ঢাকা, বুধবার 13 June 2018, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২৭ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বিপজ্জনক হয়ে উঠছে আবহাওয়া ও পরিবেশ

আখতার হামিদ খান : প্রতিদিনই পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে কোন না কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ সংঘটিত হচ্ছে। কখনো খরা, কখনো বন্যা, কখনো টর্নেডো, কখনো সাইক্লোন, কখনো বা ভূমিকম্প বিশ্বের কোন না কোন স্থানকে বিধ্বস্ত করছে। যখন এসব কিছুই ঘটছে না তখনো  অতি তীব্র উষ্ণপ্রবাহ বা অতি তীক্ষ্ণ শৈত্যপ্রবাহ বিপর্যস্ত করছে জনগণকে। আবার কখনো এল-নিনো বা লা-নিনার প্রকোপে পৃথিবীর একটি বিস্তীর্ণ অংশ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এসবই আবহাওয়া ও পরিবেশগত কর্মকাণ্ডের ফসল। এসব কর্মকাণ্ড প্রতিদিনের প্রতিক্ষণ থেকে শুরু করে শতকোটি বছরের সমস্ত উপাদানগত ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সুফল বা কুফল মাত্র। পৃথিবীর বায়ুমন্ডল ও সমুদ্রভাগ এসব ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার উৎস। এই দুই পানিবাহী মাধ্যমের মাঝে শক্তি ও বায়বীয় উপাদানসমূহের আদান-প্রদানের মাধ্যমে দৈনন্দিন বায়ুর চাপ, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বৃষ্টিপাত ও বায়ুপ্রবাহ নির্ধারিত হয়। গঠিত হয় নানাবিধ বায়ুমন্ডলীয় বা সাগরমন্ডলীয় অস্থিরতা যা বিবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সূত্রপাত ঘটায়। শেষ বরফ যুগ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে প্রায় ২০ হাজার বছর আগে। সে থেকে এ পর্যন্ত পৃথিবীর বুকে দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে মানবিক কর্মকান্ড। সভ্যতার যত বিকাশ ঘটেছে তত পাল্টেছে পৃথিবীর পরিবেশ। সে সাথে সামঞ্জস্য রেখে পরিবর্তন ঘটেছে আবহাওয়াগত কর্মকাণ্ডেও। তাই মানুষের কর্মকাণ্ডকে আবহাওয়া ও পরিবেশ বিষয়ক যে কোন আলোচনায় গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করতে হচ্ছে ইদানীংকালে। এই প্রবন্ধে বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও মানবিক কর্মকাণ্ড সম্বন্ধে সামান্যতম আলোকপাত করা হয়েছে মাত্র।
স্বাভাবিক আবহাওয়া পরিস্থিতি
পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল হচ্ছে দৈনন্দিন আবহাওয়ার প্রধান সূতিকাগার। সৌরশক্তি পৃথিবীর স্থল ও জলভাগকে উত্তপ্ত করে প্রতিদিন। এই উত্তপ্ততার ঘটনা সবচে বেশি ঘটে বিষুবীয় এলাকায়। কেননা, সূর্য এখানে সবসময়েই লম্বভাবে তার শক্তি বিকিরণ করে। এই সৌরশক্তির দ্বারা সৃষ্ট তাপশক্তি পরিচলন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বায়ুম-লের নিম্নতম অংশ ট্রপোস্ফিয়ারে পৌঁছে। তারপর সেখান থেকে একই প্রক্রিয়ায় ফিরে যায় মহাশূন্যে।
যেহেতু সৌরশক্তির আপতন সবসময়েই বিষুবীয় এলাকায় সর্বাধিক সেহেতু বিষুবীয় এলাকার তাপমাত্রা পৃথিবীর আর অন্য সমস্ত এলাকার চেয়ে সবসময়েই বেশি। আর যেহেতু মেরু এলাকায় সৌরশক্তির বিকিরণ পৃথিবীর মধ্যে সর্বনিম্নতম সেহেতু মেরু এলাকার তাপমাত্রা পৃথিবীর মধ্যে সবচে কম। আর তাই বছরের সবসময়েই বিষুবীয় এলাকায় একটি নিয়ত বায়ুপ্রবাহের সৃষ্টি হয় যা মেরুদ্বয়ের অভিমুখে ধাবিত হয় প্রতিনিয়ত। এতে করে বিষুবীয় এলাকার তাপমাত্রা কমে। আর বৃদ্ধি পায় মেরু এলাকার তাপমাত্রা। ফলে, সমগ্র পৃথিবীতে তাপশক্তি বণ্টনের ভারসাম্য অক্ষুণ্ণে থাকে।
