ঢাকা, সোমবার 11 June 2018, ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২৫ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আজ খালেদা জিয়ার জামিন আবেদনের ফের শুনানি

স্টাফ রিপোর্টার : কুমিল্লায় নাশকতার অভিযোগে বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিন আবেদনের শুনানি আজ সোমবার পর্যন্ত মুলতবি রেখেছে হাইকোর্ট। বিচারপতি মো. শওকত হোসেন ও বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমানের হাই কোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেয়।
আদালতে জামিন আবেদনের পক্ষে ছিলেন খন্দকার মাহবুব হোসেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। সঙ্গে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি মনিরুজ্জামান রুবেল ও এ কে এম আমিন উদ্দিন মানিক।
খালেদার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ব্যক্তিগতভাবে মনে হচ্ছে, দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচার ব্যবস্থার ওপর আমরা আর আস্থা রাখতে পারছি না। এই ধরনের অবস্থায় আইনজীবীরা কতদিন সুপ্রিম কোর্টের ওপর আস্থা রাখতে পারবে! মানুষ হয়ত এটাকে প্রত্যাখ্যান করে আইন নিজেদের হাতে তুলে নেবে, সেই দিনের অপেক্ষায় আমরা আছি।
এদিকে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, গত ৫ জুন ইফতারির ঠিক আগে আগে খালেদা জিয়ার সুগার লেভেল কমে গিয়েছিল। সেই জন্য তিনি যে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন, এটা ঠিক না। বা অজ্ঞান ছিলেন, এটাও ঠিক না।
ঢাকায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মানহানির একটি মামলায় জামিন চেয়ে করা আবেদনটি নিষ্পত্তি করে গত ৩১ মে আদেশ দেয় আদালত। সে দিন আবেদনটি নিষ্পত্তি করে দিলেও মৌখিক আদেশে হাই কোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল গ্রেপ্তার দেখাতে খালেদা জিয়ার পক্ষে সংশ্লিষ্ট আদালতে যে আবেদন করা হয়েছে, তা গ্রহণ করে নিষ্পত্তি করার জন্য। কিছু পর্যবেক্ষণসহ সেই আদেশটিই গত বুধবার প্রকাশ করা হয়।
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মানিক বলেন, অ্যাটর্নি জেনারেল আদালতে মানহানি মামলার ওই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করার প্রস্তুতির কথা বলে সময় চাইলে আদালত আজ সোমবার শুনানির জন্য রাখে। গত ৫ জুন এ মামলায় জামিন আবেদন করেন খালেদা জিয়া। ২০ দলীয় জোটের অবরোধ চলাকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চৌদ্দগ্রামে বাসে দুষ্কৃতিকারীদের ছোড়া পেট্রোল বোমার ঘটনায় ২০১৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি পুলিশ বাদী হয়ে এ মামলা করে।
গত ২৮ মে কুমিল্লার একটি আদালতে গ্রেপ্তার দেখানোর পর জামিন আবেদন করেন খালেদা জিয়া। সে আবেদন নামঞ্জুর করে ৮ অগাস্ট পরবর্তী দিন ধার্য করেন আদালত। ওই আদেশের বিরুদ্ধে হাই কোর্টে জামিনসহ আপিল আবেদন করেন খালেদা জিয়া। এদিকে একই মামলা বাতিলে হাই কোর্টে আরও একটি আবেদন বিচারাধীন রয়েছে।
৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ৫ বছরের কারাদ-াদেশ নিয়ে পুরান ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোডের পুরাতন কারাগারে বন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
সর্বোচ্চ আদালতের ওপর আস্থা রাখতে পারছি না: খন্দকার মাহবুব
