ঢাকা, বুধবার 13 June 2018, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২৭ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বৃষ্টি আর জোয়ারের পানিতে বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত ॥ হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দী

গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণে চট্টগ্রাম মহানগরী ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় পানিবন্ধতার সৃষ্টি হয়। ছবিতে (উপরে) নগরীর খাতুনগঞ্জ এলাকা, (নিচে) মীরসরাই এবং আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালে পানিবন্ধতার চিত্র দেখা যাচ্ছে

চট্টগ্রাম ব্যুরো : চারদিনে বৃষ্টি আর কর্ণফুলী নদীর জোয়ারের পানিতে চট্টগ্রাম নগরীর নি¤œাঞ্চল  ও পাহাড়ি ঢলসহ বৃষ্টির পানিতে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বিভিন্ন উপজেলায় হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। 
পাহাড়ি ঢল ও ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম জেলার মিরসরাই, রাউজান, সাতকানিয়া, ফটিকছড়ি ও নাজিরহাট  পৌরসভাসহ ১৪ ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
চট্টগ্রাম নগরীর নিম্নাঞ্চলে বৃষ্টি ও জোয়ারের পানি মিশে পানিবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রাম মহানগরীর  প্রবর্তক মোড়, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট,বাকলিয়া,আগ্রাবাদ সিডিএ এলাকা, চকবাজার, ষোলশহর ২ নম্বর গেট, হালিশহরসহ প্রায় এলাকা নিচু এলাকার মধ্যে কোথাও হাঁটু সমান ও কোথাও কোমর সমান ও কোথাও বুক সমান পানি হয়েছে। পানি জমে রাস্তাগুলো খালে পরিণত হয়েছে। পানির স্রোতে রাস্তা দিয়ে চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রয়োজনের তাগিদে হাঁটা-চলা করতে হচ্ছে। নিচু এলাকায় বসবাসকারী খেটেখাওয়া মানুষের ঘরে পানি উঠেছে। এতে পানিবন্দী হয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছে হাজারো মানুষ। চট্টগ্রামে খাতুনগঞ্জ চাক্তাইয়ে ব্যাপক পানিবদ্ধতায় বিভিন্ন পাইকারী খাদ্য সামগ্রীর গুদাম দোকানে আড়তে পানি ঢুকে পড়ে। এতে বহু মালামালের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে মা ও শিশু হাসপাতালে পানি ঢুকে পড়েছে। এতে রোগী ডাক্তার নার্স সবাই দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় মঙ্গলবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত ৯৪.২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা আবহওয়া অফিস। পূর্বাভাস কর্মকর্তা মো. মাজহারুল ইসলাম জানান, আকাশ মেঘলা থেকে মেঘাচ্ছন্ন থাকতে পারে। সেইসাথে অধিকাংশ জায়গায় অস্থায়ী দমকা অথবা ঝড়ো বাতাসের সাথে হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। তাছাড়া কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে । রাত ও দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। দক্ষিণ অথবা দক্ষিণ-পশ্চিম দিক হতে ঘণ্টায় ১৫-২০ কিলোমিটার বেগে যা অস্থায়ীভাবে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে সর্বোচ্চ ৪৫-৬০ কিলোমিটার বেগে বাতাস প্রবাহিত হতে পারে। পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় আবহাওয়ার সামান্য পরিবর্তন হতে পারে (বুধবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত)। এদিকে, গত তিন দিন ধরে সমুদ্রে লঘুচাপের কারণে সমুদ্র বন্দরসমূহকে ৩ নম্বর সর্তকতা সংকেত বহাল রেখেছে আবহাওয়া অধিদফতর।
