ঢাকা, সোমবার 11 June 2018, ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২৫ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

গণতন্ত্রহীন দেশে উন্নয়নশীল তকমা

মো. তোফাজ্জল বিন আমীন : পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে কোথাও অগণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা দীর্ঘ মেয়াদে যেমন সুফল বয়ে আনেনি তেমনি অন্যায়, অবিচার, জুলুম, নিষ্ঠুরতাও কল্যাণ বয়ে আনেনি। আইনের শাসনকে উপেক্ষা করে মানুষের কথা বলার অধিকারকে হরণ করে কোনো রাষ্ট্রই উন্নয়নের মহাসড়কে যেতে পারেনি। যেমনটি পারেনি জিম্বাবুয়ের স্বৈরশাসক রবার্ট মুগাবে। জিম্বাবুয়ের শাসক হিসেবে শতবর্ষী রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার মনোবাসনা ছিল তাঁর। কিন্তু ৯৩ বছর বয়সের মাথায় এসে ক্ষমতার রাজসিংহাসনের নিয়ন্ত্রণ হারাইতে বাধ্য হয়েছে। যে দেশে গণতন্ত্র নেই সে দেশে উন্নয়নশীল তকমা পুরোপুরি অর্থহীন। কারণ এটি জনগণের কাজে আসে না। যে দেশে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ থাকে না সেখানে মানুষের কথা বলার অধিকারটুকু সংকোচিত হয়ে যায়। আইনের সুশাসন ব্যতীত উন্নয়নশীল দেশের তকমা লাগানো অর্থহীন। কারণ সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশ ছাড়া কখনো সত্যিকারের উন্নয়ন সম্ভব নয়।
আমরা যে সময়টাতে বসবাস করছি সে সময়টা মোটেও সুখকর নয়। প্রতিনিয়ত গুম, খুন, অপহরণ, দুর্নীতি, সড়ক দুর্ঘটনা ও বন্দুকযুদ্ধের মিছিলের সাড়ি সাড়ি লাশ ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রকে ভাবিয়ে তুলছে। আমরা একটা ভয়ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বসবাস করছি। এহেন পরিস্থিতিতে মানবাধিকার লঙ্ঘন করার বিষয়টি শুধু আমাদেরকে ভাবিয়ে তুলছে তা কিন্তু নয়! আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও বাংলাদেশের বিরাজমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্যসেনের মতে জনসাধারণের সক্ষমতার বিকাশই উন্নয়ন। তিনি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে বলেছেন, মানবসম্পদের প্রায় সবকটি সূচকেই ভারত ও পাকিস্তান থেকে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। তবে এটি ভালো সংবাদ হলেও বাস্তবে বাংলাদেশের প্রকৃত ভগ্ন ও নগ্ন অবস্থাকে আড়াল করে উন্নয়নশীল তকমার সাইনবোর্ড লাগানো সুখকর নয়! শ্রীলংকা মানবসম্পদের সব সূচকে বাংলাদেশ থেকে এগিয়ে থাকলেও শ্রীলংকা নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা হয় না।
একটি সমাজ বা রাষ্টকে উন্নয়নশীল হতে হলে অবশ্যই যোগ্যতার মাপকাঠিতে তিনটি বিষয় থাকা অপরিহার্য। যেমন- মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক ঝুুঁকিহ্রাস। অথচ এই তিনটি সূচকেই বাংলাদেশের অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ! স্বাধীনতার ৪৬ বছর পেরিয়ে গেলেও দেশের নাগরিকদের মাথাপিছু আয়ের হিসবাটা শতভাগ সঠিক বলা যাবে না বরং অনেকটা গরমিল। উন্নয়নের মাপকাঠি যদি সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, ফার্মাস ব্যাংক, হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, ডেসটেনি ও শেয়ারমার্কেট লুটেরাদের সম্পদকে ধরে করা হয়, তাহলে তো উন্নয়নের জোয়ার চোখে পড়বেই। উন্নয়ন একেবারে হয়নি তা কিন্তু নয়! উন্নয়ন যা হয়েছে তার চেয়ে হাজারগুন বেশি লুটপাট হয়েছে যা উন্নয়নের অন্তরায়। একটি দেশের জিডিপির পরিমাণ বাড়লেই কেবল উন্নয়নশীল দেশ হয়ে যায় না। ভারতে যখন জিডিপি ৮ শতাংশ ছাড়িয়েছে তখনো বিশ্বের ক্ষুধার্ত মানুষের তালিকায় ভারত ছিল শীর্ষে। প্রায় ৮০ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে, ১৯ কোটি মানুষ অপুষ্টিতে ভুগেছে আর প্রতিদিন ৪১ জন ভারতীয় কৃষক আত্মহত্যা করছে। সিপিডির এক গবেষণায় দেখা গেছে,বাংলাদেশে গত ৬ বছরে জিডিপির পরিমাণ যেভাবে বাড়ছে তাতে স্পষ্ট হয়েছে যে দেশের ৫ শতাংশ ধনী মানুষের আয় বেড়েছে ৩২ হাজার কোটি টাকা,আর ৫ শতাংশ গরিব মানুষের আয় কমেছে ১০৫৮ টাকা। অর্থাৎ মাথাপিছু আয়ের এই সূচকটি সত্যিকার অর্থে একটি দেশের উন্নয়, আইনের শাসন, মানুষের ভালো থাকা আর মন্দ থাকার বিষয়টিকে বোঝায় না। উন্নয়নশীল দেশের খেতাব শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মিলছে তা কিন্তু নয়! বাংলাদেশের সঙ্গে সঙ্গে আফগানিস্তান আর মিয়ানমারের মতো দেশও উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। যদিও ২০২১ সালের মধ্যে সবগুলো পরীক্ষায় পাস করলেই কেবল ২০২৪ সালে মধ্যম আয়ের দেশ হওয়া সম্ভব। নতুবা এ স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই থেকে যাবে।
শুধুমাত্র উন্নয়নের চাকা আর গালভরা বুলি দিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়া যায় না। দেশকে সত্যিকার অর্থে উন্নয়নের মহাসড়কে নিতে হলে প্রয়োজন সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশ। গণতন্ত্রবিহীন উন্নয়ন বর্ষার বাদলে ডুবে যায়। তবে যেসব দেশে গণতন্ত্র আছে সেখানে উন্নয়নের ভাটা পড়েছে এমন কথা শোনা যায়নি। উন্নয়ন ও গণতন্ত্র একটি অপরটির পরিপূরক। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটিকে বাস্তবায়ন করা দেশের জন্য মঙ্গল বয়ে আনে না। স্বাধীনতার ৪৬ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, ক্ষমতায় যাওয়ার আগে গণতন্ত্রের জন্য মায়াকান্না করেছে। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে অতীতও ভুলে স্বৈরতান্ত্রিক পথে পা বাড়িয়েছেন। দুর্নীতি আর উন্নয়ন একসাথে চলতে পারে। কিন্তু গণতন্ত্র আর স্বৈরতন্ত্র এক সাথে চলতে পারে না। দেশে যে হারে দুর্নীতি,স্বজনপ্রীতি আর লুটপাট হচ্ছে, তাতে করে জিডিপি বাড়ে কিভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর সাধারণ মানুষের জানার কথা নয়। কারণ আমাদের দেশের সব মানুষই জিডিপি সর্ম্পকে জ্ঞান রাখেন তা কিন্তু নয়! তবে প্রতিটি মানুষের জানা উচিত বাংলাদেশের জনগণের মাথাপিছু আয় কত! আর মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ কত! এই দুটি বিষয়ের জ্ঞান থাকলে রাজনীতির গোলক ধাঁধার অনেক প্রশ্নের উত্তর জানা যাবে। অনেকের ধারণা দুর্নীতি হলে জিডিপি বাড়ার সুযোগ নেই। অথচ অর্থনীতিতে লেনদেন বাড়লেই জিডিপি বাড়ে। রাস্তা, কালভার্ট, ফ্লাইওভার নির্মাণে সবচেয়ে বেশি ব্যয় আমাদের দেশে হয়। গ্লোবাল কম্পেটিটিভ ইনডেক্স বলছে, এশিয়ার মধ্যে নেপালের পরেই সবচেয়ে খারাপ রাস্তা বাংলাদেশে। অন্যান্য দেশের তুলনায় দ্বিগুণ-তিনগুণ অর্থ ব্যয়ে রাস্তা নির্মাণ করা হলেও বছরের মাথায় ভয়াবহ দুর্গতি হচ্ছে রাস্তাগুলোর। দ্রুত পুনর্নিমাণ করতে হচ্ছে বছরে কয়েকবার। অর্থাৎ আবারও নতুন বাজেট,নতুন লেনদেন,নতুন ভাগ-বাটোয়ানা,নতুন চুরি। এসব প্রকল্পগুলোর দেখভাল করার দায়িত্ব কাদের হাতে? নিশ্চয় বিরোধীদলের হাতে নেই? যদি থাকতো তাহলে বিরোধীদলের নেতাদের হাড্ডিসার চেহারায় একটু হলেও তেলের আভা দেখা যেত। ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা জড়িত বলেই মাঝেমধ্যে ভাগ-বাটোয়া নিয়ে খুনাখোনিতে রূপ নেয়। প্রকল্প ব্যয় বা চুরির পরিমাণ যত বাড়বে জিডিপির পরিমাণও তত লাফিয়ে বাড়বে। যেমন এক রাস্তা অনর্থক কাটাকাটি,ভাঙ্গাভাঙ্গি করলে টাকা যেমন বেশি ব্যয় হয় তেমনি জিডিপিও বাড়ে। দেশের অর্ধেক মানুষ পানিদূষণ,বায়ুদূষণ বা সিসাদূষণের কারণে ভয়াবহ অসুখ-বিসুখে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেও জিডিপি বাড়ে। আইনের শাসনের মতো গুরুত্বপূণ বিষয়কে হাইড করে শুধুমাত্র জিডিপি বা মাথাপিছু আয়ের হিসাব দিয়েই উন্নয়ন হয় না।