অ্যাটর্নি জেনারেলের আবেদনে জামিন শুনানি মুলতবির পর খন্দকার মাহবুব সাংবাদিকদের বলেন, যে কারণে ট্রাইব্যুনাল জামিনের আবেদন নাকচ করে দিয়েছে, সেটা ঠিক না। সেখানে বলা হয়েছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়ে আসে নাই, যে কারণে জামিন আবেদন শোনা যায় না। আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, খালেদা জিয়া জেলে আছেন, ফলে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি বা না জারির কোনো প্রশ্ন আসে না। এই একই আদেশের বিরুদ্ধে ভিন্ন একটি সিনিয়র বেঞ্চ আদেশ দিয়েছেন যে, বিচারক ভুল পথে অগ্রসর হয়েছেন। ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। জামিন আবেদনের সঙ্গে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কোনো সম্পর্ক নাই। অতএব অবিলম্বে তার জামিনের আবেদনের শুনানি করা হোক। এই একই ধরনের একটি আদেশ নিয়ে আমরা এই কোর্টে আবেদন করেছি।
জামিন শুননির বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “আজ তিনি ভিন্নরূপে আবির্ভূত হয়েছেন। অ্যাটর্নি বলেছেন, সরকারের নির্দেশ বা সিদ্ধান্ত হল হাই কোর্টের সিনিয়র বেঞ্চ যে আদেশ দিয়েছে ওই আদেশের বিরুদ্ধে তারা আপিল দায়ের করবে।
তিনি বলেন, আমরা ক্ষুব্ধ, লজ্জিত এই কারণে যে, অ্যাটর্নি জেনারেল যেহেতু আপিল বিভাগে যাবেন সেহেতু আজকে এটা মুলতবি করা হল। এর অর্থ অ্যাটর্নি জেনারেলের সম্মতি ছাড়া আপাত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত কোনো আদেশ দিচ্ছেন না। অ্যাটর্নি জেনারেল সময় চেয়েছেন আদালত তাকে সময় দিয়েছেন। আবার তিনি সময় চাইবেন হয়তো আবার সময় দিবেন। এমনও হতে পারে যে, অ্যাটর্নি জেনারেলের সম্মতি হলে তখন বেগম খালেদা জিয়ার জামিন হবে। আমাদের সেই অপেক্ষায় থাকতে হবে।
খালেদার এই আইনজীবী বলেন, ব্যক্তিগতভাবে মনে হচ্ছে, দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচার ব্যবস্থার ওপর আমরা আর আস্থা রাখতে পারছি না। এই ধরনের অবস্থায় আইনজীবীরা কতদিন সুপ্রিম কোর্টের ওপর আস্থা রাখতে পারবে! মানুষ হয়ত এটাকে প্রত্যাখ্যান করে আইন নিজেদের হাতে তুলে নেবে, সেই দিনের অপেক্ষায় আমরা আছি।
খালেদা জিয়ার সুগার লেভেল কমে গিয়েছিল: অ্যাটর্নি জেনারেল
এদিকে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে খালেদার আইনজীবীদের দেওয়া বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।
খালেদা জিয়া অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন বলে যে বক্তব্য তার আইনজীবীরা দিয়েছেন, তা প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার স্বাস্থের বিষয়ে যে বক্তব্য আদালতে (খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা) রেখেছেন, আমি জানি এ বিষয়টি নিয়ে তারা নানারকমভাবে মিডিয়া মাতাবেন। অনেক কিছু বলবেন। তাই আমি আদালতে যাওয়ার আগে আইজি প্রিজনের সাথে আলাপ করেছি। আইজি প্রিজন যে তথ্য আমাকে দিয়েছেন তা হল, গত ৫ জুন ইফতারির ঠিক আগে আগে উনার সুগার লেভেল কমে গিয়েছিল। সেই জন্য তিনি যে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন, এটা ঠিক না। বা অজ্ঞান ছিলেন, এটাও ঠিক না। সুগার লেভেল পড়ে যাওয়ায় উনি দাঁড়ানো থেকে ঘুরে গিয়েছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাকে চকলেট খাইয়ে ঠিক করা হয়েছিল। এই বয়সে যার ডায়াবেটিক আছে তার সুগার লেভেল তো সারাদিনের পরে একটু এদিক-ওদিক হতেই পারে।”
