ঢাকা, বুধবার 13 June 2018, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২৭ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বাজেটে প্রযুক্তি খাত উপেক্ষিত

জাফর ইকবাল : বৃহস্পতিবার (৭ জুন) জাতীয় সংসদে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এই বাজেটে এবার প্রযুক্তি খাতের কিছু ক্ষেত্রে কমিয়ে আনা হয়েছে কর, কিছু ক্ষেত্রে আবার নতুন করে কর বসানো হয়েছে। তবে এর সাথে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঘোষিত বাজেটে তথ্য প্রযুক্তি খাতকে উপেক্ষিত রাখা হয়েছে। অথচ এই সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।
বাজেটে তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর সেবার উপর ৪.৫ শতাংশ এর স্থলে পাঁচ শতাংশ হারে মূসক বা ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের জন্য মোট ৬,০৬৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করেছেন তিনি।
প্রযুক্তি খাতে উল্লেখযোগ্য প্রস্তাবগুলো- অনলাইন প্লাটফর্ম বা সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে পণ্য বা সেবা কেনা-বেচায় পাঁচ শতাংশ হারে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।  ফেইসবুক, গুগল আর ইউটিউবের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে বাংলাদেশে করা আয়ের উপর কর আরোপের আইন সংযোজন করার কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী। রাইড শেয়ারিং বা অ্যাপভিত্তিক পরিবহন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়ে পাঁচ শতাংশ ভ্যাট বসানো হবে।
এক্ষেত্রে রাইড শেয়ারিং সেবাদাতা চালকের ভ্যাট দিতে হবে না। এই ভ্যাট আরোপ হবে এই সেবামূল্য থেকে সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান যে লাভ করছে তার উপর।
দেশে মোবাইল ফোন উৎপাদন কার্যক্রমকে প্রণোদনা দিতে ‘মোবাইল টেলিফোন সেট’কে উৎপাদন পর্যায়ে মূসক অব্যাহতি সুবিধা দিতে একটি আলাদা প্রজ্ঞাপন জারির প্রস্তাব করেন মুহিত। সেলুলার ফোন উৎপাদনে প্রয়োজনীয় কতিপয় কাঁচামালে শুল্ক হ্রাসের প্রস্তাব করেছেন তিনি।
স্থানীয় মোবাইল উৎপাদনের উপর সারচার্জ অব্যাহতি সুবিধা প্রদান করে আমদানি পর্যায়ে ২ শতাংশ সারচার্জ আরোপের প্রস্তাব আনা হয়েছে। মোবাইল ফোন উৎপাদনে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ধরনের কাঁচামাল আমদানিতে সর্বোচ্চ ২৫ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দিতে হচ্ছে, এ শুল্ক অধিকাংশ পণ্যের ক্ষেত্রে এক শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে।
ডেটাবেইস, প্রডাক্টিভিটি সফটও্য়্যার, যোগাযোগে ব্যবহৃত সফটওয়্যার, স্বয়ংক্রিয় ডেটা প্রসেসিং মেশিনে ব্যবহৃত সফটওয়্যার, অপারেটিং সিস্টেমের মতো এমন সফটওয়্যার আমদানিতে সবখাতে সম্পূরক শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে পাঁচ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সেইসঙ্গে এই খাতে বর্তমানে ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর অব্যাহতির কথাও বলা হয়েছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১২,২০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখেন অর্থমন্ত্রী। “ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বিজ্ঞান শিক্ষায় আগ্রহ বৃদ্ধির লক্ষ্যে জেলা পর্যায়ে চলমান বিজ্ঞানবিষয়ক কুইজ প্রতিযোগিতার কলেবর বৃদ্ধি করে উপজেলা পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা হয়েছে” বলে জানান তিনি। সেই সঙ্গে খুলনা, বরিশাল, রংপুর, ময়মনসিংহ এবং চট্টগ্রাম বিভাগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটারের শাখা স্থাপন কাজ চলছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, এ ছাড়াও বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর)-কে একটি সেন্টার অফ এক্সিলেন্স এবং সেন্টার ফর টেকনোলজি ট্রান্সফার অ্যান্ড ইনোভেশন হিসেবে রূপান্তর করা হচ্ছে।” পারমাণবিক নিরাপত্তা ও পারমাণবিক বিকিরণ থেকে সুরক্ষার জন্য বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের অবকাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
