ঢাকা, বুধবার 13 June 2018, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২৭ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসায় অবহেলা বা বিলম্বের পরিণাম হবে ভয়াবহ

গতকাল মঙ্গলবার নয়াপল্টন বিএনপি কার্যালয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : ইউনাইটেড হাসপাতালে দলের চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসা ব্যয় বহন  করার ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি নিয়ে জটিলতার বিষয়ে কারা মহাপরিদর্শক ইফতেখার উদ্দিনের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল মঙ্গলবার নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এই ঘোষণা দেন। তিনি বলেন,  আমরা দেশনেত্রীর উপযুক্ত চিকিৎসা চাই বলে আপনাদের মাধ্যমে সরকারকে জানাতে চাই যে, প্রয়োজনে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসার সমুদয় ব্যয় আমাদের দল বহন করবে। আমরা দাবি করছি যে, আর কাল বিলম্ব না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণের পরামর্শ অনুযায়ী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে অবিলম্বে ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা হোক।  একই সঙ্গে সর্বোচ্চ আদালতে খালেদা জিয়া জামিন পাওয়ার পরও মুক্তির পথে সৃষ্ট ‘সরকারের সকল অপকৌশল’ বন্ধের দাবিও জানান খন্দকার মোশাররফ।
প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসার অতীত নজির তুলে ধরে সাবেক মন্ত্রী বলেন, তথাকথিত ১/১১ সরকারের সময়েও একবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেয়া হয়েছিলো। অথচ তিন বারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, দেশের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ও সাবেক সেনা বাহিনীর  প্রধানের স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যাপারে সরকারি অনুমোদন ও অর্থ সংস্থানের ব্যাপারে এতোদিনের সিদ্ধান্ত না হওয়া রহস্যজনক ও নিন্দনীয়। আমরা স্পষ্ট ভাষায় জানাতে চাই যে, দেশনেত্রীর সুচিকিৎসার বিষয়ে রাজনৈতিক কারণে অবহেলা কিংবা বিলম্ব করা হলে তার পরিণাম সরকারের জন্য শুভ হবে না। দেশবাসী বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তারা সরকারের অমানবিক আচরণে ক্ষুদ্ধ।
ইউনাইটেড হাসপাতালে খালেদা জিয়ার চিকিৎসার যৌক্তিকতা তুলে ধরে সাবেক স্বাস্থ্য মন্ত্রী বলেন, দেশনেত্রী যে যে ধরণের অসুস্থতায় ভোগছেন এবং সম্প্রতি যে ঘটনা ঘটেছে। তার উপযুক্ত চিকিৎসা দিতে হলে এবং যে চিকিৎসার জন্য যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়, সেই আধুনিক উপযুক্ত যন্ত্রপাতি ইউনাইটেড হাসপাতালে আছে বলেই আমরা এই হাসপাতালে আমাদের নেত্রীকে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য দাবি করছি।
খন্দকার মোশাররফ বলেন, দেশনেত্রীর পরিবারের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে আজকে (গতকাল) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর সাথে দেখা করতে তারা সচিবালয়ে গেছেন। তারা একই রকম আবেদন করবে যাতে করে দেশনেত্রীকে ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর ব্যবস্থা করা হয়। তার চিকিৎসার সমুদয় খরচ পরিবারের পক্ষ থেকে বহন করবে বলে আমরা শুনেছি যে সেই আবেদন নিয়ে তারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়েছেন। আর আমরা কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে বলছি আমাদের দলের চেয়ারপারসনের চিকিৎসার সকল খরচ দল বহন করবে।
এটনি জেনারেলের বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তোলে খন্দকার মোশাররফ বলেন, এটর্নি জেনারেল বলেছেন যে, ৯ জুন ডাক্তারগণ বেগম খালেদা জিয়ার অজ্ঞান হওয়ার কথা বলে নাকি আদালতের সহানুভুতি লাভের চেষ্টা করেছেন।  তিনি অবশ্যই জানেন যে, ডাক্তারদের সাক্ষাতের দিনক্ষণ স্থির করে সরকার। তারা ৯ তারিখে সাক্ষাতের দিন স্থির করেছে বলেই ঐ দিন ডাক্তারগণ প্রেস ব্রিফিং করেছেন। মামলার দিন তারিখ সরকার ও কারা কর্তৃপক্ষের জানার কথা-ডাক্তারদের নয়। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে মরিয়া এই দলবাজ এটর্নি জেনারেল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর অসুস্থতা নিয়েও অশোভন ও অযৌক্তিক মন্তব্য করার আমরা তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। গত ৫ জুন দুপুরে কারাগারে খালেদা জিয়ার ‘মাইল্ড স্ট্রোক’ এর ঘটনা কেনো সরকার, কারা কর্তৃপক্ষ চেপে গেছে তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেন তিনি।
