ঢাকা, মঙ্গলবার 12 June 2018, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২৬ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

শান্তিচুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ি বাঙালিদের অধিকার খর্ব করা হয়েছে

স্টাফ রিপোর্টার : পার্বত্য নাগরিক পরিষদ ও পার্বত্য বাঙ্গালি ছাত্রপরিষদের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তারা বলেন, শান্তিচুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ি বাঙালিদের অধিকার খর্ব করা হয়েছে। উপজাতি সন্ত্রাসীদের সাথে শান্তিচুক্তি বাতিল করতে হবে। উপজাতিদের সব ধরনের রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা দেয়ার পরও তারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিদেশীদের সাথে মিলে ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। সন্তু লারমার দল জনসংহতি সমিতির কেন সামরিক শাখা থাকবে! যদিও বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দলের সামরিক শাখা নাই। 

গত রোববার রাজধানী ঢাকার বাংলাদেশ শিশুকল্যাণ পরিষদের কনফারেন্স কক্ষে অনুষ্ঠিত পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তির অন্তরায় এবং আমাদের করণীয় শীর্ষক সেমিনার ও ইফতার মাহফিলে বক্তারা এসব কথা বলেন। 

 সেমিনারে পার্বত্য নাগরিক পরিষদের চেয়ারম্যান ইঞ্জি: আলকাছ আল মামুন ভূইঁয়ার সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি খাদিমুল ইসলাম, শেখ মোহাম্মদ রাজু, আবদুল হামিদ রানা, প্রকৌশলী সাহাদাৎ ফরাজি সাকিব, আক্কাস আলী, মোশাররফ হোসেন মিলন, মুকছেদ আলম মঞ্জু, কবি ফাতেমা খাতুন রোনা প্রমুখ। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী মো: বরকত আলী। 

 পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিস্পত্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি খাদিমুল ইসলাম বলেন,পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমিপুত্র হচ্ছে বাঙালীরা। বিগত ভূমি কমিশন থেকে আমরা এখানকার একটি সমস্যা পেয়েছি তা হচ্ছে ভূমি জরিপ প্রয়োজন। তিনি আরো বলেন, বর্তমানে আমার কাছে ৩৮ হাজারের মতো পাহাড়ি বাঙালী ভূমিহীন পরিবারের আবেদন আছে। উপজাতি সন্ত্রাসীদের কারণে গুচ্ছগ্রামের মতো স্থানে একত্রে বসবাস করতে হয়। এই পরিবারগুলো এখানে তাদের ভূমির মালিকানা চাচ্ছে, চাচ্ছে ভূমির অধিকার। এটা এখানে অনেক বড় মানবাধিকারের বিষয়। ভূমি বিরোধ সম্পর্কে তিনি বলেন, কোন বিরোধই নিষ্পত্তির ঊর্ধ্বে নয়। তাই জোর করে কোন আইন পাস করা যাবেনা। তাই সকলের মনে রাখতে হবে আমরা আবারও ভূমিতে ফিরে যাবো, তাই ভূমি নিয়ে খেলা না করি। তিনি ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তিতে সকল পক্ষের সহনশীলতা, ঔদার্য এবং সহযোগিতা প্রদানের উপর গুরুত্বারোপ করেন।

