ঢাকা, মঙ্গলবার 12 June 2018, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২৬ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রাজশাহী সিটির নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু॥ সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীরা মাঠে

রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদের সম্ভাব্য প্রার্থী (বাম থেকে) বিএনপি’র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, আ’লীগের খায়রুজ্জামান লিটন, জামায়াতের সিদ্দিক হোসেন ও স্বতন্ত্র হাবিবুর রহমান -সংগ্রাম

বিশেষ প্রতিনিধি, রাজশাহী : রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও কাউন্সিলর নির্বাচনে ইসি’র অফিসিয়াল কার্যক্রম শুরু হচ্ছে আগামীকাল ১৩ জুন থেকে। এদিকে এই নির্বাচনের প্রধান আকর্ষণ মেয়র পদের সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীরা ইতোমধ্যে মাঠে প্রচারণা শুরু করে দিয়েছেন। এরই মধ্যে আ’লীগের বিরুদ্ধে পরিবেশ নষ্টের অভিযোগ তুলেছে প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি।
রাজশাহী সিটির (রাসিক) নির্বাচনের তফসিল অনুয়ায়ী ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে ৩০ জুলাই। তবে ইসির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হচ্ছে ১৩ জুন থেকে। মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময় ২৮ জুন। আপিল ও আপত্তি জানানো যাবে ৩ থেকে ৫ জুলাই পর্যন্ত। ১ ও ২ জুলাই যাচাই-বাছাই হবে এবং প্রত্যাহারের শেষ সময় ৯ জুলাই। প্রতীক বরাদ্দ হবে ১০ জুলাই।
সম্ভাব্য প্রার্থীরা : এখন পর্যন্ত রাজশাহী সিটি নির্বাচনে মেয়র পদের সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে ৫ জনের নাম জানা গেছে। এঁরা হলেন, বিএনপি’র বর্তমান মেয়র ও মহানগর বিএনপি’র সভাপতি মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, আওয়ামী লীগের সাবেক মেয়র ও মহানগর আ’লীগের সভাপতি এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরা সদস্য ও মহানগরী সেক্রেটারি অধ্যক্ষ সিদ্দিক হোসেন, স্বতন্ত্র প্রার্থী সামাজিক সংগঠন ‘নাগরিক ভাবনা’র আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিব এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ রাজশাহী জেলার অর্থ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে খায়রুজ্জামান লিটনের নাম বেশ আগেই ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে তিনি প্রচার-প্রচারণায় এগিয়ে আছেন। আর বিএনপি’র প্রার্থীর নাম সরাসরি ঘোষণা করা না হলেও বর্তমান মেয়র বুলবুলই যে প্রার্থী হবেন সেটা ধরে নিয়েই তিনি ভেতরে ভেতরে তাঁর প্রচারণা অব্যাহত রাখেন। এরই মধ্যে তিনি প্রকাশ্যেই নির্বাচনী প্রচারণায় অবতীর্ণ হয়েছেন। জামায়াতের সিদ্দিক হোসেনের পক্ষে নগরীতে শুভেচ্ছা ফেস্টুন টাঙানো হয়েছে।
গত নির্বাচনের চিত্র : ২০১৩ সালের ১৫ জুন রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন (আনারস প্রতীক) ১ লাখ ৩১ হাজার ৫৮ ভোট পান। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের এএইচএম খায়রুজ্জামান (তালা প্রতীক) পান ৮৩ হাজার ৭২৬ ভোট। দুই জনের ভোটের ব্যবধান ৪৭ হাজার ৩৩২ ভোট। কাউন্সিলর প্রার্থীদের মধ্যে অধিকাংশ নির্বাচিত হন বিএনপি-জামায়াত সমর্থিতরা। এর আগে ২০০৮ সালের ৪ আগস্টে অনুষ্ঠিত রাসিক নির্বাচনে এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন প্রথমবারের মত মেয়র নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বর্তমান মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। সেবার নতুন মুখ হিসেবে ভোট প্রাপ্তিতে বেশ চমক সৃষ্টি করেন বুলবুল।