এই বায়ুমন্ডলীয় ক্রিয়াই পৃথিবীতে দৈনন্দিন বায়ুপ্রবাহ, সমুদ্রস্রোত, বাষ্পীভবন ও ঋতুচক্রের নিয়ামক। উল্লেখ্য, বাষ্পীভবনের মাধ্যমেই শোষিত সৌরশক্তির অতিরিক্ত অংশ চলে যায় মহাকাশে। অন্যদিকে জলীয়বাষ্প শীতল হয়ে উদ্ভব ঘটায় মেঘ, বৃষ্টি, তুষারপাত ও কুয়াশার। যেসব গ্যাস প্রচুর পরিমাণে সৌরশক্তি শোষণ করে সেগুলো হচ্ছে জলীয়বাষ্প, কার্বন-ডাই-অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড, মিথেন, ক্লোরোফ্লোরোব্রোমিন ও ওজোন।
এসব গ্যাস সৌররশ্মি থেকে ক্ষতিকর তেজস্ক্রিয় অংশসমূহকে শোষণ করে নেয় বলেই পৃথিবীতে এখনো প্রাণের অস্তিত্ব টিকে রয়েছে।
সূর্য ও পানির ভূমিকা
আমাদের পৃথিবী সৌরজগতের একটি গ্রহ। পৃথিবীর শক্তির মূল উৎস হচ্ছে সূর্য। এছাড়াও পৃথিবীর কেন্দ্রভাগে রয়েছে তার নিজস্ব ভূ-চৌম্বকীয় ক্ষেত্র। এই ক্ষেত্রের শক্তির প্রধানত ব্যয় হয় নিজ অক্ষের চতুর্দিকে দৈনন্দিন ও সূর্যের চতুর্দিকে বার্ষিক আবর্তনের ক্ষেত্রে। তাই সৌরশক্তিকে পৃথিবীর দৈনন্দিন প্রাকৃতিক কর্মকা-ের উৎস হিসেবে ধরে নেয়া চলে। সৌরশক্তির আপতনের তারতম্য ও একে শোষণ করার পার্থক্যের মধ্যেই অন্তর্নিহিত রয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়াগত কর্মকাণ্ডের চাবিকাঠি। এছাড়াও শোষিত সৌরশক্তির পুনর্বিকিরণও বেশকিছু ক্ষেত্রে এসব কর্মকা-কে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। সে সাথে বিভিন্ন সৌর তেজস্ক্রিয়তা, বিশেষত কসমিক রশ্মি আয়নোস্ফিয়ারে বায়ুম-লীয় অস্থিরতার উদ্ভব ঘটায় সৌরকলঙ্কের আধিক্যের সময়।
পানি পৃথিবীর আবহাওয়া ও পরিবেশে আরো ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। পানি ধীরে সৌরশক্তি শোষণ করে বলে ধীরে উত্তপ্ত হয়। সৌরশক্তির দ্বারা উত্তপ্ত সমুদ্রপৃষ্ঠে যে তরঙ্গমালার উদ্ভব ঘটে তা তাপশক্তি বহন করে নিয়ে যায় বিষুবীয় এলাকা থেকে মেরু অঞ্চলে। ফলে, পৃথিবীতে তাপশক্তির বণ্টনের ভারসাম্য রক্ষিত হয়। সৌরশক্তি শোষণের সময় প্রচুর পরিমাণে পানি বাষ্পীভূত হয়। এসব জলীয়বাষ্প ঊর্ধ্বাকাশে আরোহণ করতে থাকে শোষিত তাপশক্তিকে সাথে নিয়ে। আরোহণ কালে জলীয়বাষ্প শীতল হতে হতে তৈরি করে মেঘ, বৃষ্টি ও তুষারকণাকে। অন্যদিকে সুপ্ত তাপশক্তি বাষ্পের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে মিলিয়ে যায় মহাকাশে। আর বৃষ্টি ও তুষারপাতের মাধ্যমে বাষ্পীভূত পানি ফিরে আসে পৃথিবীর বুকে।
এছাড়াও পানি অতি উৎকৃষ্ট একটি দ্রাবক। কার্বন, নাইট্রোজেন, ফসফরাস, সালফার, হাইড্রোজেন, অক্সিজেনের মতো প্রয়োজনীয় গ্যাসসমূহ বিভিন্ন খনিজদ্রব্য এতে দ্রবীভূত হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে পরিবাহিত হওয়ার মাধ্যমে প্রাণের পরিপুষ্টিকে অক্ষুণ্ণ রাখে। পানির প্রবাহ শতকোটি বছর ধরে পৃথিবীর উপরিভাগের গঠনকে বদলে দিচ্ছে বহুভাবে। গত কয়েক দশক ধরে মানুষ ভূগর্ভস্থ পানির স্তরকেও ব্যবহার করছে দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে।
