ঢাকা, সোমবার 11 June 2018, ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২৫ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

যানজটে অপূরণীয় ক্ষতি

বাঙ্গাল আবদুল কুদ্দুস : শুধুমাত্র রাজধানী ঢাকা মহানগরীতেই নজিরবিহীন যানজটের কারণে বছরে আর্থিক ক্ষতি হয় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণায় এ তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত গবেষণার তথ্যে বলা হয়েছে, রাজধানী ঢাকা মহানগরীতে নজিরবিহীন যানজটের কারণে নষ্ট হয় ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা, যার আর্থিক মূল্য ৩৭ হাজার কোটি টাকা। এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বুয়েটে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা বৈঠকে ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. মোয়াজ্জেম হোসেন বলেছেন, ঢাকা মহানগরীতে তীব্র যানজটের কারণে পিক আওয়ারে গণপরিবহনগুলোর গতিবেগ ঘণ্টায় ৫ কিলোমিটারে আসে, যেখানে পায়ে হেঁটে চলার গতিও ৫ কিলোমিটার। তার মতে, যানজট যদি ৬০ শতাংশ কমিয়ে আনা যেত তাহলে অন্তত ২২ হাজার কোটি টাকা বেঁচে যেত। উল্লেখ করা যায় যে, যানজট কেবলমাত্র রাজধানী ঢাকা মহানগরীরই সমস্যা নয়, সারাদেশেরই সমস্যা আর সংকট সৃষ্টি করেছে। গত কিছুদিন ধরে দেশের অর্থনীতির লাইফ লাইনখ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে নজিরবিহীন যানজট ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। দেশ স্বাধীনের পর থেকে সকল রেকর্ড ভঙ্গকারী এই যানজট ১২০ থেকে ১৩৯ কিলোমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ হয়েছে। ঘণ্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকে প্রাইভেট কার, রোগীবাহী এ্যাম্বুলেন্স, যাত্রীবাহী বাস, মালবাহী ট্রাক, লরি ইত্যাদি গাড়ি এক হাতও এগুতে না পারার মতো বাস্তবতাও দেখা গেছে। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম ৫/৬ ঘণ্টার রাস্তা। অথচ গন্তব্যে পৌঁছতে ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে। এই নজিরবিহীন যানজটে হাজার হাজার যানবাহনের চালক, যাত্রীদের বিশেষ করে মহিলা, শিশু, কিশোর-কিশোরী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা ও রোগীদের কী যে বিড়ম্বনা ও ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে যার বর্ণনা করা সত্যিই দুষ্কর। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দৈনিক গাড়ি চলাচল করে ২৫ থেকে ৩০ হাজার। এর ৬০ শতাংশ পণ্যবাহী গাড়ি। কাজেই এমন যানজটের কারণে ব্যবসায়ীদের কতটা ক্ষতি হয়, পণ্যমূল্যে যানজটের ক্ষতি সংযুক্ত হয়ে কীভাবে ক্রেতা সাধারণের পকেটের টাকা শেষ হয়ে যায় তা সহজেই অনুমেয়। বিনিয়োগ বোর্ডের এক গবেষণা থেকে জানা যায়, সারাদেশে এই যানজটের কারণে বছরে আমাদের জাতীয় অর্থনীতির ক্ষতি হয় এক লাখ কোটি টাকা। অর্থনৈতিক এই ক্ষতির পরিমাণ আমাদের জাতীয় বাজেটের প্রায় অধিক এবং এই টাকা দিয়ে বছরে অন্তত পাঁচটি পদ্মাসেতু নির্মাণ করা সম্ভব।
