ফেরেশতাগণ সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েন। তাঁরা ইবাদত কারী প্রত্যেক মুমিন মুমিনার ঘরে প্রবেশ করেন এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তবে যে সব ঘরে কুকুর, শুকর, প্রাণীর ছবি থাকে সেসব ঘরে এবং মদ্যপায়ী, ব্যভিচারী, সুদখোর প্রমুখের ঘরে প্রবেশ করেনা। হযরত শাহ আবদুল আজিজ (র) বলেন এ রাতে বিপুল সংখ্যক ফেরেশতা পৃথিবীতে পাঠিয়ে আদম সন্তানের ইবাদত গুজারীর সেই অনুপম দৃশ্য দেখানো হয়। যখন তারা আল্লাহর ইবাদত তাসবীহ-তাহলীল ইত্যাদিতে রত থাকে। যেমন ফেরেশতাগণ বলেছিলেন আপনি কি পৃথিবীতে এমন জাতি সৃষ্টি করবেন, যারা পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করবে? এ রাতে সেই আশঙ্কার উত্তর ফেরেশতাগণ পেয়ে যান।
লাইলাতুল কদর কখন : হযরত উবাদা ইবন সামিত (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বর্ণনা করেন যে, একদা মহানবী (স) তাঁর কক্ষ থেকে বের হয়ে আমাদেরকে লাইলাতুল কদর সম্পর্কে বর্ণনা দেয়ার উদ্দেশ্যে বের হন, তখন দুজন সাহাবী একটি বিষয় নিয়ে ঝগড়া করছিল। তিনি পৌঁছেই  বলেন, আমি তোমাদেরকে লাইলাতুল কদর সম্পর্কে অবহিত করার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলাম। কিন্তু অমুখ অমুখ ঝগড়া করার কারনে নির্দিষ্ট তারিখ আমাকে ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে।
এখন তোমরা রমযানের শেষ দশকের নবম, সপ্তম, পঞ্চম রাতে তা খোঁজ কর (সহীহ্ বুখারী)। হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, মহানবী (স) বলেছেন, তোমরা রমযানের শেষ দশকের বেজোড় রাতসমূহে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান ক (সহীহ্ বুখারী)। সহীহ্ মুসলিম শরীফে হযরত উবাই ইবন কাব (রা) থেকে বর্ণিত লাইলাতুল কদর হচ্ছে ২৭ রমযানের রাত। ইমাম আবু হানীফা (র) ও অন্যান্য ইমামগন লাইলাতুল কদর ২৭ রমযানের রাতকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। তাঁরা একটি সুক্ষ বিষয়ের দিকে লক্ষ করেছেন। তাহলে সুরা কদরে “লাইলাতুল কদর” বাক্যটি ৩ বার উল্লেখ করা হয়েছে। এতে রয়েছে ৯টি বর্ণ। অতএব, ৩৯=২৭ অর্থাৎ ২৭ শে রাত লাইলাতুল কদর। হযরত আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা), ইবন উমর (রা) এবং হযরত মুআবিয়া (রা) প্রিয় নবী (স) থেকে বর্ণনা  করেছেন যে, লাইলাতুল কদর হলো ২৭ রমযান।
লাইলাতুল কদর শেষ নবীর উম্মতের জন্য উপহার : লাইলাতুল কদর শেষ নবীর উম্মতের জন্য শ্রেষ্ঠ উপহার এবং মহান নেয়ামত। ইমাম মালেক (র) মুয়াত্তায় বর্ণনা করেছেন যে, মহানবী (স) জানতে পারলেন যে, পূর্বেকার উম্মতের বয়স অনেক দীর্ঘ হতো, সে তুলনায় নিজের উম্মতের বয়স অনেক কম। সুতরাং আমার উম্মতের আমলের পরিমান এ হায়াতের ব্যবধানে পূর্বেকার উম্মতের আমলের পরিমানের সমান হবে না। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়ে প্রিয় নবী (স) মর্মাহত হন। