ঢাকা, মঙ্গলবার 12 June 2018, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২৬ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

স্রষ্টার সান্নিধ্যে বিনীত রজনী : লাইলাতুল ক্বদর

সুমাইয়া তাসনীম : সেই জোছনার মধ্যে বিস্ময়কর পাঠের উচ্চারণ
সুদীর্ঘ অপেক্ষার পর প্রস্ফুটিত হাজার রাতের ফুল
রহমত, বরকত, মাগফেরাত কত নামের উপঢৌকন
চোখের একটি একটি ফোঁটা হীরের পাহাড় যেন,
শূন্য হাতগুলো ভরে উঠলো
বিবর্ণ মুখ বর্ণতার উল্লাসে ভরা সূর্য
এখন দিন নেই, রাত নেই সময়ের গুঁড়োগুলো
আশ্চর্য দানার মতো মূল্যবান মোহনীয়
একটি একটি রুকু অগণিত রুকু
একটি একটি সিজদা অগণন সিজদার আবে জমজম।
জীবনের বিশাল সীমানার সমস্ত অলিগলি পেরিয়ে প্রতিনিয়ত মানবসমাজ পাওয়া না পাওয়ার হিসাব মেলাতে ব্যস্ত। কখনো পেয়ে হারানো, কখনো হারিয়ে পাওয়া লাভ-ক্ষতির যোগ-বিয়োগ কষতে কষতে নিজের রূহকে সুসজ্জিত করার কথা ভুলে যায়, ন্যায়-অন্যায়ের সীমারেখা ভুলে যায়। নিজের আত্মাকে তালাবদ্ধ করে রাখে। বিবেকের গায়ে জীর্ণতার বেড়ি পরিয়ে দেয় নফসের চাহিদা মিটাতে পেরে সাময়িক উচ্ছাস অনুভূত হলেও ফলাফল এক বুক শূন্যতার অনুভূতি শত পাপ আর গ্লানির ক্লেদ চেপে বসে মনের চারপাশে। চোখের তৃপ্তি, ভোগ-বিলাসিতা আরাম আয়েশ সত্ত্বেও তখন মন থাকে অতৃপ্ত ও অস্থির। একটি বন্ধনের উপস্থিতি মানবমনকে মুক্তি দিতে পারে এ অস্থিরতা থেকে। ঢেলে দিতে পারে প্রশান্তির সমুদ্র। এনে দিতে প্রগাঢ় নিশ্চিন্ততাবোধ। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সাথে একটি শক্তিশালী ও মজবুত সম্পর্কই সেই কাক্সিক্ষত বন্ধন, রাতের গভীরে পরম একাকীত্বে নিবিড় নিবিষ্টচিত্তে তার কাছে কায়মনোবাক্যে আকুতিমাখা ফরিয়াদ মুছে দিতে পারে কালিমালিপ্ত অন্ধকার অতীত। হৃদয়ের সকল নিবেদন, স্মরণ, শোকর, সেজদাহ তাসবীহ ও আমাদের ভালবাসায় যাবতীয় উচ্চারণ কেবল তারই জন্য নির্দিষ্ট করে দেয়ার মধ্যেই তার নিশ্চিত সমাধান। লাইলাতুল ক্বদর রবের পক্ষ থেকে বান্দার জন্য নিজেকে সমর্পনের সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ সুযোগ। একটি মুহূর্তের এই সমর্পনের গুণফল হাজার রাতের সমর্পনের উপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করবে।
এ রাতেই মহান রাব্বুল আলামীন জ্বেলে দিলেন মানবজাতির জন্য আলোর মিনার আল কুরআন যা কেয়ামত পর্যন্ত আলো দেখাবে চির উজ্জ্বল হয়ে। যা প্রতি পদে পদে ভুলের অন্ধকারে হাবুডুবু খাওয়া থেকে মানুষকে রক্ষা করে।
লাইলাতুল ক্বদরের প্রেক্ষাপট উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য : ইবনে আবী হাতেমের রিওয়ায়াতে বর্ণিত আছে, “একদিন রাসূলুল্লাহ (সা.) বনী ইসরাঈলের এমন চারজন মহান ব্যক্তির কথা আলোচনা করলেন, যারা আশি বছর ধরে আল্লাহর ইবাদত করেছেন। তারা এক মুহূর্তের জন্যেও আল্লাহর নাফরমানি করেননি। এ চারজন ছিলেন হযরত আইয়্যুব (আ.) যাকারিয়া (আ.), হিযকিল (আ.), ইউশা ইবনে নূন (আ.)। একথা শুনে সাহাবীগণ আশ্চার্যানি¦ত হলেন। কারণ পূর্ববর্তী নবী এবং তাদের উম্মতগণ দীর্ঘায়ু লাভ করার কারণে বহু বছর আল্লাহর ইবাদত করার সুযোগ পেতেন। কিন্তু মহানবী (সা.) এবং তাঁর উম্মতের আয়ু অনেক কম হওয়ায় তাদের পক্ষে আল্লাহর ইবাদত করে পূর্ববর্তীদের সমকক্ষ হওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়। সাহাবীগণের এ আক্ষেপের প্রেক্ষিতে তৎক্ষণাৎ হযরত জীব্রাঈল (আ.) মহানবীর নিকট আগমন করে বলেন, “আপনার উম্মাত ও চার ব্যক্তির কথা শুনে স্তম্ভিত হয়েছেন। আল্লাহ এর চেয়েও উত্তম বস্তু আপনাদের জন্য দান করেছেন।” এরপর সূরা ক্বদর নাযিল হয়।
