ঢাকা, মঙ্গলবার 12 June 2018, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২৬ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কারো পৌষ মাস কারো সর্বনাশ

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : পুলিশ-র‌্যাবসহ আইনশৃংখলাবাহিনীর কোন প্রকার অভিযান এ যাবত পর্যন্ত নানা দোষে দুষ্ট হয়ে বিতর্কিত হয় নি-এমনটা বলার অবকাশ নেই। বিতর্ক ছাড়া কোন অভিযানই সফল সমাপ্ত হয়েছে, তা খুঁজেও বের করা যাবে না। কোন একটা অভিযান শুরু হলেই তা বিতর্কের মাত্রাকে যেন উস্কে দেয়। অভিযান পরিচালনাকারীদের কর্মকান্ডেই এ বিতর্কের শুরু ঘটে। এবারও তার কোন ব্যতিক্রম ঘটেনি। অভিযোগ রয়েছে, অভিযান নামক কোন একটা কাজ করার সুযোগ পেলেই আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা যেন খোলস থেকে বের হয়ে পড়েন সকল মওকা নেয়ার জন্য। চলতি মাদকবিরোধী অভিযানকে কেন্দ্র করে পুলিশ সারাদেশে ‘তালিকাবাণিজ্যে’ নেমেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। চাহিদা মতো অর্থ না দিলে আটক ব্যক্তিদের নাম মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকায় ঢুকিয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে তারা। এতে করে কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ অবস্থার উপক্রম হয়েছে।
এদিকে, এই অভিযানে সারাদেশে কথিত বন্দুকযুদ্ধের যে সব ঘটনা একের পর এক ঘটে চলেছে, তা বিতর্কের সব মাত্রাকে ছাড়িয়ে গেছে। দেশবিদেশেও সমালোচিত হয়েছে সমান্তরাল ভাবে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো এ নিয়ে সোচ্চারও। প্রতিটি বন্দুকযুদ্ধের ঘটনাই নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
এছাড়া, পুলিশের সোর্স কিংবা মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে যারা পুলিশের ঊর্ধ্বতনদের কাছে তথ্য দিতেন, এমন অনেককে আটকের পর মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে গ্রেফতার দেখানো হচ্ছে। আবার প্রকৃত মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে পুলিশের বিরুদ্ধে।
পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলায় নুসরাত শাহী ওরফে কিংজল নামে এক চিহ্নিত মাদকসেবী ও একাধিক মামলার এজাহারভুক্ত আসামীকে ধরার ৩৬ ঘণ্টা পর আর্থিক সুবিধা নিয়ে ছেড়ে দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে মঠবাড়িয়া থানার ওসি মো. গোলাম ছরোয়ারের বিরুদ্ধে। গত ২৭ মে রাত ১০টার দিকে উপজেলা শহর থেকে কিংজলকে ধরে এনে মঠবাড়িয়া থানায় রাখা হয়। পরে আদালতে হাজির না করে গত ২৯ মে সকাল ১০টায় কিংজলকে তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। আর্থিক সুবিধা নিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ওসি গোলাম ছরোয়ার।
রৌমারীর  শৈলমারীতে চরের গ্রামের মো. আবু বক্করের ছেলে মো. সাইফুল ইসলাম হায়দারকে মাদকের মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে কয়েক দফায় টাকা নিয়েছেন রৌমারী থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলম। এ বিষয়ে ওসির বিরুদ্ধে পুলিশ সদর দফতরে অভিযোগ করেছেন হায়দার। এই ওসির বিরুদ্ধে মাদক সেবন, মাদক ব্যবসা পরিচালনা, মাদক ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোষকতা, মাদক মামলার ভয় দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানির অভিযোগ লিখিত আকারে গত ১৫ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বরাবর পাঠিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।
 ফেনীর ফুলগাজীতে পুলিশকে টাকা না দেওয়ায় শামীম (২৫) ও মজনু মিয়া মনিরকে (২৩) ‘বন্দুকযুদ্ধে’র নামে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। শামীমের মা আনোয়ারা বেগম বলেন, ‘গত ২৪ মে বুধবার দুপুর ২টার দিকে ফুলগাজী থানার এসআই শফিক এসে শামীমকে তুলে নিয়ে যান। সে সময় বাড়ির পাশে জমিতে গরুর জন্য ঘাস কাটছিল শামীম। একই সময়ে রতন নামে আরেক যুবককেও ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। পরে পুলিশ আমাদের কাছে দুই লাখ টাকা দাবি করে। রতনকে ছেড়ে দিলেও টাকা দিতে না পারায় ওইদিন রাতে আমার ছেলেকে গুলী করে হত্যা করেছে পুলিশ।’
নিহত মজনু মিয়া মনিরের বোন রোজিনা বেগম বলেন, ‘বুধবার রাতে গোয়েন্দা পুলিশ পরিচয়ে ফেনী শহরের বড় মসজিদ এলাকার বোনের বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় মনিরকে। পরে তাকে ছাড়িয়ে আনতে ডিবি অফিসে গেলে পুলিশ দেড় লাখ টাকা দাবি করে। টাকা দিতে না পারায় ভোররাতে পুলিশ মনিরকে গুলী করে হত্যা করে।’ তবে স্বজনদের এমন অভিযোগ অস্বীকার করে ফুলগাজী থানার ওসি হুমায়ুন কবির বলেন, ‘নিহত দুই যুবক এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী। মাদকের টাকায় তারা তাদের পরিবার চালাতো। তাই স্বজনরা এসব মনগড়া অভিযোগ করেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। তাদের তুলে নেওয়া এবং তাদের পরিবারের কাছে টাকা দাবির অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।’