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা তাঁর উম্মতকে লাইলাতুল কদর প্রদান করেন, যাতে এ ব্যবধান দূরীভূত হয়। হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ বর্ণনা করেন, একদা রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবায়ে কিরামের সামনে বনী ইসরাঈলের এক আবিদ ব্যক্তির কথা বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় বিরামহীন ভাবে এক হাজার মাস জিহাদ করেছেন। মহানবী (স)-এর এ বর্ণনা শুনে সাহাবায়ে কিরাম সে লোকটির প্রতি ঈর্ষান্মিত হয়ে পড়েন। তখন আল্লাহ তায়ালা এ দীর্ঘ সময়ের বিকল্প হিসেব উম্মতে মুহাম্মদীকে লাইলাতুল কদর প্রদান করেন। কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে পূর্বেকার উম্মতের মধ্যে কেউ আবিদ বলে গন্য হতো না যে পর্যন্ত সে বিরামহীনভাবে এ হাজার মাস ইবাদতে মশগুল থাকতেন। আল্লাহ তায়ালা শেষ নবীর উম্মতের এ রাত প্রদান করে ঘোষনা করেন যে, এ রাত এক হাজার মাসের চেয়ে উত্তম।
কদরের রাত চিনার উপায় : (১) এ রাতটি গভীর অন্ধকারে ছেয়ে যাবে না (২) এ রাতটি নাতিশীতোষ্ণ হবে (৩) মৃদু-মন্দ বাতাস এ রাতে প্রবাহিত হবে, (৪) এ রাতে ইবাদত করে মানুষ বেশী পরিতৃপ্ত হবে, (৫) এ রাতে হালকা বৃষ্টি হবে, (৬) সকালে হালকা বৃষ্টি হবে। (৭) সকালে হালকা আলোক রশ্মিসহ সুর্যোদয় হবে, যা হবে পূর্ণিমার চাঁদের ন্যায় (সহীহ্ বুখারী, হাদীস নং ২০২১) সহীহ্ মুসলীম, হাদীস নং- ৭৬২, সহীহ ইবন খুজায়ইমা, হাদীস নং ২১৯০।
কদর রাতের ইবাদত: মহানবী (স) মাহে রমযানের প্রথম ২০ রজনী পূর্ণ রজনী জাগ্রত থাকতেন না। কিছু সময় ইবাদত করতেন এবং কিছু সময় নিদ্রা যেতেন। কিন্তু রমযানের শেষ দশ রাতে তিনি বিছানায় যেতেন না। সমস্ত রাত ইবাদতে কাটিয়ে দিতেন। তিনি কুরআন তিলাওয়াত, সালাত আদায়, সদকা প্রদান, জিকির-আযকার, দোয়া তাসবীহ-তাহলীল ও কান্দাকাটি করতেন। তিনি নিজে যেমন অনিন্দ্রায় রাত কাটাতেন তেমনি তাঁর পরিবারের সদস্যদেরকেও রাত্রে জাগিয়ে দিতেন। কদর রাতের ফযীলত লাভ করার জন্য তিনি শেষ দশদিনের পুরো সময়টাতে ইতেকাফে রত থাকতেন (মুসলিম হাদীস নং ১১৬৫)। প্রিয় নবী (স) এর অনুসরনে এ রাতটি কুরআন তিলাওয়াত, নফল নামাজ, যিকির-আযকার, ইসতেগফার, তাসবীহ-তাহলীল ও দোয়া মুনাজাতে কাটিয়ে দেয়া উচিত। হযরত আয়েশা (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স) কে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল। আমি যদি কোন ক্রমে অনুধাবন করতে পারি যে, আজই লাইলাতুল কদর, তাহলে আমি এ রাত্রে কি দোআ পড়বো? রাসুলুল্লাহ (স) বলেন-তুমি এ দোয়া পড়বে- আল্লাহুমা ইন্নাকা আফুব্বুন তুহিববুল আফওয়া ফা’ফু আন্নী। হে আল্লাহ তুমি পরম ক্ষমাশীল, তুমি ক্ষমাকে পছন্দ কর, সুতরাং আমাকে ক্ষমা করে দাও (তিরমিযী হাদীস নং ৩৫১৩)।  আল্লামা আলুসী (র) বলেছেন, কদরের রাত্রে সব ধরনের ইবাদত করা উচিত। যেমন নফল নামায,  কুরআন তিলাওয়াত, তাজবীহ-তাহলীল, ক্ষমা প্রার্থনা, দোয়া ইত্যাদি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