ঢাকা, সোমবার 11 June 2018, ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২৫ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

পাক-মার্কিন সম্পর্ক এখন তলানিতে

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা : সাম্প্রতিক সময়ে পাক-মার্কিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে  ক্রান্তিকাল চলছে বলেই মনে করা হচ্ছে। শীতল যুদ্ধকালীন সময়ে বিশ্ব পরাশক্তি যখন দু’মেরুতে অবস্থান করছিল তখন পাক-মার্কিন গাটছাড়াটা বেশ উষ্ণ পর্যায়েই ছিল। মূলত ১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের ছন্দপতনের মাধ্যমে বিশ্ব পরাশক্তির এক নক্ষত্রের কক্ষচ্যুতির পরও পাক-মার্কিন সম্পর্কটা একেবারে ভেঙ্গে পড়েনি বরং তালেবান ও আফগান ইস্যুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে পাকিস্তানকে সহায়ক ভূমিকাও পালন করতে দেখা গেছে। কিন্তু দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক রাজনীতিতে গণচীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং দক্ষিণ চীন সাগরে দেশটির সরব উপস্থিতি  যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়ার প্রেক্ষাপটে বিশ^ রাজনীতি বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ শুরু হয়। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তান নির্ভরতার পরিবর্তে ভারতে সাথে মিত্রতা স্থাপন করে। আর উপমহাদেশীয় রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নতুন মিত্র খুঁজে নেয়ার প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানও চীনের সাথে মিত্রতা স্থাপন করতে উদ্যোগী হয়। আর এর ঢেউটা এখানেই থেমে থাকেনি বরং তা রাশিয়া পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে।
ফলে পাক-মার্কিন সম্পর্ক ক্রমেই শীতল হতে শুরু করে। বিশেষ করে দেশ দু’টির মধ্যে আস্থার সংকটটা ক্রমেই বাড়তে থাকে। যদিও পাক-মার্কিন সখ্যতার আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবচ্ছেদ ঘটেনি। কিন্তু চলতি বছরের গোড়ার দিকে পাক-মার্কিন বিভেদটা বেশ ষ্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশেষ করে জানুয়ারীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক পাকিস্তানে সামরিক সহায়তা স্থগিত ঘোষণার পর উভয়ে দেশের সম্পর্কে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সেই আগুনে আবার নতুন করে ঘি ঢেলে দিয়েছে খোদ যুক্তরাষ্ট্রই। কিছুদিন আগে পাক প্রধানমন্ত্রী শহীদ খাকান আব্বাসী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরে গেলে বিমানবন্দরে অনাকাঙ্খিত তল্লাশীর শিকার হন। যা পাকিস্তান কুটনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভূত কাজ বলেই মনে করেছে এবং এই ইস্যুতেই দেশ দু’টির মধ্যে উষ্ণ সম্পর্ক শীতল হতে শুরু করে। কিন্তু চলতি মাসের গোড়ার দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক সেদেশে পাকিস্তানের কুটনীতিকদের চলাফেরায় নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং পাকিস্তান মার্কিন কুটনীতিকদের ক্ষেত্রে অনুরূপ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রেক্ষাপটে উভয় দেশের সম্পর্কের পারদটা রীতিমত নি¤œমুখী হতে শুরু করে। যা এখন উভয় দেশকেই একটা প্রান্তিক পর্যায়েই নিয়ে গেছে। 