আওয়ামী সরকারের একটানা সাড়ে ৯ বছর ধরেই তথাকথিত উন্নয়নের জোয়ারের মধ্যে রাজধানী ঢাকা মহানগরীতে নজিরবিহীন যানজটে নাগরিক জীবন বিপন্ন প্রায়। সড়ক থেকে গলির রাস্তা কোনটাই যানজট থেকে মুক্ত নয়। কখনো কখনো বিশেষ করে যখন কোন ভিআইপি কোথাও যান বা আসেন তখন যানজট দুর্বিষহ হয়ে পড়ে। যানজটের বড় কারণ তো এই যে, দেড়-পৌনে দুই কোটি মানুষের বসবাসস্থল এই মহানগরীতে যে পরিমাণ রাস্তা থাকার কথা তা নেই। দ্বিতীয়ত, রাস্তার তুলনায় গাড়ির সংখ্যা অনেক অনেক বেশি। এরই সাথে লাখ লাখ অযান্ত্রিক যানবাহনও চলাচল করে। এমন বাস্তবতায় যানজট হতে বাধ্য। উল্লেখ করা যাচ্ছে যে, অনিয়ম-অব্যবস্থা, ঘুষ-দুর্নীতির কারণে কোথাও কোন কিছুই ঠিকঠাক মতো নেই। অপরিসর ট্রাফিক সংযোগস্থল, সড়কে অবৈধ পার্কিং, বেপরোয়া চাঁদাবাজি, ফুটপাত দখল, রিকশা-সিএনজির জটলা, গণপরিবহনে যত্রতত্র যাত্রী উঠানো-নামানো, বিভিন্ন সেবা সংস্থার নির্মাণ-মেরামতে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, ত্রুটিপূর্ণ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি কারণে যানজট অপরিহার্য বাস্তবে পরিণত হয়েছে। ড. মোয়াজ্জেম হোসেন যানজট ৬০ শতাংশ কমিয়ে আনার যে কথা বলেছেন তা কেবল সম্ভব হতে পারে যদি যানবাহন চলাচলের ক্ষেত্রে যথাযথভাবে নিয়ম-শৃঙ্খলা বিধান করা যায়, রাস্তা ও ফুটপাত দখলমুক্ত করা যায়, সেবা সংস্থাগুলোর কাজের ক্ষেত্রে সমন্বয় সাধন করা যায় এবং কাজের পর রাস্তা অতি দ্রুত মানসম্মত মেরামত করা যায়। দেখা যায় গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলো বারো মাসই ভাঙ্গাচোরা ও খানাখন্দে ভরা থাকে। এ ধরনের রাস্তায় যে কোন গাড়ি স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারে না। ফলে যানজট দেখা দেয়। রাজধানীর রাস্তাগুলো যতটা সম্ভব সম্প্রসারণ ও মসৃণ করা হলে গাড়ির গতি বাড়বে, যানজট সৃষ্টি হবে না। প্রাইভেট গাড়ির সংখ্যা হ্রাস এবং অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচলে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে। রাজধানী ঢাকা মহানগরীর সীমাহীন যানজটে এই কারণগুলো কারো অজানা নয়। সরকারের দায়িত্বশীল মহল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও জানে। কিন্তু রাস্তাঘাট, সুযোগ-সুবিধা ও সিস্টেম যেখানে যে অবস্থায় যতটুকু আছে তা কাজে লাগিয়ে অধিকতর সেবা ও সুফল নিশ্চিত করার জন্য সরকারের কার্যকর কোন উদ্যোগ নেই কেন? প্রতিটি রাস্তা ও ফুটপাত স্থায়ীভাবে দখলমুক্ত করা, গণপরিবহনগুলোকে একটা সুশৃঙ্খলে এনে ট্রাফিক নিয়ম-বিধি মোতাবেক সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা এবং সেবা সংস্থাগুলোর কাজের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা কী অসম্ভব? আমরা মনে করি মোটেও না। সদিচ্ছা থাকলে অবশ্যই এই জনগুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো দ্রুত করা সম্ভব। মানুষের ক্ষেত্রে মুখম-ল যেমন, দেশের ক্ষেত্রে রাজধানী শহরও ঠিক তেমনি। আমাদের রাজধানী ঢাকা মহানগরী নজিরবিহীন যানজট, দূষণ, পানিবদ্ধতা, অনিরাপত্তা ইত্যাদি কারণে মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে আছে। কবে এ অবস্থার অবসান হবে তা কী কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারেন?