ইবনে আবী হাতিম (রা.) এর অন্য রেওয়ায়েতে এসেছে, রাসূল (সা.) একবার বনী ইসরাঈলের জনৈক মুজাহিদ সম্পর্কে আলোচনা করলেন। সে একহাজার মাস পর্যন্ত অবিরাম জেহাদে মশগুল থাকে এবং কখনো অস্ত্র সংবরং করেনি। মুসলমানগণ একথা শুনে বিস্মিত হলে এই সূরা ক্বদর অবতীর্ণ হয়। এতে এই উম্মতের জন্য শুধু এক রাতের ইবাদতই সে মুজাহিদের এক হাজার মাসের ইবাদত অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ প্রতিপন্ন করা হয়েছে।
ইবনে জারীর (রা.) অপর একটি ঘটনা এভাবে উল্লেখ করেছেন যে, বনী ইসরাঈলের জনৈক ইবাদতকারী ব্যক্তি সমস্ত রাত্রি ইবাদতে মশগুল থাকতেন ও সকাল হতেই জেহাদে বের হয়ে যেতেন এবং সারাদিন জেহাদে লিপ্ত থাকতেন। তিনি একহাজার মাস এভাবে কাটিয়ে দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতেই আল্লাহ তায়ালা সূরা ক্বদর নাযিল করে এ উম্মতের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন। এ থেকে আরও প্রতীয়মান হয় যে, শবে ক্বদর উম্মতে মুহাম্মদীর বৈশিষ্ট্য। (মাযহারী)
সুতরাং স্বল্প আয়ুষ্কাল পেয়েও উম্মতে মুহাম্মদী যেন পূর্ববর্তী উম্মতের মত আল্লাহর নৈকট্য লাভের ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকতে পারে এবং শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পারে সেজন্য মহান আল্লাহ অসামান্য এই উপহার দিলেন। ক্বদরের রাতের মর্যাদা যতটা না তার বৈশিষ্ট্য ও ফযিলতের কারণে তারচেয়েও বেশি কুরআন নাযিলের কারণে যা মানবজীবনের জন্য আল্লাহর সার্টিফিকেট প্রাপ্ত একমাত্র নির্ভুল সঠিক ও যাবতীয় কল্যাণের নিশ্চিত জীবনবিধান।
তাই কেউ যদি ভেবে নেয় যে, সারা জীবন আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে পাপ-পংকিলতায় গা ডুবিয়ে থাকবে। আর শুধু ক্বদরের এক রাতের ইবাদতের মাধ্যমে জান্নাত নিশ্চিত করে ফেলবে তাহলে তা হবে চরম অজ্ঞতা ও মূর্খতার নামান্তর। নফসের গোলামী ও শয়তানের আনুগত্যই যার স্বভাব একরাতে খালেস খোদা পাবন্দ ব্যক্তিত্বে পরিণত হওয়া সূচের ছিদ্রে উটের প্রবেশের মতোই অসম্ভব ও অবান্তর।
হ্যাঁ, তবে অবশ্যই আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার যাত্রাপথে ক্বদর রাত হতে পারে জীবনের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট। সেই সাথে গুনাহ মাফের সুযোগ আল্লাহর কাছে ফিরে আসার হাতছানি। এই ফিরে আসার মাধ্যমে নতুন পাওয়া জীবনকে সৌভাগ্য প্রশান্তি ও শ্বাশত মুক্তির মঞ্জিলে পৌঁছাতে আল কুরআনের যথাযথ অনুশীলন জীবনব্যাপী করে যেতে হবে। মন মস্তিষ্ক ও শ্রমসাধনাকে ব্যয় করতে হবে। তবেই পুঁজি দ্বিগুণ থেকে সাতগুণ মুনাফা হয়ে দেখা দিবে। মাটির অভ্যন্তরে রোপিত বীজটি ফলে ফলে সুশোভিত হয়ে ধরা দেবে। রাসূল (সা.) ও তাঁর সাহাবীরা এই পদ্ধতিই অবলম্বন করেছেন। এটিই লাইলাতুল ক্বদরের মূল তাৎপর্য। সূরা ইউনুসে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “হে মানবজাতি! তোমাদের নিকট তোমাদের প্রভুর পক্ষ থেকে পথ প্রদর্শক এসে গেছে। এটা সেই জিনিস যা অন্তরের অসুস্থতা নিরাময় করে, যারা এটা গ্রহণ করবে তাদের জন্য পথপ্রদর্শন ও রহমত হিসেবে কাজ করবে। (হে নবী)! আপনি বলে দিন যে, আল্লাহ অত্যন্ত করুণা ও মেহেরবানী করে এ মহামূল্যবান জিনিস পাঠিয়েছেন- এ কারণেই লোকদের উৎসব করা উচিত। মানুষ যা কিছু সংগ্রহ করার কাজে ব্যস্ত সেসব কিছুর চেয়ে এটা শ্রেষ্ঠ।” (সূরা ইউনুস: ৫৭-৫৮)
লাইলাতুল ক্বদর কি ও কেন?