তাই পানির অপর নাম জীবন। কিন্তু পানি মৃত্যুকেও ডেকে নিয়ে আসে কখনো কখনো। পানির ঘাতক রূপকে দেখা যায় খরা ও বন্যার সময়ে।
বায়ুম-লের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া
বায়ুম-ল বিভিন্ন গ্যাস দ্বারা গঠিত। নাইট্রোজেন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, কার্বন-ডাই-অক্সাইড, জলীয় বাষ্পসহ বিবিধ গ্যাস এই বিশাল ম-লকে গঠিত করেছে। এসব গ্যাসের অধিকাংশ রাসায়নিকভাবে সক্রিয়। তাই বায়ুম-লে প্রতিনিয়তই বিভিন্ন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ঘটছে। আর এসব ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া দৈনন্দিন আবহাওয়াগত কর্মকা-কে নিয়ন্ত্রণ করছে ব্যাপকভাবে।
পৃথিবীর বিভিন্ন অংশের মধ্যেকার তাপমাত্রার পার্থক্যের কারণে বায়ুম-লে যে অস্থিরতার উদ্ভব ঘটে তা মূলত তাপশক্তির বণ্টনের বৈষম্যকে দূর করার জন্যই ঘটে থাকে। এসব অস্থিরতার উদ্ভব দৈনন্দিন ভিত্তিতে। এছাড়াও রয়েছে উষ্ণম-লীয় এলাকার নিজস্ব কিছু ঊর্ধ্বমুখী অস্থিরতা। এসব বিশেষ ধরনের অস্থিরতা অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী। মূলত কালবৈশাখী ঝড় ও টর্নেডো এই বিশেষ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত।
প্রধানত সৌরশক্তি আপতনের তারতম্য ও এর শোষণের পার্থক্যই বায়ুম-লীয় ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার উৎস। এছাড়াও স্থল ও বায়ুর মাঝে জলীয়বাষ্পের বণ্টনও এতে প্রভাব বিস্তার করে। এর পাশাপাশি রয়েছে সমুদ্র দ্বারা সৌরশক্তি শোষণ ও এর ফলে সৃষ্ট সমুদ্রতরঙ্গ দ্বারা শোষিত তাপশক্তিকে বণ্টন। এসব কারণেই স্থল ও জলভাগের বিভিন্ন অংশের তাপমাত্রা বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে।
সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো থেকে দেখা গেছে, ভূপৃষ্ঠ থেকে ১০ হাজার ফুট উচ্চতার মধ্যে যেসব মেঘ তৈরি হয় সেগুলো ভূপৃষ্ঠ থেকে তাপশক্তি শুষে নিয়ে পৃথিবীকে শীতল করে। অন্যদিকে ১০ হাজার ফুটের অধিক উচ্চতায় সৃষ্ট মেঘগুলো ভূপৃষ্ঠ থেকে নির্গত তাপশক্তির প্রতিফলনের মাধ্যমে ভূপৃষ্ঠে ফিরিয়ে দিয়ে এর উষ্ণতাকে আরো বাড়িয়ে তোলে।
এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে হয় এল-নিনো ও লা-নিনার কথা। এল-নিনো হচ্ছে পূর্ব বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার সমুদ্রপৃষ্ঠের অত্যধিক উষ্ণপ্রবাহ যা সচরাচর টানা তিনটি মৌসুম জুড়ে অব্যাহত থাকে। প্রতি ২-৭ বছর পরপর এল-নিনোর আগমন ঘটে ঐ এলাকায়। এল-নিনোর সাথে একটি বিশেষ বায়ুম-লীয় ক্রিয়া জড়িত। এই ক্রিয়ার নাম হচ্ছে সাদার্ন অসিলেশন। এর ফলে ইন্দোনেশিয়া ও পেরুর কাছে একটি করে চাপবলয় তৈরি হয়। এরপর এই দু’টি চাপবলয়ের মধ্যে তীব্রগতিতে তাপশক্তির আদান-প্রদান চলতে থাকে। ফলে, ইন্দোনেশিয়া থেকে পেরু পর্যন্ত সমুদ্রভাগে কিছু দক্ষিণমুখী উষ্ণতম সমুদ্রস্রোতের উদ্ভব ঘটে এল-নিনোর সময়কালে। পরিণতিতে, এই অঞ্চলের বায়ুম-ল ও সমুদ্র দুই-ই স্বাভাবিকের চেয়ে উষ্ণতর হয়ে উঠে। অনাবৃষ্টির কারণে দেখা দেয় অস্বাভাবিক একটি খরাকালীন পরিস্থিতি। এই উষ্ণ প্রবাহের কারণে মাছ ও পাখির মৃত্যু ঘটে ব্যাপকভাবে।