 বৈরী আবহাওয়ার কারণে পাহাড়ধস ও যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনা ঠেকাতে নগরের বিভিন্ন পাহাড় ও পাহাড়ের পাদদেশে এবং পতেঙ্গা এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসরতদের সরে নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার জন্য মাইকিং করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। মঙ্গলবার সকাল থেকে চসিকের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের নির্দেশনায় নগরের টাইগারপাস, বাটালি হিল, মিয়ার পাহাড়, পতেঙ্গা এলাকাসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে এ সতর্কতামূলক মাইকিং করা হয়েছে। চসিকের প্রকৌশল ও পরিচ্ছন্ন বিভাগের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা এ কার্যক্রমে অংশ নেন। এ বিষয় জানতে চাইলে চসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) সুদীপ বসাক বলেন,  বৈরী আবহাওয়ার কারণে যেকোনো দুর্যোগ মোকাবেলায় সিটি করপোরেশন প্রস্তুত রয়েছে। সিটি মেয়রের নির্দেশনায় নগরের ৪১ ওয়ার্ডে সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। নগরের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় ও পাহাড়ের পাদদেশ এবং পতেঙ্গা এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসরতদের সরে যেতে মাইকিং করা হয়েছে।
একদিকে পাহাড়ি ঢল, অন্যদিকে ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম ফটিকছড়ি ও নাজিরহাট পৌরসভাসহ ১৪ ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। দুই দিনে পানিবন্দী হয়েছে হাজার হাজার পরিবার। অনেকের হাতে টাকা থাকলেও তারা অসহায়। কখনো এত পানি আগে দেখেনি ফটিক ছড়ির মানুষ। মঙ্গলবার সকালে ফটিকছড়ির উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দীপক কুমার রায় এভাবেই বন্যা পরিস্থিতি তুলে ধরেন।তিনি বলেন, জেলা প্রশাসক মহোদয়কে পরিস্থিতি অবহিত করেছি। কিন্তু এ মুহূর্তে ত্রাণসামগ্রী পাঠালেও পৌঁছানো অসম্ভব। বেশিরভাগ ইউনিয়নের সড়কে কোমরপানি। বেশকিছু সড়ক পাহাড়ি ঢলে ভেঙে গেছে। তারওপর তীব্র স্রোতের টান। ভোররাতে কাঞ্চননগর ইউনিয়নে দ্বীপের মতো একটি বাড়ির গাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে আটজনকে। পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ফটিকছড়ির বেশিরভাগ ইউনিয়নের সড়ক। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ফটিকছড়িতে ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে নারায়ণহাট, ভুজপুর, হারুয়ালছড়ি, সুয়াবিল, পাইন্দং, লেলাং, রোসাংগিরি, নানুপুর, বক্তপুর, ধর্মপুর, জাফতনগর, সমিতিরহাট, আবদুল¬াপুর, ফটিকছড়ি ও নাজিরহাট পৌর এলাকার হাজারো পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ভেসে গেছে পুকুর-দীঘি, মাছের খামারের মাছ, মুরগির খামার ও গৃহপালিত পাখি এবং গবাদি পশু। বন্ধ রয়েছে অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোর যান চলাচলও।
মিরসরাই (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে টানা দুইদিনের ভারি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে বন্ধী হয়ে আছে উপজেলার অর্ধলাখ মানুষ। পানিতে তলিয়ে গেছে শত শত একর আউশ রোপা, ভেসে গেছে প্রায় অনেক পুকুরের মাছ। গ্রামীন সড়ক গুলোর উপর দিয়ে বইছে পানির স্রোত। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। এতে দুর্ভোগে পড়েছে স্কুল কলেজের শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ীসহ এলাকার মানুষ।
এদিকে টানা বর্ষনের কারণে ঈদ উপলক্ষে বেচাকেনা অর্ধকের চেয়েও কমে গেছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
উত্তর চট্টগ্রামের বানিজ্যিক কেন্দ্র হিসবে পরিচিত বারইয়ারহাট পৌর বাজারের একাধিক ব্যবসায়ী জানান, ২২ রমজানের পর থেকে বৃষ্টি শুরু হওয়ায় বেচাকেনা একেবারে কমে গেছে।মসজিদ গলির হাসান সুজ এর স্বত্ত্বাধিকারি শাহাদাত হোসেন সাদেক বলেন, আশা ছিল রমজানের শেষ ১০দিন ভালো বেচাকেনা হবে। কিন্তু বৃষ্টির কারণে আগের চাইতেও কমে গেছে। দোকানে সব মালামাল রয়ে গেছে। কিভাবে কি করবো বুঝতে পারছিনা।