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, যানজট শুধু রাজধানী ঢাকা মহানগরীরই নয়, গোটা দেশেরই সমস্যা আর সংকট। তাই এর সমাধানও জাতীয়ভাবেই করতে হবে। সরকার অনেকটা প্রতিযোগিতাভাবে একের পর এক মেগা উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিচ্ছে। সরকারের ভাষায় দেশে এখন আওয়ামী উন্নয়নের জোয়ার বইছে। অথচ যানজট নিরসনে কোন উদ্যোগ নেই, প্রকল্পও নেই। পদ্মা সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। আওয়ামী সরকারের একটা গর্বের মেগা প্রকল্প। সেতুটি নির্মিত হলে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যোগাযোগ, যাতায়াত, ব্যবসা-বাণিজ্য ও উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। এটা সত্য। কিন্তু পদ্মা সেতুমুখী দু’দিকের সড়ক-মহাসড়ক যদি যানজটে অচল হয়ে পড়ে তাহলে কি ঐ সেতুর প্রত্যাশা অনুযায়ী সুবিধা পাওয়া যাবে। যমুনা সেতু থেকে কি পাওয়া যাচ্ছে? রাজধানী ঢাকা থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত যেতে কিংবা যমুনা সেতু থেকে ঢাকা পর্যন্ত আসতে অনেক সময় ২০-২২ ঘণ্টা পার হয়ে যায়। বলা যায়, দেশের এমন কোন সড়ক-মহাসড়ক নেই যেখানে কম বা বেশি যানজট নেই। নিত্যদিন নজিরবিহীন যানজট জনদুর্ভোগের পাশাপাশি অর্থনীতির চাকা থামিয়ে দিচ্ছে। এই অবস্থা কী আরো বছরের পর বছর ধরে চলতেই থাকবে? আমরা মনে করি, দেশের কাক্সিক্ষত উন্নয়নের জন্য ছোট-বড়-মেগা সব ধরনের উন্নযন প্রকল্পই গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। তাহলেই কেবল আমাদের উন্নয়ন-আকাক্সক্ষা পূরণ হতে পারে। মনে রাখতে হবে, সড়ক-মহাসড়ক উন্নয়ন বা সড়ক যোগাযোগের মসৃণতা যে কোন উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত। কাজেই আমাদের যতটা সড়ক আছে তা যথাযথভাবে রক্ষা করতে হবে। দেশে সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের (সওজ) আওতাধীন সড়ক-মহাসড়ক আছে প্রায় ২১ হাজার কিলোমিটার। ঐ অধিদফতরের মহাসড়ক ব্যবস্থাপনা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে এই সড়ক-মহাসড়কের ২৬ দশমিক ৩২ শতাংশের অবস্থা একেবারেই বেহাল। দেড় হাজার কিলোমিটারের বেশি রাস্তা চলাচলের অযোগ্য। আর এক হাজার ৭৩ কিলোমিটার রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ। খারাপ রাস্তায় যানবাহনের ধীরগতি ও যানজট অবশ্যাম্ভাবী। দেখা যাচ্ছে কোন সড়ক বা মহাসড়কে যানজট লাগার পর অন্যান্য সড়ক-মহাসড়কেও তার প্রভাব পড়েছে। বৃষ্টি-বন্যায় রাস্তাঘাটের ক্ষতি হওয়া স্বাভাবিক। আমাদের বাংলাদেশের রাস্তার বেহাল দশার জন্য বৃষ্টি-বন্যা বিশেষভাবে দায়ী। প্রশ্ন হচ্ছে, বৃষ্টি-বন্যা বিশ্বের আরো অনেক দেশেই হয়। কিন্তু ঐসব দেশে রাস্তাঘাটের এমন বেহাল অবস্থায় পড়ে থাকে না।
বলা বাহুল্য, আমাদের দেশে নির্মাণে ত্রুটি, সংস্কারে ত্রুটি এবং বেপরোয়া লুটপাটের কারণে রাস্তাঘাট তথা সড়ক-মহাসড়কের এই মরণদশা। সরকারের এদিকে বেশি গুরুত্ব দেয়া দরকার। সরকারকে সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ, উন্নয়ন, মেরামতে অনিয়ম, অব্যবস্থা, দলবাজি, কমিশনবাজি, স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি ও অর্থ লুটপাট অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। মনে রাখতে হবে গতিশীল ও মসৃণ সড়ক-মহাসড়ক উন্নয়নের অন্যতম মাধ্যম।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