আরবী লাইলুন অর্থ রাত, আর ক্বদর শব্দের অর্থ- ভাগ্য নির্ধারণ।
- ভাগ্যোন্নয়ন
- মাহাত্ম্য ও সম্মান
- সম্মানিত
সুতরাং লাইলাতুল ক্বদর অর্থ:
১. ভাগ্য নির্ধারণের রাত : এক বছরের সমস্ত রিযিক, ভাগ্যসমূহ যত মানুষের জন্ম হবে এবং যত মানুষের মৃত্যু হবে তা এ রাতে ফেরেশতাদের দ্বারা লেখানো হয়। সেজন্য এটি ভাগ্য নির্ধারণের রাত। (ইমাম নবী ও মোল্লা আলী ক্বারী)
পবিত্র কুরআনে এর প্রমাণ পাওয়া যায়।
 বরকতময় রাতে প্রত্যেকটি মজবুত হুকুম সিদ্ধান্ত করা হয়। (সূরা দুখান)
 ক্বদরের রাতে ফেরেশতাগণ ও জিব্রাঈল (আ.) তাদের প্রভুর অনুমতিক্রমে প্রত্যেকটি হুকুম নিয়ে অবতীর্ণ হয়।
২. ভাগ্যোন্নয়নের রাত : এ রাতেই ভাগ্য পরিবর্তনকারী গাইডলাইন মহাগ্রন্থ আল কুরআন নাযিল হয়েছে। ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্রসহ গোটা বিশ্বের ভাগ্য পরিবর্তন করে উন্নতির দিকে নিতে সক্ষম এই কুরআন।
৩. মাহাত্ম্য ও সম্মানের রাত : অগণিত ফেরেশতার আগমন, শুভেচ্ছা জ্ঞাপনের মাধ্যমে এবং বিশেষ নিদর্শনের বহিঃপ্রকাশের মাধ্যমে অন্য সমস্ত রাতের উপর শ্রেষ্ঠত্ব পেয়েছে এ রাত।
৪. সম্মানিত করার রাত : হাজার মাসের চেয়ে এ রাত শ্রেষ্ঠ মর্যাদার অধিকারী। এতে আমলকারী ব্যক্তিও হাজার মাসের ইবাদতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মর্যাদা পাবে এই এক রাতের ইবাদতের জন্য।
ক্বদর রাতের নিদর্শন : বিভিন্ন হাদীস থেকে ক্বদর রাতের বিস্ময়কর বিশেষ নিদর্শনের প্রমাণ পাওয়া যায়Ñ
 ক্বদর রাত তিমিরাচ্ছন্ন হবে না আলোকোজ্জ্বল হবে। (মুসনাদে আহমদ, তাবারানী ইবনে হুযাইফা)
 নাতিশীতোষ্ণ হবে। (না গরম, না শীত এমন) (মুসনাদে আহমদ, তাবারানী ইবনে হুযাইফা)
 মৃদু বায়ু প্রবাহিত হবে। ঝড়ো হাওয়া প্রবাহিত হয় না। (মুসনাদে আহমদ)
 আকাশ মেঘ মুক্ত থাকবে। (তাবারানী)
 ঐ রাতে বৃষ্টি বর্ষণ হতে পারে। (বুখারী, ১৮৮৯)
 ক্বদর রাতের পরদিন ভোরে সূর্যের আলোর প্রখরতা থাকে না, বরং পূর্ণিমার চাঁদের মত স্নিগ্ধ আলো থাকে। (মুসলিম, তিরমিযী, নাসাঈ)
 আকাশ থেকে কোনো উল্কাপি- পড়ে না। (তাবারানী, মুসনাদে আহমদ)
 এ রাতে মুমিনগণ কিয়ামুল লাইল বা ইবাদত করে অন্যান্য রাত অপেক্ষা তৃপ্তি বোধ করবে। রাসূল (সা.) বলেছেন, “লাইলাতুল ক্বদর হল প্রশান্তি ও আনন্দময়। না গরম ও না ঠা-া এবং ভোরে সূর্য উদিত হয় দুর্বল ও লাল হয়ে।” (ইবনে খুযাইমাহ)
 হয়তো বা আল্লাহ তায়ালা কোন ঈমানদার ব্যক্তিকে তা স্বপ্ন দেখাতেন। (ইবনে খুযায়মা, ইবনে হিব্বান, মুসনাদে আহমদ)
 সমুদ্রের লোনা পানি মিষ্টতায় পরিণত হবে। যাইরাহ বিন মা’বাদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি ২৩শে রমযান সাগরে অবস্থান করছিলাম। আমি গোসল করতে গিয়ে সাগরে পড়ে যাই। তখন দেখি পানি মিষ্টি। আমি আমার সাথীদেরকে জানাই যে, আমি মিষ্টি পানির মধ্যে আছি।” সাগরের পানি সর্বদা লবণাক্ত থাকে।
ক্বদর রাতের বৈশিষ্ট্য ও বিশেষত্ব : আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের বিশেষ আয়োজন :
১. সার্বভৌম শক্তির অধিকারী আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষের জীবন বিধান আল কুরআন নাযিল করেছেন এ রাতেই। তিনি বলেন, “আমি (কুরআন) একে ক্বদরের রাতে নাযিল করেছি।” (সূরা ক্বদর: ১)
২. এ রজনীতে প্রত্যেকটি ব্যাপারে বিজ্ঞানসম্মত সুদৃঢ় ফায়সালা জারী করা হয়। কুরআনে আল্লাহ পাক বলেছেন, “আমি এটি বরকত ও কল্যাণময় রাতে নাযিল করেছি। কারণ আমি মানুষকে সতর্ক করতে চেয়েছিলাম। এটা ছিল সেই রাত যে রাতে আমার নির্দেশে প্রতিটি বিষয়ের বিজ্ঞোচিত ফায়সালা দেয়া হয়ে থাকে। আমি এক রাসূল পাঠাতে যাচ্ছিলাম।” (সূরা দুখান: ৩-৫)
৩. এ রাতকে ঘিরেই কুরআনে বিশেষ একটি সূরা নাযিল হয়েছে। যার নাম সূরা ক্বদর।
৪. এটি শান্তি বর্ষণের রাত, সূর্যাস্ত যাওয়ার সময় থেকে সকাল পর্যন্ত আল্লাহর নূরের জ্যোতি ও অসীম করুণার ধারা এ ধুলির ধরায় বর্ষিত হতে থাকে এ রাতে। আল্লাহ বলেছেন, “সে রাত হচ্ছে শান্তিময়, তা ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।” (সূরা ক্বদর: ৫)। ফলে এ রাতের সবটুকুই নিরাপদ ও মঙ্গলময় হয়ে থাকে। পৃথিবীকে ঝড়-তুফান, বজ্রপাত, ভূমিকম্প ও অন্যান্য সর্বপ্রকার বিপদাপদ হতে সম্পূর্ণ নিরাপদ রাখেন। সুবহে সাদিক পর্যন্ত সমগ্র পৃথিবীতে এক অপূর্ব শান্তি ও মনোমুগ্ধকর অবস্থা বিরাজ করে থাকে।
৫. এ রাতে জিব্রাঈল (আ.) এমন একদল ফেরেশতা বাহিনী নিয়ে পৃথিবীতে অবতরণ করেন, যারা আর কখনোই আসেননি। এ ব্যাপারে কয়েকটি হাদীস-
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, “ক্বদরের রাতে ফেরেশতার সংখ্যা পাথরকণার চাইতেও বেশি হয়ে থাকে। ফলে জমীনের শয়তানের রাজত্ব বাতিল হয়ে যায় এবং সেই রাতে লোকেরা শয়তানের ক্ষতি থেকে নিরাপদ থাকে।”
 হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত আছে যে, “ক্বদর রাতে আল্লাহ তায়ালার হুকুমে হযরত জিব্রাঈল (আ.) সিদরাতুল মুনতাহা হতে সত্তর হাজার ফেরেশতা নিয়ে দুনিয়াতে অবতরণ করেন। আর চারটি নূরের পতাকা নিয়ে একটি বায়তুল্লাহ শরীফে, একটি বায়তুল মুকাদ্দাসে, একটি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর পবিত্র রওযা মোবারকে, একটি দূরে সিনাই মসজিদে স্থাপন করেন। এরপর তারা দুনিয়ার চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সকল উম্মতে মুহাম্মাদীর গৃহে প্রবেশ করে তাদের মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা করতে থাকেন।”
 ইমাম আবু মুহাম্মদ ইবনে আবী হাতিম (রা.) এক বিস্ময়কর রিওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন, হযরত কা’ব (রা.) বলেন যে, “সপ্তম আকাশের শেষ সীমায় জান্নাতের সাথে সংযুক্ত করেছে সিদরাতুল মুনতাহা, যা দুনিয়া ও আখেরাতের দূরত্বের উপর অবস্থিত। এর উচ্চতা জান্নাতে এবং এর শিকড় ও শাখা প্রশাখাগুলো কুরসীর নিচে প্রসারিত। তাতে এতো ফেরেশতা অবস্থান করেন যে, তাদের সংখ্যা নির্ণয় করা আল্লাহ তায়ালা ছাড়া আর কারো পক্ষে সম্ভব নয়। এমন কি চুল পরিমাণ জায়গা নেই যেখানে ফেরেশতা নেই। ঐ বৃক্ষের মধ্যভাগে হযরত জিব্রাঈল (আ.) অবস্থান করেন।
আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে হযরত জিব্রাঈল (আ.)-কে ডাক দিয়ে বলা হয়, “হে জিব্রাঈল (আ.), ক্বদরের রাত্রিতে সমস্ত ফেরেশতাকে নিয়ে পৃথিবীতে চলে যাও। এই ফেরেশতাদের সবারই অন্তর স্নেহ ও দয়ায় ভরপুর, প্রত্যেক মুমিনের জন্য তাদের মনে অনুগ্রহের প্রেরণা রয়েছে। সূর্যাস্তের সাথে সাথেই ক্বদরের রাত্রিতে এই ফেরেশতাগণ জিব্রাঈল (আ.) এর সাথে নেমে সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েন এবং জায়গায় জায়গায় সিজদায় পড়ে যান। তারা সকল ঈমানদার নারী-পুরুষের জন্যে দোয়া করেন। কিন্তু তারা গীর্জায়, মন্দিরে, অগ্নিপূজার জায়গায়, মূর্তিপূজার জায়গায়, আবর্জনা ফেলার জায়গায়, নেশাখোরের অবস্থানস্থলে, নেশাজাত দ্রব্যাদি রাখার জায়গায়, গান-বাজনার সাজ-সরঞ্জাম রাখায় জায়গায় এবং প্রস্রাব-পায়খানার জায়গায় গমন করেন না। বাকি সব জায়গায় ঘুরে ঘুরে তারা ঈমানদার নারী-পুরুষদের জন্য দোয়া করে থাকেন। হযরত জিব্রাঈল (আ.) সকল ঈমানদারের সাথে মুসাফাহা করে থাকেন। তার মুসাফার সময় মুমিন ব্যক্তির শরীরের লোমকূপ খাড়া হয়ে যায়। মন নরম হয় এবং চোখে অশ্রুধারা নেমে আসে এবং নিদর্শন দেখা দিলে বুঝতে হবে তার হাত জিব্রাঈল (আ.) এর হাতের মধ্যে রয়েছে। হযরত কাব (রা.) বলেন যে, “এ রাতে যে ব্যক্তি তিনবার ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পাঠ করে, তার প্রথমবারে পাঠের সাথে সাথেই আযাব মাফ হয়ে যায়, দ্বিতীয়বার পড়ার সাথে সাথেই আযাব থেকে সে মুক্তি পেয়ে যায় এবং তৃতীয়বারে পাঠের সাথে সাথেই জান্নাতে প্রবেশ সুনিশ্চিত হয়ে যায়।”
বর্ণনাকারী বলেন, হে আবু ইসহাক (রা.) যে ব্যক্তি সত্য বিশ্বাসের সাথে এ কালেমা উচ্চারণ করে তার কি হয়? জবাবে তিনি বলেন, সত্য বিশ্বাসীর মুখ হতেই তো এ কালেমা উচ্চারিত হবে। যে আল্লাহ তায়ালার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! লাইলাতুল ক্বদর কাফির ও মুনাফিকদের উপর এতো ভারী বোধ হয় যে, তাদের পিঠের উপরে যেন পাহাড় পতিত হয়েছে। ফজর পর্যন্ত ফেরেশতারা এভাবে রাত্রি কাটিয়ে দেন। তারপর হযরত জিব্রাঈল (আ.) উপরের দিকে উঠে যান এবং অনেক উপরে উঠে স্বীয় পালক ছড়িয়ে দেন। অতঃপর তিনি সেই বিশেষ দুটি সবুজ পালক প্রসারিত করেন যা অন্য কোন সময় প্রসারিত করেন না। এর ফলে সূর্যের কিরণ মলিন ও স্তিমিত হয়ে যায়। তারপর তিনি সমস্ত ফেরেশতাকে ডাক দিয়ে নিয়ে যান। সব ফেরেশতা উপরে উঠে গেলে তাদের নূর এবং জিব্রাঈল (আ.) এর পালকের নূর মিলিত হয়ে সূর্যের কিরণকে নি®প্রভ করে দেয়। ঐদিন সূর্য অবাক হয়ে যায়। সমস্ত ফেরেশতা সে দিন আকাশ ও জমীনের মধ্যবর্তী স্থানের ঈমানদার নারী-পুরুষের জন্য রহমত কামনা করে তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন। তারা ঐ সব লোকের জন্যেও দু’আ করেন যারা সৎ নিয়তে রোযা পালন করে এবং সুযোগ পেলে পরবর্তী রমযান মাসেও আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করার মনোভাব পোষণ করে, সন্ধ্যায় সবাই প্রথম আসমানে পৌঁছে যান। সেখানে অবস্থানকারী ফেরেশতারা এসে তখন পৃথিবীতে অবস্থানকারী ঈমানদারদেরকে অমুকের পুত্র, অমুকের কন্যা অমুক বলে বলে খবরাখবর