উপজেলার খইয়াছড়া ইউনিয়নের ফেনাপুনী, গোভনীয়া, আমবাড়িয়া গ্রামের প্রায় পাঁচশ পরিবারের বসতঘর হাঁটু পানিতে ডুবে আছে। ছোট ছোট বাচ্চাদের রাখা হয়েছে খাটের ওপর। বাহিরে বের হওয়ার কোন সুযোগ নেই। বাড়ির উঠান ডুবে আছে কোমর পানিতে। পথঘাট, পুকুর তলিয়ে গেছে পানির নিচে। স্থানীয় আজিজ, সুফিয়া বেগম, আমিন মিয়া জানান, রবিবার থেকে প্রচুর বৃষ্টি ও পাহাড়ি পানি নেমে আসায় বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, পুকুর, জমির ফসল পানিতে তলিয়ে যায়। এলাকার প্রায় পাঁচশত পরিবারের লোকজন ভোর রাতে রান্নাবান্না করতে না পেরে শুধু পানি খেয়ে রোজা রেখেছে। কিন্তু ইফতার কি ভাবে করবে, বাচ্চাদের কি ভাবে খাওয়াবে তা নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেছে। মসজিদিয়া, নয়দুয়ার, বুজর্নগর গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে। ইসহাক মিয়া নামে একজন জানান, বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে বাড়ি ঘরে থাকাও কষ্টসাধ্য পড়ে পড়বে। উপজেলার নিজতালুক এলাকায় কানু ফকির সড়কে একটি কালভার্ট দিয়ে পানি পাওয়ার পথ বন্ধ করে দিয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী শহীদুল্লাহ লেদু। এতে ওই এলাকায় প্রায় ৩০ পরিবার পানিবন্ধী হয়ে আছে।করেরহাট বাজারের ব্যবসায়ী রেজাউল করিম নোমান বলেন, বাজারে সড়ক ও জনপদ বিভাগ অপরিকল্পিতভাবে একটি ড্রেন করে রাখে। এতে পানি তো নিস্কাশন হচ্ছে না। উল্টো দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বাজারের ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসীকে।
অলিনগর এলাকার মৎস্যচাষী ইসমাইল হোসেন রানা বলেন, ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ডলে তার প্রকল্প থেকে প্রায় ২ লাখ টাকার মাছ ভেসে গেছে। এছাড়া মৎস্যজোন হিসেবে খ্যাত মুহুরী প্রজেক্ট থেকে লাখ লাখ টাকার মাছ পানিতে ভেসে গেছে।
মঈন উদ্দিন নামে একজন অভিযোগ করেন, কামারিয়া খাল, মঘাদিয়া-সাহেরখালী খালের ওপর বিভিন্ন স্থাপনা নির্মান করে খাল দখলের কারণে খইয়াছড়া, মঘাদিয়া, মায়ানী ইউনিয়নের মানুষ বৃষ্টি হলে দুর্ভোগে পড়ে। ওয়াহেদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফজলুল কবির ফিরোজ জানান, ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের মাইজগাঁও, ছোট কমলদহ, উত্তর ওয়াহেদপুর, মধ্যম ওয়াহেদপুর, দক্ষিন ওয়াহেদপুর, সাতবাড়িয়া, জাফরাবাদ, গাছবাড়িয়া, পদুয়া এলাকায় প্রায় এক হাজার পরিবারের বসতঘর পানিতে তলিয়ে আছে। ছোট কমলদহ বাজারসহ গ্রামীন সড়ক গুলোর ওপর দিয়ে পানির ¯্রােত বইছে। ¯্রােতে ভেঙ্গে গেছে হাবিব উল্লাহ ভূঁইয়া সড়ক, নিজামপুর রেলষ্টেশন সড়ক মিয়াচাঁন সড়কসহ কয়েকটি সড়ক। ভেসে গেছে বেশ কিছু পুকুরের মাছ। জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের খিরমুরালী এলাকায় বসতঘরে পানি ঢুকে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে হয়েছে প্রায় শতাধিক পরিবার। পানির কারণে ভেঙ্গে পড়েছে কয়েকটি মাটির তৈরি ঘর।মিরসরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বুলবুল আহম্মদ জানান, মিরসরাইয়ে চলতি মৌসুমে প্রায় ৮হাজার হেক্টর জমিতে আউশ রোপা লাগানো হয়েছে। সোমবারে বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে অনেক রোপা পানিতে ডুবে গেছে। এছাড়া বিভিন্ন সবজিরও ক্ষতি হয়েছে। পানি দ্রুত নেমে না গেলে কৃষক ব্যাপক লোকসানে পড়বে।মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল কবির জানান, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে কারণে বিভিন্ন এলাকায় মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে। চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে।
