ঢাকা, সোমবার 11 June 2018, ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২৫ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ঈদকে সামনে রেখে টঙ্গীতে ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্পের জামদানি শাড়ি তৈরির ধুম

টঙ্গীতে জামদানি শাড়ি কারখানায় কাজ করছে এক বৃদ্ধ

গাজী খলিলুর রহমান, (টঙ্গী) থেকে: জামদানি কারিগররা ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে দিনরাত ব্যস্ত সময় পার করছেন। ক্রেতাদের চাহিদা মেটাতে তৈরি করছেন বাহারি বিভিন্ন ডিজাইনের জামদানি পণ্য। এসব কারিগরদের দম ফেলার কোনো ফুরসত নেই। টঙ্গীর গুটিয়া এলাকায় ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্পের জামদানি শাড়ি তৈরির ধুম লেগেছে। ওই এলাকার তাঁত শিল্পীদের নিপুণ হাতের কর্মকুশলতায় জামদানি শাড়ি এখনো মুগ্ধ হচ্ছেন দেশ বিদেশে।
ওই সব তাঁত শিল্পীরা অভিযোগ করে বলেন, বাজারে নকল জামদানি সহজলভ্য হয়ে ওঠায় এবং আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা না পাওয়ায় তারা খুব বেশি লাভবান হচ্ছেন না। তাই বাজার ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতাসহ জামদানি তৈরির প্রধান নিয়ামক হস্তচালিত এসব তাঁত শিল্প রক্ষায় সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি দেওয়া জরুরি বলে মনে করেন কারখানা মালিক ও শ্রমিকসহ সংশ্লিষ্টরা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, টঙ্গীর গুটিয়া এলাকায় ঢুকলেই কানে ভেসে আসে তাঁত শিল্পীদের যন্ত্রের খটখটাখট শব্দ। একসময় এ গ্রামে অন্তত  ৩ শ’ ঘরের প্রতিটিতেই ২/৩টি করে হস্তচালিত তাঁত শিল্প কারখানা ছিল। ওই সময় জামদারি শাড়ির বাণিজ্যটাও ছিল রমরমা। কিন্তু বর্তমানে ভারতের শাড়ির অবাধে বাংলাদেশে প্রবেশ করায় শিল্পায়ন এবং শ্রমিক সংকটসহ নানাবিধ সমস্যায় পড়ে। তবুও জামদানি ঐতিহ্যের শেষ স্মারক হিসেবে ওই গ্রামে এখনো বেশ কয়েকটি তাঁতশিল্প কারখানা তাদের  কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে অতীত সৌন্দর্যকে মনে করিয়ে দিতে।
কারখানায় কর্মরত শতাধিক তাঁত শিল্পী তাঁতের মাকুর খটখটাখট শব্দের সাথে নিজ কণ্ঠের সুললিত সুর মিলিয়ে দিনরাত পরিশ্রম করে নিবিষ্ট মনে বুনে চলেছে জামদানি শাড়ি। আর সেই শাড়ি মিরপুরের জামদানি পল্লী হয়ে পৌঁছে যাচ্ছে ক্রেতার হাতে। শ্রম মজুরি নিয়ে তাঁত শিল্পীদের আক্ষেপ থাকলেও তাদের শ্রম, ঘাম ও নিপুণ কর্মকুশলতায় সৃষ্ট শাড়ি জামদানি ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। আর ঈদকে সামনে রেখে অতিরিক্ত চাহিদার কথা মাথায় রেখে বেড়েছে এখানকার কারিগরদের ব্যস্ততা। প্রয়োজনীয় বাজার মূল্য না পেলেও কেবলমাত্র ঐতিহ্যপ্রীতির কারণেই কেউ কেউ এখনো বয়ে নিয়ে চলেছেন তাদের পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া তাঁতের শিল্প কুশলতা। ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে তাঁত শিল্পে জড়িতদের প্রতি সংশ্লিষ্টদের নজর দেওয়া জরুরি বলে মনে করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
কারখানায় কর্মরত কয়েকজন জামদানি কারিগর জানান, পৈত্রিক পেশা হিসেবে তারা জামদানি শাড়ি তৈরির এ পেশাকে বেছে নিয়েছেন। কালের পরিক্রমায় অন্যান্য পেশার লোকজনের বেতন ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা বাড়লেও তাদের তেমন বেতন ভাতা বাড়েনি। চুক্তিভিত্তিক কাজ করে যে আয় হয় তা দিয়ে তাদের কোনোমতে সংসার চলে। তবে আসন্ন ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে এখন অর্ডার বেড়েছে। ফলে দিনরাত অবিরাম কাজ করতে হচ্ছে তাদের। এখানকার জামদানি ও কাতান শাড়ি রাজধানীর মিরপুর হয়ে সারা দেশে বিভিন্ন অঞ্চলে যাবে।
শ্রমিকরা অভিযোগ করে বলেন, ভারতের শাড়ির অবাধ বাংলাদেশে প্রবেশ করায় এবং বাজার অব্যবস্থাপনার কারণে ঐতিহ্যবাহী তাঁতের জামদানি শাড়ি হারিয়ে যেতে বসেছে। হাতের তৈরি শাড়ি টেকসই এবং বুনন ভালো হলেও ভারতের তৈরি শাড়ি কম দামের হওয়ায় এখানকার বাজারে ভারতের শাড়িই বেশি। ফলে গুটিয়া এলাকায় অনেক তাঁতের কল এখন বন্ধের পথে। তবে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং বাজার এ শাড়ির বিক্রিতে পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা প্রয়োজন।
তাঁত শিল্প মালিকরা জানান, জামদানি শুধু টঙ্গী নয়, সারা দেশের সম্পদ। ঈদ আসলেই সুতার দাম বেড়ে যায় এবং ভারতের শাড়ি আমদানির কারণে বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না ঐতিহ্যবাহী জামদানি। এ কারণে এই ব্যবসায় এখন আগের মতো লাভ নেই। এজন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাসহ তাঁত শিল্পের ঐতিহ্য রক্ষায় তাদের অতীত কর্মচাঞ্চল্য ফিরে পেতে সকল পক্ষের সহযোগিতা কামনা শিল্প মালিকরা।
গুটিয়া এলাকার উৎপাদিত শাড়ির বুনন কৌশল ও ছাপের কারণে এর সুনাম রয়েছে। এছাড়া এ শাড়ি টেকসই এবং নজরকাড়া। ফলে সারা দেশে এই শাড়ির চাহিদা রয়েছে। এবারের ঈদে চাহিদার যোগান দিতে তাঁতীরা দিনরাত কাজ করছেন। প্রতিটি শাড়ি তৈরীতে কারিগরদের ৫শ’ টাকা মজুরি দিতে হয়। টঙ্গীর গুটিয়া থেকে উৎপাদিত জামদানী ও কাতান শাড়ি ১২ শ’ টাকা থেকে ৩ হাজার টাকা দরে রাজধানীর মিরপুরে বিক্রি করা হয়। সেখান থেকে সারাদেশের মোকামে চলে যায়।
টঙ্গীর বিসিক শিল্প নগরীর পাগাড় এলাকার বাসিন্দা সৈয়দ আতিক বলেন, জামদানি রক্ষায় বাজার ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা দেয়াটা জরুরি। এছাড়া তাঁতীদের জীবন মান উন্নয়নে এবং কারখানা সমৃদ্ধির জন্য আর্থিক সহযোগিতার বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে। সেই সব সুযোগ সুবিধা প্রদানের পাশাপাশি তাঁত শিল্প জামদানি শাড়ি প্রসারে শিল্প মালিকরা কাজ করছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