জিজ্ঞেস করেন। নির্দিষ্ট ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার পর কোন কোন ব্যক্তি সম্পর্কে ফেরেশতারা বলেন, তাকে আমরা গত বছর ইবাদতে লিপ্ত দেখেছিলাম কিন্তু এবার সে বিদআতে লিপ্ত হয়ে পড়েছে। আবার অমুককে গত বছর বিদআতে লিপ্ত দেখেছিলাম কিন্তু এবার তাকে ইবাদতে লিপ্ত দেখে এসেছি। প্রশ্নকারী ফেরেশতা তখন শোষোক্ত ব্যক্তির জন্যে আল্লাহ তায়ালার দরবারে মাগফিরাত, রহমতের দুয়া করেন। ফেরেশতারা প্রশ্নকারী ফেরেশতাদেরকে আরো জানান যে, তারা অমুক অমুককে আল্লাহ তায়ালার যিকর করতে দেখেছেন, অমুক অমুককে রুকুতে অমুক অমুককে সিজদায় পেয়েছেন এবং অমুক অমুককে কুরআন তিলাওয়াত করতে দেখেছেন।
একরাত একদিন প্রথম আসমানে কাটিয়ে তারা দ্বিতীয় আসমানে গমন করেন। সেখানেও একই অবস্থার সৃষ্টি হয়। এমনি করে তারা নিজেদের জায়গা সিদরাতুল মুনতাহায় পৌছেন। সিদরাতুল মুনতাহা তাদেরকে বলে, আমাতে অবস্থানকারী হিসেবে তোমাদের প্রতি আমার দাবী রয়েছে, আল্লাহকে যারা ভালবাসে আমিও তাদেরকে ভালবাসি। আমাকে তাদের অবস্থার কথা একটু শোনাও। তাদের নাম শোনাও। হযরত কাব (রা.) বলেন, ফেরেশতারা তখন আল্লাহ তায়ালার পুণ্যবান বান্দাদের নাম ও পিতার নাম জানাতে শুরু করেন। তারপর জান্নাত সিদরাতুল মুনতাহাকে সম্বোধন করে বলে, তোমাতে অবস্থানকারীরা তোমাকে যে সব খবর শুনিয়েছে সে সব আমাকেও শোনাও। তখন সিদরাতুল মুনতাহা জান্নাতকে সব কথা শুনিয়ে দেয়। শোনার পর জান্নাত বলে, অমুক পুরুষ ও নারীর উপর আল্লাহ তায়ালার রহমত বর্ষিত হোক। হে আল্লাহ! অতি শীঘ্রই তাদেরকে আমার সাথে মিলিত করুন।
হযরত জিব্রাঈল (আ.) সর্বপ্রথম নিজের জায়গায় পৌঁছে যান। তার উপর তখন ইলহাম হয় এবং তিনি বলেন, হে আল্লাহ! আমি আপনার অমুক অমুক বান্দাকে সিজদারত অবস্থায় দেখেছি। আপনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিন। আল্লাহ তায়ালা তখন বলেন, আমি তাদেরকে ক্ষমা করে দিলাম। হযরত জিব্রাঈল (আ.) তখন আরশ বহনকারী ফেরেশতাদেরকে এ কথা শুনিয়ে দেন। তখন ফেরেশতারা পরস্পর বলাবলি করেন যে, অমুক অমুক নারী পুরুষের উপর আল্লাহ তায়ালার রহমত ও মাগফিরাত হয়েছে।
তারপর হযরত জিব্রাঈল (আ.) বলেন, “হে আল্লাহ! গত বছর আমি অমুক ব্যক্তিকে সুন্নাতের উপর আমলকারী এবং আপনার ইবাদতকারী হিসেবে দেখেছি কিন্তু এবার সে বিদয়াতে লিপ্ত হয়ে পড়েছে। এবং আপনার বিধিবিধানের অবাধ্যতা করেছে।” তখন আল্লাহ তায়ালা বলেন, “হে হযরত জিব্রাঈল (আ.), সে যদি মৃত্যুর কিছু মুহূর্ত পূর্বেও তওবা করে নেয় তাহলে আমি তাকে মাফ করে দিব। তখন হযরত জিব্রাঈল (আ.) বলেন, হে আল্লাহ আপনারই জন্য সমস্ত প্রশংসা। আপনি সমস্ত প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। হে আমার প্রতিপালক! আপনি আপনার সৃষ্ট জীবের উপর সবচেয়ে বড় মেহেরবান। বান্দা তার নিজের উপর যেরূপ মেহেরবানী করে থাকে আপনার মেহেরবানী তাদের তার চেয়েও অধিক। ঐ সময় আরশ এবং তার পাশের পর্দাসমূহ এবং আকাশ ও এর মধ্যস্থিত সবকিছুই কেঁপে উঠে বলে, করুনাময় আল্লাহ তায়ালার জন্যই সমস্ত প্রশংসা।
হযরত কাব (রা.) বলেন, “যে ব্যক্তি রমযান মাসের রোযা পূর্ণ করে রমযান মাসের পরেও পাপমুক্ত জীবন যাপনের মনোভাব পোষণ করে সে বিনা প্রশ্নে ও বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” (তাফসীরে ইবনে কাসীর)
ভাগ্য রজনীর অনন্য সৌভাগ্যভা-ার
 ক্বদর রাতে ইবাদতকারীর গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। রাসূল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি এ রাত ইবাদতের মাধ্যমে অতিবাহিত করবে আল্লাহ তার আগে করা সব গুনাহখাতা মাফ করে দেবেন।” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
 আত্মসমর্পণের হৃদয় নিয়ে ইবাদতকারীর মর্যাদা বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়া হবে। রাসূল (সা.) বলেন, “যে ব্যক্তি লাইলাতুল ক্বদরে আত্মসমর্পিত হৃদয় নিয়ে ইবাদতে কাটাবে আল্লাহ তার ইজ্জত ও মর্যাদা বহুগুণে বাড়িয়ে দেবেন।”
 এ রাতে ইবাদতকারীর কবর আলোকিত করে দেয়া হবে। রাসূল (সা.) বলেন, “তোমরা তোমাদের করবকে আলোকিত পেতে চাইলে ক্বদরের রাত জেগে ইবাদতে কাটিয়ে দাও।”
 ক্বদর রাতের দ্বারা সমস্ত রজনীকে মোহনীয় করে দেয়া হয়েছে। রাসূল (সা.) বলেছেন, “সমস্ত রজনী আল্লাহ তায়ালা লাইলাতুল ক্বদর দ্বারা সৌন্দর্যম-িত ও মোহনীয় করে দিয়েছেন। অতএব তোমরা এ বরকতময় রজনীতে রত থাকো।”
 “ক্বদরের এক রাতের ইবাদতকারী হাজার মাসের ইবাদত অপেক্ষা উত্তম।” (নাসায়ী ও মুসনাদ)
 শরয়ী ওযর (হায়েয, নেফাস ও অন্যান্য অসুস্থতা) এর কারণে ইবাদত থেকে বঞ্চিতরাও সওয়াব পাবেন। (আল্লামা দাহহাক রহ.)
