ঢাকা, মঙ্গলবার 12 June 2018, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২৬ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ঈদ বাজারে নিম্নমানের ভারতীয় ও চায়না কসমেটিকস গহনার দাপট

ঈদের কেনাকাটায় নিজেদের পছন্দমতো কসমেটিকস ও গহনার দোকানে মহিলা ক্রেতাদের একাংশ -সংগ্রাম

* দেশীয় কসমেটিকস ও ইমিটেশনের গহনা শিল্প হুমকির মুখে
* নারীরা ছুটছে হিন্দী সিরিয়ালের অনুরূপ গহনার দিকে
মুহাম্মদ নূরে আলম: ঈদে নিম্নমানের ভারতীয় ও চায়না কসমেটিকস ও গহনা বিক্রি হচ্ছে ব্যাপকভাবে। দেশের ঈদ বাজারের দোকানে দোকানে ৮০ শতাংশ কসমেটিকস ও জুয়েলারি ইমিটেশনের গহনা ভারত ও চীনের। উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত সব শ্রেণির নারীরা ছুটছে হিন্দী সিরিয়ালের অনুরূপ গহনার দোকানগুলোর দিকে। দেশীয় কসমেটিকস ও ইমিটেশন গহনা শিল্প হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। মুক্তবাজার অর্থনীতির সুবাদে দেশের ঈদবাজারের সিংহভাগই বিদেশী পণ্যের দখলে। ঈদ-উল ফিতরের অন্যতম অনুষঙ্গ নতুন পোশাক থেকে শুরু করে শাড়ি, জুতা, মোজা, কসমেটিকস্, পারফিউম, গহনা-জুয়েলারি সামগ্রী, ব্যাগ, জায়নামাজ, টুপি, তসবিহ, আতর, মসলাসহ সবকিছুই বিদেশী। ঈদ বাজারের বিনিয়োগ ও লেনদেন নিয়ে সঠিক কোনো তথ্য না থাকলেও ব্যবসায়ীদের মতে বাংলাদেশের ঈদবাজারের আকার প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার মতো। আর এর ৮০ শতাংশই অর্থাৎ ২৪ হাজার কোটি টাকার ঈদ বাজার বিদেশী পণ্যের দখলে। এর মধ্যে ভারতের দখলে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার পণ্য বাজার এবং বাকিটা পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, জাপান, চীন, তুরস্ক ও ফ্রান্সসহ ১২টি দেশের। আর এভাবে চলতে থাকলে দেশীয় শিল্প হুমকির মুখে পড়বে। অথচ পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করলে বিশাল এ ঈদবাজারের বড় অংশে দেশী পণ্যের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। দেশের বাজারে বিদেশী বিশেষ করে ভারতীয় পণ্যের আগ্রাসন প্রসঙ্গে অনেক সচেতন ক্রেতা বলছেন, শিল্পেরক্ষেত্রে বাংলাদেশ আত্মঘাতী নীতি অনুসরণ করে চলেছে। আর এভাবে ভারতের প্রভাব বাড়তে থাকলে বছর কয়েকের মধ্যেই দেশের বাজার থেকে দেশী সব পণ্য সংশ্লিষ্ঠ কারখানা গুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়া আশঙ্কা রয়েছে। 