রাজধানীর রামপুরার বাগিচারটেক এলাকার বাসিন্দা শাহীন আহমেদ (৪০)। এলাকার বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে নষ্ট হয়ে যাওয়া এয়ারকন্ডিশনার (এসি) মেরামতের কাজ করেন তিনি। সেই সুবাদে অনেকের সঙ্গেই পরিচয় রয়েছে তার। এলাকায় নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন শাহীন। মাদক ব্যবসায়ী ও এর সঙ্গে জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধেও তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ করতেন। কয়েক মাস আগে রামপুরা থানার সিদ্দিক নামে একজন সাব-ইন্সপেক্টরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে। গত বুধবার (৬ জুন) দিবাগত রাতে শাহীনকে একটি মোটরসাইকেলসহ আটক করে পুলিশ। পরে দেখানো হয়, তার কাছে ১৩৫ পিস ইয়াবা পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় রামপুরা থানায় পুলিশের দায়ের করা মামলায় শাহিনকে গ্রেফতার দেখিয়ে রিমান্ডের আবেদন জানিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। আদালত দু’পক্ষের বক্তব্য শুনে রিমান্ডের আবেদন না মঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
শাহীন আহমেদের ছোট বোন জান্নাতুল ফেরদৌস লিনা বলেন, পুলিশ সদস্যদের অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযোগ করায় তার ভাইকে মাদক ব্যবসায়ী বানানো হয়েছে। তিনি এলাকায় বাসাবাড়িতে এসি মেরামতের কাজ করতেন। এলাকায় কোনও অন্যায়-অনিয়ম দেখলে তিনি প্রতিবাদ করতেন। সংশ্লিষ্ট দফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সেটা জানিয়ে দিতেন। সেই সুবাদে তার সঙ্গে অনেকের পরিচয় ছিল।’ লিনা বলেন, ‘বুধবার দিবাগত রাত একটার দিকে একটি ফোন পেয়ে তিনি ঘর থেকে বের হন। এরপর শুনি তাকে ইয়াবাসহ পুলিশ আটক করেছে। থানায় নিয়ে তাকে অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছে। অতীতে তার বিরুদ্ধে থানায় কোনও মামলা বা অভিযোগ ছিল না।’ মাদক ও পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার কারণেই তার ভাইকে মাদক ব্যবসায়ী বানানো হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
শাহীনের বোনের এই অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রামপুরা থানার ওসি প্রলয় কুমার সাহা বলেন, ‘ভাই এমন প্রশ্ন করলে কষ্ট পাই। সম্পূর্ণ মিথ্যা অভিযোগ। যে অভিযোগ করেছে তাকে নিয়ে আইসেন। বাগিচারটেকের শাহীনকে ১৪-১৫ জন লোকের সামনে থেকে আমরা ১৩৫ পিস ইয়াবাসহ ধরেছি। বহুদিন বেটাকে ধরতে পারিনি। এবার পেরেছি। সে অরিজিনালি ইয়াবা ব্যবসায়ী।’
রাজধানীর দোয়েল চত্বর ও হাইকোর্ট মাজারের মাঝামাঝি স্থানে পুলিশের তল্লাশিতে পড়েন নিউমার্কেটের এক ব্যবসায়ী। হয়রানির ভয়ে পত্রিকায় নিউজ হোক এটাও চান না তিনি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই ব্যবসায়ী  বলেন, ‘গত ২৮ মে ভোরে আমি নিউমার্কেট থেকে কাপ্তানবাজারে যাচ্ছিলাম। হাইকোর্ট মাজারের একটু আগে আমার মোটরসাইকেল থামিয়ে তল্লাশি করে তারা।’ একপর্যায়ে পুলিশ বলে, ‘এই ইয়াবা ব্যবসায়ীকে গাড়িতে ওঠা।’ তখন আমি বলি, ‘‘স্যার, আমি নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী, বিশ্বাস না হইলে আমারে নিয়ে নিউমার্কেটে চলেন। আমার এই কথা শুনে পুলিশ বলে, ‘আমরা কি তোর বাপ-দাদার চাকর?’ ওদের বিশ্বাস করার জন্য আমার পরিচিত একজনকে ফোন করে জানালাম। সে আসার পর পুলিশ তাকেও ধরে। তার উদ্দেশে পুলিশ সদস্যরা বলেন, ‘এই, এটা ইয়াবার ডিলার, এরেও গাড়িতে ওঠা।’
নিউমার্কেটের এই ব্যবসায়ী বলেন, ‘এভাবে কিছুক্ষণ চলার পর আমার কাছে ছিল ২০ হাজার টাকা, আর আমার পরিচিতজনের কাছে ছিল ৬ হাজার টাকা। মোট ২৬ হাজার টাকা দেওয়ার পর আমরা ছাড়া পাই।’ তবে কোন থানার পুলিশ সদস্যরা তখন সেখানে দায়িত্বে, তা জানাতে পারেননি ওই ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, ‘আমি তাদের এ কথা জিজ্ঞেস করার সাহস পাইনি। আগে ফাঁকা রাস্তায় ছিনতাইকারীর ভয় পাইতাম। এখন ফাঁকা রাস্তায় পুলিশ দেখলে ভয় পাই।’
পুলিশ সদস্যদের মাদক ব্যবসা, নিরীহদের ধরে মাদক ব্যবসায়ী বানিয়ে ‘তালিকাবাণিজ্যের’ অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দফতরের জনসংযোগ বিভাগের এআইজি সহেলী ফেরদৌস বলেন, ‘এমন অভিযোগ আমরা পাচ্ছি, লিখিত কিংবা মেইলে। সব অভিযোগেরই তদন্ত করা হবে। তদন্ত শেষে অভিযোগের প্রমাণ পেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় এবং ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এসব ক্ষেত্রে কোনও ছাড় দেওয়া হবে না বলে তিনি দাবি করেন।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