 এ রাতে ইবাদতকারীদের দোয়া কবুল হবে এবং তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির পুরস্কারপ্রাপ্ত হবেন। হাদীসে এসেছে, “ক্বদরের রাত যখন সমাগত হবে তখন আল্লাহর নির্দেশে জিব্রাঈল (আ.) একদল ফেরেশতা নিয়ে পৃথিবীতে নামেন তাদের সাথে থাকে একটা নীল পতাকা, সেই পতাকাকে তারা কাবা শরীফের পাশে স্থাপন করেন। জিব্রাঈল (আ.) এর একশো ডানা আছে। তা থেকে দু’টো ডানা শুধু ঐ রাতে প্রসারিত করেন। ডানা দুটো পৃথিবীর পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত অতিক্রম করে। অতপর জীবরীলের উৎসাহ পেয়ে ফেরেশতারা নামাযী, যিকরকারী দাঁড়ানো ও বসা প্রত্যেক ব্যক্তিদের সালাম দেয়। তাদের সাথে হাত মেলায় তাদের দোয়ায় আমীন বলে। এই কাজ ফজর পর্যন্ত চলে। ফজরের পর জিব্রাঈল (আ.) ডেকে বলেন, “ওহে ফেরেশতাগণ এখন রওনা হও। রওনা হও। ফেরেশতারা বলে, হে জিবরাঈল (আ.) আল্লাহ তায়ালা মুহাম্মদ (সা.) এর উম্মতের কি কি প্রয়োজন পূরণ করলেন। জিব্রাঈল (আ.) বলেন, এই রাতে আল্লাহ তায়ালা তাদের দিকে দৃষ্টি দিয়েছেন এবং ক্ষমা করেছেন।” (বায়হাকী)
বায়হাকীর বর্ণনায় আরো এসেছে, আল্লাহ বলেন- হে আমার বান্দারা তোমরা আমার কাছে চাও, আমার সম্মান ও প্রতাপের শপথ আজ দুনিয়ার জন্য যা কিছু চাইবে তা আমি বিবেচনা করবো। আমার মর্যাদার শপথ, আমি তোমাদের ভুলত্রুটি ক্ষমা করবো, যতক্ষণ তোমরা আমার দিকে মন নিবিষ্ট রাখবে। আমার সম্মান ও প্রতাপের শপথ। আমি তোমাদেরকে অপমানিত করবো না। তোমরা আমাকে সন্তুষ্ট করেছো, এরপর ফেরেশতারা আনন্দিত হয়ে যায় এবং রমযান শেষে এই উম্মতকে আল্লাহ তায়ালা যা দান করে, তাতে সন্তুষ্ট হয়ে যায়।
সৌভাগ্য অর্জনের শর্তসমূহ : ক্বদর রাতের অসংখ্য ফযীলত, মর্যাদা ও বিশেষ বৈশিষ্ট্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার বান্দাদের জন্যই প্রস্তুত রেখেছেন। তবে কিছু শর্ত রয়েছে যেগুলো পূরণ না হলে কাক্সিক্ষত মর্যাদা ও সৌভাগ্যের অধিকারী হওয়া সম্ভব নয়। যেমন-
  ঈমানের সাথে সওয়াবের নিয়তে নিতে হবে।
  খুলুসিয়াত থাকতে হবে।
  রিয়ামুক্ত থাকতে হবে। (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
ভাগ্য রজনীতেও হতভাগা যারা
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “রমযান মাসে এমন একটি রাত আছে যা হাজার মাস হতে উত্তম। যে ব্যক্তি সে রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হবে, এর কল্যাণ থেকে একমাত্র হতভাগা লোক ছাড়া আর কেউ বঞ্চিত হবে না।” (ইবনে মাজাহ, মিশকাত, আত তারগীব)
এই হতভাগ্য ব্যক্তিদের পরিচয় অন্য একটি হাদীস থেকে পাওয়া যায়, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, “রাসূল (সা.) বলেছেন, আল্লাহ ক্বদরের রাতে উম্মতে মুহাম্মদীর দিকে তাকান এবং তাদেরকে ক্ষমা ও দয়া করেন। তবে চার ব্যক্তি এ দয়ার আওতায় পড়ে নাÑ
১. মদ্য পানকারী ২. মাতা-পিতার সাথে সম্পর্ক ছিন্নকারী ৩. হিংসুক-নিন্দুক এবং
৪. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী।” (আত তারগীব ওয়াত তারহীব, ওজায়েফ শাহার রমাদান আল মোয়াজ্জাম হাফেজ ইবনে রজব)
যদি এ রাতের কল্যাণ হতে কেউ বঞ্চিত থাকে তাহলে তার চেয়ে বড় দুর্ভাগা আর কিছুতেই হতে পারে না। অবশ্য এ ধরনের পাপাচারে লিপ্ত ব্যক্তি যদি খালিসভাবে তওবা করে এবং বাকী জীবন পূতপবিত্র হয়ে চলার সিদ্ধান্ত নেয় আল্লাহ তাদেরকে নিজ করুণা ও দয়ার মাঝে শামিল করে নেন।
উসওয়ায়ে হাসানা মুহাম্মদ (সা.) এর ক্বদর উদযাপন : রাসূল (সা.) ক্বদরের রাত অনুসন্ধান ও এই সৌভাগ্যের অধিকারী হওয়ার জন্য ইবাদতে কঠোর পরিশ্রম ও অনুশীলন করতেন। হাদীস থেকে তার এ সময়ের রুটিন ও অনুশীলনের নিম্নোক্ত ধরনগুলো জানা যায়:
 হযরত আয়শা (রা.) থেকে বর্ণিত, “রাসূল (সা.) ২০ রমযান পর্যন্ত রাত্রে নামায ও ঘুমকে একত্রিত করতেন। কিন্তু রমযানের শেষ দশকে তিনি পূর্ণপ্রস্তুতি নিতেন এবং নিজ স্ত্রীদের থেকে দূরে থাকতেন।” (মুসনাদে আহমদ)
 হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, “রাসূল (সা.) বিছানা উঠিয়ে ফেলতেন, নিজ স্ত্রীদের থেকে দূরে থাকতেন এবং ভোর রাত্রে সেহরীর সময় সন্ধ্যাবেলার খাবার খেতেন।” (তাবারানী)
 নিজের পাশাপাশি পরিবারকেও রাত্রি জাগরণের জন্য উঠাতেন। হযরত আয়শা (রা.) বলেন, “রমযানের শেষ দশক শুরু হলে রাসূল (সা.) ক্বদরের রাত লাভের উদ্দেশ্যে পূর্ণ প্রস্তুতি নিতেন, রাত্রি জাগরণ করতেন এবং নিজ পরিবারকে জাগাতেন।” (বুখারী ও মুসলিম)
 ইতেকাফ করতেন। হযরত আয়শা (রা.) ও হযরত আবদুল্লাহ বিন ওমর (রা.) হতে বর্ণিত হাদীসে এসেছে নবী (সা.) জীবিত অবস্থায় রমযান মাসের শেষ দশক রাত্রিতে ইতেকাফ করতেন। একবার এভাবে ইতেকাফ করতে না পারার কারণে তাঁর জীবনের শেষ রমযানটিতে বিশ দিন ইতেকাফ করেছেন।
 পূর্ব পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন এবং এমন কিছু নেক কাজের জন্য নির্দিষ্ট করতেন যা মাসের অবশিষ্ট অংশের জন্য করতেন না। (বুখারী ও মুসলিম)
  আয়শা (রা.) বর্ণিত, “রাসূল (সা.) রমযানের শেষ দশকে এত বেশি পরিশ্রম ও ইবাদত করতেন যা অন্য সময় করতেন না। তিনি রমযানের শেষ দশকে এমন কিছু নেক কাজের জন্য নির্দিষ্ট করতেন যা মাসের অবশিষ্টাংশের জন্য করতেন না। এর মধ্যে রাত্রি জাগরণ অন্যতম।” (মুসলিম)
সৌভাগ্যকে নিশ্চিত করার কৌশল ও করণীয় : নবী (সা.) এর কথা অনুযায়ী এই রাতের ইবাদতের দৃষ্টান্ত এই যে, উম্মতে মুসলিমা আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত পরিশ্রম করলে ইহুদীদের ফজর থেকে জোহর পর্যন্ত পরিশ্রম ও ঈসায়ীদের জোহর থেকে মাগরিব পর্যন্তকার পরিশ্রমের প্রতিদানের চেয়েও অধিক প্রতিদান দেয়া হবে। (বুখারী, ইবনে উমর রা. বর্ণিত)
সুতরাং রাসূলুল্লাহর (সা.) অনুসরণে এ রাতে ইবাদতের জন্য কোমর বেঁধেই নামতে হবে। এ ক্ষেত্রে আমাদের করণীয় হতে পারে-
১. পূর্ব হতেই পরিকল্পনা করে নিজস্ব কাজগুলো গুছিয়ে ফেলা।
২. মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ইবাদতের নিয়তে রাত্রি জাগরণ করা এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরও রাতের ইবাদতে অংশগ্রহণে উৎসাহিত ও উদ্বুদ্ধ করা।
৩. রাতের প্রথম অংশেই মাগরিব ও এশার সালাত আদায় করে ফেলা।
৪. অতীতের কাযা নামায আদায় করা।
৫. বিশেষ একটি অংশে তারাবীহর সালাত ও নফল/ তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করা।
৬. জীবনের সকল প্রকার ছোট-বড় গুনাহের জন্য একনিষ্ঠভাবে তওবা করা ও কায়মনোবাক্যে আল্লাহর দরবারে গুনাহ মাফের জন্য কান্নাকাটি করা।
৭. চুপিসারে রিয়ামুক্ত অবস্থায় যিকর আযকার দরূদ ও তাসবীহ পাঠ করা।
৮. দোয়া কবুলের সুবর্ণ এই সুযোগে দুনিয়া ও আখেরাতের যাবতীয় কল্যাণ ও মুক্তি চেয়ে দোয়া করা।
৯. বিশেষভাবে এই দু’আ পড়া
“হে আল্লাহ তুমি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করাকে তুমি ভালোবাসো। অতএব আমাকে ক্ষমা করো।”
১০. কুরআন তেলাওয়াত ও অধ্যয়নের জন্য বিশেষ সময় নির্ধারণ করা এবং বুঝে বুঝে উপলব্ধি নিয়ে পড়া।
১১. যেহেতু আল্লাহর ক্ষমা, রহমত ও বরকত- নাজাত পাওয়ার ও দোয়া কবুলের সমূহ সম্ভাবনা এই রাতে সেহেতু বিশেষভাবে দান করা।
১২. সারা জীবন কুরআনের গাইডলাইন অনুযায়ী পথ চলার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া।