 রাউজান থেকে সংবাদদাতা জানায়,তিনদিন ধরে অবিরাম বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢলে সর্তা, ডাবুয়া, বেরুলিয়া খালের ভাঙ্গনে সৃষ্ট বন্যায় রাউজানে তিন ইউনিয়ন ও পৌরসভার ৮ ওয়ার্ডের অর্ধলক্ষ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। এছাড়াও আরো বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। চট্টগ্রাম–রাঙামাটি সড়কের কয়েকটি অংশ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এতে প্রায় ছয়ঘণ্টা পর্যন্ত দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। অভ্যন্তরীণ সড়ক, বাড়িঘরে পানি ঢুকে জিন্মি হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ। মাছের পুকুর, পোল্ট্রি ফার্মে পানি ঢুকে কোটি কোটি টাকার মাছ, মুরগি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানির তোড়ে ভেঙ্গে গেছে কাঁচা ঘরবাড়ি। পানির তীব্র গতিতে ভেঙ্গে   গেছে বহু সড়ক। সবজি ক্ষেত ডুবে গেছে। কয়েকটি ব্রিজ ভেঙ্গে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সদরের জলিল নগর, মুন্সিরঘাটা, ফকিরহাটও ডুবে যাওয়ায় ঈদের মার্কেটগুলোতে ক্রেতাশূন্য হয়ে পড়ে। দু’জন পৌর কাউন্সিলরের বাড়িঘরও ডুবে যায় বন্যার পানিতে। 
বিভিন্ন এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ডাবুয়া ইউনিয়ন, চিকদাইর ইউনিয়ন ও হলদিয়া ইউনিয়নের উপর দিয়ে প্রবাহমান সর্তা, ডাবুয়া ও বেরুলিয়া খালের একাধিকস্থানে বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ায় গত  সোমবার ভোর থেকে পানি গতি বাড়তে থাকে। ৭টা থেকে রাউজান পৌরসভার ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭ ও ৮নং ওয়ার্ড এবং হলদিয়া ডাবুয়া, চিকদাইর ও হলদিয়া ইউনিয়নের কমপক্ষে অর্ধশত সড়ক কয়েকফুট পানিতে তলিয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যায় গাড়ি চলাচল। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম হোসেন জানান, বন্যার পানিতে এবার সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছে, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, পুকুরের মাছ, পোল্ট্রি ফার্ম। তিনি ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিসংখ্যান দিতে না পারলেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে জানান। স্থানীয়রা জানান, সোমবার সকাল ৮টা থেকে পৌরসভার দায়ারঘাটা, জানালী হাট সড়ক, বেরুলিয়া অংশ কোমর ও হাঁটু পরিমাণ পানিতে তলিয়ে গিয়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। প্রায় ছয়ঘণ্টা পর দুপুর দুইটার দিকে কিছুটা স্বাভাবিক হলেও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
চিকদাইর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রিয়তোষ চৌধুরী বলেন র্সর্তা খালের জাকেরিয়া চৌধুরী অংশে প্রায় তিনশ ফুট ভেঙ্গে ডাবুয়া, চিকদাইর, গহিরা দলই নগর, বিনাজুরী, এবং ডাবুয়া খালের ভাঙ্গনে ক্ষেত্রপাল এলাকাসহ পুরো চিকদাইর ইউনিয়ন পানিতে ভাসছে। বাড়িঘরে পানি ঢুকে গৃহবন্দী হয়ে পড়েছে। ইউনিয়নের সাহেব বাড়ি সড়কসহ প্রায় প্রতিটি সড়কে কোমর পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে গেছে। সাধারণ মানুষের ঘরে পানি ঢুকায় অনেকে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। রমযানের সময় চুলা জ্বলারও উপায় নেই। গরু, ছাগল নিয়ে বিপাকে পড়েছে অনেকে। পূর্ব পাঠানপাড়ায় একটি ব্রিজ ভেঙ্গে গেছে। এই ইউনিয়নের প্রায় দশ হাজার মানুষ এখন পানিবন্দী। রাস্তাঘাট, মুরগির ফার্ম সর্তার পানির তোড়ে ভেঙ্গে নিয়ে গেছে। তলিয়ে গিয়ে লাখ লাখ টাকার মাছ ভেসে গেছে।
