ঢাকা, সোমবার 11 June 2018, ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২৫ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ভারতকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন মহিলা ক্রিকেট দল

রফিকুল ইসলাম মিঞা : এশিয়া কাপে এখনো শিরোপা জিততে পারেনি বাংলাদেশ পুরুষ ক্রিকেট দল। দুই দুইবার শিরোপার কাছে গিয়েও শিরোপা জয়ের উল্লাস করতে পারেনি সাকিব-মাশরাফিরা। এছাড়া ক'দিন আগেই ভারতের দেরাদুনে আফগানিস্তান ক্রিকেট দলের কাছে হোয়াইটওয়াশ হয়ে এসেছে সাকিব আল হাসানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। অথচ তাদের পিছনে ফেলে অবিশ্বাস্য এক অর্জন করে দেখালো বাংলাদেশ মহিলা ক্রিকেট দল। প্রথম বারেরমতো ফাইনালে উঠে দেশবাসীকে এশিয়া কাপের শিরোপা উপহার দিয়েছে দলটি। গতকাল এশিয়া কাপে ছয়বারের চ্যাম্পিয়ন ভারতকে ৩ উইকেটে হারিয়ে প্রথমবারের মতো এই শিরোপা জিতেছে বাংলাদেশ। যেকোনও পর্যায়ের ক্রিকেটে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের এটাই সেরা সাফল্য। আর এই সাফল্যটি আসল মহিলা ক্রিকেট দলের হাত ধরেই। ২০০৪ থেকে শুরু হয়েছে মেয়েদের এশিয়া কাপ ক্রিকেট। এই ক্রিকেটে ভারতের ছিল একক আধিপত্য। ভারত গত ৬ আসরের সবগুলোতেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। আর বাংলাদেশ এবারের আসরসহ তিনটি আসরে মাঠে নেমেছে। আগের দুই আসরে বাংলাদেশের মহিলা দল ভালো করতে না পারলেও তৃতীয় আসরে নেমে এবার শিরোপা জেতার স্বাদ পেয়েছে সালমারা। এতদিন ভারতের বিপক্ষে খেলা মানেই ছিল বাংলাদেশের হার। কিন্তু এবারই অসাধ্য সাধন করেছে বাংলাদেশ মহিলা দল। হারের বৃত্ত ভেঙে বাংলাদেশ এই টুর্নামেন্টেই জিতলো দুটিতে। গ্রুপ পর্বে ভারতকে হারানোর পর ফাইনালে হারিয়ে শিরোপা জয় করেছে। 
গতকাল কুয়ালালামপুরে ফাইনালে শিরোপা জয়ের ম্যাচে বাংলাদেশের সামনে টার্গেট ছিল ১১৩ রান। টার্গেটটা হাতের নাগালেই ছিল সালমাদের। ফলে  ১১৩ রানের লক্ষ্যে খেলতে নেমে খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি বাংলাদেশের। জাহানার-শুকতারার ব্যাটে সহজেই জয় এসেছে তিন উইকেটে। শেষ ওভারে জয়ের জন্য বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল ৯ রান। দ্বিতীয় বলে একটি চার মেরে সমীকরণটি অনেকটাই হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছিলেন রুমানা আহমেদ। পরের বলে একটি সিঙ্গেল নিয়ে তিনি ব্যাট করার সুযোগ দেন সানজিদা ইসলামকে। কিন্তু ওভারের চতুর্থ বলে সানজিদা উইকেট হারান। শেষ দুই বলে জয়ের জন্য তখন প্রয়োজন ৩ রানের। পঞ্চম বলে রুমানা ও সানজিদা এক রান নেন। রান