মূলত এই অচলাবস্থার শুরু হয়েছিল চলতি বছরের শুরুতেই । আসলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি পাকিস্তান বিরোধী টুইটকে কেন্দ্র করেই নতুন সংকটের শুরু হয়। বর্ণিত টুইটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক পাকিস্তানে সামরিক সহায়তা স্থগিতের ইঙ্গিত দেয়া হয়। এর একদিনের ব্যবধানে সামরিক সহায়তা স্থগিতের ঘোষণাও আসে। এর আগে জাতিসংঘে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হ্যালি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানে প্রদেয় সামরিক সহায়তা বন্ধ করে দিতে চলেছে। অন্য দিকে হোয়াইট হাউস সূত্র বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র দু’য়েক দিনের মধ্যে এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি প্রকাশ করবে। প্রাথমিকভাবে এ ব্যাপারে কিছুটা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হলেও পাকিস্তানের উপর চাপ সৃষ্টির ট্রাম্প প্রশাসনের এই উদ্যোগে পাকিস্তানের সামরিক বেসামরিক নেতৃত্বের সাড়া বিস্ময়করভাবে শীতল। ট্রাম্পের ব্যতিক্রমী টুইটার মন্তব্যের জন্য আমেরিকান রাষ্ট্রদূতকে ডেকে এনে ইসলামাবাদ প্রতিবাদ জানায়।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ১ জানুয়ারী এক টুইটে বলেন, “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গত ১৫ বছরে পাকিস্তানকে ৩৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশী সাহায্য দিয়েছিল, কিন্তু তারা এর বিপরীতে মিথ্যা এবং প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই করেনি। তারা আমাদের নেতাদের বোকা মনে করেছে”। এরপর জাতিসংঘে মার্কিন রাষ্ট্রদূত নিক্কি হ্যালি বলেছেন, ওয়াশিংটন পাকিস্তানের ২৫৫ মিলিয়ন ডলার আর্থিক সহায়তা স্থগিত করতে যাচ্ছে। নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দফতরে সাংবাদিকদের হ্যালি  অভিযোগ করে বলেন, “পাকিস্তান অনেক বছর ধরে দ্বিমুখী খেলা খেলছে। তারা আমাদের সাথে সময়ে সময়ে কাজ করে আর আফগানিস্তানে আমাদের সৈন্যদের আক্রমণকারী সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেয়। এই খেলাটি ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।”
মার্কিন প্রেসিডেন্টের আলোচিত টুইটের জবাবে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী  তার দেশের সংবাদ মাধ্যমে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে ইতোমধ্যে জানিয়ে দেয়াা হয়েছে যে তাদের আর সহযোগীতা করতে পারবে না পাকিস্তান। ফলে ট্রাম্পের এই ‘না’ এর বাড়তি কোনো গুরুত্ব নেই। যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে পাকিস্তান যে অর্থ সহায়তা নিয়েছে তার ব্যয়সহ যাবতীয় তথ্য প্রকাশ করতে ইসলামাবাদ প্রস্তুত বলেও জানান পাক পররাষ্ট্রমন্ত্রী। অন্য দিকে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী একটি  টুইটে বলেন, সন্ত্রাসবিরোধী জোটের অংশ হিসেবে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রকে বিনামূল্যে স্থল ও আকাশসীমা এবং দেশটির সামরিক ঘাঁটিসমূহ ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছে। এছাড়াও গত ১৬ বছর ধরে আল কায়েদাকে ধ্বংস করতে সাহায্য করা হয়েছে। এর বিনিময়ে পাকিস্তান ‘অবিশ্বাস’ ছাড়া পায়নি কিছুই।
মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অসংযত টুইট বার্তা নতুন বছরে পাক-মার্কিন সম্পর্কে একটি নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। ট্রাম্পের এবং অপ্রচলিত ভাষার বক্তব্যে পাকিস্তানে আতঙ্কও ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এটা স্পষ্ট নয় যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানে উপর নতুন করে চাপ দিচ্ছেন বা কেবল অলঙ্কৃত হুমকি দিচ্ছেন কিনা। এরপরও বলা হচ্ছে মার্কিন প্রেসিডেন্টের হুমকিমূলক মন্তব্যকে উপেক্ষা করা যাবে না। স্পষ্টতই আফগানিস্তানে ১৬ বছরের যুদ্ধে কোন সাফল্য অর্জন করতে না পারার ক্ষোভ একটু অন্যভাবে প্রকাশ পেয়েছে ট্রাম্পের বক্তব্যে। তবে ১৬ বছরে যা অর্জন করা সম্ভব হয়নি তা শীঘ্রই অর্জন করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। এটি ঠিক যে আফগানিস্তানে একটি শান্তি চুক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা তার প্রাথমিক সমর্থন ছাড়া সম্ভব হবে না। আবার পাকিস্তানকে বাদ দিয়েওে এখানে শান্তি  প্রতিষ্ঠা প্রায় অসম্ভব।
দৃশ্যত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের টুইটটি অসম্পূর্ণ বলেই মনে করেন আন্তর্জাতিক বোদ্ধামহল। পাকিস্তানের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে আত্মত্যাগ কোনভাবে কম নয়। দেশটি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আমেরিকান যুদ্ধে সহায়তা করতে গিয়ে প্রায় ৭০ হাজার বেসামরিক নাগরিক এবং ১০ হাজার সৈন্য ও পুলিশ সদস্য হারিয়েছে। আমেরিকা এই যুদ্ধের সমস্ত ব্যয় বহন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সে প্রতিশ্রুতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রক্ষা করেনি। পাক পক্ষ দাবি করে, আমেরিকা এখানে ব্যয় হওয়া অর্থের অর্ধেকও প্রদান করেনি। শুধুমাত্র মিডিয়াতে দাবি করেছে পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদের যুদ্ধের অংশ হিসাবে একটি প্রধান অ-ন্যাটো সহযোগী এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তাকারী।
পাকিস্তানে ২০০১ সাল থেকে সমন্বয় এবং জঙ্গি সন্ত্রাসবাদ ইউনিটের প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার পাবার আশা করে। কিন্তু ওসামা বিন লাদেনের অভিযানের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনী ৫০০ মিলিয়ন ডলারের প্রশিক্ষণ কর্মসূচী বাতিল করে এবং ১৩৫ জন প্রশিক্ষককে ফেরত পাঠায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এতে অসন্তোষ প্রকাশ করে এবং সহায়তার জন্য বরাদ্দ করা ৩০০ মিলিয় ডলারে বেশি অর্থ প্রদান স্থগিত করে। পাকিস্তানের কিছু রাজনীতিবিদ মনে করেন যে, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে তিক্ত যুদ্ধে দেশটি ৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে এই যুদ্ধে সহায়তা করার দীর্ঘমেয়াদি মূল্য হিসাব করা হলে সেটি হবে আরো অনেক বেশি। এতো কিছুর পরও যুক্তরাষ্ট্র কেবল অভিযুক্ত করে চলেছে এবং পাকিস্তানকে একটি ক্লায়েন্ট রাষ্ট্র বানিয়েছে।
পাক-মার্কিন সম্পর্কের কিছু অকথিত বিষয় রয়েছে যা কদাচিৎ আলোচনায় আসে। অথচ দু’দেশের সম্পর্কের উত্থান-পতনের ক্ষেত্রে এর রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। স্নায়ুযুদ্ধকালে পাকিস্তান ছিল আমেরিকার প্রধান মিত্র। এসময় ভারত ছিল সোভিয়েত বলয়ে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে একক পরাশক্তি হিসাবে আবির্ভুত হয়। আর আমেরিকা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আঞ্চলিক শক্তি ভারতকে মিত্র হিসাবে গ্রহণ করে এই অঞ্চলে চীন বিরোধী বলয় গঠনের কৌশল নেয়। এই কৌশল ভারতের অতীতের সরকারের সময়ে এগোয় বেশ খানিকটা ধীর গতিতে। মোদি ক্ষমতায় আসার পর এটি দ্রুতগতিতে অবয়ব নিতে শুরু করে।