  পশ্চিম ডাবুয়ায় আড়াইশ–তিনশ ফুটের বাঁধ ভাঙ্গার ফলে চিকদাইর, গহিরা, বিনাজুরী, পশ্চিম ডাবুয়া ও পৌরসভার বিভিন্ন এলাকা ডুবে গেছে। কার্পেটিং রাস্তা, গাছ, পোল্ট্রি ফার্ম ভেঙ্গে গেছে। কুন্ডেশ্বরী, দায়ারঘাটাসহ সবস্থানে বন্যার পানিতে থৈথৈ করছে। পৌরসভা সদরের ৮নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এডভোকেট দীলিপ কুমার চৌধুরীসহ প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ফকিরহাট, মুন্সিরঘাটা সংলগ্ন আধুনিক ক্লাব এলাকা, গোলাপ ড্রাইভার বাড়ি, এনাম মাস্টার, সাপলঙ্গা, বাড়িঘর, জলিল নগর, থানা রোড, রাউজান হাফেজ বজলুর রহমান সড়ক, ঢেউয়া হাজীপাড়াসহ বিভিন্ন দোকান, বাড়িঘর বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়। ফকিরহাটে ঈদের বাজারে এর প্রভাব পড়ে।
পৌরসভার ৫ নং ওয়াডের বাচাইয়্যার দোকান সংলগ্ন এলাকায় ডাবুয়ার খালের বাঁধ ভেঙ্গে বাইন্যপাড়া, দাশপাড়া, বনিক পাড়া, দায়ারঘাটা, নন্দীপাড়া, জলদাশপাড়া, রাঙামাটি সড়ক ডুবে গেছে।  ডাবুয়া খাল খালের ভাঙ্গনে কুলবাড়ি, জগৎধর সড়ক, জগৎ মল্লপাড়া, জানালী হাট সড়ক, দায়ারঘাটা, দায়ারঘাটা থেকে সিকদারঘাটা পর্যন্ত কোমরসম পানিতে তলিয়ে যায়। 
এছাড়া বেরুলিয়া খাল ভেঙ্গে গিয়ে মুন্সিরঘাটা, ফায়ার সার্ভিস, বড় বাড়ি পাড়া, দোয়া পাড়া, ডেপুটি বাড়ি সুলতানপুর এলাকা তলিয়ে গেছে। পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলের পানি, বেরুলি, ডাবুয়া, সর্তা খালের পানি এসে আমার ওয়ার্ডে বন্যা সৃষ্টি করেছে। এখানকার আবদুল জব্বার সড়ক, কবির আহমদ তালুকদার সড়ক, আজিম হাবিলদার বাড়ি সড়ক, পুরো এলাকা ডুবে রয়েছে। মোবারকখীল কোরআন আলী শাহ মাজার বাড়ির একটি ব্রিজ ভেঙ্গে গেছে। মাছের পুকুরসহ রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এখনও পানিতে ডুবে আছে এলাকা।ডাবুয়া ইউয়িননের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান চৌধুরী বলেন ‘পূর্ব ডাবুয়া ও পশ্চিম ডাবুয়ার রোড ভেঙ্গে নিয়ে গেছে। রাস্তা বাড়িঘর খালের ভাঙ্গনে ডুবে যায়। পশ্চিম ডাবুয়া বশর মিয়া মাস্টার, সেন বাড়ির, পূর্ব ডাবুয়া এলাকায় খাল ভেঙ্গে আমার এলাকার মানুষের ঘরবাড়ি, জমি, প্রচুর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’ হলদিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান   শফিকুল ইসলাম চৌধুরী বলেন ‘সর্তা খালের বিভিন্নস্থানে বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ায় ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স ভবন, এয়াছিন নগর, হলদিয়া, গর্জনিয়া, রুস্তম শাহ ভিলেজ সড়কসহ বহু সড়ক উপসড়ক ডুবে গেছে। কয়েকটি ব্রিজ, কালভার্ট ভেঙ্গে গেছে। ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিভিন্ন গ্রাম। কাউন্সিলর আলমগীর আলী বলেন ‘হালদা নদীর পানি ঢুকে পশ্চিম গহিরা, বড়–য়া, আবুদ্দার বাড়ি, রাস্তাঘাট, পুকুর ডুবে গেছে। পশ্চিম গহিরা মৎস্য হাচারীর দেওয়ালে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। নোয়াজিষপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সরোয়ার্দী সিকদার বলেন ‘হালদা নদীর পানি ঢুকে নদিমপুর এবং সর্তা খালের উত্তর ফতেনগর, মিলন মাস্টার ঘাটা এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’ গহিরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নুরুল আবছার বাশি বলেন ‘হালদা নদীর পানি বেড়ে কোতায়ালীঘোনা গ্রামে বন্যার পানি ঢুকেছে। পৌরসভার বাসিন্দা নুরুল আবছার বলেন ‘৫নং ওয়ার্ডে বাড়িঘর, রাস্তা ছাড়াও ত্রিশটি পুকুর ডুবে গেছে। পৌরসভার বাসিন্দা মোহাম্মদ হোসেন জানান, ৬নং শরীফপাড়া, ছিটিয়াপাড়া, ৮নং পালিতপাড়া সড়ক, মুন্সিরঘাটা আধুনিক কমিউনিটি সেন্টার, শফিকুল ইসলাম চৌধুরী সড়কসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রচুর জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।