লাইলাতুল ক্বদরকে নির্দিষ্ট করা যাবে কি না : হযরত আবু সালমা (রা.) বলেছেন, “আমি আবু সাঈদ (রা.) কে (যিনি আমার বন্ধু ছিলেন) প্রশ্ন করলাম তিনি জবাব দিলেন, আমরা মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর সাথে রমযানের মধ্যের দশ দিনে ইতিকাফ করলাম। এরপর বিশ তারিখের ভোরে মহানবী (সা.) বেরিয়ে এলেন, আমাদের সামনে ভাষণ দিলেন এবং বললেন, আমাকে লাইলাতুল ক্বদর দেখানো হয়েছে। তারপর আমি তা ভুলে গিয়েছি বা তিনি বলেছেন আমাকে ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে। অতএব তোমরা রমযানের শেষ দশ দিনের বেজোড় তারিখে (২১, ২৩, ২৫, ২৭, ২৯)  লাইলাতুল ক্বদর সন্ধান কর। কারণ আমি দেখতে পেয়েছি যে, আমি স্বয়ং কাদা ও পানিতে সিজদা করছি। তাই যে ব্যক্তি রাসূল (সা.) এর সাথে ইতেকাফ করেছে সে যেন ফিরে আসে। সুতরাং আমরা ফিরে এলাম। আমরা আকাশে এক টুকরো মেঘও দেখলাম না। হঠাৎ একখ- মেঘ দেখা দিল। এবং বর্ষণ শুরু হলো। এমনকি মসজিদের ছাদ ভেসে গেল। ঐ ছাদ খেজুর পাতায় নির্মিত ছিল। এরপর নামায পড়া হলো। আমি মহানবী (সা.) কে পানি ও কাদায় সিজদা করতে দেখলাম। এমনকি তাঁর কপালে কাদামাটির চিহ্ন দেখতে পেলাম।” (বুখারী ১৮৮৯ নং হাদীস)
এ ক্ষেত্রে কোন তারিখটি ক্বদর তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। যেমন-
 হযরত উবাদা বিন সামেত (রা.) বর্ণনা করেছেন, “রমযানের শেষ দশ রাতের বেজোড় রাতগুলোর যেমন- একুশ, তেইশ, পঁচিশ, সাতাশ, উনত্রিশ বা শেষ রাতের মধ্যে রয়েছে ক্বদরের রাত।” (মুসনাদে আহমদ)
 আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা মতে, “সাতাশ বা ঊনত্রিশের রাত।” (আবু দাউদ)
 হযরত আবু যর, উমর (রা.) হুযায়ফা (রা.) সহ বহু সাহাবাদের মতে এটি সাতাশতম রাত।
 ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, “এক ব্যক্তি বললো, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি একজন বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তি। আমার জন্য রাতের নামায খুব কষ্টকর। আমাকে এমন এক রাতের আদেশ দিন যে রাত হবে ক্বদরের রাত। তিনি বলেন, তুমি সাতাশ রমযানের রাতকে আঁকড়ে ধরো।” (মুসনাদে আহমদ)
যদিও তিনটি তারিখের ব্যাপারে অধিকাংশ মতামত পাওয়া গিয়েছে। তবে এটি আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নির্দিষ্ট করেননি। প্রতি বছর একই তারিখে হবে এমন নয়। শেষ দশ রাতের বেজোড় যে কোন রাতে হতে পারে তাই প্রতি বেজোড় যে কোন রাতে হতে পারে। তাই প্রতি বেজোড় রাতকেই ক্বদর রাত বিবেচনা করেই ইবাদতে নিয়োজিত করতে হবে নিজেকে।
এই রাত গোপনের রহস্য হলো- প্রত্যেক মূল্যবান বস্তু হাসিল করা যেমন কষ্টসাধ্য ব্যাপার তেমনি আল্লাহ তায়ালা চান এ মহামূল্যবান রাতের অনুসন্ধানে বান্দাগণ সাধনা করুক। তিনি দেখতে চান এর বরকত ও ফযীলত লাভের জন্য কে কতটা প্রচেষ্টা চালায়। তবে এতে সুবিধাগুলো হলো-
 এ কারণে আজকেই ক্বদর কী না ভাবতে ভাবতে অনেকগুলো রাত ইবাদত করার সুযোগ পাবে।
 তা না থাকলে ঐ দিনটি ছুটে গেলে পরবর্তী রাতগুলোতে মন ভরে ইবাদতের মাধ্যমে যে ক্ষতি পূরণের মনমানসিকতা থাকে না।
 যতগুলো রাত এভাবে ইবাদতে কাটাবে প্রত্যেকটিরই স্বতন্ত্র প্রতিদান মিলবে।
 যারা স্বভাবজাত অপরাধী তারা জেনেশুনে ঐ নির্দিষ্ট রাত জানা সত্ত্বেও রাতটি অবহেলা করে খোদাদ্রোহিতা করতো। ফলে শাস্তি বেড়ে যেতো।
পরিশেষে বলা যায় যে, অফুরন্ত সৌভাগ্য ও অনন্য উপহারের রাতটিকে নিজের মর্যাদা, সম্মান কবুলিয়াত ও ক্ষমা প্রাপ্তি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি নিশ্চিত করার অসামান্য সুযোগ মনে করে যথোপযুক্ত কাজে লাগাতে হবে। মুনাফা অর্জনের এ সময়টিতে নিজস্ব পুঁজির সবটুকু বিনিয়োগ করতে হবে। তবেই মিলবে কাক্সিক্ষত মুক্তির মঞ্জিল।
পঞ্চাশ বছর ধরে কত উষা নেমেছে মাটিতে
আমার দৃষ্টির বাইরে এসে এসে চলে গেছে আলো
প্রথম দেখলাম আজি অন্ধকার কি করে গুটালো।
দুটি কালো ডানা তার আমার নিজেরও অজ্ঞাতে
হাত দুটি উঠে গেলো একটি কৃতজ্ঞ মুনাজাতে
যখন ঝরনা ঝরছে দুধ-সাদা দিনের বাটিতে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