অন্যদিকে লা-নিনা হচ্ছে এল-নিনোর বিপরীত একটি বায়ু-সমুদ্রম-লীয় ক্রিয়া। এতে তাপমাত্রা কমে আসে। সমুদ্রপৃষ্ঠ শীতল হয়ে পড়ে। অতিবৃষ্টির কারণে বন্যা দেখা দেয় কখনো কখনো। উল্লেখ্য, এল-নিনোর মতই লা-নিনার প্রভাববলয় হচ্ছে ঐ পূর্ব বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকা।
তবে, এল-নিনো ও লা-নিনা সংঘটিত হবার সঠিক কার্যকারণগুলোকে আবহাওয়া বিজ্ঞানীরা এখনো সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে পারেননি।
সমুদ্রের প্রভাব
সমুদ্র পৃথিবীর আবহাওয়া ও পরিবেশের একটি সক্রিয় অংশ। সমুদ্রপৃষ্ঠ যে সৌরশক্তিকে শোষণ করে তার প্রতিক্রিয়ায় তৈরি হয় সমুদ্রতরঙ্গ। এসব তরঙ্গ বিষুবীয় অঞ্চলে সঞ্চিত তাপশক্তিকে মেরু এলাকার দিকে বয়ে নিয়ে যেয়ে গোটা পৃথিবীর তাপমাত্রার ভারসাম্যকে রক্ষা করে। এছাড়াও সমুদ্র বায়ুম-লে সঞ্চিত ও তাপশক্তিকে শোষণ করে একে শীতল করে তোলে। বিভিন্ন গ্রীনহাউজ গ্যাসকে শোষণ করে বায়ুম-লের গ্যাসীয় গঠনকে যথাযথ রাখতে সাহায্য করে। বাষ্পীভবনের সর্ববৃহৎ উৎস যেমন সমুদ্র, তেমনি বারিবর্ষণের ফলে সৃষ্ট সুবিপুল পানি প্রবাহের শেষ ঠিকানাও এই সমুদ্র। এছাড়াও বিভিন্ন সমুদ্রে বরফ জমাট বাঁধার ফলে প্রতিফলনের মাধ্যমে ভূপৃষ্ঠে আপতিত সৌরশক্তির একটি বড় অংশ ফিরে যায় মহাকাশে।
সমুদ্রে দু’ধরনের প্রবাহ পরিলক্ষিত হয়েছে এ পর্যন্ত। এক, সৌরশক্তি শোষণের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠে তরঙ্গমালার সৃষ্টি হয়। নিকটবর্তী উত্তপ্ত বায়ুম-লে সৃষ্ট বায়ুপ্রবাহের সাহায্যে এসব সমুদ্রতরঙ্গ ধাবিত হয় কাছের উপকূলের দিকে। আবার বাষ্পীভবন ও পানি প্রবাহের আগমনের কারণেও সমুদ্রের উপরিভাগে তরঙ্গের সৃষ্টি হয়। দৈনন্দিন ভিত্তিতে সৃষ্ট এসব তরঙ্গের গভীরতা ৫০-১০০ ফুট মাত্র। দুই, সমুদ্রের গভীর গর্ভে রয়েছে শতকোটি বছরের প্রাচীন বহু ¯্রােতধারা। এসব প্রবাহ শীতল, ধীর গতিসম্পন্ন ও ভারি। মূলত এসব প্রবাহই বিভিন্ন সমুদ্রের বৈশিষ্ট্যকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। উল্লেখ্য যেসব সমুদ্র তুলনামূলকভাবে অগভীর সেসব সমুদ্রে অন্তর্লীন প্রবাহের পরিমাণ সুগভীর সমুদ্রগুলোর তুলনায় নিতান্তই স্বল্প। বঙ্গোপসাগর অগভীর সমুদ্রগুলোর মধ্যে একটি। আর তাই এর সমুদ্রগর্ভে সৃষ্ট গভীর প্রবাহের পরিমাণ নিকটবর্তী ভারত মহাসাগরের তুলনায় খুবই কম।
সমুদ্রে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেমন সাইক্লোন, তৈরি হয় সমুদ্রপৃষ্ঠে যেসব বায়বীয় সামুদ্রিক অস্থিরতা ঘটে তার কারণে। এসব অস্থিরতা ঘটে তাপমাত্রার তারতম্যের কারণে সৃষ্ট লঘুচাপের সুবাদে। এসব লঘুচাপ পড়ন্ত বায়ুচাপের সুযোগ নিয়ে ঊর্ধ্বদিকে বাড়তে থাকে। অন্যদিকে চালক বায়ুপ্রবাহের সাহায্যে সম্মুখপানে অগ্রসর হতে থাকে। লঘুচাপ থেকে সৃষ্ট সাইক্লোন যখন উপকূলভাগের ১০০-১৫০ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে উপস্থিত হয় তখন প্রবল বায়ু প্রবাহের কারণে জলোচ্ছ্বাসের উদ্ভব ঘটে। জলোচ্ছ্বাস সবসময়েই সাইক্লোনের আগে উপকূলে আঘাত হানে। কখনোই পরে আঘাত হানে না। সমুদ্রগর্ভে যেসব স্রোতপ্রবাহ বিরাজমান সেসব প্রবাহের উৎস হচ্ছে সমুদ্র গর্ভে পানির ঘনত্বের তারতম্য। ঘনত্বের পার্থক্য আবার নির্ভর করে দ্রবীভূত খনিজ পদার্থের পরিমাণের উপর। এছাড়াও নিজ অক্ষের চতুর্দিকে পৃথিবীর ঘূর্ণনও এসবস্রোত প্রবাহের উপর প্রভাব বিস্তার করে। তবে কিভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের সাথে সমুদ্রগর্ভের পানি প্রবাহসমূহের সংমিশ্রণ ঘটে তা এখনো জানা যায়নি। কোন কোন সমুদ্রবিজ্ঞানীর মতে, ভূকেন্দ্র থেকে নির্গত তাপশক্তির ফলে সমুদ্রগর্ভের স্রোতধারাগুলো উত্তপ্ত হয়ে উপরে উঠে মিশে যায় সমুদ্রপৃষ্ঠের তরঙ্গমালার সাথে। অন্যরা অবশ্য এই মতবাদকে এখনো মেনে নিতে পারেননি। তবে এক্ষেত্রে প্রচুর গবেষণা চলছে।
কিছু কিছু সমুদ্রে শীতকালে বরফ জমাট বাঁধে। এ ঘটনা ঘটে মূলত উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর নিকটবর্তী সমুদ্রগুলোতে। সমুদ্রে বরফ জমাট বাঁধার ব্যাপারটি দু’টি দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক, মেঘমুক্ত দিনে সমুদ্রপৃষ্ঠের বরফের আচ্ছাদন সৌরশক্তির প্রতিফলক হিসেবে কাজ করে। দুই, শৈত্য প্রবাহের হাত থেকে এসব সমুদ্রগর্ভের জীবজগৎকে রক্ষা করে। অথচ এসব সমুদ্র থেকে যখন হিমশেল উষ্ণতর সমুদ্রে এসে পৌঁছে তখন উষ্ণতর সমুদ্রের জীবজগৎ হঠাৎ করে শীতল পানিপ্রবাহের কারণে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এছাড়াও হিমশৈলের আঘাতে জাহাজডুবির ঘটনাতো রয়েছেই।
ভূ-পৃষ্ঠের ভূমিকা
বায়বীয়-সামুদ্রিক আদান-প্রদানের অন্যতম প্রধান নিয়ামক হচ্ছে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা। ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা আবার প্রভাবিত হয় সৌরশক্তির শোষণ ও এর নির্গমন দ্বারা। শোষিত সৌরশক্তির নির্গমন নির্ভর করে ভূপৃষ্ঠ থেকে বায়ুম-ল পর্যন্ত তাপশক্তির ঊর্ধ্বমুখী পরিবহনের উপর। জলভাগের চেয়ে স্থলভাগ দ্রুততর হারে সৌরশক্তি শোষণ করে। তাই স্থলভাগ অধিক দ্রুত উত্তপ্ত হয়। আবার দিনের অবসানে শীতলও হয় অতি দ্রুতগতিতে।
এসব কারণেই স্থলভাগে বায়বীয় অস্থিরতার উদ্ভব ঘটে অতি দ্রুতভাবে। উত্তপ্ত বায়ু যেমন দ্রুতগতিতে উপরে উঠতে থাকে, তেমনি শীতল বায়ু দ্রুতগতিতে নিচে নেমে আসতে থাকে। এই উঠানামার ফাঁকে স্থলভাগে লঘুচাপের উদ্ভব ঘটে। এসব লঘুচাপ ঝড়োহাওয়া ও বৃষ্টি সহকারে কালবৈশাখী ঝড় হিসেবে কোনস্থানে আঘাত হানে। কখনো কখনো এসব লঘুচাপ এতোটা শক্তিশালী হয়ে উঠে যে, এসব লঘুচাপের বজ্রমেঘের উচ্চতা বিস্তৃত হয় ২০ হাজার ফুট থেকে ভূপৃষ্ঠ পর্যন্ত। তখন উদ্ভব ঘটে টর্নেডোর। কালবৈশাখী ঝড় সরলপথে অগ্রসর হলেও টর্নেডো আঁকাবাঁকা পথে অগ্রসর হয়। আর সামনে যা কিছু পায় তাকে দুমড়ে মুচড়ে উপরে উঠিয়ে ফেলে দেয় বহুদূরে। কালবৈশাখী ঝড় ও টর্নেডো অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী বলে এসব দুর্যোগের সঠিক পূর্বাভাস প্রদান এখনও সম্ভব হয়নি বিশ্বের কোন আবহাওয়া সংস্থার পক্ষে।