ফটিকছড়িতে ভয়াবহ বন্যা
মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, ফটিকছড়ি : ফটিকছড়িতে গত কয়েকদিনের টানা বর্ষণে ভয়াবহ বন্যায় প্লাবিত হচ্ছে বিভিন্ন অঞ্চল। যোগাযোগ বন্ধ হয়ে পড়েছে প্রধান সড়ক সমূহে। ইতোমধ্যে উপজেলার ফটিকছড়ির পৌরসভা,নাজিরহাট পৌরসভসহ প্রায় ইউনিয়ন বন্যার পানিতে ভাসছে।চারদিকে পানি আর পানি,
ভারি ববর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে চরম ভাবে।। পানিবন্দী হয়ে পড়ছে লাখো মানুষ।
ইতোমধ্যে হালদা,সর্তা খাল, ধুরুং খালের পানি বিপদ সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। শংকায় দিন যাপন করছ পাড়ের বাসিন্দারা। ভাঙ্গা বাঁধ পাড়ের ব্যাপক ভাঙ্গণ দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়ে উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।
ধর্মপুরে অনেক ঘরে পানি ডুকেছে।র্ সতা খালে পানি আরো বাড়ছে বলে জানান ঐ এলাকার সাংবাদিক সোলাইমান আকাশ।
সাংবাদিক আলমগীর নিশান জানান,রাতে কাঞ্চন নগরে ধরুং খালের চরে আটকা পড়া নারী-শিশু সহ আট জনকে অসীম সাহসীকতার সাথে কলা গাছের ভেলায় করে উদ্ধার করেছে স্থানীয় যুবকরা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন,উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দীপক কুমার রায়।
ফটিকছড়ি পৌরসভা কাউন্সিলর ও সাংবাদিক রফিকুল আলম জানান, ফটিকছড়ি সদর, সুন্দরপুর, পাইন্দং এলাকায় ধুরুং খালের পানি প্রবেশ করছে । ফটিকছড়ির ধুরং খালের পানিতে
 বেড়াজালী, পশ্চিম কাঞ্চননগর প্লাবিত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় আরো বহু এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। ফটিকছড়ির পাইন্দং ইউপির বেড়াজালী (এনায়েতুল হক চৌধুরী) লুলি চৌধুরীর বাড়ীর দক্ষিন পাশ দিয়ে পাখি মেম্বারের ঘরের সামনে দিয়ে ধুরং খালের বাঁধ উপছে বন্যার পানি প্রবাহিত হয়ে বিস্তীর্ন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। সে সাথে শত শত বসত ঘরে পানি প্রবেশ করেছে। স্থানীয় হাজারো এলাকাবাসী আতংন্কের মধ্যে রয়েছে বলে জানান, স্থানীয় ইউপি সদস্য আনোয়ার।তিনি আরো জানান,ইতোমধ্য কয়েকটি পুকুর পানিত ডুবে গেছে।
 এদিকে বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় ফটিকছড়ির আরো বহু এলাকা প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এসব এলাকার সড়ক,পুকুর,বসত ঘর পানিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে। হালদা নদী ও ধুরং খালের পূর্বের ভাঙ্গা বাঁধ মেরামত না করার কারনে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে উপজেলার পশ্চিম কাঞ্চন নগর গ্রাম ও কাঞ্চননগর বাজার ধুরং খালের পানিতে সড়ক সহ শত শত পরিবার পানি বন্দি হয়ে পড়েছে। সড়কের উপর দিয়ে ৩ থেকে ৬ ফুট উচ্চতায় বন্যার পানি প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানা যায়। বন্যার পানিতে চাষের জমিসহ অনেক পুকুর ইতোমধ্যে তলিয়ে গেছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় উপজেলার নাজিরহাট,বিবিরহাট,নানুপুরের বাজার ও বাজার সংলগ্ন এলাকা জলবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। পাহাড়ি ঢলে প্লাবিত হয়েছে আরো বিভিন্ন এলাকা। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দীপক কুমার রায় বলেন, এলাকার জনপ্রতিনিধিদের জনসাধারণের খবরা খবর রাখার জন্য নিন্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমিও খোঁজ খবর নিচ্ছি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