 ঈদের আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। পোশাকের পর এবার কেনাকাটা জমে উঠেছে জুয়েলারি ও কসমেটিকসের দোকানগুলোতে। গোল্ড ও ডায়মন্ডের পাশাপাশি রয়েছে ইমিটেশনের বাহারি ডিজাইনের চুড়ি, ব্রেসলেটসহ বিভিন্ন গহনা। বাঙালি নারীর ঈদ কেনাকাটায় চুড়ি আর গহনা ছাড়া কি চলে! মোটেই না। জামা-জুতা কেনার পর ম্যাচিং করে এখন ক্রেতারা ছুটছেন গহনার মার্কেটে। গহনার ঢং আর রঙ মিলিয়ে কিনে নিচ্ছেন রেশমি, মেটাল কিংবা রুপার তৈরি চুড়ি। এবার মার্কেটগুলো পুঁতি, কাঠ, পিতল, কড়ি, শেল, সুতাসহ নানা ধরনের গহনা আর চুড়ির পসরা সাজিয়েছেন দোকানিরা। এদিকে নব্য ফ্যাশনের হাল ধরতে ফ্যাশন ডিজাইনাররা হাউসগুলোতে কাঠ, পিতল, চুমকির ব্যবহারে বিভিন্ন মোটিফের গহনা নিয়ে হাজির হয়েছেন। ক্রেতারা জানান, মার্কেট থেকে ফ্যাশন হাউসগুলোতে গহনার দাম বেশি। তার পরও ডিজাইনের বৈচিত্র্যের কারণে তাদের প্রথম পছন্দ সেখানেই। আর প্রত্যাশা অনুযায়ী বেচাকেনাও ভাল হচ্ছে বলে জানায় ব্যবসায়ীরা।
মেয়েদের মাথায় টিকলি, গলায় হার, কানে ঝুমকা আর হাতে রেশমি চুড়ি। বিশেষ দিনে এসব গয়না পরে সাজবে নারী, এটাই স্বাভাবিক। আর এ বিশেষ দিনটি যদি হয় ঈদের দিন তাহলে এসব গহনা না পরলে নিজেকে যেন একটু ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয় না! কারণ সৌন্দর্যচর্চায় গহনার কোনো বিকল্প নেই। তাই সুদূর প্রাচীনকাল থেকেই মেয়েরা গহনা ব্যবহার করে আসছে। এক সময় স্বর্ণ, ইমিটেশন ব্যাপক ব্যবহার হলেও এখন ব্যবহার হচ্ছে একটু ভিন্ন ধাঁচের গহনা। বছরের খুশির এই দিনটিতে সবসময় নিজেকে একটু ভিন্নভাবেই উপস্থাপন করতে চায় মেয়েরা। এজন্য ঈদের বিশেষ পোশাকের সঙ্গে মিল রেখে তারা বেছে নিচ্ছেন পছন্দের গহনা। ঈদের কেনাকাটায় মেয়েদের প্রিয় স্টোনের কানের দুল আর রেশমি চুড়ি। তাই নতুন পোশাক কেনার পাশাপাশি গহনার দোকানগুলোতে এখন উপচেপড়া ভিড়।
এবারের ঈদের বাজারে একেক বয়সী মেয়েদের জন্য বাজারে এসেছে একেক রকমের গহনা। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ূয়া ও চাকরিজীবী মেয়েদের জন্য ঈদবাজারে এসেছে মিনা করা ও স্টোনের দুল। স্কুল ও কলেজপড়ূয়াদের জন্য এসেছে হালকা ও হেভি মেটালের চুড়ি আর কানের দুল। নিজেদের মধ্যে এন্টিক ও ট্রাইভাল লুক আনতেই তারা এখন বেছে নিচ্ছে এসব কানের দুল। টপস, ফতুয়া, জিনস, শার্ট কিংবা স্কার্টের সঙ্গে পরার জন্যই এসব গহনা বেছে নিচ্ছে তারা। হালকা ও হেভি মেটালের এসব কানের দুল পাওয়া যাচ্ছে ১০০ থেকে ৭০০ টাকার মধ্যে।
ঈদে শেষমুহূর্তের কেনাকাটায় ব্যস্ত এখন রাজধানী ঢাকাবাসী। ঈদে মেয়েদের কেনাকাটার বড় অংশ জুড়ে থাকে গহনা। জুয়েলারির পাশাপাশি জমে উঠেছে কসমেটিকসের দোকানগুলোও। ঈদের পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে মেয়েরা কিনছেন লিপস্টিক, নেইলপলিশ, আইলাইনারসহ বিভিন্ন প্রসাধনী। দেশী-বিদেশী বিভেদ না করে পছন্দ ও সামর্থ্য অনুযায়ী ক্রেতারা কিনছেন তাদের প্রয়োজনীয় কসমেটিকস। একই সঙ্গে তাদের চাহিদা মতো স্বর্ণসহ ইমিটেশন, সিটি গোল্ড, গোল্ড প্লেটেডের নানা ধরনের গহনার পসরা সাজিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
