ঢাকা, বুধবার 13 June 2018, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২৭ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক-মহাসড়কে ঈদযাত্রা

পবিত্র ঈদুল ফিতরের প্রাক্কালে সাধারণ মানুষ তো বটেই, দেশের গণমাধ্যমগুলোও মানুষের বাড়ি ফেরা নিয়ে ভীতি ও আশংকা প্রকাশ করতে শুরু করেছে। ‘ক্ষতবিক্ষত সড়ক-মহাসড়ক’, ‘ঈদ এলেই সড়কে জোড়াতালি’ এবং ‘ঈদযাত্রা ভয় জাগাচ্ছে’ ধরনের শিরোনাম দেখা যাচ্ছে প্রায় সকল দৈনিকে। বেসরকারি টেলিভিশনগুলোর সচিত্র রিপোর্টেও সড়ক-মহাসড়কের বিপদজনক অবস্থাই উঠে আসছে। এক কথায় বলা যায়, ঈদের মাত্র দু’-তিন দিন বাকি থাকলেও দেশের কোনো অঞ্চলের সড়ক-মহাসড়কই এখনো নিরাপদ বা ঝুঁকিমুক্ত চলাচলের উপযোগী হতে পারেনি।
বাস্তবে বিগত দুই-আড়াই মাসের বৃষ্টি এবং তার পরপর কিছু কিছু স্থানে শুরু হওয়া অকাল বন্যায় বরং প্রায় সকল এলাকার সড়ক-মহাসড়কগুলো বহুস্থানে ভেঙে পড়েছে। সৃষ্টি হয়েছে শত শত ছোট-বড় গর্ত ও খানা-খন্দকের। বহু এলাকায় ১২ থেকে ১৫/২০ ফুট পর্যন্ত জায়গা জুড়ে এখন গর্ত ও খানা-খন্দক। ইট-বালু-সিমেন্ট সরে যাওয়ায় এবড়ো-থেবড়ো হয়ে পড়েছে প্রতিটি সড়ক-মহাসড়ক। যাত্রী পরিবহন নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই রীতিমতো কুস্তি চলছে বিভিন্ন গন্তব্যের অভিমুখীন সড়ক-মহাসড়কে। দেড়-দু’ঘন্টার পথ হলেও মহাসড়কে আজকাল সময় লাগছে ১০ থেকে ১২ ঘন্টা পর্যন্ত। ওদিকে রংপুর-বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলমুখী ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের আবদুল্লাহপুর থেকে চন্দ্রা পর্যন্ত এলাকায় ভোগান্তি চলছে বহুদিন ধরে। একই মহাসড়কের বগুড়া ও সিরাজগঞ্জ এলাকায় সব অংশের সংস্কার কাজ এখনো শেষ হয়নি। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ভুলতা ও ওসমানিনগরে প্রচন্ড ভোগান্তির আশংকা করা হচ্ছে। ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের যাত্রীরাও এবার খানাখন্দক পাড়ি দিয়েই যাতায়াত করতে বাধ্য হবেন।
অর্থাৎ দেশের কোনো এলাকার সড়ক-মহসড়কই স্বাভাবিক এবং নিরাপদে চলাচলের উপযোগী নয়। এমন অবস্থার কারণ জানাতে গিয়ে গণমাধ্যমের খবরে জানানো হয়েছে, সারা বছর নীরবে কাটিয়ে দেয়ার পর ঠিক ঈদের প্রাক্কালে এসেই সড়ক ও জনপথ অধিদফতরসহ সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগগুলো তোড়জোড় শুরু করে। শুরু হয় কোনোভাবে জোড়াসহ তালি দিয়ে সংস্কারের নামে মেরামতের কর্মকান্ড। অথচ প্রতি বছরের বার্ষিক বাজেটেই কিন্তু সড়ক-মহাসড়কের সংস্কার এবং নতুন নতুন সড়ক নির্মাণের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থের বরাদ্দ দেয়া হয়। যেমন চলতি ২০১৭-১৮ অর্থ বছরের বাজেটেও সওজের অধীনে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ৩২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। এ ছাড়াও ১৯০টি প্রকল্পে বড় ধরনের মেরামত ও সংস্কার কাজের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল ১৯০০ কোটি টাকা। অন্যদিকে অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঠিকাদার নিয়োগের কাজেই সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো ছয় মাসের বেশি সময় নষ্ট করেছে।
বলা হচ্ছে, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও আর্থিক সঙ্গতির মতো জরুরি বিষয়গুলোর চাইতে ঠিকাদারদের রাজনৈতিক পরিচিতিকেই অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সে কারণে কাজও পেয়েছে ক্ষমতাসীন দলের ঠিকাদাররা। ক্ষমতাসীনদের নেকনজরে থাকায় কাজ তো পেয়েছেই, কাজের নামে চুরি করা ও ফাঁকি দেয়া ছাড়া অন্য কিছুও করেনি তারা। এজন্যই অর্থবছরের একেবারে শেষ সময়ে এসে তাদের দৌড়-ঝাঁপ শুরু হয়ে গেছে। ওদিকে এগিয়ে এসেছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। ফলে সবদিক থেকেই লেজেগোবরে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। মাঝখান দিয়ে জীবনের প্রচন্ড ঝুঁকিতে পড়তে চলেছে সাধারণ মানুষ- যারা বছরের এই একটি উপলক্ষে আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার এবং আনন্দ করার জন্য রাজধানীসহ সকল কর্মস্থল ছেড়ে যার যার বাড়িতে ফিরে  যায়।
বলা বাহুল্য, অন্যান্যবারের মতো এবারও লাখ লাখ নারী-শিশু ও মানুষের ঈদ যাত্রা অত্যন্ত ভয়ংকরই হতে চলেছে। সড়ক-মহাসড়কগুলোই শুধু এমন অবস্থার কারণ নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রচন্ড রকমের বৈরি আবহাওয়াও। স্বাভাবিক প্রাকৃতিক নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে এবারের বৈশাখ মাস থেকেই প্রবল বৃষ্টির শুরু হয়েছে। জ্যৈষ্ঠ শেষ হয়ে এলেও বৃষ্টি কমার তেমন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। এখনো দেশের কোথাও না কোথাও থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছেই। সেই সাথে হচ্ছে বজ্রপাত। বজ্রপাতে এবার মানুষের মৃত্যুও কম হয়নি। বলা হচ্ছে, বৃষ্টি-বাদল যদি অব্যাহত থাকে তাহলে এবারের ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক বা আনন্দদায়ক তো হবেই না বরং সড়ক-মহাসড়কের কারণে অত্যন্ত বিপদজনকও হয়ে উঠবে। এমন অবস্থার মধ্যেও বাস মালিকরা ঘোষণা দিয়েছেন, যেহেতু রাস্তা ভালো নয় এবং যেহেতু ১০ ঘণ্টার দূরত্ব অতিক্রম করতে ২০/২৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লেগে যেতে পারে সেহেতু ঈদের সময় তারা বাসের সংখ্যা কমিয়ে দেবেন। তাদের নাকি পুষবে না!
বলার অপেক্ষা রাখে না, বাসের সংখ্যা কমে যাওয়ার অর্থই হলো, ঈদে ঘরমুখী মানুষের দুর্ভোগ অনেক বেড়ে যাবে। বড় কথা, মহাব্যস্ত সেতুমন্ত্রীকে যখন অন্যবারের মতো দৌড়-ঝাঁপ করতে দেখা যাচ্ছে না এবং বাস মালিকরাও যখন আগেভাগেই বাসের সংখ্যা কমিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন তখন আর বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না যে, দেশের সকল অঞ্চলেই সড়ক-মহাসড়কের অবস্থা আসলেও শোচনীয় শুধু নয়, বিপদজনকও হয়ে উঠেছে। ঈদের ছুটিতে বাড়িতে যাওয়ার যারা চেষ্টা করবেন তাদের সকলকেই এবার অত্যন্ত আশংকাজনক পরিস্থিতির মুখেই পড়তে হবে। বাস্তবে এ ধরনের খবর এরই মধ্যে আসতেও শুরু করেছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, সব মিলিয়েই পরিস্থিতি বিপদজনক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও ক্ষমতাসীনদের মধ্যে ইতিবাচক বা জনকল্যাণমুখী পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এবারও ঈদের ঠিক প্রাক্কালে এসে কেবলই দায়সারা মেরামতের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন তারা। সে মেরামতও এমনভাবেই করা হচ্ছে, যাতে অদূর ভবিষ্যতেই আবারও ‘মেরামত’ করার সুযোগ পাওয়া যায়! কথাটাকে হাল্কাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই। কারণ, সকল ধরনের গবেষণা ও পর্যালোচনায় বারবার প্রমাণিত হয়েছে, সওজসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ঠিকাদারদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকে। পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত থাকেন মন্ত্রী-এমপি এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। এখানে তাই ‘এক শ্রেণির’ ঠিকাদার বা ‘এক শ্রেণির’ কর্মকর্তা বলে কাউকে ছাড় দেয়া যায় না। ঘুষ ও অবৈধ অর্থের লোভে সবাই আসলে পচে গেছে। এজন্যই কোনো কাজই ১০০ ভাগ দূরে থাকুক, ৫০/৬০ ভাগও নির্মাণ কাজের নীতিমালা অনুযায়ী সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা হয় না। কিন্তু দোষ ও অপরাধগুলো ধরার এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কেউ নেই। কারণ, এসব যাদের দায়িত্ব তারা নিজেরাই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন!

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