এবারের সম্ভাব্য ইস্যু : আ’লীগ, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্ভাব্য প্রার্থী কারা হচ্ছেন বা দলীয় মনোনয়ন কে পাবেন তা চুড়ান্ত হতে ঈদের পরের সপ্তাহ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তবে আ’লীগ, বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীতার বিষয়টি অনেকটাই নিশ্চিত হওয়া গেছে। বিগত যে কোনো সময়ের চেয়ে আসন্ন রাজশাহী সিটি নির্বাচনকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে রাজনৈতিক দলগুলো। তাছাড়া নগরবাসীও এই নির্বাচনকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন। এবারের প্রার্থীদের নির্বাচনী সম্ভাব্য ইস্যুগুলো কী হতে পারে তাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিএনপি জাতীয় পর্যায়ে গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি স্থানীয় উন্নয়নকেও গুরুত্ব দিচ্ছে। তাদের দাবী, আধুনিক রাজশাহীর রূপান্তর ঘটেছে বিএনপির হাত দিয়ে। তা অব্যাহতও রাখতে চায় তারা। এছাড়াও আ’লীগ সরকার একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির প্রতি কী পরিমাণে প্রতিহিংসামূলক আচরণ দেখিয়েছে তাও তুলে ধরতে চায়। মেয়র বুলবুলের দায়িত্ব গ্রহণের পর অন্তত তিনবার তাকে মেয়র পদ থেকে সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। প্রত্যেকবারই তিনি উচ্চ আদালতের নির্দেশে চেয়ারে ফিরে আসেন। এর মধ্যে তাঁকে একাধিকবার কারাগারেও পাঠানো হয়। একজন জননির্বাচিত মেয়রকে সরকারি আদেশবলে দায়িত্ব থেকে দূরে রাখার বিষয়টি সাধারণ ভোটারদের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া করে। এছাড়াও প্যানেল মেয়রদের বাদ দিয়ে একজন ওয়ার্ড কাউন্সিলরকে মেয়রের চেয়ারে বসিয়ে দেয়া এবং তার নেতৃত্বে নগরবাসীর উপর বিপুলহারে ট্যাক্সের বোঝা চাপানো হয়। এসময় কৃত অনেক প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠে। বলা হয়ে থাকে, এই কাউন্সিলরকে মেয়রের চেয়ারে বসিয়ে নেপথ্যে থেকে একজন সাবেক মেয়রই ছিলেন নগর ভবনের মূল নিয়ন্ত্রক। বুলবুল মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর মেয়াদের প্রায় অর্ধেক সময়ই দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলায় দীর্ঘদিন কারাগারে অথবা আত্মগোপনে থাকতে হয় তাকে। নগরবাসীর উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে তাকে কার্যত বাধা দেয়া হয়। বিএনপি’র দাবী, তথাপি মেয়র বুলবুল স্বল্প সময়ে দায়িত্ব পালনকালে নগরবাসীর যে উন্নয়ন করেছেন এবং আধুনিক ও স্মার্ট মহানগরী পড়ে তোলার জন্য তার ভবিষ্যত কর্মপরিকল্পনা নগরবাসীর কাছে পরিষ্কার। তাই আসন্ন নির্বাচনে বুলবুল আবারো বিপুল ভোটে মেয়র নির্বাচিত হবেন বলে তারা আশা প্রকাশ করেন। আওয়ামী লীগের মূল ইস্যু, ক্ষমতাসীন দলের লোক চেয়ারে থাকলে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। রাজশাহীর উন্নয়ন কর্মকা-ে নিজেদের নানান কৃতিত্বও তারা তুলে ধরতে চায়। তবে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী না হলে তাদের সরকারের ধারাবাহিকতা কীভাবে রক্ষিত হবে- তার কোন উত্তর পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী জাতীয় পর্যায়ে যে চরম নিগ্রহের শিকার হয়েছে তার ক্ষত নিবারণ এবং যে সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদাহরণ সৃষ্টি করেছে তার প্রমাণও রাখতে চায় এই নির্বাচনের মাধ্যমে। জামায়াতে মহানগর সেক্রেটারি অধ্যক্ষ সিদ্দিক হোসেন ১৯৯৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত রাসিক নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হয়ে বেশ পরিমাণ ভোট টানতে সমর্থ হন। জামায়াতের একজন নেতা জানান, জামায়াতে ইসলামী সাংগঠনিকভাবে সুসংগঠিত ও সুশৃঙ্খল একটি সংগঠন। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব না থাকায় দলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা অধ্যক্ষ সিদ্দিক হোসেনকে বিজয়ী করতে সর্বাত্মকভাবে কাজ চালিয়ে যাবেন। এটি খুবই ইতিবাচক একটি দিক। এছাড়া অধ্যক্ষ সিদ্দিক হোসেন নগরবাসীর কাছে স্বচ্ছ ভাবমর্যাদা ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতিক হিসেবে বহুল পরিচিত। সামাজিক কর্মকা-ে তার রয়েছে অনেক অবদান। জামায়াতের জনসমর্থনসহ ভোটব্যাংকও আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। নাগরিক ভাবনার আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান গত রাসিক নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন। আসন্ন নির্বাচনেও তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে চান। তিনি রাজশাহীকে দলবাজিমুক্ত মানবিক নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছেন বলে দাবী করেন।