একটি দল যখন বিরোধী দলে অবস্থান করে তখন অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে কুন্ঠাবোধ করে না। কিন্তু তারাই যখন আবার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় তখন সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে একই অন্যায়ের জালে নিজেরাও যে জড়িয়ে পড়েছে তা অনুভব পর্যন্ত করতে পারে না। আমরা যখন গণতন্ত্রের কথা বলি, তখন আমাদের অনেকেই মনেপ্রাণে বুঝতে সক্ষম হন না যে, বিরোধী দল থাকা হলো গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত। একমাত্র  স্বৈরতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই পার্লামেন্টের প্রধান বিরোধী দলকে দেশের শত্রু বলে মনে করা হয়। পার্লামেন্টারি পদ্ধতিতে প্রধান বিরোধী দল ছায়া মন্ত্রিসভার মর্যাদা ভোগ করার কথা থাকলেও বাস্তবে তেমনটা দেখা যাচ্ছে না। গণতন্ত্রকে অর্থবহ করার জন্য অবাধ, সুষ্ঠু এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠান একটি রাষ্ট্রের জন্য খুবই গুরুত্বপূণ। রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন ও একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম উদ্দেশ্য। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৬ বছর পেরিয়ে গেলেও একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন করা যায়নি। গণতন্ত্র নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য হলো, বিরোধী দল না থাকলে গণতন্ত্র চলতে পারে না। করাচিতে খাজা নাজিমউদ্দীনের সঙ্গে দেখা করে তৎকালীন পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু আরও বলেন, আওয়ামী লীগ বিরোধী পার্টি। তাকে কাজ করতে সুযোগ দেওয়া উচিত।(অসমাপ্ত আত্মজীবনী পৃষ্ঠা ২১৪) তাঁর এই উক্তির আলোকে আমরা যদি বাংলাদেশের গত ৪৬ বছরের রাজনীতি বিশ্লেষণ করি তাহলে আমরা কী দেখতে পাই? দেখতে পাই যখন যাঁরাই ক্ষমতায় থাকেন, তখন তাঁরা নিজেদের  রাষ্ট্র মনে করেন। দল ও রাষ্ট্রের ফারাকটি মুছে ফেলেন। এটি অনেকটা ফরাসি রাজা ষষ্ঠ লুইয়ের সেই উক্তির মতো, আমিই রাষ্ট্র। অনির্বাচিত স্বৈরশাসকেরা এ ধরনের আচরণ করতে পারেন। কেন না জনগণের প্রতি তাঁদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। কিন্তু গণতান্ত্রিক সরকারগুলোও কেন সেই পথে হাঁটবে?
গণতন্ত্রের প্রধান পূর্বশর্ত হচ্ছে একসাথে চলা, সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া। আলোচনা, বিতর্ক, মতবিনিময়ে যে গণতন্ত্রের অপরিহার্য দিক, সেটি আমাদের রাজনীতিকেরা স্বীকার করতে চান না। ক্ষমতাসীন শাসকেরা নিজেদের ইচ্ছামতো সভা-সমাবেশ ও দলীয় প্রচারে রাষ্ট্রীয় যন্ত্র ব্যবহার করেন। কিন্তু অন্যকে সেই অধিকার ও সুযোগ দিতে নারাজ। বিরোধী দলের সভা-সমাবেশ করার অধিকারের কথা বললে আওয়ামী লীগের  নেতারা বিএনপির হরতাল অবরোধের নামে ধ্বংসযজ্ঞের উদাহরণ দেন। কিন্তু বিএনপি ঘোষণা দিয়ে সেই পথ পরিহার করার কথা বললেও তাদের সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে কেন? তাহলে কি আওয়ামী লীগ চায় তারা আবার সহিংস পথ বেছে নিক? সেটি কারও জন্য ভালো ফল বয়ে আনবে না। অন্যের খারাপ উদাহরণ টেনে সেটি অনুসরণ না করে ভালো উদাহরণ সৃষ্টি করার নামই তো গণতন্ত্র। গণতন্ত্রের পথকে রুদ্ধ করে শুধু গালভরা উন্নয়ন দিয়ে গণমানুষের মন রক্ষা করা যায় না। গত তিন দশক আগেও সিঙ্গাপুর, মালেয়শিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের অর্থনীতি বাংলাদেশের মতই ছিল।
কিন্তু গণতন্ত্রের যাত্রা সুগম ছিল না। তারপরও তারা সুশাসন, দুর্নীতিরোধ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রতি বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল। সুশাসন যেমন গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে তেমনি সুষ্ঠু অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনের অভাব জাতির মধ্যে হতাশা, অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি করে। সুশাসনের অভাবে গণতন্ত্রের হাড্ডিসার রূপ কোনভাবেই কাম্য নয়। উন্নয়নের মহাসড়কে গণতন্ত্রের এ ধরনের খুঁড়িয়ে পথ চলা ও সুখকর নয়। সরকার জনগণের মনের দ্রোহটা অনুধাবন করে উন্নয়নের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের পথে হাঁটবে এমটিই দেশের ১৬ কোটি মানুষের প্রত্যাশা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