কুমিল্লায় নাশকতার অভিযোগে বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় খালেদা জিয়ার জামিন চেয়ে করা আবেদনের শুনানি মুলতবির পর গতকাল রোববার সুপ্রিম কোর্টে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা।
শনিবার খালেদার ব্যক্তিগত চিকিৎসকরা দেখে এসে বলেছিলেন, গত ৫ জুন বিএনপি চেয়ারপারসনের ‘মাইল্ড স্ট্রোক’ হয়েছিল বলে তারা ধারণা করছেন। সেই কারণে তিনি পড়ে গিয়েছিলেন।
চিকিৎসকরা ‘মাইল্ড স্ট্রোক’ বলে সন্দেহ প্রকাশ করায় রোববার স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য খালেদা জিয়াকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে নেওয়া হয়।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এটা আমার কাছে বিশেষ রকম ব্যাপার মনে হয়, আজ একটি মামলার তারিখ। আর তার আগের দিন গতকাল তার চিকিৎসকরা কারাগারে গেলেন। আর এসেই এমন একটা প্রেস কনফারেন্স করে ফেললেন যে, তিনি অজ্ঞান ছিলেন। তিনি যদি অজ্ঞান হতেন, তাহলে নিশ্চয়ই আইজি প্রিজনের কাছে রিপোর্ট থাকত, সিভিল সার্জন জানত। এগুলো নিয়ে তারা একটি জনমত সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। উনি অজ্ঞান হননি, উনার সুগার লেভেল কমে গিয়েছিল। এই হল আসল কথা।
খালেদা জিয়ার মাইল্ড স্ট্রোক হয়েছে বলে চিকিৎসকদের ধারণার বিষয়ে মাহবুবে আলম বলেন, এটাও ঠিক না। তিনি অসুস্থ হলে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে এনে স্ক্যান করা হতো। তার চিকিৎসায় সরকার কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে, কোনো আসামীর ব্যাপারে আপনারা দেখেছেন ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের যেতে দেওয়া হয়? কিন্তু তারা যাতে সরকারকে কোনো রকম দোষারোপ করতে না পারে এজন্যই সরকার বেশ কয়েকবার তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের জেলে যেতে অনুমতি দিয়েছে।
তিনি বলেন, দুঃখজনক ব্যাপার হল চিকিৎসকরাও যদি রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে যান এবং এ ধরনের কথা বলেন, তাহলে এটা দুঃখজনক। তিনি অজ্ঞান হননি। অথচ তারা বলছে সাত-আট মিনিট অজ্ঞান ছিলেন।
আজকে মামলার শুনানি অথচ ব্যক্তিগত চিকিৎসকরা গতকাল গেলেন তার সঙ্গে দেখা করতে। ৫ জুন যদি তিনি অজ্ঞান হতেন তাহলে সেদিনই বিষয়টি মিডিয়াতে আসত। কিন্তু তা আসেনি। আজ ১০ জুন। এ বিষয়টি নিয়ে ঘোলাটে করার চেষ্টা হচ্ছে। একটা বিভ্রান্ত তথ্য দেওয়া হচ্ছে। আদালতের সহানূভুতি পাওয়ার জন্যেই তারা এমন করছে।
অ্যাটর্নি জেনারেলের সম্মতি ছাড়া খালেদা জিয়ার জামিন মিলবে না, খন্দকার মাহবুবের এ বক্তব্যের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে মাহবুবে আলম বলেন, এটা শুধু মিথ্যা কথা নয়, দুঃখজনক এবং আদালত অবমাননাকর। আদালত কারো কথায় চলে না। আমার বা সরকারের কথায় চলার তো প্রশ্নই আসে না। এসব কথা শুনে মনে হচ্ছে, তারা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন।
তিনি বলেন, আমাদের বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীন। খালেদা জিয়াকে (হাই কোর্ট) জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় জামিন দিয়েছেন। সুতরাং এ রকম কোনো অভিযোগ করা অহেতুক যে, অ্যাটর্নি জেনারেলের সম্মতি ছাড়া কোনো জামিন হবে না। বহু মামলায় তারা জামিন নিয়েছেন এবং নিচ্ছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