গতকাল সোমবার রাজধানীর নিউমার্কেট, চাঁদনী চক, গাউছিয়া, চন্দ্রিমা সুপার মার্কেট ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। তবে মার্কেট ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি গহনার বিশাল কালেকশনে কোনো অংশে কম নন নিউমার্কেট ও গাউছিয়ার ফুটপাত ব্যবসায়ীরাও।
সরেজমিনে মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে, ঈদ উপলক্ষে গহনা ব্যবসায়ীরা স্বর্ণ ছাড়াও ইমিটিশন ও সিটি গোল্ডের চেইন, লকেট, চিকন ও মাঝারি বালা, আংটি, কানের দুল, নাকফুল, নোলক, নূপুর ও টিকলিসহ আধুনিক সব অলঙ্কারের পসরা সাজিয়েছেন তারা। এ ছাড়াও বড় ঝুমকা, পাশা, রুপার বালাসহ নানা সাইজের চুড়ি নজর কাড়ছে ক্রেতাদের। বিক্রেতারা জানান, মার্কেটের এসব গহনা ভারত, চীন, কোরিয়া, হংকং, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুর থেকে আমদানি করা। তবে ইদানীং দেশেও তৈরি হচ্ছে ইমিটেশন গয়না।
চয়নিকার বিক্রয়কর্মী ফাহিম আহমেদ বলেন, বর্তমানে অ্যানিক্স, গ্রেইন কোরিয়ান, রিং, স্টোন রুবি পান্না, ক্রিস্টাল মালা, জয়পুরী গোল্ড প্লেট, নেকলেস বাজু ব্রেসলেট বেশি চলছে। তবে ঈদের বাজার এখনও জমজমাট হয়নি। ক্রেতারা এখনও ঈদের মৌলিক কেনাকাটায় ব্যস্ত। আমাদের বাজার জমজমাট হয় ২৫ রমজানের পর। ফলে ঈদের অনেক নতুন কালেকশন এখনও ডিসপ্লে করিনি। বিভিন্ন দোকানে সিটি গোল্ডের কানের দুল ২০০ থেকে ১ হাজার টাকায়, চুড়ি ২৫০ থেকে ২ হাজার টাকায়, ব্রেসলেট ১০০ থেকে ৮০০ টাকায় এবং আংটি ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে মার্কেট থেকে তুলনামূলক কম দামে এসব অলঙ্কার বিক্রি হচ্ছে ফুটপাতের ভ্রাম্যমাণ দোকানগুলোতে। নিউ মার্কেট ওভারব্রিজের দোকানগুলোতে ৫০ টাকায়ও গহনা পাওয়া যাচ্ছে। সালমা বেগম নামে এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী বলেন, নিউমার্কেট থেকে আগেও গহনা কিনেছি। এবারও কিনছি। অন্যান্য জায়গা থেকে এখানকার গহনার দামও তুলনামূলক কম এবং কালেকশনও ভালো।
ঈদকে কেন্দ্র করে পোশাক, জুতা, কেনা হলেও ম্যাচিং করে গহনা কেনা হয়নি শনিরআখড়ার বাসিন্দা পারভীন আক্তার লাকীর। নিজের ও তার দুই মেয়ের জন্য কিনবেন রঙিন চুড়ি। তাই গহনা কিনতে এসেছেন গাউছিয়ায়। গাউছিয়ায় পোশাকের মার্কেটের পাশাপাশি গহনার বাজারেও অনেক ভিড়। এই ভিড় ঠেলেই তিনি গহনার শোরুমে এসেছেন। ম্যাচিং করে কিনেছেন চুরি ও পিতলের মধ্যে ছোট ছোট পাথরের কাজ করা গহনা। তিনি জানান, এবার নতুন নতুন ডিজাইনের গহনা এসেছে। দোকানিরা এগুলো ইন্ডিয়ান বলে দাম হাঁকাচ্ছেন অনেক বেশি। কিন্তু দরদাম করে অনেক কমে কেনা যায়। আরেকজন ক্রেতা লায়লা আক্তার জানান, নিজের জন্য কিনেছি। এখন বান্ধবীর জন্য গহনা খুঁজছি। গিফট করব। দাম যা বলেছে। তাতেই কিনেছি। এদিকে, গহনা ও চুড়ির পাইকারি মার্কেটের বিক্রেতারা জানান, রোজা শুরুর পর থেকেই গহনা ও চুড়ির মার্কেটে খুচরা বিক্রেতার ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। নিত্যদিনের