খন্দকার মোশাররফ  বলেন,  গত  ৫ জুন সংঘটিত এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সম্পর্কে সরকারের মন্ত্রীবর্গ, এটর্নি জেনারেল ও আইজি প্রিজন প্রায় ১  সপ্তাহ পরে ১১ জুন তারিখে মুখ খুললেন কেন?  কেন এতদিন ঘটনাটি চেপে যাওয়ার চেষ্টা করা হলো? কেন ইতোমধ্যে তার হঠাৎ এত বেশী অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণ অনুসন্ধানের জন্য ব্যবস্থা নেয়া হয়নি? দেশনেত্রীকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা দেয়া হচ্ছে না। তার স্বাস্থ্যের অবনতির কথাও গোপন রাখার অপচেষ্টা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় স্পষ্টত:ই বোঝা যায় যে, ক্ষমতাসীন সরকার তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রীকে অকালে বিনা চিকিৎসায় জীবনে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
তিনি বলেন, অতীতে প্রাইভেট হাসপাতালে বন্দির চিকিৎসার বহু  ঘটনা আছে।এখনো অনেকে বন্দি বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ১/১১ সরকারের সময়ে শুধু শেখ হাসিনা নন, আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল সাহেব বেসরকারি প্রাইভেট হাসপাতালে এবং আরো অন্যান্যদের স্কয়ার, এ্যাপেলো হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।
গতকাল সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ঈদের আগে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে শতনাগরিক কমিটির আয়োজিত মৌন অবস্থান পুলিশের পন্ড করে দেয়া ও সোমবার রাতে উত্তরার বাসা থেকে যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকুকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তুলে নেওয়ার ঘটনার নিন্দা জানান খন্দকার মোশাররফ।
খালেদা জিয়ার অসুস্থতার বিষয়টিকে সরকার  রাজনৈতিক বিষয়ে পরিণত করেছে উল্লেখ কওে মোশাররফ বলেন, বেগম খালেদা জিয়াকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত ও অন্যায়ভাবে এবং তার দেয়া জবানবন্দী বিকৃত করে একটি আদালত তাঁকে পাঁচ বছরের জেল দিয়ে সরকারের ইচ্ছা পূরণ করেছে। বর্তমানে তাকে একটি পরিত্যক্ত ঘোষিত নির্জন কারাগারের একমাত্র বন্দী হিসেবে রাখা হয়েছে। ৭৩ বছর বয়স্কা এই সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে যে পরিবেশে রাখা হয়েছে তা যেকোন সুস্থ মানুষকে অসুস্থ করে ফেলার মতো। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে আর্থাইটিস, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। তাঁর দুই হাঁটু এবং দুই চোখেই অপারেশন করতে হয়েছে। ফলে তাঁকে সবসময়ই যোগ্য চিকিৎসকের নিয়মিত পর্যবেক্ষণে থাকতে হয়। অথচ নির্জন এই কারাগারে তাঁকে দেখার জন্য জুনিয়র ডাক্তার ও ডিপ্লোমা নার্স নিয়োগ করে সরকার দাবি করছে যে, বেগম খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ৩ বারের নির্বাচিত এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রীর স্বাস্থ্যের যে অবস্থা তাতে তাকে সর্বক্ষণ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে এবং জরুরী পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা প্রদানের ব্যবস্থা রাখা একান্তই জরুরী। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার অসুস্থতা বৃদ্ধি পেয়েছে। আর্থাইটিস এর ব্যথা বৃদ্ধির ফলে তিনি চলৎশক্তিহীন হয়ে পড়ছেন এবং পাশাপাশি তার অপারেশন করা চোখ লাল হয়ে আছে। এই পরিস্থিতিতে দ্রুত তাঁর উপযুক্ত চিকিৎসা না হলে তাঁর শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি হতে পারে।
সাংবাদিক সম্মেলনে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান এজেডএম জাহিদ হোসেন, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