মূলত যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ এশিয়ায় নিয়ন্ত্রক হিসাবে দিল্লিতে স্বীকৃতি দেয়। আফগানিস্তানকে ভারতের সহযোগী হিসাবে ভূমিকা পালনে উদ্বুদ্ধ করে ওয়াশিংটন। আর এ সময়টাতে পাকিস্তান বিরোধী চাপ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে মার্কিন ডিফেন্স জার্নালে পাকিস্তানকে চার ভাগে বিভক্ত করার পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়। বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদে নতুন করে ইন্ধন যোগানো হয়। পাকিস্তানী তালেবান সৃষ্টি করে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সংহতিকে নিরাপত্তাহীনতার দিকে ঠেলে দেয়া হয়। ভারতীয় গোয়েন্দা বাহিনীর সাথে আফগান গোয়েন্দা সংস্থার যোগসূত্র তৈরি হলে পাকিস্তানে অত্মঘাতী হামলা বেড়ে যেতে থাকে। ভারতের ‘গোয়েন্দা কর্মকর্তা’ কুলভুষণ যাদবের স্বীকারোক্তিতে অনেক তথ্য ফাঁস হয়ে যায়।
এই ধরনের এক পরিস্থিতিতে ইসলামাবাদ নিজস্ব নিরাপত্তার জন্য বিকল্পের দিকে ঝুঁকে পড়ে। চীনের সাথে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ চীন-পাক অর্থনৈতিক করিডোরের বিলাসবহুল প্রকল্প গ্রহণ করে। প্রতিরক্ষা এবং অর্থনৈতিক সহায়তা উভয় ক্ষেত্রে পাকিস্তানের মার্কিন নির্ভরতা কমতে থাকে। এই অবস্থায় দক্ষিণ এশিয়ায় চীন ভারত পাকিস্তান একটি বলয়ও তৈরি হয়। আফগানিস্তান ও এর আশপাশে আমেরিকান কর্তৃত্ব হুমকির মধ্যে পড়ে যায়। এই অবস্থায় ওয়াশিংটনে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্তৃত্ব গ্রহণের পর পররাষ্ট্রনীতি থেকে রাখ ডাক বিদায় নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের  পাকিস্তান বিরোধী ভারতপন্থী নীতি স্পষ্ট রূপ নেয়।
মূলত পাকিস্তান এখন আমেরিকার উপর আগের মতো নির্ভরশীল নেই। আবার চীন-রাশিয়ার সাথে কৌশলগত মৈত্রির কারণে পাকিস্তানকে অস্থির করার মার্কিন সক্ষমতাও আগের অবস্থায় নেই। এর ফলে নতুন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে আফ-পাক এলাকায়। এখানে পাকিস্তানের উপর মার্কিন চাপ প্রয়োগ করে ইসলামাবাদকে নতি স্বীকারে বাধ্য করা যাবে বলে মনে হয় না। আর ভারত ও আফগানিস্তানকে নিয়ে পাকিস্তান বিরোধি সর্বাত্মক অভিযান চালানোর বিষয়টিও বাস্তব সম্মত নয়। পাক-মার্কিন উত্তাপ উত্তেজনা সামনে আরো বাড়তে পারে। তবে পাকিস্তান চাইবে না এই উত্তেজনার ফাঁদে এখনি পা দিতে। যদিও দেশটি যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলার প্রস্তুতি গ্রহণ থেকে দুরে থাকবে না।
পাক-মার্কিন সম্পর্কের এই চলমান অচলাবস্থার মধ্যেই নতুন সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে কূটনীতিকদের চলাফেরা সীমাবদ্ধ করতে পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ নিয়ে পাক-মার্কিন সম্পর্কে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। মূলত চলতি বছরের শুরুতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে দেওয়া মার্কিন সাহায্য বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পরই থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে। পাকিস্তানী গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, এই অবস্থার মধ্যে গত ১২ মে পাকিস্তানে অবস্থানরত এক মার্কিন কূটনীতিককে (অ্যাটাচি) দেশে যেতে দেয়নি ইসলামাবাদ কর্তৃপক্ষ। কারণ ওই কূটনীতিকের গাড়ির ধাক্কায় এক পাকিস্তানী নিহত হয়েছেন বলে অভিযোগ আছে।