প্রস্তাবিত বাজেট প্রযুক্তিবান্ধব নয়:  বাজেট প্রযুক্তিবান্ধব নয় বলে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বেসিস ও আইটি অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা। জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে সাংবাদিক সম্মেলন তারা এ অসন্তোষের কথা জানান। বাংলাদেশ অ্যাসোশিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবির বলেন, বাংলাদেশে উৎপাদিত হয় এমন সফটওয়্যারও বিদেশ থেকে আমদানি করা হবে। এটি আইটি শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। বৃহস্পতিবার (৭ জুন) জাতীয় সংসদে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত।
নতুন এই বাজেট বাস্তবায়িত হলে কম্পিউটারের মূল্য ১১ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন আলমাস কবির। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বেসিস সিনিয়র সভাপতি ফারহানা রহমান, বিসিএস সভাপতি প্রকৌশলী সুব্রত সরকার, মহাসচিব মোশারফ হোসেন সুমন প্রমুখ।
২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের সঙ্গে জারিকৃত মূল্য সংযোজন কর অব্যাহতি সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন-১৬৮ এর কয়েকটি শর্ত দেশে মোবাইল হ্যান্ডসেট সংযোজন ও উৎপাদন শিল্পের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাই প্রজ্ঞাপনটিতে বাস্তবসম্মত শর্ত অন্তর্ভুক্ত করা এবং সংযোজন শিল্পকে ভ্যাটমুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ মোবাইল ফোন ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা। শনিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারের একটি হোটেলে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে সংগঠনটির পক্ষ থেকে এই আহ্বান জানানো হয়। লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বিএমপিআইএ-এর সভাপতি রুহুল আলম আল মাহাবুব।
তিনি বলেন, গত বছর প্রজ্ঞাপন জারি করে এ বছরই বিপরীত প্রজ্ঞাপন জারি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি করেছে। বর্তমান বিশ্বেও সব মোবাইল প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোই একটি পূর্ণাঙ্গ মোবাইল ফোন তৈরির জন্য অনেকগুলো সহযোগী শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে যন্ত্রাংশ নিয়ে তা সংযোজন করে নিজস্ব ব্র্যান্ড-এর মোবাইল উৎপাদন করে থাকে। বর্তমান বাজেট মোবাইল ফোন সংযোজন ও উৎপাদন শিল্পের জন্য সহায়ক লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, প্রস্তাাবিত বাজেটের সঙ্গে জারিকৃত মূল্য সংযোজন কর অব্যাহতি সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন-১৬৮ এর কয়েকটি শর্ত দেশে মোবাইল হ্যান্ডসেট সংযোজন ও উৎপাদন শিল্পের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
প্রজ্ঞাপনের শর্ত (ক)-তে বলা হয়েছে ‘সংযোজন প্রতিষ্ঠান ব্যতীত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ইহা প্রযোজ্য হইবে’। এই শর্ত অনুযায়ী শুধুমাত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ভ্যাটের আওতামুক্ত থাকবে, সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠান নয়। অথচ অর্থ বছরের বাজেটের সময় জারি করা প্রজ্ঞাপনে সংযোজন এবং উৎপাদনকারী উভয় প্রতিষ্ঠানকেই ভ্যাটের আওতা মুক্ত রাখা হয়েছিল।
বাজেট বিষয়ে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি সেবার ওপর ভ্যাট বাড়লেও ইন্টারনেট সেবার ওপর বিদ্যমান ১৫ শতাংশ ভ্যাট কিছুটা কমার প্রস্তাবনা আসতে পারে। এটি অবশ্যই আশার খবর। প্রযুক্তি খাতের ব্যবসায়ি 'ডি-টেক ইনফো' এর স্বত্বাধিকারী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, তথ্য প্রযুক্তির কোনো খাতেই ভ্যাট বাড়ানো ঠিক না। এতে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার অন্তরায় হবে। আমরা সরকারের প্রযুক্তি বিপ্লবের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করতে চাই।
এদিকে দীর্ঘদিন যাবত ইন্টারনেট ব্যবহারকারী, মোবাইল ফোন অপারেটর ও এ ব্যবসায় জড়িতরা ইন্টারনেটের ওপর থেকে ভ্যাট সম্পূর্ণ তুলে নেয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন অনেক দিন আগে থেকে। অর্থমন্ত্রী কিছুদিন আগে বিষয়টি বিবেচনা করা হবে সংশ্লিষ্টদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