পূর্ণ করার পর বোলিং প্রান্তে ক্রিজের বাইরে ছিলেন রুমানা। উইকেট ভেঙে তাকে রান আউট করেন ভারতীয় অধিনায়ক হারমাপ্রীত কাউর। ফলে বাংলাদেশের মেয়েদের জন্য সমীকরণটি বেশ কঠিন হয়ে যায় তখন। শেষ বলে জয়ের জন্য প্রয়োজন দুই রান। ব্যাট করছিলেন জাহানারা আলম। কাউরের করা শেষ বলে দুই রান নিয়ে দলকে জয় এনে দেন সাবেক এই অধিনায়ক। ব্যাট করতে নেমে ওপেনিং জুটিতে আয়েশা ও শামিমা শুরুটা ভালোই করেছিলেন। এই জুটিতে আসে ৩৫ রান। তবে ভারতীয় স্পিনার পুনম যাদবের পর পর দুই বলে আয়েশা ১৬ রানে ও শামিমা ১৭ রানে সাজঘরে ফিরলে কিছুটা বিপদে পড়ে বাংলাদেশ। দুই ওপেনারকে হারিয়ে ফারজানা হক ও মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান নিগার সুলতানা দেখেশুনে খেলতে থাকেন। যদিও অফস্ট্যাম্পের বাইরের একটি বল  খেলতে গিয়ে উইকেট কিপারের হাতে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফেরেন ফারজানা। ফলে ১১ রানে ফিরতে হয় তাকে। তবে চতুর্থ উইকেটে নিগার ও ওয়ানডে অধিনায়ক রুমানা মিলে জয়ের কাছেই নিয়ে যাচ্ছিলেন দলকে। তবে পুনম যাদবের ফুলটস বল মিড অনে খেলতে গিয়ে নিগার ক্যাচ তুলে দিলে দারুণ একটি ইনিংসের সমাপ্তি ঘটে। ২৪ বলে ৪ চারে ২৭ রানের ইনিংস খেলেন নিগার। ফলে দলকে জয় এনে দেয়ার দায়িত্ব ছিল ফাহিমা-রুমানার উপর। কিন্তু সাত রান করে আউট হন ফাহিমা খাতুন।  তবে ৬ষ্ঠ উইকেটে সানজিদা ও রুমানা মিলে জয়ের কাছেই ছিলেন। কিন্তু সানজিদা বাউন্ডারি লাইনে ক্যাচ দিয়ে বিদায় নেওয়ার পর পর রুমানাও ফিরে যান রান আউটে। ফেরার আগে ২২ বলে ২৩ রানের ইনিংস খেলেন অভিজ্ঞ এই অলরাউন্ডার। ফলে শেষ বলে জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল দুই রান। জাহানারা বলটি বাঁ পাশে ঠেলেই দ্রুত ২ রান নিতে চেষ্টা করে সফল হন। শেষ পর্যন্ত ৭ উইকেটে ১১৩ রান করে মহিলা ক্রিকেট দল নিজেদের করে নেয় প্রথম এশিয়া শ্রেষ্ঠত্বের ট্রফি। প্রথমবারের মতো মহিলা দল শিরোপা জয়ের উপলক্ষ এনে দেয় দেশবাসীকে। ম্যাচে দারুণ বল করেছেন ভারতীয় লেগস্পিনার পুনম যাদব। চার ওভার বল করে মাত্র ৯ রানে তিনি পেয়েছেন চার উইকেট। ২ উইকেট পেয়েছেন অধিনায়ক কাউর। তবে ফাইনাল ম্যাচে ম্যাচসেরা হয়েছেন রুমানা আহমেদ। তবে টুর্নামেন্ট সেরা ভারতের অধিনায়ক হারমানপ্রীত কর। এর আগে কিনরারা ওভালে টসে জিতে ব্যাট করতে নেমে ভারত ফাইনাল ম্যাচে বড় স্কোর করতে পারেনি। বাংলাদেশের বোলিং তোপে ৯ উইকেট হারিয়ে করে মাত্র ১১২ রান। শুরুতেই ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের বোলিং আক্রমণে চেপে ধরে বাংলাদেশ বোলাররা। দলীয় ১২ রানে স্মৃতি মন্ধানাকে ফিরিয়ে প্রথম উইকেট নেয় বাংলাদেশ। তাকে রান আউটের শিকার করে ফিরান অধিনায়ক সালমা খাতুন।  