পরিবেশ নষ্টের অভিযোগ : রাজশাহী সিটি নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার দলীয় প্রার্থী ‘অগণতান্ত্রিক’ আচরণ শুরু করেছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। বর্তমান মেয়র বুলবুল অভিযোগ করেন, অন্যদলের সকল পোস্টার লিফলেট, ফেস্টুন ও ব্যানার অপসারণ করে আ’লীগের প্রার্থী নিজের ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টার টানানো শুরু করেছে। পাড়া-মহল্লার সকল বাড়ির দেয়াল ও বাউন্ডারি দেয়ালে পোস্টার লাগিয়ে এবং শহরের প্রতিটি স্থানে অসংখ্য পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুন লাগিয়ে শহরের সৌন্দর্য নষ্ট করেছে। এছাড়াও তার এই সকল পোস্টার, ফেস্টুন ও ব্যানারের কারণে সরকার লক্ষ লক্ষ টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। দেশে বর্তমানে আইনশৃংখলা বলতে কিছু নেই। পুলিশের সামনে বিএনপি ও সিটি কর্পোরেশনের ব্যানার ফেস্টুন খুলে ফেলে দলীয় প্রার্থীর ব্যানার ফেস্টুন টাঙিয়েছে। সরকার আগামী সিটি ও সংসদ নির্বাচন নিয়ে নীল নক্সা আঁকছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
নির্বাচনী প্রচারণা : ভোটের তফসিল ঘোষণার অনেক আগে থেকেই রাসিক নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা শুরু হয়ে যায়। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে রঙীন পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন, দেয়াল লিখন প্রভৃতি মূল দল ও বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের নামে পুরো নগরী ছেয়ে ফেলা হয়। এছাড়া বাড়ির দেয়ালগুলো লিফলেটে ছেয়ে ফেলা হয়। বাড়ি বাড়ি প্রচারপত্র বিতরণও করা হয়েছে আগাম। তবে দলের ভিতরে প্রার্থী নিয়ে ‘অদৃশ্য’ টানাপোড়েনের আভাষ পাওয়া যায়। আগের রাসিক নির্বাচনে দলের যেসব নেতা সক্রিয় ভূমিকা রাখেননি বা বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন তাদের তালিকাও করা হয়েছিলো। পরে এসব অভিযুক্তকে ‘সাধারণ ক্ষমা’ ঘোষণা করা হয় বলে দলীয় সূত্র জানায়।
অন্যদিকে কিছুটা দেরিতে হলেও বিএনপি’র প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল নগরীর অলিগলিতে পৌঁছে ভোটারদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করছেন। নগরীর বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। গত শুক্রবার রাজশাহী নগরীর আরডিএ মার্কেট মসজিদে জুমার নামাজ আদায় শেষে মার্কেটের ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করার সময় তিনি সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা জানান। সেই সঙ্গে আগামী সিটি নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি যেন আবার নগরবাসীর সেবা করতে পারেন সে জন্য তাদের দোয়া চান। ভোট চান ধানের শীষে। নির্বাচনী প্রচারণার বিষয়ে মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল বলেন, ‘বিএনপি নির্বাচনমুখী দল। নির্বাচনের প্রস্তুতি তো নিতেই হবে। আন্দোলন, কারাবন্দী চেয়ারপার্সনের মুক্তি এবং সিটি নির্বাচন- সবই আমাদের একসঙ্গে করতে হচ্ছে। এখন নিয়মিতই বিভিন্ন এলাকায় যাবো। মেয়র হিসেবে মানুষ আমার কাছ থেকে কী পেয়েছেন, আগামীতে কী চান তা জানতে হবে। মানুষের সঙ্গেই থাকতে হবে। দলের নির্দেশনা মোতাবেক আমি কাজ করে যাচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মী আর প্রশাসনের অতি উৎসাহী কিছু কর্মকর্তা রাজশাহীর নির্বাচনী পরিবেশ নষ্ট করছে। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে সিটি কর্পোরেশনের ব্যানার ও ফেস্টুন সরিয়ে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীর ব্যানার-ফেস্টুন টাঙিয়ে দিচ্ছে। এভাবে নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট করা হচ্ছে। তারপরেও আমরা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি।’ জামায়াতের প্রার্থীর পক্ষ থেকে নগরীর বিভিন্ন স্থানে সরাসরি ভোট চাওয়া না হলেও শুভেচ্ছামূলক ফেস্টুন টানানো হয়েছে। নির্বাচনী তৎপরতা পুরোদমে শুরু হলে প্রচার তৎপরতাও বাড়বে বলে জানা গেছে। তবে ২০ দলীয় জোটের ভিত্তিতে নির্বাচন হলে সে ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