মতো চকবাজারে পা ফেলার জায়গাও ছিল না। চাহিদা অনুযায়ী চুড়ির প্রত্যেকটি দোকানে প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই লাখ টাকার বিক্রি হয়েছে বলে জানান পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ীরা। তারা জানান, আগামী শুক্রবার চাদঁরাত পর্যন্ত চলবে এই বেচাকেনা। তারপর আর তেমন হবে না। কারণ খুচরা বিক্রেতাদের কেনাকাটাও শেষের দিকে।
চকবাজারের কুমকুম ফ্যাশন চুড়ি হাউসের স্বত্বাধিকারী বশির উদ্দিন জানান, ঈদে ভারতের টিভি সিরিয়ালের চরিত্রের নামে বেশ কয়েক ডিজাইনের চুড়ি বাজারে এসেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পাখি, রেশমি, ঝুনঝুনি বেশ জনপ্রিয়। তিনি বলেন, শনিবার পর্যন্তই পাইকারি বাজারে ক্রেতা আসবে। এরপর আর বিক্রি হবে না। তবে রোজার পর থেকে প্রতিদিন সর্বোচ্চ চার লাখ টাকার চুড়ি বিক্রি হয়েছে। আরেক বিক্রেতা জরি মহলের স্বত্বাধিকারী আবদুর রহমান বলেন, ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী খুচরা দোকানিরা চকবাজার থেকে পাইকারি পণ্য কিনে থাকেন।
আজিজ সুপার মার্কেটের দেশাল আউটলেটের বিক্রয়কর্মী রোমিও বলেন, এবার ঈদে পোড়া মাটির ওপর পাথর ও চুমকি বসানো গহনা এসেছে। এ ছাড়া বৈচিত্র্য আনতে পুঁতির সঙ্গে ধাতু, শেল বা সুতার মিশ্রণে গহনার নকশা বানিয়েছি। এখানে কানের দুল হচ্ছে ৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত, ব্রেসলেট ১৫০ থেকে ৩৫০ টাকা, বিভিন্ন ডিজাইনের গহনা ৩০০ থেকে ৮০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।
এদিকে রুপার গহনার চাহিদাও দিনদিন বাড়ছে। ঈদকে কেন্দ্র করে রুপার গহনা কিনতেও মেয়েদের ভিড়। নিউমার্কেট, চাঁদনী চক, বায়তুল মোকাররম এবং অন্যান্য শপিংমলের গহনার দোকানগুলোতে এসব রুপার গহনা পাওয়া যায়। গাউছিয়ার চাঁদনী চকে মধ্যবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তরা নিজেদের ডিজাইন কিংবা শোরুমে সজ্জিত গহনা কিনে থাকেন। অনেকে রুপার ওপর স্বর্ণের প্রলেপ দিয়ে থাকেন। ফলে দেখতে অনেকটা স্বর্ণের গহনার মতোই হয়। এবার রুপার গহনা গোল্ড প্লেট, কপার ও অ্যান্টিক- এই তিন রূপেই পাওয়া যাচ্ছে। সাজে বৈচিত্র্য আনতে ডিজাইনাররাও বেছে নিয়েছেন নতুন ডিজাইন। সেইসঙ্গে ব্যবহার করেছেন প্রচুর পরিমাণ মুক্তা।
ক্রেতারা জানান, এবার চাঁদনী চকে উৎসবকেন্দ্রিক গহনার পাশাপাশি স্বাভাবিক সময়ে পরার উপযোগী ছোট নকশার গহনারও পসরা সাজিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এসব গহনায় ধাতু, পুঁতি, মুক্তার ব্যবহারে নান্দনিক সব ডিজাইন আর নিখুঁত কারুকাজই তাদের আকৃষ্ট করছে। এসব গহনা ৫০ বা ১০০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০০ বা আড়াই হাজার টাকার মধ্যেই মিলছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