বক্তারা বলেন, উপজাতি সন্ত্রাসীরা মালিকানা এবং ভূমি দখল নিয়ে ভূমি বিরোধ সৃষ্টি করে রাখছে। পাহাড়ি বাঙালিদের বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে বাঘাইছড়ির দুই টিলা নামক স্থানে রিজার্ভ ফরেষ্ট এলাকায় বসতি স্থাপনের কারনে জেলা প্রশাসন থেকে ১৪৪ ধারা জারি করার পরও উপজাতিরা ধর্মীয় প্রার্থনালয় স্থাপন করেছেন। তাদের উদ্দেশ্য অসৎ। উপজাতিরা ভূমি দখলের উদ্দেশ্যে ধর্মীয় উপাশনালয় বানাচ্ছে পাহাড়ি বাঙালীদের জায়গা দখল করে। তাই সকলকে সজাগ থাকতে হবে ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে কেউ যাতে কিছু করতে না পারে।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী মো: বরকত আলী বলেন, ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক উপজাতি নেতৃত্বের সাথে যে শান্তিচুক্তি হয়েছিল তার ফলস্বরূপ এ অঞ্চলে স্থায়ী শান্তির সম্ভাবনা কাক্সিক্ষত ছিল। চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন ইতিবাচক পদক্ষেপের মাধ্যমে শান্তিচুক্তির অধিকাংশ ধারা বাস্তবায়নের করেছে এবং অবশিষ্ট ধারাসমূহ বাস্তবায়নের জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু ভূমিবণ্টনসহ অন্যান্য কিছু মৌলিক বিষয়ে বিভিন্ন দল ও জনগোষ্ঠীর মতামতে ভিন্নতা শান্তিচুক্তির অবাস্তবায়িত ধারাসমূহ বাস্তবায়ন করতে দীর্ঘসূত্রিতা সৃষ্টি করেছে।

ইতোমধ্যে পার্বত্য অঞ্চলের উপজাতি আঞ্চলিক নেতৃত্বের মধ্যে দ্বিধা-বিভক্তির কারণেও চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী পিসিজেএসএস ছাড়াও অন্য আরও দুইটি আঞ্চলিক উপজাতি দল গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে একটি দল ইউপিডিএফ শান্তিচুক্তির সম্পূর্ণ বিরোধিতা করে স্বায়ত্বশাসন দাবি করছে। অন্যদিকে আঞ্চলিক অপর দল জেএসএস (সংস্কার), জেএসএস (মূল) দলের সাথে নেতৃত্বের সংঘাতে জড়িয়ে পৃথক অবস্থানে রয়েছে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে কাক্সিক্ষত শান্তি ফিরে আসার কথা থাকলেও সেই অনুযায়ী আশানুরূপ শান্তি ফিরে আসেনি। আঞ্চলিক উপজাতি তিনটি দলই পৃথক পৃথক সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপ পরিচালনা করে।

তিনটি দলই সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিভিন্ন এলাকায় ভাগ করে নিয়মিত চাঁদাবাজী ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আঞ্চলিক উপজাতি দলসমূহের সশস্ত্র সংগঠনসমূহ আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত। পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ উপজাতি-বাঙালি অধিবাসীগণ উল্লেখিত তিনটি সশস্ত্র সংগঠনের চাঁদাবাজীতে অতীষ্ঠ। সশস্ত্র সংগঠনগুলোর দৌরাত্ম্যের কারণে পার্বত্য অঞ্চলে গড়ে উঠছে না কোন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিমূলক স্থাপনা। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অনুমান করা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমানে এই অশান্ত হয়ে ওঠা, শান্তিচুক্তির পরেও সাধারণ উপজাতি, বাঙালিদের নিরাপত্তাহীনতা এসব কিছুর জন্যই কিছু কিছু উপজাতি নেতৃবৃন্দের স্বার্থপরতা ও ব্যক্তিগত ক্ষমতা গ্রহণের লিপ্সাই দায়ী।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী মো: বরকত আলী বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রধানত ১৩ থেকে ১৪টি উপজাতি সম্প্রদায়ের বসবাস থাকলেও সর্বক্ষেত্রেই চাকমা সম্প্রদায়ের ব্যক্তিবর্গই নেতৃত্বের অবস্থানে শীর্ষস্থান দখল করে আছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা সম্প্রদায়ের জমিদারদের মধ্যে স্বীকৃত প্রথম জমিদার কালিন্দি রায়ের সিপাহী বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ, ইংরেজদের তুষ্ট করার প্রবণতা, ইংরেজ কর্তৃক দেশ বিভাগের সময় সকল উপজাতি সম্প্রদায়ের ভারতের সাথে সংযুক্তির ইচ্ছে থাকলেও নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য নলিনাক্ষ রায়ের পাকিস্তানের সাথে সংযুক্তিতে স্বস্তি, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ত্রিদিব রায়ের পাকিস্তানকে সমর্থন ও সহযোগিতা, বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর এম এন লারমা কর্তৃক সশস্ত্র গেরিলা সংগঠন শান্তিবাহিনী গঠন, দেবাশীষ রায়ের দেশবিরোধী প্রচারণার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্বার্থন্বেষী মহলের সহায়তায় নতুন উদ্ভাবিত ‘আদিবাসী’ দাবি ইত্যাদি, এসব কিছুই চাকমা সম্প্রদায়ের কোন কোন গোত্রের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দের স্বার্থপরতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ফুটে ওঠে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিকাংশ চাকমাই আরাকান অঞ্চল থেকে শরণার্থী হিসেবে ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে এসেছিল। চাকমাদের তথাকথিত রাজবংশের শুরুটা ছিল কালিন্দি রায়ের মৃত্যুর পর থেকে। ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে কালিন্দি রায় ও ধরম বক্স খাঁ’র কন্যা মেনকা এবং তার স্বামী গোপীনাথ দেওয়ান চাকমার সন্তান হরিশ্চন্দ্র রায় পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমাদের জমিদারির দায়িত্ব পাবার পর, ‘এই অঞ্চলটি চাকমাদের’ এরূপভাবে প্রচার পেতে শুরু করে।

২০০৩ সালে প্রকাশিত আত্মজীবনী মূলক বইতে ত্রিদিব রায় নিজেই রাজাকার হিসেবে তার কর্মকা- বিস্তৃতভাবে উল্লেখ করেছেন এবং এসব অপকর্মের কারণে তিনি অনুতপ্ত তো ননই বরং গর্ব প্রকাশ করেছেন তার বইয়ের। একই সাথে তিনি মুক্তিযোদ্ধা, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে ব্যঙ্গ করার পাশাপাশি পাকিস্তানী হানাদারদের প্রসংশা করেছেন। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন প্রকার কল-কারখানা, পর্যটনসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটত। সর্বোপরি দেশের অর্থনীতিতে বিষয়টি অত্যন্ত ইতিবাচক হতো। ঐতিহাসিকভাবে চাকমা নেতৃত্বের স্বার্থপরতাজনিত এই বিতর্কিত ভূমিকা দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠির স্বার্থবিরোধী হয়ে দেখা দিয়েছে।

চাকমা সম্প্রদায়ের ৪৬ ধরনের গোত্রের মধ্যে অধিকাংশ গোত্র সাধারণ উপজাতি ও বাঙালিদের সাথে মিলে মিশে এক সাথে কাজ করতে চায়। ঐতিহাসিকভাবে চাকমা সম্প্রদায়ের বিতর্কিত প্রশ্নবৃদ্ধ ভূমিকা সাধারণ পাহাড়ী, বাঙালিদের জনজীবন অতিষ্ঠ করাসহ দেশের সামগ্রীক উন্নয়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বার্থান্বেষী গুটি কয়েক চাকমা নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের আচরণ এবং কার্যক্রমের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ফিরে আসছে না।

পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি পুনরুদ্ধারে এবং উক্ত অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য ব্যাপক শিল্পায়ন প্রয়োজন। যুগে যুগে চাকমা সম্প্রদায়ের নেতৃত্বের স্বার্থপরতার জন্য উচ্চবিত্তদের সন্তানগণ শিক্ষার আলো পেলেও, সাধারণ পাহাড়ীদের সন্তানগণ শিক্ষাসহ অন্যান্য নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল জাতি/গোষ্ঠী নিজ নিজ সম্প্রদায়ের জনগণের আগামী প্রজন্মকে উন্নত নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য চাকমা সম্প্রদায়ের চিহ্নিত কিছু নেতৃবৃন্দের নিজ জাতিগোষ্ঠীর স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের সাথে সহমত প্রকাশ না করে, নিজ দেশ বাংলাদেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে নিজেকে আরো উন্নত গর্বিত বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে, এই প্রত্যাশা সকলের।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