ঢাকা, বুধবার 13 June 2018, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২৭ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ঈদ বাজারে জমে উঠেছে জুতা বেচাকেনা

মুহাম্মদ নূরে আলম: পছন্দের পোশাকের সঙ্গে চাই মানানসই জুতা। সেটা না মিললে ঈদ উৎসবই যেন অপূর্ণ থেকে যায়। তাই মানানসই জুতা বাছাই করতে ক্রেতাদের ছুটতে হচ্ছে এই দোকান থেকে সেই দোকানে, এই মার্কেট থেকে ওই মার্কেটে। সবার চেয়ে আলাদা ও খানিকটা বৈচিত্র্য খুঁজতেই ব্যস্ত সবাই। কারণ শেষ মুহূর্তে পছন্দের পণ্যটি পাওয়া যায় না। এবার ঈদে বসেছে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার জুতার বাজার। জুতা বাজারে জমে উঠেছে বেচাকেনা।
রাজধানীর এলিফেন্ট রোড, পলওয়েল মার্কেট, নিউমার্কেট, বসুন্ধরা সিটি ও যমুনা ফিউচার পার্কসহ সব মার্কেটেই জুতার বিক্রি বেশ ভালো বলে জানান ব্যবসায়ীরা। ঈদ বাজারে মেয়েদের পছন্দ ছিমছাম অল্প হিল ও স্লিপার ধরনের স্যান্ডেল। এলিফ্যান্ট রোডে বাটার বিপণন কর্মকর্তা জুবায়ের ইসলাম বলেন, ‘এবার ঈদের জুতায় ব্যবহার করা হয়েছে বর্ষা উপযোগী উপকরণ। তবে ডিজাইনে থাকছে আধুনিকতার ছাপ। সঙ্গে রেগুলার ও এক্সক্লুসিভ দুই ধরনের।’
এখানকার অন্যান্য জুতার দোকানগুলোতে স্ট্র্যাপি বা স্লিপারের দাম নকশার ওপর নির্ভর করে ৩৫০ থেকে দুই হাজার ২০০ পর্যন্ত হতে পারে। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের হিল পাবেন ৯০০ থেকে তিন হাজার টাকার মধ্যে। রাবার বা স্পঞ্জের স্যান্ডেল পাওয়া যাবে ১৫০ থেকে ৬০০ টাকায়।
ছেলেদের জুতার মধ্যে এবার ঈদে সিøপার, কনভার্স ও সু-এর চাহিদাই বেশি। এ ছাড়া কিছু স্পোর্টস সুও বিক্রি হচ্ছে। চামড়া, রেক্সিন ও কাপড়ের জুতার মধ্যে ডিজাইন ও স্থায়িত্বের ভিত্তিতে দামের হেরফের হয়। চামড়ার স্যান্ডেলের দাম ৬৯০ থেকে ২ হাজার ৪৫০ টাকা, বুট শু এক হাজার ৩৫০ থেকে ৩ হাজার ৬৫০ টাকা, স্নিকার্স ৮৫০ থেকে দুই হাজার ৪৫০ টাকা এবং বিভিন্ন ডিজাইনের মোকাসিন পাওয়া যাচ্ছে এক হাজার ৫৫০ থেকে ৪ হাজার টাকার মধ্যে। আর রাবার বা স্পঞ্জের স্যান্ডেল পাওয়া যাচ্ছে ১৫০ থেকে ৪০০ টাকায়। এবারও বাচ্চাদের জুতায় রয়েছে বাহারি ডিজাইন ও নতুনত্বের ছোঁয়া। ডোরেমন, মটু-পাতলু কার্টুন সংবলিত জুতাই বিক্রি হচ্ছে বেশি। ২৫০ থেকে শুরু করে ৩ হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে এগুলো।
এদিকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ঈদে নগদ ছাড়সহ কিস্তিতে জুতা কেনার সুযোগ দিচ্ছে। সঙ্গে ক্যাশব্যাকের অফার তো আছেই। বাটার শোরুম থেকে বাংলা লিংক গ্রাহকরা সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ ছাড়ে জুতা কিনতে পারবেন। এ ছাড়া বিকাশে ১০ ও রকেটে ২০ শতাংশ ক্যাশ ব্যাক তো আছেই। তবে আড়ং এর শো রুমগুলোতে বিকাশে পেমেন্ট করলে মিলছে ২০ শতাংশ ক্যাশব্যাক সুবিধা। আর ক্রিসেন্ট দিচ্ছে কিস্তিতে জুতা কিনার সুযোগ।
সারাবছর জুতার চাহিদা থাকলেও রোজার ঈদে তা কয়েকগুণ বাড়ে। আর এ চাহিদা মেটাতে রাজধানীর পুরান ঢাকার কারখানা ও গুলিস্তানের পাইকারি সব মার্কেটে চলছে জোর প্রস্তুতি। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে জুতা কিনতে আসছেন পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা। ঈদবাজার ও চাহিদার কথা মাথায় রেখে দিনরাত পরিশ্রম করে জুতা তৈরি করছেন কারিগররা। ক্রেতা আকর্ষণে এবার জুতার ডিজাইন, আকৃতি ও রঙে ভিন্নতা আনা হয়েছে। এবারকার ঈদ মৌসুমে ফুলবাড়িয়াসহ পাইকারি বাজারে ১২শ’ কোটি টাকার জুতা বিক্রির আশা করছেন ব্যবসায়ীরা। মজানা গেছে, রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা গুলিস্তানসংলগ্ন ফুলবাড়িয়ায় রয়েছে বেশ কয়েকটি জুতার পাইকারি মার্কেট। এগুলো হলো- সিটি সুপার মার্কেট, জাকের সুপার মার্কেট, ঢাকা ট্রেড সেন্টার ও সিদ্দিকবাজার সমবায় মার্কেট। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা এখানে আসছেন জুতা সংগ্রহ করতে। এছাড়া রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোড, বসুন্ধরা সিটি, গুলশান, ধানমন্ডি ও উত্তরার বড় বড় শপিংমল এবং ফ্যাশন হাউসে যেসব জুতা-স্যান্ডেল শোভাবর্ধন করছে তার প্রায় ৬০ শতাংশের যোগান দেন এখানকার পাইকারি ব্যবসায়ীরা। এছাড়া নন-লেদার ও প্লাস্টিকের অধিকাংশ জুতা আসে চীন, থাইল্যান্ড ও মিয়ানমার থেকে। তবে পুরান ঢাকার সিদ্দিকবাজার, মালিটোলা, নাজিরাবাজার, আলুবাজার, বংশাল, নবাবগঞ্জ ও ইসলামপুরেও তৈরি দেশী জুতার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে অভ্যন্তরীণ বাজারে। পরিসংখ্যান বলছে, পাইকারি ও খুচরা মিলিয়ে জুতার বাজার প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার। এবারকার ঈদ মৈৗসুমে পুরান ঢাকার পাইকারি বাজারগুলোর অন্যতম ফুলবাড়িয়া মার্কেটসহ পাইকারি বাজারে ঈদে ১২শ’ কোটি টাকার জুতা বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশে জুতার বৃহত্তম বাজার ফুলবাড়িয়া সিটি সুপার মার্কেট ঘুরে দেখা যায়, এ মার্কেটের এক থেকে সাততলা পর্যন্তই জুতার শোরুম। রয়েছে কয়েক শ’ জুতার দোকান। এগুলোর মধ্যে আফজাল সুজ, তানিশা সুজ, সম্রাট সুজ, রংধনু সুজ, স্বদেশ সুজ, মাসুম সুজ, রুমান সুজ, ডিলাক্স সুজ, পদ্মা সুজ, যমুনা সুজ, কাজী সুজ, সিকদার সুজ, ঝর্ণা সুজ ও মিলন সুজসহ বিভিন্ন কোম্পানির দেশী জুতার দোকান। এর বাইরে এ মার্কেটে প্রায় অর্ধশত বিদেশী জুতার দোকান রয়েছে। তবে সিংহভাগ দোকানই দেশী জুতার। এসব দোকানের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রোজার আগে থেকেই জুতার পাইকারি বেচাকেনা চলছে। পুরো রমযান মাসই এ বেচাকেনা চলবে। কোন কোন দোকানে ক্রেতার সংখ্যা ছিল চোখে পড়ার মতো। শিশু ও নারী-পুরুষের বাহারি ডিজাইনের জুতায় কানায় কানায় পরিপূর্ণ দোকানগুলো। রাজধানীসহ দেশের অন্য এলাকার খুচরা বিক্রেতারা এক দোকান থেকে অন্য দোকানে ছুটছেন নতুন ডিজাইন ও সাশ্রয়ী দামের জুতার জন্য, যাতে ঈদবাজারে ভাল মুনাফা হয়। এবার বর্ষা মৌসুমে ঈদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জুতা আমদানি ও দেশীয় কারখানায় তৈরি জুতা শো রুমগুলোতে স্থান পেয়েছে। সিলেটের জুতা ব্যবসায়ী ফরিদ হোসেন ও হবিগঞ্জের জুতা ব্যবসায়ী মালেক দেওয়ান বলেন, দেশী জুতার পাশাপাশি এখন বিদেশী জুতারও চাহিদা বেড়েছে। অন্য সময়ের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি বিক্রি হয় রোজার সময়। এ বাড়তি চাহিদা মেটাতে আগাম পাইকারিতে কেনাকাটা করছেন তারা।
ফুলবাড়িয়া মার্কেটের তানিশা সুজের স্বত্বাধিকারী মোঃ মাসুম শেখ জানান, পাইকারিতে জুতা বিক্রি শুরু হয়েছে মূলত রোজার আগে থেকেই। এবার প্রস্তুতিও ভাল ছিল। ঈদে ব্যবসা কেমন হচ্ছে জানতে চাইলে বলেন, এখনও আশানুরূপ বিক্রি হয়নি। তবে কয়েকদিনের মধ্যেই জুতার বাজার জমে উঠবে বলে তিনি জানান। আফজাল সুজের ম্যানেজার নাসির মিয়া জানান, এ মার্কেটে দেশী জুতা বেশ ভাল চলছে। তবে এবার বিদেশী জুতারও বেশ চাহিদা রয়েছে। আরও কয়েকদিন পর জুতার বাজার পুরোপুরি শুরু হবে বলে তিনি জানান। ঢাকা ট্রেড সেন্টার ব্যবসায়ী মালিক সমিতির ব্যবসায়ীর জানান, বিগত ঈদ মৌসুমে দোকানভেদে প্রতিদিন দুই থেকে পাঁচ লাখ টাকা বিক্রি হয়েছে। এবার ওই রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে বলে ব্যবসায়ীরা আশা করছেন। জুতার বিকিকিন সম্পর্কে লেদার টেকের স্বত্বাধিকারী মাসুদ আহমেদ বলেন, চীন থেকে আমদানি করা পণ্য বাজার দখল করে আছে। এসব সস্তা জুতার ভিড়ে মার খেয়ে খাচ্ছে দেশীয় জুতা। এজন্য দেশী জুতার কাঁচামালের উচ্চমূল্যকে দায়ী করেন তিনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