ভূপৃষ্ঠের স্বাভাবিক আবহাওয়া মূলত নির্ভর করে কোন স্থানের মসৃণতা, বনরাজি, উচ্চতা ও প্রতিফলন ক্ষমতার উপর। যে স্থান যতোবেশি মসৃণ সে স্থানে তাপশক্তি শোষণ ও নির্গমনের তারতম্য ততো কম হবে। যতো বেশি বনসম্পদ থাকবে ততো বাড়বে পানি ও কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণের ক্ষমতা। উচ্চতা বেশি হলে উষ্ণ ও শীতল হবার হার বৃদ্ধি পাবে। আর প্রতিফলন ক্ষমতার উপর নির্ভর করবে শোষিত তাপশক্তি নির্গমনের হার।
কোন স্থানে বনসম্পদ কতটুকু তার উপরে নির্ভর করছে ঐ স্থানটি খরা ও বন্যার দ্বারা কি পরিমাণ আক্রান্ত হবে সে ব্যাপারটি। অত্যধিক উষ্ণ প্রবাহের কারণে বায়ুম-ল ও ভূত্বকে সঞ্চিত আর্দ্রতা স্বাভাবিকের চেয়ে ৪০% কম হলে খরার উদ্ভব ঘটে। অন্যদিকে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্¦াভাবিকের চেয়ে বেশি হলেই বন্যার প্রকোপ দেখা দেয় না। বরঞ্চ অতি অল্প সময়ের মধ্যে অধিক বৃষ্টিপাত ঘটলেই বন্যার উদ্ভব ঘটে। অর্থাৎ, বৃষ্টিপাতের অসম ও অত্যধিক প্রাকৃতিক বণ্টনের নামই হচ্ছে বন্যা। বনসম্পদ প্রচুর থাকলে মূলে সঞ্চিত পানি ব্যবহার করে উদ্ভিজ্জ শ্রেণী খরার প্রকোপ কাটিয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে প্রস্বেদন ও বাষ্পীভবনের মাধ্যমে বৃষ্টিপাতের অতিরিক্ত পরিমাণকে সহনীয় মাত্রার মধ্যেও নামিয়ে আনতে পারে। কিন্তু বনসম্পদ না থাকলে খরার সময়ে ভূত্বক অতি দ্রুত আর্দ্রতা হারাবে। আর বন্যার সময়ে খুব তাড়াতাড়ি আর্দ্রতা দ্বারা সম্পৃক্ত হয়ে পড়বে। এছাড়াও চাই পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা। নতুবা, জলাবদ্ধতা ভয়াবহ আকার ধারণ করবে বন্যার সময়ে।
এককথায়, খরা ও বন্যার প্রকোপ কতোটুকু ভয়াবহ হবে তার অনেকখানিই নির্ভর করছে মানবিক কর্মকা-ে উপর।
পরিবেশের কথা
পরিবেশ বলতে আমরা সচরাচর বুঝি মানুষ ও তার চারপাশের জগৎকে। কিন্তু আসলে মানুষ পুরো পৃথিবীর জীবজগতের অংশবিশেষ মাত্র। পৃথিবী সৃষ্টি হবার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৪৫০ কোটি বছর ধরে ক্রমবিবর্তনের মাধ্যমে আজকের এই বিশাল বিশ্ব পরিবেশ গড়ে উঠেছে তিলে তিলে। তবে কখনোই এই প্রক্রিয়া ধারাবাহিকতাকে রক্ষা করতে পারেনি বিভিন্ন প্রাকৃতিক কারণে। পরিবেশ মূলত পৃথিবীর সকল জড় ও জীবের কর্মকা-ের সমষ্টি মাত্র। এসব কর্মকাণ্ডে যে সৌরশক্তি, পানি, অক্সিজেন, কার্বন-ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন, হাইড্রোজেন, সালফার, ফসফরাস, আয়রন, সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম, ক্লোরিন, ব্রোমিনসহ বিভিন্ন ধাতব ও অধাতব উপাদান ব্যবহৃত হয় সে সবের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াই প্রতিদিনের পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণ করছে।
এছাড়াও রয়েছে প্রতিস্তরে সুবিন্যস্ত পরিবেশ চক্র। এই চক্রের একেবারে নিচের স্তরে রয়েছে আদিম এককোষী জীব। আর সবচে উপরের স্তরে রয়েছে তুলনামূলকভাবে আধুনিক বহুকোষী জীব। কোন স্তরের জীবসংখ্যা বৃদ্ধি পেলে তার নিচের স্তরের বিলুপ্তি ঘটতে শুরু করবে যুক্তিসঙ্গতভাবেই। কেননা, পরিবেশ চক্র মূলত প্রাকৃতিক খাদ্যচক্র বৈ আর কিছুই নয়। আবার কোন স্তরের বিলুপ্তি ঘটলে উচ্চতর স্তরের জীবসমূহ হুমকির সম্মুখীন হবে একই কারণে।