দলীয় ৩২ রানে চার উইকেট হারিয়ে সেই চাপটা আরও বাড়ে ভারতের। তবে শেষ পর্যন্ত অধিনায়ক হারমানপ্রীতের অসাধারণ ইনিংসের কল্যাণেই মান বাঁচে ভারতের। একপ্রান্তে থেকে রানের চাকা সচল রেখেছেন এই ব্যাটসম্যান। শেষ পর্যন্ত তার দায়িত্বশীল ৫৬ রানের ইনিংসে ভর করে ৯ উইকেটে ১১২ রাস করতে পারে ভারত। ইনিংসের শেষ বলে বিদায় নিয়েছেন ভারতীয় অধিনায়ক। তার ৪২ বলের ইনিংসে ছিল ৭টি চার। বাংলাদেশের পক্ষে দুটি করে উইকেট নেন খাদিজা তুল কুবরা ও রুমানা আহমেদ। একটি করে উইকেট নেন সালমা খাতুন ও জাহানারা।
বাংলাদেশ মহিলা ক্রিকেট দলের টি-টোয়েন্টি অভিষেক ২০১২ সালে। এশিয়া কাপের এই ফাইনালের আগে তারা খেলেছেন মোট ৪১ ম্যাচ। এই টুর্নামন্টের লিগ পর্বে টানা ৪ জয়ের আগে বলার মতো তেমন কিছুই ছিল না। মোটে তিনটি জয় ছিল খাতায়। হার ছিল ৩৩টি। কিন্তু এবার  ক্রিকেট বিশ্বকেই চমকে দিলেন মহিলা ক্রিকেট দল। এশিয়া কাপে এবার প্রথম ম্যাচে হার দিয়েই শুরু করেছিল বাংরাদেশ মহিলা ক্রিকেট দল। তবে প্রথম ম্যাচের পরই বদলে যায় বাংলাদেশ দল। শ্রীলংকার কাছে প্রথম ম্যাচে হারের পর একে একে  উড়িয়ে দিয়েছে পাকিস্তান, ভারত, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াকে। আর শাসরুদ্ধকর ফাইনাল ম্যাচে শক্তিশালী ভারতকে হারিয়ে এশিয়ার সেরার খাতায় নাম লেখালো বাংলাদেশ। আগের ৬ এশিয়া কাপেরই চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ভারত। এবার তাদের শিরোপাবঞ্চিত করে বাংলাদেশকে উৎসবে ভাসালেন সালমারা। বাংলাদেশের পুরুষ দল এই মালয়েশিয়া থেকেই ১৯৯৯ বিশ্বকাপ খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশের এখনো পর্যন্ত কোনো শিরোপা জেতা হয়নি। তবে মহিলা ক্রিকেট দলের হাত ধরেই প্রথম কোনো টুর্নামেন্টের শিরোপা এলো।
সংক্ষিপ্ত স্কোর :
ভারত : ১১২/৯ (২০ ওভার) (মিথালি ১১, স্মৃতি ৭, দিপ্তি ৪, কাউর ৫৬, অনুজা ৩,  ভেদা ১১, তানিয়া ৩, শিখা ১, ঝুলন ১০, একতা ১*; নাহিদা ০/১২, সালমা ১/২৪, খাদিজা ২/২৩, জাহানারা ১/২৩, রুমানা ২/২২, ফাহিমা ০/৮)।
বাংলাদেশ : ১১৩/৭ (২০ ওভার) (শামিমা ১৬, আয়েশা ১৭, ফারজানা ১১, নিগার ২৭, রুমানা ২৩, ফাহিমা ৯, সানজিদা ৫, জাহানারা ২*, সালমা ০*; বিস্ট ০/১৩, শিখা ০/১০, দিপ্তি ০/১৯, অঞ্জু ০/২৩, পুনম ৪/৯, ঝুলন ০/২০, হারমানপ্রিত ২/১৯)।
ফলাফল : বাংলাদেশ ৩ উইকেটে জয়ী।
প্লেয়ার অব দ্যা ম্যাচ : রুমানা আহমেদ।
প্লেয়ার অব দ্য টুর্নামেন্ট : হারমানপ্রিত কাউর।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