এর মাত্র এক দিন আগে পাকিস্তানে থাকা মার্কিন কূটনীতিকদের চলাফেরা সীমাবদ্ধ করে দেয় ইসলামাবাদ। দেশটিতে থাকা মার্কিন দূতাবাসে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, মার্কিন সরকার দেশটিতে অবস্থানরত পাকিস্তানি কূটনীতিকদের চলাফেরার ওপর যে বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে, একই বিধি-নিষেধ পাকিস্তানে অবস্থানরত মার্কিন কূটনীতিকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। ইসলামাবাদের এই উদ্যোগের এক দিন আগে ওয়াশিংটনে অবস্থানরত পাক কূটনীতিকদের চলাফেরার ওপর বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়। ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, পাকিস্তানী কূটনীতিকরা কর্মস্থল থেকে ৪০ কিলোমিটারের বেশী ভ্রমণ করতে পারবেন না। এর বেশি পথ পাড়ি দিতে হলে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে। ওয়াশিংটনের এই উদ্যোগের জবাব হিসেবেই পাল্টা পদক্ষেপ নেয় ইসলামাবাদ।
মার্কিন ওই কূটনীতিককে দেশে যেতে না দেওয়া নিয়ে গণমাধ্যমের খবরের ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি ইসলামাবাদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র। আর ওয়াশিংটনে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র বিষয়টি নিশ্চিতও করেননি আবার অস্বীকারও করেননি। স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র বলেছেন, ‘এর সঙ্গে গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা জড়িত। ওই কূটনীতিকের বর্তমান অবস্থান আমরা প্রকাশ করতে পারব না।’ প্রসঙ্গত, আমেরিকা যখন আফগানিস্তানে তালেবানবিরোধী অভিযান শুরু করে তখন থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম সহযোগী হিসেবে কাজ করে আসছে পাকিস্তান। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন যে, ইসলামাবাদ বরং তালেবান নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে। এরপর পাকিস্তানের ওপর চাপ বাড়াতে দেশটিকে দেওয়া সামরিক সহায়তা বন্ধ করে দেন তিনি।
আসলে, উভয় দেশের সম্পর্কের মধ্যে সর্বশেষ উত্তেজনা তৈরি হয় গত ১২ মে, যেদিন ইসলামাবাদে থাকা এক মার্কিন সামরিক অ্যাটাচিকে দেশে যেতে বাধা দেওয়া হয়। এর এক দিন আগে ইসলামাবাদের একটি আদালত বলেন, গত ৭ এপ্রিল যে দুর্ঘটনা ঘটেছে তাতে ওই অ্যাটাচির ক্ষেত্রে কূটনৈতিক নিরাপত্তা (ইমিউনিটি) খাটে না। ৭ এপ্রিল ওই অ্যাটাচির গাড়ির ধাক্কায় ২২ বছর বয়সী এক মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হন। অতীত ঘটনাবলী ও সাম্প্রতিক ঘটনা প্রবাহ একথায় প্রমাণ করে যে, পাক-মার্কিন সম্পর্ক এখন রীতিমত তলানিতে এসে ঠেকেছে। আর এ সমস্যার সমাধানের আশু কোন পথও দেখা যাচ্ছে না।
মূলত আঞ্চলিক রাজনীতির রূঢ় বাস্তবতা ও বিশ্ব রাজনীতির অবধারিত পরিণতির কারণেই পাক-মার্কিন সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব-প্রতিপত্তিতে সঙ্কিত হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর রাষ্ট্র ভারতে মিত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে। যেহেতু ভারত পাকিস্তানের জন্ম শত্রু তাই নতুন মিত্র হিসেবে ভারতের বৈরি রাষ্ট্র গণচীনের সাথে সখ্যতা স্থাপন করেছে। সঙ্গত কারণেই পাক-মার্কিন সম্পর্ক এখন রীতিমত তলানিতে এসে ঠেকেছে। মূলত উভয় পক্ষই আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে এবং স্বীয় স্বার্থের অনুকুলেই এই নতুন মেরুকরণের পথ বেছে নিয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বোদ্ধামহল মনে করছেন যে, এটাই শেষ কথা নয় বরং আগামী দিনে হয়তো বিশ্ববাসীর জন্য আরও নতুন কিছু অপেক্ষা করছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