তবে উপাদানের ঘাটতি বা প্রাচুর্য পরিবেশ চক্রকে বিঘ্নিত করে আরো মারাত্মকভাবে। যদি সমুদ্রের পানিতে নাইট্রোজেনের আধিক্য ঘটে তাহলে সমুদ্রের জীবজগৎ বিলুপ্তির সম্মুখীন হবে। আবার স্থলভাগে পানির ঘাটতি দেখা দিলে ডাঙ্গার জীবজগতের অস্তিত্ব হুমকির মুখোমুখি দাঁড়াবে। এককথায়, পৃথিবীর পরিবেশকে অক্ষুণœ রাখতে হলে সঠিক স্থানে সঠিক সময়ে সঠিক পরিমাণে সবক’টি উপাদানের সরবরাহ বজায় থাকতে হবে।
সমুদ্র ও পরিবেশ
পৃথিবীর পরিবেশগত ক্ষেত্রে সমুদ্রের এক সুবিশাল ভূমিকা রয়েছে। পৃথিবীর কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও খনিজ সম্পদের চাহিদার ৯০% এর যোগান আসে সমুদ্র থেকে। অন্যদিকে পৃথিবীতে যে পরিমাণ সৌরশক্তি আপতিত হয় তার ৫০% ই শোষণ করে সমুদ্র। বায়ুম-লে সঞ্চিত কার্বন-ডাই-অক্সাইড এর ৮০% ই সমুদ্র শুষে নেয়। পৃথিবীতে তাপশক্তির পরিবাহকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সমুদ্র বিশ্বের কার্বন বাজেটকেও সুষম রাখতে সাহায্য করে। এছাড়াও, সমুদ্রগর্ভে জীবজগতের বৈচিত্র্যের কারণে সমুদ্র বায়ুম-ল থেকে যেমন বহুবিধ উপাদান শোষণ করে তেমনি বায়ুম-লে নানা রকম উপাদানও ফেরৎ দেয়। এতে করে বায়ুম-লের উপাদানগত গঠন অক্ষুণœ থাকে।
তবে সামুদ্রিক জীবজগতের স্বাভাবিক কর্মকা- ব্যাহত হলে উপরে উল্লিখিত কাজগুলো বিঘিœত হবে স্বাভাবিকভাবেই। সামুদ্রিক জীবজগতের একটি বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে ফাইটোপ্লাঙ্কটন। এসব এককোষী জীব আবার সামুদ্রিক অস্থিরতার পরিমাণ স্বাভাবিক পর্যায়ে থাকে তাহলে প্লাঙ্কটন কলোনীগুলো নিজেদের স্বাভাবিক কর্মকা- বজায় রাখতে পারে। নতুনা, ধ্বংসের সম্মুখীন হয়।
প্লাঙ্কটনদের বিলুপ্তি ঘটলে সমুদ্রের পানিতে নাইট্রোজেনের পরিমাণ বাড়ে। কমে কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করার ক্ষমতা। এতে করে সামুদ্রিক জীবজগতের অস্তিত্ব মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়ে।
স্থলভাগের পরিবেশ
স্থলভাগের পরিবেশ মূলত কিছু শর্তের উপর নির্ভর করে। এক, কিছু আবহাওয়াগত উপাদান যেমন সূর্যকিরণ, তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাত এই পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণ করে। দুই, বায়ুম-লীয় দু’টি গ্যাস কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও নাইট্রোজেনের উপর স্থলভাগের পরিবেশ ব্যাপকভাবে নির্ভর করে। তিন, মাটিতে সঞ্চিত বিভিন্ন উপাদান স্থল পরিবেশকে পুষ্টির যোগান দেয়। চার, ভূভাগের উচ্চতা, ঢাল ও মাটির প্রকৃতি যথেষ্টভাবে পরিবেশের বৈশিষ্ট্যকে চিহ্নিত করে।
কখনো কখনো স্থল-পরিবেশ ব্যাপক ধ্বংসের সম্মুখীন হয়। এর জন্য কিছু কারণকে চিহ্নিত করেছেন পরিবেশ বিজ্ঞানীরা। এক, মাটির তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়া। দুই, মাটির আর্দ্রতা কমে যাওয়া। তিন, দ্রুত পচন ঘটা। চার, প্রজননশক্তি হ্রাস পাওয়া। পাঁচ, ভূমিক্ষয় বৃদ্ধি পাওয়া। ছয়, বিভিন্ন ধাতব ও অধাতব উপাদানের যোগান কমে যাওয়া।
স্থল-পরিবেশকে পানির ঘাটতি ও প্রাচুর্য দুই-ই প্রভাবিত করে। পানির ঘাটতি অব্যাহত থাকলে ক্ষুদ্রশ্রেণীর গাছগুলো দ্রুত বিলুপ্ত হতে থাকে। আবার পানির যোগান অতিরিক্ত হলে এ ধরনের উদ্ভিদগুলো মৃত্যুবরণ করতে থাকে। এ ধরনের পরিবেশে বৃহদাকার টিকে থাকে মাটির নিচে বহুদূর বিস্তৃত শেকড় থাকার কারণে।
আবহাওয়া ও পরিবেশ
যুক্তিসঙ্গত কারণেই পৃথিবীর আবহাওয়া ও পরিবেশের মধ্যে সম্পর্ক বিরাজ করছে সুগভীরভাবে। প্রতিবছর কার্বন-ডাই-অক্সাইড ০.৪%, নাইট্রাস অক্সাইড ০.৩%, মিথেন ১% ও অন্যান্য গ্রীনহাউজ গ্যাস ৫% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে পৃথিবীর বায়ুম-লে। ফলে, পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সে সাথে বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। অন্যদিকে বায়ুম-লের ওজোন স্তর ক্ষয় পাচ্ছে ক্রমান্বয়ে। এর সাথে পাল্লা দিয়ে পৃথিবীর আবহাওয়াতে দেখা দিচ্ছে নানারকম পরিবর্তন। গ্রীষ্মকালে উষ্ণপ্রবাহ তীব্রতর হয়ে উঠায় খরার প্রকোপে আক্রান্ত হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন অংশ। এতে শস্য ও জীবহানি দুই-ই ঘটছে। বাষ্পীভবন ও বরফ গলনের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্ষাকালে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বাড়ছে। বন্যাও একইসাথে প্রলয়ংকরী রূপ ধারণ করতে শুরু করছে। বাড়ছে সাইক্লোনও টর্নেডোর ভয়াবহতা। ভূগর্ভ থেকে ব্যাপকভাবে পানি ও খনিজ সম্পদ উত্তোলনের ফলে ভূমিকম্পের তীব্রতাও বাড়ছে। সে সাথে কুয়াশার ঘন আবরণের কারণে শৈত্যপ্রবাহ আরো তীক্ষ্ণ হয়ে উঠছে। দেখা দিচ্ছে আরসেনিক দূষণের অভিশাপ। এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামী শতাব্দীর শেষার্ধে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে পৃথিবী।
চাই সুন্দর একটি ভবিষ্যৎ
যদি তাই-ই ঘটে তাহলে মানুষকে দায়ী করতে হবে সর্বাগ্রে। শিল্প বিপ্লবের পর থেকে এ পর্যন্ত জীবনযাত্রাকে অত্যাধুনিক করার জন্য যা কিছু করা হয়েছে তারই নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পড়েছে পৃথিবীতে। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি দহনের কারণে যে পরিমাণ কাবর্ন-ডাই-অক্সাইড সঞ্চিত হচ্ছে বায়ুমন্ডলে তা শোষণ করার ক্ষমতা সমুদ্রের নেই। এই গ্যাস ঊর্ধ্বাকাশে উঠে ক্রমান্বয়ে ধ্বংস করছে ওজোন স্তরকে। ফলে, সৌরশক্তির তেজস্ক্রিয়তা বাড়ছে। বৃদ্ধি পাচ্ছে সৌর তাপশক্তির পরিমাণ।
অধিক খাদ্য উৎপাদনের জন্য প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক সার ব্যবহৃত হচ্ছে জমিতে। এসব সার মাটির উর্বরতাকে কমাচ্ছে। দূষিত করে তুলছে চারপাশের পরিবেশকে। উচ্চ ফলনশীল বীজ ক্রমান্বয়ে তৈরি করার ফলে বহু প্রজাতির উদ্ভিদ লোপ পাচ্ছে পৃথিবী থেকে। এতে পরিবেশ চক্র ক্ষুণ্ণ হচ্ছে প্রতিদিনই।
ভূগর্ভস্থ পানির যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে আরসেনিক দূষণ মহামারীর আকার ধারণ করতে শুরু করেছে। পৃথিবী হচ্ছে বন ও বন্যপ্রাণী শূন্য। অর্থাৎ, মানুষের কর্মকাণ্ড এমন একটি পরিবেশকে তৈরি করছে যেখানে থাকবে শুধু মানুষ ও তার প্রয়োজনীয় কিছু প্রাকৃতিক উপাদান। এটা আর যাই হোক না কেন সুষ্ঠু পরিবেশ নয় মোটেও।
তাই চাই সুস্থ একটি পরিবেশ, সুন্দর একটি ভবিষ্যৎ, নির্মল একটি পৃথিবী। যেখানে মানুষ পৃথিবীর নিয়ন্ত্রক হিসেবে নয়, এর সদস্য হিসেবে বিরাজ করবে।
এই পরিবেশ চাই মানুষেরই স্বার্থে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